দুর্গাপূজা (Durga Puja)

২০২৩ সালের দুর্গাপূজা (Durga Puja) -র নির্ঘন্ট। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা প্রসঙ্গে দুর্গাপূজার সময়কাল, দশ দিনের দুর্গাপূজা, পনেরো দিনের দুর্গাপূজা, দুর্গাপূজার সূচনা ও শেষ দিন।

ঐতিহ্যের দুর্গাপূজা, বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যে দুর্গাপূজা, দুর্গাপূজা পদ্ধতির উপকরণ, দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি, কলকাতার পারিবারিক দুর্গাপূজা, বারোয়ারি দুর্গাপূজা, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাবনায় দেবী দুর্গা, বিভিন্ন সংঘের দুর্গাপূজা, দুর্গাপূজা উপলক্ষে শোক পালন, অকাল বোধন দুর্গাপূজা।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা সম্পর্কে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের বর্ণনা, দেবীভাগবত পুরাণের বর্ণনা, পৌরাণিক কাহিনী, রাজা সুরথের গল্প, মধুকৈটভের কাহিনী, মহিষাসুরের কাহিনী, শুম্ভনিশুম্ভ বধের কাহিনী, দুর্গাপূজা সম্পর্কে কালিকা পুরাণের বর্ণনা, দুর্গাপূজা সম্পর্কে কৃত্তিবাসী রামায়ণের বর্ণনা, দুর্গাপূজায় মন্ত্রের গুরুত্ব, দূর্গাপূজায় ভাবগম্ভীর পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি, দূর্গাপূজায় প্রচলিত দেবী দুর্গার ধ্যানমন্ত্র, দুর্গাপূজায় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার মন্ত্র, দূর্গাপূজায় দেবী দুর্গা প্রণাম মন্ত্র।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা (Durga Puja is the best Bengali festival)

দূর্গাপূজায় প্রতিমা তত্ত্ব, দুর্গা মূর্তি, সিংহ মূর্তি, মহিষাসুর মূর্তি, গণেশ মূর্তি, মূষিক মূর্তি, লক্ষ্মী মূর্তি, পেচক মূর্তি, সরস্বতী মূর্তি, হংস মূর্তি, কার্তিক মূর্তি, ময়ূর মূর্তি, দুর্গাপূজার অন্যতম উপাদান বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা, দুর্গাপূজার সূচনা মহালয়া থেকে, দুর্গা ষষ্ঠী, দুর্গা সপ্তমী, মহাস্নান, দুর্গা অষ্টমী, দুর্গাপূজার সময় কুমারী পূজা, দুর্গাপূজায় সন্ধিপূজা, দুর্গা নবমী, দুর্গাপূজায় দশমী পূজা, দুর্গাপূজায় অপরাজিতা পূজা, পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা উদযাপন, বাংলাদেশে দুর্গাপূজা উদযাপন, বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজা, কালীঘাট মন্দিরে দুর্গাপূজা, বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা, বিষ্ণুপুর মৃন্ময়ী মন্দিরে দুর্গাপূজা, নতুন দিল্লির কালীবাড়ির দুর্গাপূজা, ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দুর্গাপূজা, বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজার সূচনা, দুর্গাপূজা উপলক্ষে কুমোরটুলির সংস্কৃতি, জনপ্রিয় মাধ্যমে দুর্গাপূজা।

উৎসবদুর্গাপূজা
অন্য নামদুর্গোৎসব, শারদীয়া দুর্গাপূজা, শারদোৎসব, দেবীপক্ষ, অকালবোধন,
মহাপূজা (শরৎকালীন দুর্গাপূজা), বাসন্তী পূজা (বসন্তকালীন দুর্গাপূজা), নবরাত্রি
ধরণধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব
পালনহিন্দু সম্প্রদায়
সংঘটনবার্ষিক
সূচনামহালয়া
সমাপ্তিবিজয়া দশমী
সম্পর্কিতমহালয়া, নবরাত্রি, দশেরা, কোজাগরী লক্ষ্মী পূজা

ভূমিকা:- দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে ভারত উপমহাদেশে প্রচলিত একটি হিন্দু ধর্মীয় উৎসব হল দুর্গা পূজা। এই উৎসব সারা বিশ্বে হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বারা পালিত হলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ওড়িশা, বিহার, ত্রিপুরা, ঝাড়খন্ড, উত্তর প্রদেশ এবং বাংলাদেশে ঐতিহ্যগত বিশেষভাবে উদযাপিত হয়।

দুর্গাপূজার সময়কাল

বাংলা বর্ষপঞ্জির আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশম দিন পর্যন্ত শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচ দিন যথাক্রমে ‘দুর্গাষষ্ঠী‘, মহাসপ্তমী‘, ‘মহাঅষ্টমী‘, ‘মহানবমী’ ও ‘বিজয়াদশমী’ নামে পরিচিত।

দশ দিনের দুর্গাপূজা

দুর্গাপূজা মূলত দশ দিনের উৎসব, যার মধ্যে শেষ পাঁচ দিন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আশ্বিনের নবরাত্রির পূজা শারদীয় পূজা এবং বসন্তের নবরাত্রির পূজা বাসন্তিক বা বসন্তকালীন দুর্গাপূজা নামে পরিচিত।

নবরাত্রি

পনেরো দিনের দুর্গাপূজা

  • (১) কোথাও কোথাও পনেরো দিন ধরেই দুর্গাপূজা পালিত হয়। সেক্ষেত্রে মহালয়ার আগের নবমী তিথিতে পূজা শুরু হয়ে যায়। এক্ষেত্রে বলা দরকার যে, কালিকা পুরাণে বলা হয়েছে, অষ্টাদশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী উগ্রচণ্ডা তথা দশভুজার বোধন করা হবে কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে, ষোড়শভুজা ভগবতী ভদ্রকালীর বোধন করা হবে কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশীতে।
  • (২) আবার চতুর্ভুজা ও দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী বিগ্রহের বোধন করা হবে যথাক্রমে শুক্ল প্রতিপদে এবং শুক্লা ষষ্ঠীতে। আবার মহাকাল সংহিতার বিধানে প্রতিমাভেদে উগ্রচণ্ডার কৃষ্ণনবম্যাদিকল্পে, ভদ্রকালীর প্রতিপদাদি কল্পে ও কাত্যায়নী দুর্গার ষষ্ঠ্যাদি কল্পে পূজার অনুষ্ঠান বিধেয়।

দুর্গাপূজার সূচনা ও শেষ দিবস

আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় ‘দেবীপক্ষ’। দেবীপক্ষের সূচনায় যে অমাবস্যা তার নাম মহালয়া; এই দিন সনাতনীরা তর্পণ করে তাদের পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। দেবীপক্ষের শেষ দিনটি হল কোজাগরী পূর্ণিমা। এই দিন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দেবী লক্ষ্মীর পূজা করা হয়।

ঐতিহ্যের দুর্গাপূজা

২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতার দুর্গাপূজা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় যুক্ত করা হয়।

বিভিন্ন দেশ ও রাজ্যে দুর্গাপূজা

  • (১) দুর্গাপূজা ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল সহ ভারতীয় উপমহাদেশ ও বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রে পালিত হয়ে থাকে। তবে সনাতনী বাঙালীর প্রধান উৎসব হওয়ার জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড রাজ্য ও বাংলাদেশে দুর্গাপূজা বিশেষ জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়।
  • (২) এমনকি ভারতের আসাম, বিহার, ঝাড়খণ্ড, মণিপুর এবং ওড়িশা রাজ্যেও দুর্গাপূজা মহাসমারোহে পালিত হয়ে থাকে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যে প্রবাসী বাঙালি সনাতনীরা ও স্থানীয় জনসাধারণ নিজ নিজ প্রথা অনুযায়ী শারদীয়া দুর্গাপূজা বা নবরাত্রি উৎসব পালন করে।
  • (৩) পাশ্চাত্য দেশগুলিতে কর্মসূত্রে বসবাসরত বাঙালি হিন্দুরাও দুর্গাপূজা পালন করে থাকেন। ২০০৬ সালে ইংল্যান্ড -এর রাজধানী লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গ্রেট হলে ‘ভয়েসেস অফ বেঙ্গল’ মরসুম নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অঙ্গ হিসেবে স্থানীয় বাঙালি সনাতনী অভিবাসীরা ও জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এক বিরাট দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।

দূর্গাপূজা পদ্ধতির উপকরণ

  • (১) পশ্চিমবঙ্গ তথা বাংলাদেশ, আসাম, বিহার, উড়িষ্যায় প্রচলিত ‘দুর্গোৎসব’ সাধারণত কালিকাপুরাণে বর্ণিত পদ্ধতি নির্ভর, তবে বলা হয়ে থাকে যে, বাংলায় দুর্গোৎসব মূলতঃ বৃহন্নন্দীকেশ্বর পুরাণ, কালিকা ও দেবী পুরাণে বিবৃত রীতি অনুযায়ী তিনটি ভিন্নধারায় সম্পন্ন হয়।
  • (২) অনেক সময় আবার মহাকাল সংহিতায় বর্ণিত পদ্ধতির কদাচিৎ অনুসরণ করা হয়, যা তান্ত্রিক দুর্গোৎসব নামে পরিচিত। পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতির জন্য অবশ্য স্মার্ত রঘুনন্দনের দুর্গোৎসবতত্ত্ব ও তিথিতত্ত্বের অনুসরণ করা হয়।
  • (৩) ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী বা শূলপাণি রচিত দুর্গোৎসববিবেক প্রভৃতি স্মৃতিভাষ্য বা মহাকালসংহিতা বা কালীবিলাস তন্ত্র বর্ণিত পদ্ধতিরও অনুসরণ করা হয়। আবার বিহারে দুর্গোৎসব মূলতঃ দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনী অনুসারে নিষ্পন্ন হয়।

দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি

পশ্চিমবঙ্গের বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির এবং অনেক পরিবারে এই রীতি প্রচলিত আছে। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে দুর্গাসপ্তমী থেকে বিজয়াদশমী পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে দুর্গাসপ্তমী থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা পর্যন্ত এবং অন্যান্য সরকারি ক্ষেত্রে চার দিন ছুটি থাকে। বাংলাদেশে বিজয়াদশমীতে সর্বসাধারণের জন্য এক দিন সরকারি ছুটি থাকে।

কলকাতার পারিবারিক দুর্গাপূজা

পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা সাধারণত ধনী পরিবারগুলোতেই আয়োজিত হয়। কলকাতা শহরের পুরনো ধনী পরিবারগুলির দুর্গাপূজা ‘বনেদি বাড়ির পূজা’ নামে পরিচিত। পারিবারিক দুর্গাপূজাগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়। পূজা উপলক্ষে বাড়িতে আত্মীয়-সমাগম হয়ে থাকে।

বারোয়ারি দুর্গাপূজা

  • (১) আঞ্চলিক স্তরে এক একটি অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তা বারোয়ারি পূজা বা সর্বজনীন পূজা নামে পরিচিত। ভারতে ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সময় সর্বজনীন পূজা শুরু হয়। প্রধানত দেবী দুর্গাকে মাথায় রেখেই দেশমাতা বা ভারতমাতা বা মাতৃভূমির জাতীয়তাবাদী ধারণা বিপ্লবের আকার নেয়।
  • (২) সুভাষচন্দ্র বসু প্রমুখ বিল্পবী ও জাতীয়তাবাদী নেতারা বিভিন্ন সর্বজনীন পূজার সঙ্গে যুক্ত থাকতেন। এখন সর্বজনীন পূজায় ‘থিম’ বা নির্দিষ্ট বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপ, প্রতিমা ও আলোকসজ্জার প্রবণতা দেখা যায়। থিমগুলোর শ্রেষ্ঠত্ব বিচার করে বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকে ‘শারদ সম্মান’ নামে বিশেষ পুরস্কারও দেওয়া হয়।

বঙ্কিমচন্দ্রের ভাবনায় দেবী দুর্গা

দেবী দুর্গার ভাবনা থেকেই বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বন্দেমাতরম গানটি রচনা করেন, যা ভারতের স্বাধীনতা-আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্র।

বিভিন্ন সংঘের দুর্গাপূজা

হাওড়ার কাছে বেলুড় নামক স্থানে অবস্থিত বেলুড় মঠ সহ রামকৃষ্ণ মিশন ও মঠ -এর বিভিন্ন শাখাকেন্দ্র এবং ভারত সেবাশ্রম সংঘের বিভিন্ন কেন্দ্রের সন্ন্যাসীরা দুর্গাপূজার আয়োজন করেন।

দূর্গাপূজা উপলক্ষে শোক পালন

ঝাড়খন্ডের নিকটবর্তী পুরুলিয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর থেকে উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ির চা-বাগানে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী অসুর জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা এই সময়টা শোক হিসেবে পালন করে।

অকাল বোধন দুর্গাপূজা

  • (১) শারদীয়া দুর্গাপূজাকে ‘অকালবোধন‘ বলা হয়। কালিকা পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণ অনুযায়ী, শ্রীরাম ও দশানন রাবণের যুদ্ধের সময় শরৎকালে দুর্গার পূজা করা হয়েছিল। হিন্দুশাস্ত্র অনুযায়ী, শরৎকালে দেবতারা নিদ্রায় থাকেন। তাই এই সময়ে তাদের পূজা করার যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজা বলেই এই পূজার নাম হয় ‘অকালবোধন’।
  • (২) উপরের দুই পুরাণ অনুযায়ী, রামকে সাহায্য করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝা তার রামায়ণে লিখেছেন, রাম স্বয়ং দুর্গার বোধন ও পূজা করেছিলেন। তবে রামায়ণের প্রকৃত রচয়িতা বাল্মীকি মুনি রামায়ণে রামচন্দ্রের দুর্গাপূজার কোনো উল্লেখ করেন নি।
  • (৩) রামায়ণ -এর অন্যান্য অনুবাদেও এর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না। তবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী স্মৃতিশাস্ত্র গুলিতে শরৎকালে দুর্গাপূজার বিধান দেওয়া হয়েছে। হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে,

“অকালবোধন শরতে বৈদিক যজ্ঞের আধুনিক রূপায়ণ ছাড়া আর কিছুই না।”

দুর্গাপূজা সম্পর্কে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণের বর্ণনা

  • (১) ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে কৃষ্ণকে দুর্গাপূজার প্রবর্তক বলা হয়েছে। বিভিন্ন দেবদেবীরা কীভাবে দুর্গাপূজা করেছিলেন, তার বর্ণনা এই পুরাণে পাওয়া যায়। তবে এই প্রসঙ্গে কোনো পৌরাণিক গল্পের বিস্তারিত বর্ণনা এখানে দেওয়া হয় নি।
  • (২) এই পুরাণের্ বলা হয়েছে যে, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মা দ্বিতীয় দুর্গাপূজা করেছিলেন। ত্রিপুর নামে এক অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে মহাদেব বিপদে পড়ে তৃতীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন।
  • (৩) দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র চতুর্থ দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। এরপর থেকেই পৃথিবীতে মুনি, ঋষি, সিদ্ধপুরুষ, দেবতা ও মানুষেরা নানা দেশে নানা সময়ে দুর্গাপূজা করে আসছেন।

দুর্গাপূজা সম্পর্কে দেবীভাগবত পুরাণের বর্ণনা

  • (১) শাক্তধর্মের অন্যতম প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল দেবীভাগবত পুরাণ। এই পুরাণ অনুযায়ী, ব্রহ্মার মানসপুত্র মনু পৃথিবীর শাসক হয়ে ক্ষীরোদসাগরের তীরে মাটির মূর্তি তৈরি করে দেবী দুর্গার পূজা করেন। এই সময় তিনি ‘বাগ্‌ভব’ বীজ জপ করতেন এবং আহার ও শ্বাস গ্রহণ ত্যাগ করে এক পায়ে দাঁড়িয়ে একশো বছর ধরে ঘোর তপস্যা করেন।
  • (২) এর ফলে তিনি শীর্ণ হয়ে পড়লেও কাম ও ক্রোধ জয় করতে সক্ষম হন এবং দুর্গানাম চিন্তা করতে করতে সমাধির প্রভাবে স্থাবরে পরিণত হন। তখন দুর্গা প্রীত হয়ে তাকে বর দিতে আসেন। মনু তখন দেবতাদেরও দুর্লভ একটি বর চাইলেন। দুর্গা সেই প্রার্থনা রক্ষা করেন। সেই সঙ্গে দুর্গা তার রাজ্যশাসনের পথ নিষ্কণ্টক করেন এবং মনুকে পুত্রলাভের বরও দেন।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা সম্পর্কে পৌরাণিক কাহিনী

দেবী দুর্গা ও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যতগুলি পৌরাণিক গল্প প্রচলিত আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি পাওয়া যায় শ্রীশ্রীচণ্ডী বা দেবীমাহাত্ম্যম গ্ৰন্থে। এই গল্পটি হিন্দুরা এতটাই মান্য করে যে শ্রীশ্রীচণ্ডীর পাঠ দুর্গাপূজার একটি অপরিহার্য অঙ্গ হয়ে গিয়েছে। দেবীমাহাত্ম্যম আসলে মার্কণ্ডেয় পুরাণের একটি নির্বাচিত অংশ। এই বইয়ে দেবী দুর্গাকে নিয়ে প্রচলিত তিনটি গল্প ও দুর্গাপূজা প্রচলনের একটি গল্প আছে। প্রতিটি গল্পে দেবী দুর্গাই কেন্দ্রীয় চরিত্র। –

(ক) রাজা সুরথের গল্প

  • (১) পৌরাণিক রাজা সুরথের গল্পটি দেবীমাহাত্ম্যম গ্ৰন্থের প্রধান তিনটি গল্পের অবতরণিকা ও যোগসূত্র। সুরথ ছিলেন পৃথিবীর রাজা। সুশাসক ও যোদ্ধা হিসেবে তার যথেষ্ট খ্যাতি ও নাম ডাক ছিল। কিন্তু একবার এক যবন জাতির কাছে তার পরাজয় ঘটে। সেই সুযোগে তার মন্ত্রী ও সভাসদেরা তার ধনসম্পদ ও সেনাবাহিনীর দখল নেন।
  • (২) এরপর সুরথ মনের দুঃখে বনে চলে আসেন। বনের মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে তিনি মেধা নামে এক ঋষির আশ্রমে এসে হাজির হন। মেধা ঋষি রাজাকে সমাদর করে নিজের আশ্রমে আশ্রয় দেন। কিন্তু বনে থেকেও রাজার মনে সুখ ছিল না। তিনি সর্বদা তার হারানো রাজ্যের ভালমন্দের কথা ভেবে শঙ্কিত হতেন।
  • (৩) এরপর একদিন বনের মধ্যে সুরথ সমাধি নামে এক বৈশ্যের দেখা পেলেন। তার সঙ্গে কথা বলে সুরথ জানতে পারলেন, সমাধির স্ত্রী ও ছেলেরা তার সব টাকাপয়সা ও বিষয়সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তাসত্ত্বেও তিনি সব সময় নিজের স্ত্রী ও ছেলদের কল্যাণ-অকল্যাণের কথা চিন্তা করে শঙ্কিত হন।
  • (৪) এরপর রাজা সুরথ ও বৈশ্য সমাধির মনে প্রশ্ন জাগে, যারা তাদের সব কিছু কেড়ে নিয়েছে, তাদের প্রতি তাদের রাগ হয় না কেন? কেনই বা তারা সেই সব লোকেদের ভালমন্দের কথা চিন্তা করে করে ভীত হন?
  • (৫) তারা দুজনে মেধা ঋষিকে এই কথা জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বললেন, পরমেশ্বরী মহামায়ার প্রভাবেই এরকম ঘটছে। সুরথ মহামায়ার কথা জিজ্ঞাসা করলে, মেধা ঋষি একে একে তাকে তিনটি গল্প বলেন। এই গল্পগুলিই শ্রীশ্রীচণ্ডী-র মূল আলোচ্য বিষয়।
  • (৬) এই বইয়ের শেষে দেখা যায়, মেধার গল্প শুনে সুরথ ও সমাধি তিন বছর ধরে নদীর তীরে কঠিন তপস্যা ও দুর্গাপূজা করেন। শেষে দেবী দুর্গা তাদের দেখা দিয়ে সুরথকে হারানো রাজ্য ফিরিয়ে দিলেন এবং বৈশ্যকে তত্ত্বজ্ঞান দিলেন।

(খ) মধুকৈটভের উপাখ্যান

  • (১) দেবীমাহাত্ম্যম গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে সংক্ষেপে মধুকৈটভের উপাখ্যানের বর্ণনা আছে। প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট কারণ-সমুদ্রে পরিণত হলে বিষ্ণু অনন্তনাগকে শয্যা করে যোগনিদ্রায় মগ্ন হন। এই সময়ে বিষ্ণুর কর্ণমূল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়।
  • (২) তারা বিষ্ণুর নাভিপদ্মে স্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হলে ভীত ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জাগরিত করার জন্য তার নয়নাশ্রিতা যোগনিদ্রার স্তব করতে লাগলেন। এই স্তবে সন্তুষ্টা দেবী বিষ্ণুকে জাগরিত করলে তিনি পাঁচ হাজার বছর ধরে মধু ও কৈটভের সঙ্গে মহাসংগ্রামে রত হন।
  • (৩) অবশেষে মহামায়া দুই অসুরকে বিমোহিত করলে তারা বিষ্ণুকে বলে বসে, “আপনার সঙ্গে যুদ্ধ করে আমরা প্রীত; তাই আপনার হাতে মৃত্যু হবে আমাদের শ্লাঘার বিষয়। পৃথিবীর যে স্থান জলপ্লাবিত নয়, সেখানে আপনি আমাদের উভয়কে বিনাশ করতে পারেন।” বিষ্ণু তথাস্তু বলে অসুরদ্বয়ের মাথা নিজের জঙ্ঘার উপর রেখে তাদের বধ করেন।

(গ) মহিষাসুরের কাহিনী

  • (১) দেবীমাহাত্ম্যম গ্রন্থে বর্ণিত দেবী দুর্গার কাহিনিগুলির মধ্যে মহিষাসুর বধের কাহিনী সর্বাধিক জনপ্রিয়। এই কাহিনী অনুযায়ী পুরাকালে মহিষাসুর দেবতাদের শতবর্ষব্যাপী এক যুদ্ধে পরাস্ত করে স্বর্গের অধিকার কেড়ে নেয়। বিতাড়িত দেবতারা প্রথমে প্রজাপতি ব্রহ্মা এবং পরে তাঁকে মুখপাত্র করে মহাদেব ও নারায়ণের কাছে উপস্থিত হন।
  • (২) মহিষাসুরের অত্যাচার কাহিনী শুনে তাঁরা দুজনেই অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হন। সেই ক্রোধে তাঁদের মুখমণ্ডল ভীষণাকার ধারণ করে। প্রথমে বিষ্ণু ও শিব, পরে ব্রহ্মার মুখমণ্ডল থেকে এক মহাতেজ নির্গত হয়। সেই সঙ্গে ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতাদের দেহ থেকেও সুবিপুল তেজ নির্গত হয়ে সেই মহাতেজের সঙ্গে মিলিত হয়। হিমালয়ে অবস্থিত ঋষি কাত্যায়নের আশ্রমে সেই বিরাট তেজপুঞ্জ একত্রিত হয়ে এক নারীমূর্তি ধারণ করে।
  • (৩) এক এক দেবতার তেজপ্রভাবে বহুবর্ণময়ী দেবীর এক এক অঙ্গ উৎপন্ন হয়, যেমন – শিবের তেজে মুখমণ্ডল, যমের তেজে কেশদাম, সন্ধ্যার তেজে ভ্রূযুগল, অগ্নিতেজে ত্রিনয়ন ইত্যাদি। প্রত্যেক দেবতা তাঁদের নিজস্ব আয়ুধ বা অস্ত্র দেবীকে দান করলেন।
  • (৪) হিমালয় দেবীকে তাঁর বাহনরূপে সিংহ দান করলেন। এই মহাদেবীই অষ্টাদশভুজা জয়া মহালক্ষ্মী রূপে মহিষাসুর বধের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দেবী ও তাঁর বাহনের সিংহনাদে ত্রিভুবন কম্পিত হতে থাকে।
  • (৫) মহিষাসুর সেই প্রকম্পনে ভীত হয়ে প্রথমে তাঁর সেনাদলের বীরযোদ্ধাদের পাঠাতে শুরু করেন। দেবী ও তাঁর বাহন সিংহ প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে একের পর এক যোদ্ধা ও অসুরসেনাকে বিনষ্ট করেন। তখন মহিষাসুর স্বয়ং দেবীর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করেন।
  • (৬) যুদ্ধকালে মায়াবী মহিষাসুর নানা রূপ ধারণ করে দেবীকে ভীত বা বিমোহিত করার প্রচেষ্টা করেন। কিন্তু দেবী সেই সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। তখন অসুর অহঙ্কারে মত্ত হয়ে প্রবল গর্জন করেন। এবার দেবী বলেন, “রে মূঢ়, যতক্ষণ আমি মধুপান করি, ততক্ষণ তুই গর্জন করে নে। আমি তোকে বধ করলেই দেবতারা এখানে শীঘ্রই গর্জন করবেন।”
  • (৭) এই বলে দেবী লম্ফ দিয়ে মহিষাসুরের উপর আরোহণ করে তার কণ্ঠে পা দিয়ে শূলদ্বারা বক্ষ বিদীর্ণ করে তাঁকে বধ করলেন। অসুরসেনা হাহাকার করতে করতে পালিয়ে যায় এবং দেবতারা স্বর্গের অধিকার ফিরে পেয়ে আনন্দধ্বনি করতে থাকেন।
  • (৮) কাত্যায়নের আশ্রমে আবির্ভূত হওয়ায় এই দেবী কাত্যায়নী নামে অভিহিতা হন। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে দেবী কাত্যায়নী আবির্ভূতা হয়েছিলেন। শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিথিতে কাত্যায়ন দেবীকে পূজা করেন এবং দশমীতে দেবী মহিষাসুর বধ করেন।

(ঘ) শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের কাহিনি

  • (১) দেবীমাহাত্ম্যম গ্রন্থে বর্ণিত দেবী পার্বতী সংক্রান্ত তৃতীয় ও সর্বশেষ কাহিনিটি হল শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের কাহিনি। শুম্ভ ও নিশুম্ভ নামে দুই অসুরভ্রাতা স্বর্গ ও দেবতাদের স্থান অধিকার করে নিলে দেবতারা হিমালয়ে গিয়ে আদিদেবী মহাদেবীর স্তব করতে লাগলেন।
  • (২) এই সময় সেই স্থানে পার্বতী গঙ্গাস্নানে উপস্থিত হন। দেবতাদের কষ্ট দেখে দেবী পার্বতী ইন্দ্র ও অন্যান্য দেবতার স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে তার দেহকোষ থেকে সৃষ্টি করেন এই দেবী কে। পার্বতী এই দেবীর সাথে বিন্ধ্য পর্বতে যান ও বিন্ধ্যবাসিনী নামে অভিহিত হন। এই দেবী কৌশিকী নামেও আখ্যাত হন ও শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
  • (৩) শুম্ভ-নিশুম্ভের দুই চর চণ্ড ও মুণ্ড দেবীকে দেখতে পেয়ে নিজ প্রভুদ্বয়কে বলেন যে এমন স্ত্রীলোক আপনাদেরই ভোগ্যা হবার যোগ্য। চণ্ড-মুণ্ডের কথায় শুম্ভ-নিশুম্ভ মহাসুর সুগ্রীবকে দৌত্যকর্মে নিযুক্ত করে দেবীর নিকট প্রেরণ করেন। সুগ্রীব দেবীর কাছে শুম্ভ-নিশুম্ভের কুপ্রস্তাব মধুরভাবে ব্যক্ত করল।
  • (৪) দেবী মৃদু হেসে বিনীত স্বরে বলেন, “তুমি সঠিকই বলেছ। এই বিশ্বে শুম্ভ-নিশুম্ভের মতো বীর কে আছে? তবে আমি পূর্বে অল্পবুদ্ধিবশত প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, যে আমাকে যুদ্ধে পরাভূত করতে পারবে, কেবলমাত্র তাকেই আমি বিবাহ করব। এখন আমি প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করি কি করে! তুমি বরং মহাসুর শুম্ভ বা নিশুম্ভকে বল, তাঁরা যেন এখানে এসে আমাকে পরাস্ত করে শীঘ্র আমার পাণিগ্রহণ করেন। আর বিলম্বে কি প্রয়োজন?”
  • (৫) সুগ্রীব ক্রোধান্বিত হয়ে দেবীকে নিরস্ত্র হতে পরামর্শ দিল। কিন্তু দেবী নিজবাক্যে স্থির থেকে তাকে শুম্ভ-নিশুম্ভের কাছে প্রেরণ করেন। দেবীর কথায় কুপিত হয়ে অসুররাজ শুম্ভ তাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে দৈত্যসেনাপতি ধূম্রলোচনকে প্রেরণ করেন। দেবীর সঙ্গে ভয়ানক যুদ্ধে ধূম্রলোচন পরাজিত ও নিহত হয়।
  • (৬) এই খবর পেয়ে শুম্ভ চণ্ড-মুণ্ড ও অন্যান্য অসুরসৈন্যদের প্রেরণ করে। তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য দেবী নিজ দেহ থেকে দেবী কালীর সৃষ্টি করেন। দেবী কালী ভীষণ যুদ্ধের পর চণ্ড-মুণ্ডকে বধ করেন। তখন দেবী কৌশিকী তাকে চামুণ্ডা আখ্যায় ভূষিত করেন।
  • (৭) চণ্ড-মুণ্ডের মৃত্যুর খবর পেয়ে সকল দৈত্যসেনাকে সুসজ্জিত করে প্রেরণ করেন দেবীর বিরুদ্ধে। তখন প্রত্যেক দেবতার শক্তি রূপে দেবী পার্বতী তার এক এক অঙ্গ থেকে এক এক দেবীকে সৃষ্টি করেন। এই দেবীরা হলেন ব্রহ্মাণী, মাহেশ্বরী, কৌমারী, বৈষ্ণবী, বারাহী, নারসিংহী, ঐন্দ্রী প্রমুখ। এঁরা প্রচণ্ড যুদ্ধে দৈত্যসেনাদের পরাভূত ও নিহত করতে থাকেন।
  • (৮) এই সময় রক্তবীজ দৈত্য সংগ্রামস্থলে উপস্থিত হয়। তার রক্ত একফোঁটা মাটিতে পড়লে তা থেকে লক্ষ লক্ষ রক্তবীজ দৈত্য সৃষ্টি হয়। এই কারণে কৌশিকী কালীর সাহায্যে রক্তবীজকে বধ করলেন। কালী রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পড়তে না দিয়ে নিজে পান করে নেন।
  • (৯) এরপর শুম্ভ আপন ভ্রাতা নিশুম্ভকে যুদ্ধে প্রেরণ করেন। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দেবী দুর্গা নিশুম্ভকে বধ করেন। প্রাণপ্রতিম ভাইয়ের মৃত্যুর শোকে আকুল হয়ে শুম্ভ দেবীকে বলে, “তুমি গর্ব করো না, কারণ তুমি অন্যের সাহায্যে এই যুদ্ধে জয়লাভ করেছ।”
  • (১০) তখন দেবী বলেন, “একা আমিই এ জগতে বিরাজিত। আমি ছাড়া দ্বিতীয় কে আছে? রে দুষ্ট, এই সকল দেবী আমারই বিভূতি। দ্যাখ, এরা আমার দেহে বিলীন হচ্ছে। তখন অন্যান্য সকল দেবী কৌশিকী দেহে মিলিত হয়ে গেলেন।
  • (১১) দেবীর সঙ্গে শুম্ভের ঘোর যুদ্ধ আরম্ভ হল। যুদ্ধান্তে দেবী শুম্ভকে শূলে গ্রথিত করে বধ করলেন। দেবতারা পুনরায় স্বর্গের অধিকার ফিরে পেলেন। যুদ্ধ পরে কৌশিকী পার্বতীর দেহে বিলীন হয়ে যান। পরে দেবী পার্বতী মালভূমের রাজার মাধ্যমে নিজের এই রূপের পুজো শুরু করেন।

দুর্গাপূজা সম্পর্কে কালিকা পুরাণের বর্ণনা

  • (১) কালিকা পুরাণের মূল উপজীব্য বিষয় হল কামাখ্যা মন্দির ও নরকাসুর বৃত্তান্ত। তবে এখানে দুর্গাপূজার রীতিনীতির বিস্তারিত বিবরণ বিবৃত আছে। উপাখ্যানটির বিন্যাস মহাদেব আর বেতাল-ভৈরবের কথোপকথনের মাধ্যমে।
  • (২) কাহিনীর সূচনায় মহিষাসুরের বিনাশ কামনায় দেবতাদের সম্মিলিত স্তুতিতে প্রসন্নচিত্ত মহামায়া ষোড়শভুজা ভদ্রকালী রূপে আবির্ভূতা হয়ে দেবতাদের কাত্যায়নের আশ্রমে যেতে আদেশ করেন। সেখানে দেবতারা আদ্যাদেবীর দর্শনলাভের আশায় যান ও ত্রিমূর্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু , মহেশ্বর) সাক্ষাৎ লাভ করেন।
  • (৩) ক্রমে তাঁরা মহিষাসুরের অত্যাচার-উৎপীড়নের কথা তুলে ধরলে ত্রিমূর্তি কোপাবিষ্ট হন। তাঁদের ও অন্যান্য দেবতাদের ক্রোধরশ্মি সুবৃহৎ এক তেজচক্র সৃষ্টি করে, যা ক্রমে দশভুজা তপ্তকাঞ্চনবর্ণা দেবী দুর্গার রূপ নেয়।
  • (৪) এদিকে মহিষাসুর নিশীথ দুঃস্বপ্নে দেবী ভদ্রকালীকে খড়্গাঘাতে তাঁর শিরশ্ছেদ করে রক্তপান করতে দেখেন। সন্ত্রস্ত অসুররাজ সপার্ষদে পরদিন সকালে দেবীর আরাধনা করলে দেবী মহামায়া তাঁকে ষোড়শভুজা অতসী পুষ্পবর্ণা ভদ্রকালী রূপে দর্শন দেন।
  • (৫) শিবের বরে রম্ভাসুরের ঔরসে মহিষাসুরের জন্ম, শিবের প্রসাদেই তাঁর ত্রিলোকবিজয়ের বৈভব-প্রতিপত্তি, আবার নিয়তির নির্দেশে তিনি নারীরই বধ্য, তাই জাগতিক অন্যান্য কামনার পরিবর্তে তাঁর মনে জাগে ভিন্ন এক ‘অমরত্ব’ লাভের আকাঙ্ক্ষা।
  • (৬) মহামায়ার হাতে মৃত্যু নিশ্চিত জেনে তাঁর কাছেই মহিষাসুর আসুরিক মনোবৃত্তির স্খালন আর যজ্ঞভাগ লাভের বর প্রার্থনা করেন। দেবী অসুরত্ব মোচনের বর দিলেও যজ্ঞভাগের মনোবাঞ্ছাটি অপূর্ণ রাখেন, পরিবর্তে দেন ত্রিলোকে পূজ্য হওয়ার বর।
  • (৭) তিনি জানান যে তাঁর মহিষাসুর বধ এক সততঃ ঘটনা। যুগ-যুগান্তরে, কল্পে কল্পান্তরে যা ঘটে চলেছে। ইতিপূর্বে অঞ্জননিভা অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডা ও অতসীপুষ্পবর্ণা ষোড়শভুজা ভদ্রকালী রূপে মহিষাসুরকে তিনি বধ করেছেন। পরবর্তীতে দশভুজা তপ্তকাঞ্চনাভা কাত্যায়নী দুর্গা রূপে তাঁকে আবারো বধ করবেন। আর এই তিনরূপে দেবীর পদলগ্ন হয়ে মহিষাসুর দেব-দানব-মানব সবার পূজা পাবেন।
  • (৮) প্রতিশ্রুতিমতই দেবী দশভুজারূপে অন্তিমকল্পের যুদ্ধে মহিষাসুরকে বধ করেন আর মহিষাসুরও দেবীর পদসংলগ্ন হয়ে দেবীর সাথে সাথে পূজা পেতে থাকেন। আদ্যাশক্তির আশীর্বাদে মহিষাসুরের অসুরস্বভাব মুছে যায়, চলে যায় দেবতাদের প্রতি বিদ্বেষ আর পুনর্জন্মের চক্র থেকেও অব্যাহতি পায়।
  • (৯) এই প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অবশ্য আরও দুটি প্রতিশ্রুতির আখ্যান কালিকা পুরাণের এই অধ্যায়ে বর্ণিত আছে। একটি হল রম্ভাসুরের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট মহাদেবের বরদান আর সেই অঙ্গীকারের দায়বদ্ধতা থেকে মহিষাসুর রূপে তিন কল্পে রম্ভের পুত্রত্ব স্বীকার।
  • (১০) অপর অঙ্গীকারটি হল মহাদেবীর কাছে মহাদেবের অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া। তিন কল্পে যোগবদ্ধ মহিষাসুর দেবীর পদপ্রান্তে থেকে তাঁর সাযুজ্যলাভ ও মহিষ শরীরে সিংহরূপী হরির সঙ্গে দেবীর ভারবহন।

দুর্গাপূজা সম্পর্কে কৃত্তিবাসী রামায়ণের বর্ণনা

  • (১) বাল্মীকির সংস্কৃত রামায়ণে রামের দুর্গাপূজার কোনো বিবরণ নেই। কিন্তু রামায়ণের অনুবাদ করার সময় কৃত্তিবাস ওঝা কালিকাপুরাণ ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ-এর কাহিনি কিঞ্চিৎ পরিবর্তন করে সংযোজিত করেছেন।
  • (২) কৃত্তিবাসি রামায়ণ অনুযায়ী, রাবণ ছিলেন শিবভক্ত। মা পার্বতী তাকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দেন, শিবের স্ত্রী পার্বতী কে পূজা করে তাকে তুষ্ট করতে। ফলে রামের পক্ষে রাবণ বধ সহজসাধ্য হবে। ব্রহ্মার পরামর্শ মেনে রাম শরৎকালে পার্বতীর দুর্গতিনাশিনী রূপের বোধন, চণ্ডীপাঠ ও মহাপূজার আয়োজন করেন।
  • (৩) আশ্বিন মাসের শুক্লা ষষ্ঠীর দিন রাম কল্পারম্ভ করেন। তারপর সন্ধ্যায় বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাস করেন। মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও সন্ধিপূজার পরেও দুর্গার আবির্ভাব না ঘটায়, রাম ১০৮টি নীল পদ্মফুল দিয়ে মহানবমী পূজার পরিকল্পনা করেন। হনুমান তাকে এই ১০৮টি পদ্মফুল জোগাড় করে দেন।
  • (৪) মহামায়া রামকে পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্মফুল লুকিয়ে রাখেন। একটি পদ্মফুল না পেয়ে রাম পদ্মফুলের বদলে নিজের একটি চোখ উপড়ে দুর্গাকে নিবেদন করতে গেলে, দেবী পার্বতী আবির্ভূত হয়ে রামকে কাঙ্ক্ষিত বর দেন। তবে সম্প্রতি একটি জরিপে দেখা গেছে কৃত্তিবাস ওঝা যে কাহিনী সংকলন করেছেন, তা রামচন্দ্রের প্রকৃত জীবনী বাল্মিকী রামায়ণে নেই।
  • (৫) রামায়ণের অন্যান্য অনুবাদ, যেমন – তুলসীদাস রচিত হিন্দি রামচরিতমানস, তামিলভাষায় কাম্ব রামায়ণ, কন্নড় ভাষায় কুমুদেন্দু রামায়ণ, অসমীয়া ভাষায় কথা রামায়ণ, ওড়িয়া ভাষায় জগমোহন রামায়ণ, মারাঠি ভাষায় ভাবার্থ রামায়ণ, উর্দু ভাষায় পুঁথি রামায়ণ প্রভৃতিতে রামের দুর্গাপূজার কাহিনী উল্লেখিত হয় নি। যোগবাশিষ্ট রামায়ণেও উক্ত হয় নি।

দুর্গাপূজায় মন্ত্রের গুরুত্ব

সনাতম ধর্মের যে কোনো পূজার ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে সংস্কৃত মন্ত্রগুলি। মহাস্নান, পূজন, হোম, বলিদান – এই চারটি কর্ম জড়িত থাকার কারণে দুর্গাপূজা মহাপূজা। এখানে পূজামন্ত্রের সঙ্গে শ্রীশ্রী চণ্ডীও পঠিত হয় ।

দূর্গাপূজায় ভাবগম্ভীর পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি

ঢাক-ঢোল-খোল-করতাল-শঙ্খ-ঘন্টা বাদ্যের সম্মিলিত ঐকতান, ধূপ-ধুনোর সুগন্ধী ধোঁয়া, ফুল-মালা-নৈবেদ্য-চন্দন-অগুরু-কস্তুরী-কর্পূরের মিলিত সুবাস, তার সাথে মন্ত্রোচ্চারণ ও মন্দ্রস্বরে চণ্ডীপাঠ এক ভাবগম্ভীর পবিত্র পরিবেশের সৃষ্টি করে।

দূর্গাপূজায় প্রচলিত দেবী দুর্গার ধ্যানমন্ত্র

জটাজুটসমাযুক্তামর্দ্ধ্বেন্দুকৃতশেখরাম্।

লোচনত্রয়সংযুক্তাং পূর্ণেন্দুসদৃশাননাম্।।

অতসীপুষ্পবর্ণাভাং (তপ্তকাঞ্চনবর্ণাভাং ইতি পাঠান্তরম্) সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্।

নবযৌবনসম্পন্নাং সর্ব্বাভরণভূষিতাম্।।

সুচারুদশনাং তদ্বৎ পীনোন্নতপয়োধরাম্।

ত্রিভঙ্গস্থানসংস্থানাং মহিষাসুরমর্দ্দিনীম্।।

মৃণালায়তসংস্পর্শদশবাহুসমন্বিতাম্।

ত্রিশূলং দক্ষিণে ধ্যেয়ং খড়্গং চক্রং ক্রমাদধঃ।

তীক্ষ্ণবাণং তথা শক্তিং দক্ষিণে সুবিচিন্তয়েৎ (বাহুসঙ্ঘেষু সঙ্গতাম্ ইতি পাঠান্তরম্)।

খেটকং পূর্ণচাপঞ্চ পাশমঙ্কুশমেব চ (পাশং চাঙ্কুশমূর্দ্ধ্বতঃ ইতি পাঠান্তরম্)।।

ঘন্টাং বা পরশুং বাপি বামতঃ সন্নিবেশয়েৎ (ঘন্টাঞ্চ পরশুঞ্চাপি বামেহধঃ প্রতিযোজয়েৎ ইতি পাঠান্তরম্)।

অধস্তান্মহিষং তদ্বদ্বিশিরিষ্কং প্রদর্শয়েৎ।।

শিরশ্ছেদোদ্ভবং তদ্বদ্দানবং খড়্গপাণিনম্।

হৃদি শূলেন নির্ভিন্নং নির্য্যদন্ত্রবিভূষিতম্।।

রক্তারক্তীকৃতাঙ্গঞ্চ রক্তবিস্ফুরিতেক্ষণম্।

বেষ্টিতং নাগপাশেন ভ্রূকুটিভীষণাননম্ (ভ্রূকুটীকুটিলাননম্ ইতি পাঠান্তরম্)।।

সপাশবামহস্তেন ধৃতকেশঞ্চ দুর্গয়া।

বমদ্রুধিরবক্ত্রঞ্চ দেব্যাঃ সিংহং প্রদর্শয়েৎ।।

দেব্যাস্তু দক্ষিণং পাদং সমং সিংহোপরি‌ স্থিতম্।

কিঞ্চিদূর্দ্ধ্বং তথা বামমঙ্গুষ্ঠং মহিষোপরি।।

শত্রুক্ষয়করীং দেবীং দৈত্যদানবদর্পহাম্।

প্রসন্নবদনাং দেবীং সর্ব্বকামফলপ্রদাম্।।

স্তূয়মানাঞ্চ তদ্রুপমমরৈঃ সন্নিবেশয়েৎ।

উগ্রচণ্ডা প্রচণ্ডা চ চণ্ডোগ্রা চণ্ডনায়িকা

চণ্ডা চণ্ডবতী চৈব চণ্ডরূপাতিচণ্ডিকা (চামুণ্ডা চণ্ডিকা তথা ইতি পাঠান্তরম্)।।

আভিঃ শক্তিভিরষ্টাভিঃ সততং পরিবেষ্টিতম্।

চিন্তয়েজ্জগতাং ধাত্রীং (চিন্তয়েৎ সততং দেবীং ইতি পাঠান্তরম্) ধর্ম্মকামার্থমোক্ষদাম্।।

দুর্গাপূজায় পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার মন্ত্র

ওঁ আয়ুর্দ্দেহি যশো দেহি ভাগ্যং ভগবতি দেহি মে।

পুত্রান্ দেহি ধনং দেহি সর্ব্বান্ কামাংশ্চ দেহি মে।।

এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি

সায়ুধবাহনসাঙ্গাবরণপরিবারসহিতায়ৈ

মহাঘোরায়ৈ কোটিযোগিনীপরিবৃতায়ৈ

ভদ্রকাল্যৈ ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।

ওঁ হর পাপং হর ক্লেশং হর শোকং হরাসুখম্।

হর রোগং হর ক্ষোভং হর মারীং হরপ্রিয়ে।।

এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি

সায়ুধবাহনসাঙ্গাবরণপরিবারসহিতায়ৈ

মহাঘোরায়ৈ কোটিযোগিনীপরিবৃতায়ৈ

ভদ্রকাল্যৈ ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।

ওঁ মহিষঘ্নি মহামায়ে চামুণ্ডে মুণ্ডমালিনি।

আয়ুরারোগ্যং বিজয়ং দেহি দেবি নমোহস্তুতে।।

চন্দনেন সমালব্ধে কুঙ্কুমেন বিলেপিতে।

বিল্বপত্রকৃতাপীড়ে দুর্গেহহং শরণং গতঃ।।

এষ সচন্দনপুষ্পবিল্বপত্রাঞ্জলি

সায়ুধবাহনসাঙ্গাবরণপরিবারসহিতায়ৈ

মহাঘোরায়ৈ কোটিযোগিনীপরিবৃতায়ৈ

ভদ্রকাল্যৈ ওঁ হ্রীং দুর্গায়ৈ নমঃ।

দূর্গাপূজায় দেবী দুর্গা প্রণাম মন্ত্র

“সর্ব্বমঙ্গলমঙ্গল্যে শিবে সর্ব্বার্থসাধিকে।

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোহস্তুতে।।”

দূর্গাপূজায় প্রতিমা তত্ত্ব

  • (১) বাংলায় দেবী দুর্গার যে প্রতিমাটি সচরাচর দেখা যায় সেটি পরিবারসমন্বিতা বা সপরিবারে দুর্গার মূর্তি। এই মূর্তির মধ্যস্থলে দেবী দুর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দিনী; তার মুকুটের উপরে শিবের ছোট মুখ, দেবীর ডানপাশে উপরে দেবী লক্ষ্মী ও নিচে গণেশ; বামপাশে উপরে দেবী সরস্বতী ও নিচে কার্তিকেয়।
  • (২) কলকাতায় সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার ১৬১০ সালে এই সপরিবার দুর্গার প্রচলন করেন। তারা কার্তিকেয়র রূপ দেন জমিদারপুত্রের, যা তৎপূর্ব ছিল গুপ্ত সাম্রাজ্য -এর সম্রাট সমুদ্রগুপ্ত -এর আদলে যুদ্ধের দেবতা রূপে। এছাড়াও বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর-সংলগ্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার এক বিশেষ মূর্তি দেখা যায়।
  • (৩) বিষ্ণুপুরে দেবীর ডানপাশে উপরে গণেশ ও নিচে লক্ষ্মী, বামে উপরে কার্তিকেয় ও নিচে সরস্বতী এবং কাঠামোর উপরে নন্দী-ভৃঙ্গীসহ বৃষভবাহন শিব ও দুইপাশে দেবীর দুই সখী জয়া ও বিজয়া অবস্থান করেন। কলকাতার কোনও কোনও বাড়িতে দুর্গোৎসবে লক্ষ্মী ও গণেশকে সরস্বতী ও কার্তিকেয়ের সঙ্গে স্থান বিনিময় করতে দেখা যায়।
  • (৪) আবার কোথাও কোথায় দুর্গাকে শিবের কোলে বসে থাকতেও দেখা যায়। এগুলি ছাড়াও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রকমের স্বতন্ত্র মূর্তিও চোখে পড়ে। তবে দুর্গার রূপকল্পনা বা কাঠামোবিন্যাসে যতই বৈচিত্র্য থাকুক, বাংলায় দুর্গোৎসবে প্রায় সর্বত্রই দেবী দুর্গা সপরিবারে পূজিতা হন।

দুর্গা মূর্তি

  • (১) হিন্দু শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ নামটির ব্যাখ্যা নিম্নলিখিত ভাবে করা হয়েছে। ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, ‘উ’ কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও ‘অ’ কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ, দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা।
  • (২) অন্যদিকে শব্দকল্পদ্রুম অনুযায়ী, “দুর্গং নাশয়তি যা নিত্যং সা দুর্গা বা প্রকীর্তিতা” – অর্থাৎ, দুর্গ নামক অসুরকে যিনি বধ করেছেন তিনিই নিত্য দুর্গা নামে অভিহিতা। আবার চণ্ডীমাহাত্মম গ্ৰন্থ অনুযায়ী এই দেবীই ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমূর্ত্যাঃ’ বা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমূর্তি।
  • (৩) দেবী সবসময় অষ্ট শক্তি দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে আছেন। এই অষ্টশক্তি হলেন উগ্ৰচণ্ডা, প্রচণ্ডা, চণ্ডোগ্ৰা, চণ্ডনায়িকা, চণ্ডা, চণ্ডবতী,চণ্ডরূপা, অতিচণ্ডিকা। তবে বর্তমানে দেবী বিগ্রহে এই অষ্টশক্তির বিগ্রহ সংযুক্ত থাকে না। যদিও, তাদের পূজা করা হয় দেবীর সাথেই।
দুর্গা মূর্তি

সিংহ মূর্তি

  • (১) দেবী দুর্গার বাহন সিংহ। চণ্ডীমাহাত্মম গ্ৰন্থে সিংহকে ‘মহাসিংহ’, ‘বাহনকেশরী’, ‘ধূতসট’ ইত্যাদি বিশেষণে ভূষিত করা হয়েছে। দুর্গাপূজার সময় সিংহকেও বিশেষভাবে পূজা করা হয়। দেবী পুরাণে উল্লিখিত সিংহের ধ্যানে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিষ্ণু, শিব, দুর্গা প্রমুখ দেবদেবীরা অবস্থান করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
  • (২) অন্য একটি ধ্যান মন্ত্রে সিংহকে বিষ্ণুর একটি রূপ বলা হয়েছে। কালীবিলাস তন্ত্রে দুর্গার বাহনকে বলা হয়েছে বিষ্ণুরূপী সিংহ। কালিকাপুরাণ অনুযায়ী, মহামায়া কামাখ্যার বাহন হওয়ার জন্য শিব শবদেহ, ব্রহ্মা রক্তপদ্ম ও বিষ্ণু সিংহের মূর্তি ধারণ করেছিলেন।
  • (৩) মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী, হিমালয় দুর্গাকে সিংহ দেন। শিবপুরাণ অনুযায়ী, শুম্ভ-নিশুম্ভকে বধ করার জন্য ব্রহ্মা দুর্গাকে সিংহ দেন। পদ্মপুরাণ অনুযায়ী, দুর্গার ক্রোধ থেকে সিংহের জন্ম হয়।
  • (৪) দেবীপুরাণ অনুসারে, বিষ্ণু দুর্গার বাহন সিংহকে নির্মাণ করেছিলেন এবং সেই সিংহে সকল দেবতার অধিষ্ঠান হয়েছিল। সিংহ রজোগুণের এক প্রচণ্ড শক্তির উচ্ছ্বাসের প্রতীক। এছাড়াও সিংহ মানুষের পশুত্ববিজয়েরও প্রতীক।

মহিষাসুর মূর্তি

  • (১) দৈত্য মহিষাসুর অসুর, অর্থাৎ দেবদ্রোহী। তাই দেবীপ্রতিমায় দেবীর পদতলে দলিত এই অসুর ‘সু’ এবং ‘কু’-এর মধ্যকার চিরকালীন দ্বন্দ্বে অশুভ শক্তির উপর শুভশক্তির বিজয়ের প্রতীক। তবে অসুর হলেও দুর্গোৎসবে মহিষাসুরের পূজা শাস্ত্রনির্দিষ্ট।
  • (২) কালিকা পুরাণ অনুযায়ী, মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে ভদ্রকালীর হাতে নিজের শিরশ্ছেদ ও রক্তপানের স্বপ্নদৃশ্য দেখে ভীত মহিষাসুর ভদ্রকালীকে তুষ্ট করেন। ভদ্রকালী তাঁর ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বরদান করতে ইচ্ছুক হন। মহিষাসুর যজ্ঞভাগ বর চাইলে দেবী সেই বর দিতে অস্বীকৃত হন।
  • (৩) দেবী মহিষাসুরকে এই বর দেন যে যেখানেই দেবী অষ্টাদশভুজা উগ্রচণ্ডা, ষোড়শভুজা ভদ্রকালী ও দশভুজা দুর্গা রূপে পূজিতা হবেন, সেখানেই তাঁর চরণতলে থেকে মহিষাসুরও পূজা পাবেন।
  • (৪) কালিকা পুরাণের বর্ণনায় আরও জানা যায় যে স্বয়ং মহাদেব রম্ভাসুরের কঠোর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে তিন জন্মে মহিষাসুর রূপে তাঁর পুত্র হিসাবে জন্ম নেন, আর জগজ্জননী দুর্গার পদলগ্ন হয়ে সিংহরূপী বিষ্ণুর সঙ্গে দেবীর ভার বহন করেন।

গণেশ মূর্তি

কার্যসিদ্ধির দেবতা গণেশ। হিন্দু পুরাণের নিয়ম অনুযায়ী, অন্যান্য দেবতার আগে গণেশের পূজা করতে হয়। গণেশের পূজা আগে না করে অন্য কোনো দেবতার পূজা করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ।

মূষিক মূর্তি

গণেশের বাহন মূষিক বা ইঁদুর। এই ইঁদুর মায়া ও অষ্টপাশ ছেদনের প্রতীক।

লক্ষ্মী মূর্তি

দেবী লক্ষ্মী শ্রী, সমৃদ্ধি, বিকাশ ও অভ্যুদয়ের প্রতীক। শুধু ধনৈশ্বর্যই নয়, লক্ষ্মী চরিত্রধনেরও প্রতীক।

পেচক মূর্তি

দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেচক বা প্যাঁচা। রূপে ও গুণে অতুলনীয় এই দেবীর এমন কিম্ভূত বাহন নিয়ে তর্ক আছে। প্রথমেই স্মরণে রাখা কর্তব্য, হিন্দু শাস্ত্রে কোথাও পেচককে লক্ষ্মীর বাহনের মর্যাদা দান করা হয় নি। এই বিশ্বাস একান্তই বাঙালির লোকবিশ্বাস। প্যাঁচা দিবান্ধ। মনে করা হয়, যাঁরা দিবান্ধ অর্থাৎ তত্ত্ববিষয়ে অজ্ঞ, তারাই পেচকধর্মী। মানুষ যতকাল পেচকধর্মী থাকে ততদিনই ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীর আরাধনা করে সে।

সরস্বতী মূর্তি

দেবী সরস্বতী বাণীরূপিণী বাগদেবী। তিনি জ্ঞানশক্তির প্রতীক। দেবীর হাতে পুস্তক ও বীণা। পুস্তক বেদ শব্দব্রহ্ম। বীণা সুরছন্দের প্রতীক নাদব্রহ্ম। শুদ্ধ সত্ত্বগুণের পূর্তি, তাই সর্বশুক্লা। শ্বেতবর্ণটি প্রকাশাত্মক। সরস্বতী শুদ্ধ জ্ঞানময়ী প্রকাশস্বরূপা। জ্ঞানের সাধক হতে হলে সাধককে হতে হবে দেহে মনে প্রাণে শুভ্র-শুচি।

হংস মূর্তি

দেবী সরস্বতীর বাহন হংস। হংস হিন্দুদের নিকট একটি পবিত্র প্রতীক।

কার্তিক মূর্তি

দেবসেনাপতি কার্তিকেয় বা কার্তিক সৌন্দর্য ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক। যুদ্ধে শৌর্য-বীর্য প্রদর্শন একান্ত প্রয়োজনীয়। তাই সাধক-জীবনে এবং ব্যবহারিক জীবনে কার্তিকেয়কে প্রসন্ন করতে পারলে শৌর্য-বীর্য আমাদের হস্তগত হয়।

ময়ূর মূর্তি

দেব সেনাপতি কার্তিকেয়ের বাহন ময়ূর। সৌন্দর্য ও শৌর্য – কার্তিকেয়ের এই দুই বৈশিষ্ট্যই তার বাহন ময়ূরের মধ্যে বিদ্যমান।

দুর্গাপূজার অন্যতম উপাদান বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা

পূজায় বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা তথা পতিতালয়ের দ্বারের মাটি ব্যবহারের কারণ হিসেবে বিশ্বাস করা হয় যে যখন পুরুষেরা পতিতালয়ের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে পতিতার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পাপ সংগ্রহ করেন, তখন জীবনের সঞ্চিত সমস্ত পুণ্য সেই দরজাতেই ফেলে আসেন তারা৷ তাই পতিতালয়ের মাটি পরম পবিত্র। পতিতারা সমাজের অপবিত্রতা নিজের মধ্যে ধারণ করে সমাজকে পবিত্র রাখে বলে এই মাটি পূজার অন্যতম উপাদান

দুর্গাপূজার সূচনা মহালয়া থেকে

মহালয়া বা পিতৃপক্ষের দিন থেকে মূলত দুর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে এ দিনটির তাৎপর্য মূলত ভিন্ন। এ তিথিকে পিতৃপক্ষও বলা হয়ে থাকে। এ দিনে পিতৃপক্ষের শেষ এবং দেবী পক্ষের শুরু হয়। এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তারা তাদের পূর্বপুরুষের স্মরণ করে, পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলি প্রদান করেন।

দুর্গাষষ্ঠী

  • (১) দুর্গাষষ্ঠী ব্রত বা বোধনষষ্ঠী ব্রত বাংলার হিন্দুসমাজের অশাস্ত্রীয় বা মেয়েলি ব্রতগুলোর অন্তর্গত একটি সধবা ব্রত। গ্রামীণ বাংলার বাঙালি হিন্দুঘরের মহিলারা সাংসারিক মঙ্গলকামনায় এই ব্রত পালন করেন।
  • (২) এটি আশ্বিন মাসের শুক্লাষষ্ঠী তিথিতে শারদীয়া দুর্গাপূজার বোধনের দিনে ষষ্ঠী পূজা হিসাবে পালন করা হয়। দুর্গাষষ্ঠী ব্রত পালনের প্রথম পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উপকরণ অর্থাৎ ফুল, ফল, ধূপ, দীপ, দূর্বা, আতপচাল ও মিষ্টান্ন সংগ্রহ করতে হয়।
  • (৩) দ্বিতীয় পর্যায়ে উপকরণগুলি দিয়ে দেবীর পূজা করতে হয়। এদিন অন্নভোগ বা ভাত খাওয়া নিষিদ্ধ। শরতকালে স্বর্গের দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন। তাই দেবীকে ঘুম থেকে তোলার জন্য আহ্বান করতে হয়। দেবী এই সময় কুমারী রূপে বেল গাছের পাতায় অবস্থান করেন।
  • (৪) তাই ষষ্ঠীর দিন বেল গাছের তলায় দেবীর বোধন ও অধিবাস সম্পন্ন হয়। এই দিন বেল গাছের একটি ডালকে চিহ্নিত করে রাখা হয়। তারপর সপ্তমীর দিন ওই চিহ্নিত ডাল কেটে মণ্ডপে পুজোর স্থানে নিয়ে আসতে হয়।

দুর্গাসপ্তমী

  • (১) হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে পালিত হয় মহা সপ্তমী। ষষ্ঠীতে বোধনের পরে মহাসপ্তমী থেকে শুরু হয় মহা দুর্গাপূজা। মহাসপ্তমীর সকালে সর্বপ্রথম কলাবউ স্নান করানো হয়। কলাবউ বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ।
  • (২) সপ্তমীর সকালে নদী বা জলাশয়ে নিয়ে যাওয়া হয় নবপত্রিকাকে মহাস্নান করাতে৷ তখনই শাস্ত্রবিধি মেনে স্নান করিয়ে নতুন শাড়ি পরানো হয় নবপত্রিকাকে। নয়টি উদ্ভিদ দিয়ে নবপত্রিকা গঠন করা হয়। এই নয়টি উদ্ভিদ মা দুর্গার নয়টি শক্তির প্রতীক। এই নয়টি উদ্ভিদ হল কদলী বা রম্ভা (কলাগাছ), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব(বেল), দাড়িম্ব(ডালিম), অশোক, মান ও ধান।
  • (৩) নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে ফিরিয়ে আনা হয় বাড়ির পুজোর দালান অথবা বারোয়ারি পুজোমণ্ডপে ৷ সেখানে প্রবেশের পরই দুর্গাপূজার মূল প্রথাগত অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। নবপত্রিকা প্রবেশের পরই দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়।
  • (৪) তারপর মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে চক্ষুদানের মধ্য দিয়ে ত্রিনয়নী দেবী দুর্গার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয়। ধূপ-ধুনো, বেল-তুলসী, আসন, বস্ত্র, নৈবেদ্য, পুষ্পমাল্য, চন্দনসহ ১৬টি উপাচার দিয়ে দেবী দুর্গাকে পূজা করা হয়।

মহাস্নান

  • (১) দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হল মহাস্নান। মহাসপ্তমীর দিন নবপত্রিকা স্নানের পর মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। মহাষ্টমী ও মহানবমীর দিনও পূজার মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে মহাস্নান অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গাপ্রতিমার সামনে একটি দর্পণ বা আয়না রেখে সেই দর্পণে প্রতিফলিত প্রতিমার প্রতিবিম্বে বিভিন্ন জিনিস দিয়ে স্নান করানো হয়।
  • (২) মহাস্নানের সময় শুদ্ধজল, নদীর জল, শঙ্খজল, গঙ্গাজল, উষ্ণ জল, সুগন্ধি জল, পঞ্চগব্য, কুশ ঘাসের দ্বারা ছেটানো জল, ফুলে দ্বারা ছেটানো জল, ফলের জল, মধু, দুধ, নারকেলের জল, আখের রস, তিল তেল, বিষ্ণু তেল, শিশিরের জল, রাজদ্বারের মাটি, চৌমাথার মাটি, বৃষশৃঙ্গমৃত্তিকা, গজদন্তমৃত্তিকা, বেশ্যাদ্বারমৃত্তিকা, নদীর দুই তীরের মাটি, গঙ্গামাটি, সব তীর্থের মাটি, সাগরের জল, ঔষধি মেশানো জল, বৃষ্টিজল, সরস্বতী নদীর জল, পদ্মের রেণু মেশানো জল, ঝরনার জল ইত্যাদি দিয়ে দুর্গাকে স্নান করানো হয়।

দুর্গা অষ্টমী

  • (১) অষ্টমী পূজা হল দুর্গাপূজার একটি গুরুত্ব পূর্ণ অংশ। এই অষ্টমীর দিনে অনেক মানুষ পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে দেবী দুর্গাকে নিজের মনের ইচ্ছা জানায়। পূজার সূচনায় দন্তকাষ্ঠ ও উষ্ণোদকে দেবীর মুখপ্রক্ষালনের পর মহাস্নান, সাধারণ পূজার নিয়মে ন্যাস, অর্ঘ্যস্থাপন প্রভৃতির পর দুর্গা, কার্তিক,গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতীর পৃথক ষোড়শোপচার পূজা, নবপত্রিকা পূজা, সর্বতোভদ্রমণ্ডলে অষ্টশক্তি, অষ্টমাতৃকা, নবঘট-নবপতাকায় নবদুর্গার পূজা, ৬৪ যোগিনী ও কোটি যোগিনীর পূজা, দেবীর অস্ত্রপূজার পর সিংহ, মহিষাসুর, ময়ূর, মুষিকের পঞ্চোপচার পূজা সমাধা করা হয়।
  • (২) এই দিন অষ্টমী-নবমীর সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিটে চামুণ্ডা রূপে দেবী দুর্গাকে পুজো করা হয়। এই দিন বিভিন্ন মন্দিরে চালকুমড়ো, চিনি প্রভৃতি বলি দেবার রীতি প্রচলিত আছে। এই দিন অষ্টমীর সন্ধি পুজোর সময় অষ্ট মাতৃকা, ৬৪ ও কোটি যোগিনীরও পুজো করা হয়। এই দিন বেশিরভাগ মন্দিরে দেবী দুর্গাকে লুচি সুজির ভোগ দেওয়া হয়। এই মহাষ্টমী তিথি হল দুর্গাপূজার মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান দিন।

দুর্গাপূজার সময় কুমারী পূজা

দুর্গাপূজার সময় কুমারী পূজা
  • (১) তন্ত্রশাস্ত্রমতে, কুমারী পূজা হল ষোলো বছরের অনধিক অরজঃস্বলা কুমারী মেয়েকে দেবীজ্ঞানে পূজা করা। বিশেষত দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অঙ্গরূপে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়াও কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা এবং অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে।
  • (২) সপ্তমী,অষ্টমী ও নবমী তিথিতে ষোলো বছরের কম বয়স্কা কোনো কুমারী বালিকাকে দেবীজ্ঞানে পূজা করার রীতি আছে। বৃহদ্ধর্মপুরাণ অনুযায়ী, দেবী অম্বিকা কুমারী কন্যারূপে দেবতাদের সামনে আবির্ভূতা হয়ে বেলগাছে দেবীর বোধন করতে নির্দেশ দেন।
  • (৩) তৈত্তিরীয় আরণ্যকে দেবীকে কুমারী নামে অভিহিত করা হয়েছে। দক্ষিণ ভারতের কন্যাকুমারী মন্দিরে আরাধ্যা দেবী কুমারী রূপেই পূজিতা হন। যেহেতু কুমারী পূজা তান্ত্রিক মতবাদের প্রতিফলন তাই ভারতের সব শক্তিপীঠেই কুমারী পূজা হয়ে থাকে।
  • (৪) কুমারী পূজায় বিভিন্ন বয়সের কন্যাকে বিভিন্ন নামে পূজা করা হয়। এক বছরের কন্যা সন্ধ্যা, দুই বছরের কন্যা সরস্বতী, তিন বছরের কন্যা ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কন্যা কালিকা, পাঁচ বছরের কন্যা সুভগা, ছ’বছরের কন্যা উমা, সাত বছরের কন্যা মালিনী, আট বছরের কন্যা কুঞ্জিকা, ন’বছরের কন্যা কালসন্দর্ভা, দশ বছরের কন্যা অপরাজিতা, এগারো বছরের কন্যা রুদ্রাণী, বারো বছরের কন্যা ভৈরবী, তেরো বছরের কন্যা মহালক্ষ্মী, চোদ্দ বছরের কন্যা পঠিনায়িকা, পনেরো বছরের কন্যা ক্ষেত্রজ্ঞা এবং ষোলো বছরের কন্যা অম্বিকা নামে অভিহিতা হয়।
  • (৫) তন্ত্র মতে, কন্যা ঋতুমতী না হওয়া পর্যন্ত তারা দেবীরূপে পূজিত হতে পারে। আরও বলা হয় যে, একটি কুমারী কন্যাকে খাওয়ানোর অর্থ বিশ্বভুবনকে খাওয়ানো। ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ অক্টোবর, স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার অষ্টমী তিথিতে প্রথম কুমারী পূজার সূচনা করেছিলেন। বেলুড় মঠে রঘুনন্দন প্রণীত তত্ত্ব অনুসারেই পূজা নিষ্পন্ন হয়। পুজোয় সারদা দেবীর নামে সংকল্প করা হয়।

দুর্গাপূজায় সন্ধিপূজা

  • (১) শারদীয়া দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অধ্যায় হল সন্ধিপূজা। দুর্গাপূজার অষ্টমী ও নবমী তিথির সন্ধিক্ষণে ৪৮ মিনিট এই পূজা হয়ে থাকে। অষ্টমী তিথির শেষ ২৪ মিনিট ও নবমী তিথির প্রথম ২৪ মিনিট নিয়ে মোট ৪৮ মিনিটের মধ্যে এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
  • (২) যেহেতু অষ্টমী ও নবমী তিথির সংযোগ স্থলে এই পূজা হয়, তাই এই পূজার নাম সন্ধিপূজা অর্থ্যাৎ সন্ধি-কালীন পূজা। এই পূজা দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অঙ্গ, এইসময় দেবী দুর্গাকে চামুন্ডা রূপে পূজা করা হয়ে থাকে। সন্ধিপুজোর মাহেন্দ্রক্ষণেই দেবী দুর্গা মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন।
  • (৩) এই পূজা সম্পন্ন হয় তান্ত্রিক মতে। এই পূজায় দেবীকে ষোলটি উপাচার নিবেদন করা হয়। এই সময় বলিকৃত পশুর স্মাংস-রুধি (মাংস ও রক্ত) এবং কারণ (মদ) দেবীর উদ্দেশ্যে প্রদান করা হয়।

দুর্গা নবমী

  • (১) নবমী তিথিই শারদীয়া দুর্গোৎসবে দুর্গার পুজোর শেষ দিন। এই তিথিতে দুর্গার এক স্বরূপ সিদ্ধিদাত্রীর পুজো হয়। পাশাপাশি এ দিনই কুমারী পুজোর নিয়ম রয়েছে। শাস্ত্র মতে সিদ্ধিদাত্রীর কাছে অণিমা, মহিমা, প্রাপ্তি, প্রকাম্য, গরিমা, লঘিমা, ঈশিত্ব ও বশিত্ব নামক আটটি সিদ্ধি রয়েছে।
  • (২) জ্যোতিষ অনুযায়ী নবরাত্রির নবমী তিথিতে যাঁরা নিয়ম মেনে সিদ্ধিদাত্রীর পুজো করেন, তাঁরা সমস্ত সিদ্ধি লাভ করেন। জ্যোতিষ শাস্ত্রে কিছু উপায়ের উল্লেখ রয়েছে, যা করলে দুর্গা প্রসন্ন হবেন। এর ফলে ভক্তদের সমস্ত রোগ, কষ্ট দূর হয় ও ধন, বিবাহ সংক্রান্ত সমস্ত বাধা কেটে যায়।

দুর্গাপূজায় দশমী পূজা

শাস্ত্র মতে দশমীতেই দেবী দুর্গার গমন। মা চলে যাবেন কৈলাশে। দশমীর দিন মায়ের বরণ পর্ব শেষে বিসর্জন, সিঁদুর খেলা। তার পরে মিষ্টিমুখ, কোলাকুলি, বড়দের প্রণাম ও ছোটোদের শুভেচ্ছা জানানোর লগ্ন।

দুর্গাপূজায় অপরাজিতা পূজা

  • (১) অপরাজিতা পূজা দুর্গাপূজার একটি অঙ্গ। দুর্গার অপর নাম অপরাজিতা। তবে এই দেবীর মূর্তি অন্যরকম। তিনি চতুর্ভূজা – হাতে শঙ্খ, চক্র, বর ও অভয়মুদ্রা – গায়ের রং নীল – ত্রিনয়না ও মাথায় চন্দ্রকলা।
  • (২) বিজয়াদশমীর দিন বিসর্জনের পর পূজামণ্ডপের ঈশানকোণে অষ্টদল পদ্ম এঁকে অপরাজিতার লতা রেখে এই দেবীর পূজা করা হয়। হংসনারায়ণ ভট্টাচার্যের মতে,

“বৈষ্ণবী শক্তি বিষ্ণুমায়া লক্ষ্মী ও শিবশিক্তি শিবানীর মিশ্রণে কল্পিতা।”

পশ্চিমবঙ্গে দুর্গাপূজা উদযাপন

  • (১) শরৎকালীন দুর্গাপূজা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান হিন্দু ধর্মীয় উৎসব। বাংলা পঞ্জিকার আশ্বিন বা কার্তিক মাসে (সেপ্টেমর-অক্টোবর মাসে) এই পূজা অনুষ্ঠিত হয়। কৃত্তিবাস ওঝার রামায়ণে রাবণ বধের জন্য রামের দুর্গাপূজার পৌরাণিক কাহিনিটি উল্লেখিত হয়েছে।
  • (২) দুর্গার পূজা বসন্তকালের উৎসব হলেও, রাম শরৎকালে তার পূজা করেছিলেন। এই পূজা অকালবোধন নামে পরিচিত। তাই বাসন্তী পূজা প্রচলিত থাকলেও, শারদীয়া দুর্গাপূজাই মহাসমারোহে পালিত হয়। সাধারণত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত দুর্গাপূজা পালিত হয়।
  • (৩) বাঙালি হিন্দুরা এই উৎসবকে হিমালয়ে দেবী দুর্গার বাপের বাড়ি ফেরার অনুষ্ঠান হিসেবেই দেখে। বাঙালি হিন্দু সমাজে এই পূজা উপলক্ষে নতুন পোশাক পরার চল রয়েছে। পূজার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে প্রতিমা দর্শনও বাঙালি হিন্দুদের একটি বিশেষ প্রথা।

বাংলাদেশে দুর্গাপূজা উদযাপন

হিন্দু সম্প্রদায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় সম্প্রদায়। হিন্দুদের বৃহত্তম উৎসব হওয়ার জন্য তাই বাংলাদেশেও গ্রাম ও শহরে ৩১ হাজারের বেশি দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়। দুর্গাপূজার বিজয়াদশমীর দিনে বাংলাদেশে সরকারিভাবে একদিন ছুটি দেওয়া হয়। ময়মনসিংহ শহরের শিববাড়ি মন্দিরের মন্ডপে দুর্গাপূজায় পুরোহিত ব্যাতিত সকলেই নারী।

বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজা

পারিবারিক স্তরে বাসন্তী ও দুর্গা দেবীর পূজা প্রধানত ধনী পরিবারগুলিতেই আয়োজিত হয়। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে পুরনো ও ধনী বা এককালীন সেখানকার উচ্চ রাজবংশের পরিবারগুলিতে বাসন্তীপূজা ‘বনেদি বাড়ির পূজা’ নামে পরিচিত। যোড়শ শতক থেকেই বাংলার রাজবাড়ি ও জমিদারবাড়িতে বসন্তকালে বাসন্তীপুজো অনুষ্ঠিত হয়। বনেদি বাড়ির দুর্গাপূজার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

(ক) কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির পুজো

  • (১) অষ্টাদশ শতাব্দীতে নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র নতুন রীতি চালু করে মহালয়ার দিন থেকে শুরু করেন সকলের মঙ্গলকামনায় যজ্ঞ, টানা নবমী পর্যন্ত চলত সেই যজ্ঞ। কথিত আছে, মহালয়ার পর থেকে নাকি কখনও আগুন নিভত না। যজ্ঞের দেবী এখানে রাজরাজেশ্বরী, শক্তির প্রতীক। তাই যোদ্ধাবেশী। দেবীর বাহন এখানে সিংহরূপী।
  • (২) এখনও সেই প্রথা মেনেই রাজবাড়িতে পুজো হয় একচালার যোদ্ধা দেবীর। প্রতিমার মাটি মাখতে ব্যবহার করা হয় শুধুমাত্র গঙ্গাজল। নবদ্বীপ থেকে নিয়ে আসা হয় সেই জল। আগে পুজোতে বাড়ির মহিলারা উপস্থিত থাকলেও প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় দেবীর সঙ্গে যাওয়ার নিয়ম ছিল না।
  • (৩) তখন নীলকণ্ঠ পাখি দেবীপ্রতিমার সঙ্গে ভাসানে যেত। ভাসান হয়ে গেলেই সে ফিরে আসত রাজবাড়ির বারান্দায়। এরপর অন্দরমহলে শুরু হয়ে যেত বিজয়ার প্রস্তুতি। এখন আর রাজবাড়ির পুজোতে সেই জৌলুস না থাকলেও রয়ে গিয়েছে আচার রীতি। এখনও দেবীর পুজোয় ব্যবহার করা হয় ১০৮ টি ফোটা পদ্ম। জল আনা হয় নবদ্বীপের গঙ্গা থেকে।
  • (৪) আগে পুজোর পরে তৈরি হতো মাটির অসুর মূর্তি। রাজা তিরধনুক নিয়ে বধ করতেন তাকে। সে রীতিও এখন আর নেই। তবে এখনও দেশ বিদেশের লোক পুজোর সময় সকলে আমন্ত্রিত হন রাজ দালা।

(খ) চিল্কিগড়ের পূজো

  • (১) সামন্ত রাজা গোপীনাথ মত্ত গজ সিং স্বপ্নে নির্দেশ পেয়েছিলেন রানির হাতের কঙ্কণ দিয়ে তৈরি করতে হবে মায়ের চতুর্ভুজা অশ্বারোহী মূর্তি। কনক দুর্গা নামে পুজো নেবেন মা চণ্ডী। সেই থেকেই শুরু হয় চিল্কিগড় রাজবাড়ির দুর্গা পুজো। অনেক খুঁজেও যখন পূজার জন্য কোনও ব্রাহ্মণ পাওয়া যায় নি, তখন ওড়িশা থেকে আনা হয় রামচন্দ্র ষড়ঙ্গীকে। সেই থেকে এই ষড়ঙ্গী বংশই বংশ পরম্পরায় পুজো করে আসছে এখানে৷
  • (২) কথিত আছে, এক সময় মায়ের পুজো সেরে বাড়ি ফেরার পথে রাজ পুরোহিতকে ছোবল মারে একটি কালো খরিস সাপ। পুরোহিত যখন যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট তখনই স্বপ্নে দেখা দিলেন নীল শাড়ি পরিহিতা চতুর্ভুজা দুর্গা এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন পুরোহিত। দেবীর আশীর্বাদে সেই অঞ্চলে তারপর থেকে আর এই সাপ দেখা যায় নি।
  • (৩) রাজত্ব অবলুপ্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে রাজবাড়ির ১৫ দিনের পুজো নেমে আসে ৫ দিনে। এই ৫ দিনই মহা সমারোহে হয় চণ্ডীপাঠ। আয়োজন হয় বলির৷ দেবী এখানে রক্তমুখী, তাই বলি বাধ্যতামূলক। এক সময় নরবলিও হত৷ কথিত আছে, একবার এক বালককে নিয়ে আসা হয় বলি দিতে। হাঁড়ি কাঠে গলা দেওয়ার পর দুর্গামন্ত্র জপ করতে শুরু করে সে। জানা যায় সে এক ব্রাহ্মণ সন্তান। সেই থেকে নরবলি বন্ধ হয়।
  • (৪) এখন মহাষ্টমীতে মায়ের কাছে নিবেদন করা হয় ১০ থেকে ১২ টি মোষ আর পাঁচশোর-ও বেশি ছাগল। এখন পঞ্চমীর দিন রাজবাড়ির মহিলারা মায়ের মন্দিরে গিয়ে মাকে নতুন সাজে সাজান৷ অষ্টমী পুজোর দিন মন্দিরে উপস্থিত থাকেন কেবলমাত্র রাজবাড়ির লোকজন।
  • (৫) পুজো হয়ে গেলে মন্দির খুলে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের জন্য৷ অষ্টমীতেই পাওয়া যায় বিরাম ভোগ। পুজোর পাশাপাশি প্রাসাদ প্রাঙ্গনে বসে মেলা৷ হয় নাচ গানের অনুষ্ঠান৷ সেকালের রাজা-প্রজা সকলেই এখন একইসঙ্গে মেতে ওঠেন উৎসব অঙ্গনে।

(গ) শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো

  • (১) ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধ -এ হেরে গিয়েছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশদের যাঁরা সহায়ক ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রাজা নবকৃষ্ণদেব৷ জয়ের আনন্দেই সে বছর নিজের বাড়িতে দুর্গাপুজো করেন তিনি৷ সে বছর পুজোর অন্যতম অতিথি ছিলেন লর্ড ক্লাইভ।
  • (২) এখনও সেই পরম্পরা মেনেই পুজোর আয়োজন হয় এখানে৷ শিকাগো বক্তৃতার পর স্বামী বিবেকানন্দকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল এই বাড়ির নাটমন্দিরেই৷ রাজা নবকৃষ্ণের আদি বাড়ি ছিল এটি৷ পরে তিনি পোষ্যপুত্র গোপীমোহনকে এই বাড়িটি দান করে নিজে নতুন বাড়িতে উঠে যান৷
  • (৩) এত গুণীজনের সমাবেশ হতো নাটমন্দিরে, অথচ বাইরে আসার হুকুম ছিল না বাড়ির মেয়েদের৷ পর্দানশীন অন্তঃপুরিকারা শুধুমাত্র অষ্টমীর দিনে চিকের আড়াল থেকে প্রতিমা দেখে অঞ্জলি দিতেন৷ সেই সময় সারা দেশ থেকে আসতেন বত্রিশজন শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ৷ কৃষ্ণা নবমী তিথি থেকে তারা শুরু করতেন চণ্ডীপাঠ, সেই পাঠ শেষ করতে হতো ষষ্ঠীর দিন৷
  • (৪) এখনও হয় ২১০ বার চণ্ডীপাঠ৷ কাশী থেকে ব্রাহ্মণরা এসে বেদ এবং রামায়ণ পাঠ করেন৷ একবার পুজোর বলির জন্য উৎসর্গ করা পশু আশ্রয় নেয় পরিবারের তৎকালীন কর্তা হিন্দুকুলচূড়ামণি রাধাকান্ত দেবের পায়ের তলায়৷ সে বছর থেকে পশুবলি বন্ধ হয়ে যায় শোভাবাজার বাড়িতে৷
  • (৫) তখনকার প্রথা মেনে আজও নানা ধরনের ভাজা আর মিষ্টি দিয়ে হয় মায়ের ভোগ৷ বাড়িতে ভিয়েন বসিয়ে তৈরি হয় মিষ্টি৷ রাজবাড়ির প্রসাদ নিতে আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ।

(ঘ) কাটোয়ার শ্রীখন্ডকর্তারায় দুর্গাপুজো

  • (১) এটি বৈষ্ণব সাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত ব্রজ বুলি ভাষার কবি গোবিন্দ দাস ও দামোদর সেনের বাড়ির দুর্গা পুজো। এই স্থান পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়ার কাছে শ্রীখন্ড নামক গ্রামে অবস্থিত। এখন এই পুজোকে এই অঞ্চলের মানুষ কর্তা রায় বাড়ির দুর্গা পুজো বলেই চেনেন।
  • (২) দামোদর সেনের সময় থেকেই এই পুজো আড়ম্বরের সঙ্গে এখনও চলছে। এই পুজো প্রায় চোদ্দশ শতকে চালু হয় বলে জানা যায়। এখনও তার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত বৃন্দাবন চন্দ্র, রাধারাণী ও দুগ্ধ কুমার শিব নিত্য পুজো পান এই বাড়িতে। তার দ্বারা নিজের হতে প্রতিষ্ঠিত সেই সব মূর্তির পুজো হয়।
  • (৩) দুর্গা পুজোয় রয়েছে কিছু বৈচিত্র্য। তারা নিজের নিয়মে পুজো করেন। তাদের একটি পুরনো বই আছে সেই বই দেখেই হয় পুজোয় জোগাড়। আগে শাক্ত মতে পুজো হলেও, বহু বছর হল বৈষ্ণব মতেই পুজো হয়। দেবী ঘোড়া মত সাদা সিংহের পিঠে বর্তমান। গ্রামের মানুষের ঢল নামে এই পুজোয়। 
  • (৪) কাটোয়া অঞ্চলের সবথেকে ও পূর্ব বর্ধমান জেলার পুরনো পুজোগুলোর মধ্যে এটি একটি। এছাড়াও এই দেবী মুর্তি পুজোর সময় শিকল দিয়ে পিছন থেকে বেঁধে রাখা হয় কারণ দেবী সন্ধি পুজোর সময় নড়ে ওঠেন। আর যেখানে অন্যান্য জায়গায় সন্ধি পুজো সবাই দেখতে পান।
  • (৫) এই পুজোয় পর্দা দিয়ে ঠাকুর কে ঢেকে রাখা হয়। সেই সময় ওই ঠাকুর ঘরে পুরোহিত ও একজন মাত্র সেবায়েত ছাড়া আর কেউ থাকেন না। কারণ দেবী মুর্তি তখন উগ্র রূপ ধারণ করেন এমন হয়েছে যে অনেকেই দেখতে চেয়েছেন তার পরে অজ্ঞান হয়ে যান তাই পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
  • (৬) বলিদানের বাজনা বাজলে পর্দা সরিয়ে সবাইকে দর্শনের সুযোগ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এই দায়িত্ব ভার সামলাচ্ছেন তরুণ সদস্য অরিন্দম রায়। এটি ব্রজ বুলি ভাষার কবি গোবিন্দ দাসের বাড়ির পুজো। এখন এই বাড়ি কে সবাই কর্তা রায় বা বনকাটা রায় বলেই চেনেন।

(ঙ) বাংলাদেশের বাগেরহাটে শিকদার বাড়ির দুর্গাপূজা

প্রতিবছর শিকদার বাড়িতে দুর্গাপ্রতিমা সহ একহাজার থেকে দুইহাজার প্রতিমা বানানো হয়। অনেক দুরদুরান্ত থেকে লোকজন এই পূজামন্ডপে ভিড় জমায়।

(চ) নোয়াখালী রামেন্দ্র সাহার বাড়ির দুর্গাপূজা

বাংলাদেশের নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজ রোডের রামেন্দ্রসাহার বাড়ির সামনে বিশাল আকারের ৭১ ফুট দেবী দুর্গার প্রতিমা নির্মাণ করা হয়।

(ছ) রাজশাহীর কংসনারায়ণের দুর্গাপূজা

মুঘল আমলে বাংলাদেশের রাজশাহীতে এক এলাহি পুজোর আয়োজন করেছিলেন কংসনারায়ন। তখন তিনি খরচ করেছিলেন প্রায় ৯ লক্ষ টাকা, এখনকার হিসাবে দাঁড়ায় ৩০০ কোটি টাকা, দুর্গা পূজার ইতিহাসে এটাই প্রথম এলাহি আয়োজন ছিল।

(জ) মুখোপাধ্যায় পরিবারের আড়াইশো বছরের প্রাচীন দুর্গাপূজা

  • (১) ময়ূরেশ্বর থানার অন্তর্গত বহুপ্রাচীন গ্রাম কুন্ডলার বিত্তশালী হাটুরাম মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত দুর্গা পুজো এলাকার সবথেকে প্রাচীন পুজো। দাদন ও তেজারতির কারবারে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়ে তিনি প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন দুর্গাপুজোয়।
  • (২) পরে তাঁর বংশধরেরা পুর্বে মুর্শিদাবাদ জেলার বড়োঞা থানা থেকে পশ্চিমে মহম্মদবাজার এবং উত্তরে নলহাটি থেকে দক্ষিনে সিউড়ি পর্যন্ত এক বিশাল জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। ধনসম্পদ অর্জনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পুজোর জাঁকজমক ও বেড়ে চলে তা এলাকায় প্রবাদে পরিণত হয়।
  • (৩) এখানে বৈষ্ণব মতে পুজো হয় এবং সন্ধিপুজো এখনও শুরু হয় বন্দুক দেগে। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ কুন্ডলার মুখোপাধ্যায় পরিবারের এই দুর্গাপুজো শুরু হয়।

কালীঘাট মন্দিরে দুর্গাপূজা

  • (১) কলকাতার কালীঘাট মন্দিরে শারদীয়া দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। এই পূজা কবে শুরু হয়েছিল, তা সঠিক জানা যায় না। এখানে দুর্গাপ্রতিমা আনা হয় না। মন্দিরের গর্ভগৃহে স্থাপিত দেবী কালীর মূর্তিকেই দুর্গার মন্ত্রে চামুণ্ডা দুর্গা রূপে পূজা করা হয়। পূজা হয় কালিকা পুরাণ মতে।
  • (২) দুর্গাষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় মন্দির চত্বরের মনসাতলায় বেল গাছ পুঁতে সেখানে বোধন হয়। মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নানের মাধ্যমে পূজা শুরু হয়। কালীঘাট মন্দিরে কালী মূর্তির দুই পাশে দুটি নবপত্রিকা রাখা হয়। মূর্তির ডানদিকের নবপত্রিকাটি সেবায়েতদের পক্ষ থেকে এবং বাঁদিকেরটি সেবায়েতদের গুরুদের পক্ষ থেকে বসানো হয়।
  • (৩) মহাষ্টমী ও মহানবমী তিথিতে কুমারী পূজা করা হয়। মহানবমীতে বলিদান হয়। এই দিনে বলিদান মন্দিরের পুরোহিত ছাড়া কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না। মন্দিরের সব দরজা বন্ধ করে বলি দেওয়া হয়। দুর্গাপূজার সময় কালীঘাট মন্দিরে বিশেষ ভোগের ব্যবস্থা করা হয়।
  • (৪) মহানবমীর রাতে পান্তা ভাত দিয়ে ভোগ দেওয়ার রীতি আছে। বিজয়াদশমীর দিন সিঁদুরখেলা হয়। এই সময় মন্দিরে পুরুষদের ঢুকতে দেওয়া হয় না। এই দিনই নবপত্রিকা বিসর্জনের মাধ্যমে মন্দিরের দুর্গাপূজার সমাপ্তি ঘটে।
  • (৫) দুর্গাপূজা উপলক্ষে বহু মানুষ কালীঘাট মন্দিরে আসেন ও পূজা দেন। কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে এই সময় মন্দিরের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ পুলিশ বাহিনী নিয়োগ করা হয়।

বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা

  • (১) রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রধান কার্যালয় বেলুড় মঠের অন্যতম প্রধান উৎসব হল শারদীয়া দুর্গাপূজা। ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিলেন। সারদা দেবী এই দুর্গাপূজার সময় মঠে উপস্থিত ছিলেন। এর পরেও সারদা দেবী কয়েক বার বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা দেখতে এসেছিলেন।
  • (২) বেলুড় মঠে দুর্গাপূজার সময় কলকাতার কুমারটুলি থেকে প্রতিমা নিয়ে আসা হতো। বর্তমানে মঠ প্রাঙ্গনেই প্রতিমা তৈরি হয়। এখানে বৃহন্নন্দিকেশ্বর পুরাণ মতে পূজা হয়। এই পূজার একটি বৈশিষ্ট্য হল, পূজার সঙ্কল্প এখনও সারদা দেবীর নামেই হয়ে থাকে। ১৯০১ সাল থেকেই কুমারী পূজা বেলুড় মঠের দুর্গাপূজার একটি বিশেষ অঙ্গ।
  • (৩) বেলুড় মঠের দুর্গাপূজার সূচনা হয় জন্মাষ্টমীর দিন। এই দিন কাঠামো পূজা হয়। এরপর মূর্তি নির্মিত হলে, দুর্গাষষ্ঠীর আগের দিন স্থানীয় জগন্নাথ মন্দির থেকে শালগ্রাম শিলা নিয়ে আসা হয়। এরপর দুর্গাষষ্ঠী থেকে বিজয়াদশমী পর্যন্ত সাধারণ শাস্ত্রবিধি অনুসারে পূজা হয়। বিজয়াদশমীর দিন সন্ধ্যায় মঠের ঘাটেই গঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন হয়।
  • (৪) বেলুড় মঠে দুর্গাপূজা দেখার জন্য প্রতিদিন প্রচুর জনসমাগম হয়। সরকারি ও বেসরকারি পরিবহন সংস্থাগুলি এই উপলক্ষে দর্শনার্থীদের জন্য বিশেষ যানবাহনের ব্যবস্থা করে। বেলুড় মঠ ছাড়াও রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অন্যান্য শাখাকেন্দ্রেও পরে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে।

বিষ্ণুপুর মৃন্ময়ী মন্দিরে দুর্গাপূজা

  • (১) পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুর শহরের মৃন্ময়ী মন্দির রাজ্যের একটি অন্যতম প্রধান দুর্গামন্দির। এই মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে। এখানে দুর্গার দশভূজা মূর্তি ‘মৃন্ময়ী’ নামে পূজিত হয়। মৃন্ময়ী মল্লভূমের রাজপরিবারের কুলদেবী। মৃন্ময়ী মন্দিরের শারদীয়া দুর্গাপূজা ১৮ বা ১৯ দিন ধরে চলে।
  • (২) মহালয়ার আগের নবমীতে জীমূতবাহন পূজা হয়। ওই দিন ‘বিল্ববরণ’ নামে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান হয়। দুর্গাপূজার সময় তিনটি বিশেষ পট রাজবাড়ি মন্দিরে আনা হয়। এগুলির নাম হল বড় ঠাকুরানি, মাইতো ঠাকুরানি ও ছোটো ঠাকুরানি বা পটেশ্বরী। জিতাষ্টমীর পরদিন বড় ঠাকুরানি নামের পটটি মন্দিরে আনা হয়।
  • (৩) দুর্গাষষ্ঠীর আগের চতুর্থীর দিন মাইতো ঠাকুরানি নামের পটটি মন্দিরে এনে পূজা করে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। মহাসপ্তমীর দিন মাইতো ঠাকুরানি ও ছোটো ঠাকুরানিকে এক সঙ্গে মন্দিরে আনা হয়। ছোটো ঠাকুরানির পটটি সোনার তৈরি। মহাসপ্তমী থেকে যথানিয়মে পূজা হয়। তবে এই পূজায় পশুবলি দেওয়া হয় না।
  • (৪) মহাষ্টমীর দিন রাজবাড়ি থেকে রাজবাড়ির গৃহদেবী বিশালাক্ষীর অষ্টাদশভূজা অষ্টধাতুর মূর্তিটি মন্দিরে আনা হয়। সন্ধিপূজার সময় তোপধ্বনি করা হয়। মহানবমীর দিন রাতে খচ্চরবাহিনী পূজা নামে একটি বিশেষ পূজা হয়। এই পূজা দুজন পুরোহিত ছাড়া আর কাউকে দেখতে দেওয়া হয় না।
  • (৫) ষ মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী ও মহানবমীর দিন একান্ন পীঠশক্তির বিশেষ পূজা এই মন্দিরের দুর্গাপূজার একটি বৈশিষ্ট্য। দশমীর দিন ঘটবিসর্জন, দীপদান, অপরাজিতা পূজা ও রামচন্দ্র পূজা হয়। দ্বাদশীর দিন মাঝরাতে রাবণকাটা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পূজা শেষ হয়।

নতুন দিল্লি কালীবাড়ির দুর্গাপূজা

  • (১) নতুন দিল্লি কালীবাড়ির দুর্গাপূজা দিল্লি শহরের সবচেয়ে পুরনো দুর্গাপূজাগুলির একটি। পূজাটি শুরু হয়েছিল ১৯২৫ সালে। সেই সময় পূজা হতো বার্ড রোডের (বর্তমানে বাংলা সাহিব রোড) আদি মন্দিরে। স্থানীয় বাঙালি অধিবাসীরা পূজার সময় মন্দিরে আসেন।
  • (২) ১৯৩১ সালে নতুন মন্দিরটি তৈরি হলে সেখানেই দুর্গাপূজার আয়োজন শুরু হয়। কালীবাড়ির পূজা হয় সাবেকি রীতি অনুযায়ী। দুর্গাপ্রতিমাটি হয় একচালার প্রতিমা এবং শোলার সাজবিশিষ্ট। ১৯৩৬ সাল থেকে পূজার ব্যাপারে কিছু নির্দিষ্ট আচার মেনে চলা হচ্ছে। পূজা উপলক্ষে রবীন্দ্রসংগীত ও আবৃত্তির প্রতিযোগিতা আয়োজিত হয়।
  • (৩) কলকাতার শিল্পীরা মণ্ডপ তৈরি করে। কাশ্মীরি গেটের অন্য পূজাটি পরিচালিত হয় দিল্লি দুর্গাপূজা সমিতির দ্বারা। এটি ১৯১০ সাল থেকে চলে আসছে। তিমারপুর অ্যান্ড সিভিল লাইনস পূজা সমিতির পূজাটি তিমারপুরে চলছে ১৯১৪ সাল থেকে।

ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে দুর্গাপূজা

  • (১) বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির দেশের প্রধান মন্দির। এই মন্দিরটি খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীতে নির্মিত। এটি একটি দুর্গামন্দির এবং এখানেও মহাসমারোহে শারদীয়া দুর্গাপূজা আয়োজিত হয়। পূজার সময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী সহ বিরোধী দলনেতা, সাংসদ ও বিখ্যাত ব্যক্তিরা এই মন্দির পরিদর্শনে আসেন।
  • (২) দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই মন্দির দর্শনে আসেন। পূজায় ভোগ খাওয়ানো হয়। বিজয়াদশমীতে পার্শ্ববর্তী প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজয়া সম্মেলনী হয়। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সংগীত ও চলচ্চিত্র জগতের বিশিষ্ট শিল্পীরা উপস্থিত থাকেন।

বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজার সূচনা

  • (১) প্রচলিত মত অনুযায়ী, বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজা করেন নদীয়ার (বর্তমান রাজশাহী) তাহেরপুরে রাজা কংস নারায়ণ রায় বাহাদুর। ১৫৮০ সালে পূজা শুরু হয়। কথিত আছে সেই সময় এই পূজায় কংস নায়রাণ ৮-৯ লক্ষ টাকা খরচ করেছিলেন। তিনি কংস নারায়ণ মন্দিরও ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন।
  • (২) রাজকীয় অনুষ্ঠান করার ইচ্ছায় কংসনারায়ণ মহাযজ্ঞ করার সিদ্ধান্ত নেন। রাজপুরোহিত ছিলেন নাটোর বাসুদেবপুরের ভট্টাচার্য বংশের পণ্ডিত রমেশ শাস্ত্রী। বংশানুক্রমে কংসনারায়ণ পশুবলি-বিরোধী বলে অশ্বমেধ বা গোমেধ যজ্ঞ করা যাবে না বলে দুর্গাপূজা শুরু করেন।
  • (৩) আর একটি দাবী অনুযায়ী, তারও আগে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রধান শিষ্য নিত্যানন্দ খড়দহে স্বগৃহে প্রতিমায় দুর্গোৎসব করেছিলেন। আর একটি মতে কনৌজ -এর পাঁচ কুলীন ব্রাহ্মণের এক ব্রাহ্মণ সুধানিধির বংশকে ‘ঘোষাল’ উপাধি দেন বাংলার সেন বংশ -এর শাসক লক্ষ্মণ সেন
  • (৪) ১৪৫০ সালে সেই সুধানিধি বংশের আশুতোষ ঘোষাল কোন্নগরে আসেন। সেই ঘোষাল বংশের পারিবারিক নথি অনুসারে, কোন্নগরের বাড়িতে ১৪৫৪ সালে বাংলায় প্রথম দুর্গাপূজার সূচনা হয়। আরো একটি মতে ১৫০৭ সালে চন্দননগরের খলিসানির বসু বাড়িতে করুণাময় বসু দুর্গাপূজার প্রবর্তন করে।
  • (৫) সেই দুর্গাপূজারর বিস্তৃতি ছড়ায় সেই বংশের রামকমল বসুর আমলে। পর্তুগিজদের সঙ্গে ব্যবসা করতেন বলে তাঁকে বলা হতো ‘ফিরিঙ্গি কমল বসু’। রামকমল বসুর নামে আপার চিৎপুর রোডের (বর্তমানে রবীন্দ্র সরণি) বাড়িতে এখন বর্তমানে ‘মাতৃমঙ্গল প্রতিষ্ঠান’ নামে হাসপাতাল রয়েছে।
  • (৬) আরও একটি দাবী মতে, বাংলায় সবার আগে মাটির মূর্তিতে দুর্গাপূজা হয়েছে বাকুড়ার বিষ্ণুপুরের মৃন্ময়ী মন্দিরে। তখন মল্লভূমের রাজধানী প্রদ্যুম্ননগরে ছিল। রাজা জগৎমল্ল ছিলেন এই বংশের ১৯তম রাজা। লোকশ্রুতি মতে প্রদ্যুম্ননগর থেকে রাজধানী বিষ্ণুপুরে সরিয়ে আনেন এবং রাজা জগৎমল্ল মৃন্ময়ী দেবীর মূর্তি পূজা শুরু করেন।

দুর্গাপূজা উপলক্ষে কুমোরটুলির সংস্কৃতি

  • (১) কলকাতার কুমারটুলি নামে স্থানটি মাটির দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণের জন্য বিখ্যাত। কুমারটুলি থেকে শুধু কলকাতা বা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলেই নয়, আমেরিকা, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশেও দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। বিদেশে সরবরাহের জন্য মাটি ছাড়া অন্যান্য উপাদানেও দুর্গাপ্রতিমা বানানো হয়। কারণ, মাটি ভঙ্গুর, পরিযানে স্থানান্তরের অসুবিধে।
  • (২) ১৯৮৯ সালে কুমারটুলির শিল্পী অমরনাথ ঘোষ শোলার দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে সুইডেন, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া ও নাইজেরিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। ফাইবার গ্লাসের দুর্গাপ্রতিমাও অন্যান্য দেশে সরবরাহ করা হয়। ২০০৬ সালের হিসেব অনুযায়ী, কুমারটুলি থেকে মোট ১২,৩০০টি দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়।
  • (৩) এই অঞ্চল থেকে প্রতিবছর বিশ্বের ৯০টিরও বেশি দেশে দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করা হয়। বিদেশে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে দুর্গাপ্রতিমা সরবরাহ করে দেওয়ার জন্য কুমারটুলিতে বেশ কিছু কর্মী কাজ করে। মোহনবাঁশি রুদ্রপাল, সনাতন রুদ্রপাল, প্রদীপ রুদ্রপাল, রাখাল পাল, গণেশ পাল, অলোক সেন, কার্তিক পাল, কেনা পাল প্রমুখ শিল্পীরা কুমারটুলির প্রধান প্রতিমাশিল্পী।
  • (৪) কলকাতার অধিকাংশ পূজার প্রতিমা তারাই বানান। মিনতি পাল, সোমা পাল, কাঞ্চি পাল, চাঁপারানি পাল, চায়না পাল প্রমুখ মহিলা শিল্পীরাও বর্তমানে প্রতিমা তৈরি করছেন। কুমারটুলির শিল্পীদের দুর্গাপূজা শুরু হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। বিশিষ্ট প্রতিমাশিল্পী গোপেশ্বর পাল এই পূজার প্রতিমা তৈরি করেছিলেন।

জনপ্রিয় মাধ্যমে দুর্গাপূজা

পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসব হল দুর্গাপূজা। দুই জনপ্রিয় মাধ্যমে এই পূজা উদযাপন করা হয়। যেমন –

(ক) আগমনী গান

  • (১) পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, যজ্ঞস্থলে পিতা দক্ষ প্রজাপতির মুখে পতি মহাদেবের নিন্দাবাণী ও কটূক্তি শুনে ক্রোধে ও ক্ষোভে অধীরা সতী দেহত্যাগ করেছিলেন এবং মহাদেবকে আবার পতিরূপে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় গিরিরাজ হিমালয়ের গৃহে দেবী মহামায়া তার কন্যা পার্বতীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
  • (২) পুরাণে বর্ণিত মহিষাসরমর্দিনী চণ্ডিকা বা শুম্ভ নিশুম্ভ দলনি কৌশিকী এই সকল দেবী মাতা পার্বতীর অবতার। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে রচিত বাংলা আগমনী গানগুলিতে দুর্গারূপে শিবজায়া পার্বতীর সপরিবারে পিতৃগৃহে অবস্থানের এই আনন্দময় দিনগুলোর এবং তার বিবাহিত জীবনের অপূর্ব বর্ণনা পাওয়া যায়।
  • (৩) এই সব গানে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে কন্যা বিরহে কাতরা মা মেনকার গভীর অপত্যস্নেহ, অন্যদিকে তেমনি চিত্রিত হয়েছে স্বামী সোহাগিনী পার্বতীর গর্ব ও আনন্দের উচ্ছাস। এখানে গৌরী একাধারে জগজ্জননী এবং বাংলার জননীদের কাছে কন্যাসমা।
  • (৪) আগমনী গানগুলি শাক্ত পদাবলীর অন্তর্গত। এই গান গুলি রচয়িতাদের মধ্যে সাধক রামপ্রসাদ সেন, কমলাকান্ত চক্রবর্তী, দাশরথি রায় এবং পরবর্তীকালে নাট্যাচার্য গিরিশচন্দ্র ঘোষ, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তিরা প্রভূত মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।

(খ) মহিষাসুরমর্দিনী

  • (১) জনপ্রিয় কাহিনী মহিষাসুরমর্দিনী মহালয়ার দিন ভোরবেলা সম্প্রচারিত বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের মহিষাসুরমর্দিনী মহালয়া  একটি বিশেষ বেতার অনুষ্ঠান। এটি ১৯৩২ সাল থেকে আকাশবাণীতে সম্প্রচারিত হয়ে আসছে। বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র মহাজাতি সদনের একটি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতানুষ্ঠানে মস্করা করে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ঘরে খিল দেওয়া থাকলেও আমি পৌঁছে যাই সকলের কাছে।’ কারণ বেতারে চণ্ডীপাঠ সবাই শোনেন।
  • (২) এই অনুষ্ঠানে শ্রীশ্রীচণ্ডী থেকে নির্বাচিত কিছু স্তোত্র, আগমনী গান ও বাংলা ভক্তিগীতি সহ চণ্ডীমাহাত্মম গ্ৰন্থের দুটি গল্প শ্রুতিনাটকের আকারে শোনানো হয়। সর্বভারতীয় শ্রোতাদের জন্য অনুষ্ঠানটির হিন্দি সংস্করণও একই সময় সম্প্রচারিত হয়। প্রথম দিকে এই অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচারিত হতো।
  • (৩) ১৯৬০-এর দশক থেকে অনুষ্ঠানটির রেকর্ড সম্প্রচারিত হয়ে আসছে। এই অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয়। আকাশবাণীর পক্ষ থেকে এই অনুষ্ঠানটি ক্যাসেট ও সিডি আকারেও প্রকাশ করা হয়েছে। এই অনুষ্ঠানে চণ্ডীপাঠসহ অন্যান্য পাঠগুলি করেছেন বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র।
  • (৪) তার পাঠ এতটাই জনপ্রিয় হয় যে, ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এই অনুষ্ঠানটি বন্ধ করে জনপ্রিয় বাঙালি অভিনেতা উত্তমকুমারকে দিয়ে অন্য একটি অনুষ্ঠান করাতে গেলে শ্রোতারা নতুন অনুষ্ঠানটির প্রতি বিরূপ হন। ফলে পরবর্তীতে পুরোনো অনুষ্ঠানটির সম্প্রচারই চলতে থাকে।
  • (৫) অনুষ্ঠানটির গান রচনা করেছিলেন বাণীকুমার ভট্টাচার্য এবং সুরারোপ করেছিলেন পঙ্কজকুমার মল্লিক। গানগুলি গেয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষ প্রমুখ বিশিষ্ট শিল্পীরা।

২০২৩ সালের দুর্গাপূজার নির্ঘন্ট

পঞ্জিকা অনুসারে, ১৪৩০ বঙ্গাব্দে দুর্গাপুজো পড়েছে কার্তিকের শুরুতে। ইংরাজি ক্যালেন্ডারের হিসাবে ২০২৩ সালে দুর্গাপুজো হবে অক্টোবরের শেষে। বাংলা ২ কার্তিক ইংরাজি ২০ অক্টোবর শুক্রবার ষষ্ঠীতে শুরু হবে দুর্গাপুজো। ওই দিন রাত ১১.২৪ মিনিটে লাগবে সপ্তমী। শনিবার ২১ অক্টোবর পড়েছে সপ্তমী। ওই দিন রাত ৯.৫৪ মিনিটে লাগবে অষ্টমী। ২২ অক্টোবর রবিবার হবে অষ্টমী পুজো। ওই দিন রাত ৭.৫৯ মিনিটে লাগবে নবমী। ২৩ অক্টোবর সোমবার নবমী। ওই দিন বিকেল ৫.৪৫ মিনিটে লাগবে দশমী। ২৪ অক্টোবর মঙ্গলবার পড়েছে বিজয়া দশমী।

মহালয়া১৪ অক্টোবর
মহা ষষ্ঠী২০ অক্টোবর
মহা সপ্তমী২১ অক্টোবর
মহা অষ্টমী২২ অক্টোবর
মহা নবমী২৩ অক্টোবর
বিজয়া দশমী২৪ অক্টোবর
২০২৩ সালের দুর্গাপূজার নির্ঘন্ট

উপসংহার:- শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, শিউলি ফুলের গন্ধ জানান দেয় পুজোর আগমন বার্তা। বাঙালির সবচেয়ে বড় পার্বণ দুর্গা পুজো। ষষ্ঠী থেকে দশমী, শারদীয়া দুর্গোত্‍সবের এই পাঁচ দিন মেতে ওঠেন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে আপামর বাঙালি। ঘরের মেয়েকে স্বাগত জানাতে সেজে ওঠে ধনীর অট্টালিকা থেকে গরীবের কুঁড়েঘর।

(FAQ) দুর্গাপূজা (Durga Puja) সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দুর্গাপূজা কি?

উত্তর:- দুর্গাপূজা হল দেবী দুর্গার উপাসনার জন্য নিবেদিত একটি প্রধান হিন্দু উৎসব, যিনি অশুভের উপর শুভ বিজয়ের প্রতীক।

২. দুর্গাপূজা কখন উদযাপিত হয়?

উত্তর:- দূর্গা পূজা সাধারণত চন্দ্র ক্যালেন্ডারের উপর নির্ভর করে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এটি চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে বিস্তৃত।

৩. কোথায় দুর্গাপূজা সবচেয়ে জনপ্রিয়?

উত্তর:- দুর্গাপূজা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে, বিশেষ করে কলকাতায় সর্বাধিক জনপ্রিয়। তবে এটি ভারত জুড়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশে উল্লেখযোগ্য ভারতীয় প্রবাসীদের সাথে পালিত হয়।

৪. দুর্গাপূজার প্রধান আচারগুলো কি কি?

উত্তর:- দুর্গাপূজার কিছু প্রধান আচারের মধ্যে রয়েছে প্রতিমা স্থাপন, ‘সপ্তমী’, ‘অষ্টমী’, ‘নবমী’ পূজা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ‘দশমীতে’ প্রতিমা বিসর্জন।

৫. দুর্গাপূজা কেন পালিত হয়?

উত্তর:- দুর্গাপূজা অসুর মহিষাসুরের উপর দেবী দুর্গার বিজয় উদযাপন করে। এই পূজা অশুভের উপর শুভ বিজয়ের প্রতীক।

৬. দুর্গাপূজার ঐতিহ্যবাহী খাবার কি কি?

উত্তর:- ঐতিহ্যবাহী বাঙালি মিষ্টি যেমন – ‘রসোগোল্লা’, ‘সন্দেশ’, এবং ‘মিষ্টি দই’ সাধারণত দুর্গাপূজার সময় অন্যান্য সুস্বাদু খাবারের সাথে প্রস্তুত করা হয়।

৭. দুর্গাপূজা প্রতিমার তাৎপর্য কি?

উত্তর:- দেবী দুর্গার মূর্তিটি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে এবং ভক্তি সহকারে তৈরি করা হয়েছে। এই পূজা ঐশ্বরিক নারী শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এই প্রতিমা সাধারণত দেবী দুর্গা কর্তৃক মহিষাসুর রাক্ষস বধ করার দিকটিকে চিত্রিত করে।

৮. ভারতের বাইরে দুর্গাপূজা কীভাবে পালিত হয়?

উত্তর:- দুর্গাপূজা বিভিন্ন দেশে ভারতীয় প্রবাসীরা উৎসাহের সাথে উদযাপন করে। তারা উৎসবের চেতনা বজায় রেখে ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোকে পুনরায় তৈরি করে।

৯. দুর্গাপূজার সময় বিসর্জনের প্রক্রিয়া কী?

উত্তর:- দুর্গাপূজার শেষ দিনে, মূর্তিটিকে জলে (সাধারণত একটি নদী বা জলাশয়) নিমজ্জিত করা হয়, যা দেবীর স্বর্গীয় আবাসে ফিরে আসার প্রতীক।

১০. দুর্গাপূজার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পোষাক কোড আছে?

উত্তর:- দুর্গাপূজার কোনো কঠোর পোষাক কোড নেই, তবে অনেকেই ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় পোশাক পরতে পছন্দ করে, বিশেষ করে পূজা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময়।

Leave a Comment