নেপাল

স্বাধীন দেশ নেপাল প্রসঙ্গে নামকরণ, ইতিহাস, রাজনৈতিক দিক, সামরিক দিক, প্রশাসনিক অঞ্চল, ভৌগোলিক দিক, অর্থনৈতিক দিক, জনবসতি, ভাষা, সংস্কৃতি, পর্যটন কেন্দ্র, উদ্ভিদ ও প্রাণী জগৎ সম্পর্কে জানবো।

নেপাল

দেশ নেপাল
রাজধানী কাঠমান্ডু
প্রধান ভাষা নেপালি ভাষা
সরকার যুক্তরাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র
প্রধানমন্ত্রী শের বাহাদুর দেউবা
রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি
নেপাল

ভূমিকা :- হিমালয় অধ্যুষিত দক্ষিণ এশীয় একটি দেশ নেপাল, যার সাথে উত্তরে চীন এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারত -এর সীমান্ত আছে। নেপালের শতকরা ৮১ ভাগ জনগণই হিন্দু ধর্মের অনুসারী।

নামকরণ

নেপাল নামটির সঠিক উৎপত্তি সম্পর্কে জানা যায়নি। তবে সবচেয়ে জনপ্রিয় মত অনুসারে নেপাল নামটি দুটি শব্দ নে এবং পাল থেকে এসেছে। নে শব্দের অর্থ পবিত্র এবং পাল শব্দের অর্থ গুহা। সেদিক থেকে নেপাল শব্দের অর্থ হল পবিত্র গুহা।

ইতিহাস

  • (১) নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর উপত্যকায় প্রাপ্ত নব্য প্রস্তর যুগ -এর বেশকিছু উপাদান থেকে মনে করা হয় যে হিমালয়ান অঞ্চলে প্রায় ৯০০০ বছর থেকে মানুষ বসবাস করছে। প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে নেপালে তিব্বতী-বার্মীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল বলে জানা যায়।
  • (২) ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইন্দো ইরানীয় বা আর্য জাতিগোষ্ঠী এই হিমালয়ান উপত্যকায় প্রবেশ করে। ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এই অঞ্চলটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য স্বতন্ত্র রাজ্য ও কনফেডারেশন গড়ে উঠে। এরকমই একটি কনফেডারেশন ছিল শাক্য, যার একসময়কার রাজা ছিলেন সিদ্ধার্থ গৌতম বা গৌতম বুদ্ধ। তিনি পবিত্র ও সাধনাময় জীবনযাপনের জন্য তার রাজত্ব ত্যাগ করেছিলেন।
  • (৩) ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এই অঞ্চলটি উত্তর ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্য -এর অধীনে আসে এবং চতুর্থ শতাব্দীতে এটি গুপ্ত সম্রাজ্যের অধীনে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পঞ্চম শতাব্দীর শেষ হতে শুরু করে পরবর্তী বেশ কিছুটা সময় শাসন করে একদল শাসক যারা সাধারণভাবে লিচ্ছবি নামে পরিচিত।
  • (৪) একাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে নেপালের দক্ষিণাংশ দক্ষিণ ভারতের চালুক্য সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। চালুক্যদের রাজত্বকালে নেপালের ধর্মে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। কারণ, সব রাজাই হিন্দু ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন এবং বৌদ্ধ ধর্ম -এর প্রসারের বিপরীতে হিন্দু ধর্মের প্রচারে অবদান রাখেন।
  • (৫) দ্বাদশ শতাব্দীতে যেসব রাজা অধিষ্ঠান করেন তাদের নামের শেষে সাধারণ একটি শব্দ ছিল আর তা হল মল্ল, যার অর্থ কুস্তীগীর।
  • (৬) গোর্খারাজ পৃথ্বীনারায়ণ শাহ কয়েক দশক ধরে যুদ্ধের পর কাঠমান্ডু উপত্যকা দখল করে ছোটবড় রাজ্যে বিভক্ত নেপালকে একটি রাষ্ট্রীয় সংহতি দান করেন। নেপালের ইতিহাসে এই সময় থেকে একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে হিমালয় কন্যা নেপালের যাত্রা শুরু হয়। এই পৃথ্বীনারায়ণ শাহকে আজকের নেপালের প্রতিষ্ঠাতা বলা যায়।

রাজনৈতিক দিক

  • (১) বর্তমানে নেপালের রাজনীতি একটি বহুদলীয় প্রজাতন্ত্রের কাঠামোতে সংগঠিত। সরকারের প্রধান হলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারের হাতে নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। আইনসভার উপর আইন প্রণয়নের দায়িত্ব ন্যস্ত। বর্তমানে শের বাহাদুর দেউবা নেপালের রাষ্ট্রপতি এবং বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি নেপালের প্রধানমন্ত্রী।
  • (২) ২০০৮ সালের মে মাস পর্যন্ত নেপাল একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ছিল। মে মাসের ২৮ তারিখে নেপালের আইনসভা সংবিধানে সংশোধন আনে এবং নেপালকে একটি প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত করে।
  • (৩) নেপালের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দল গুলি হল – জাতীয় প্রজাতন্ত্র পার্টি, নেপালি কংগ্রেস, জাতীয় জনতা পার্টি, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি (একীকৃত মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী), নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (সংযুক্ত মার্কসবাদী), সঙ্ঘীয় সমাজবাদী ফোরাম, নেপালের কমিউনিস্ট পার্টি (মাওবাদী-কেন্দ্র), নেপাল মজদুর কিসান পার্টি।

সামরিক দিক

১৭৬২ সালে নেপালী সেনাবাহিনী গঠিত হয় এবং ২০০৮ সাল পর্যন্ত নেপালের সেনাবাহিনীর নাম ছিল ‘রাজকীয় নেপালি সেনা’। নেপালে কোনো বিমান বাহিনী নেই আর যেহেতু নেপালের কোনো সমুদ্র সীমানা নেই তাই নৌবাহিনীও নেই।

প্রশাসনিক বিভাগ

নেপালকে ১৪টি প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এগুলি আবার ৭৫টি জেলায় বিভক্ত। নেপালের প্রশাসনিক অঞ্চল গুলি হল –

(১) পূর্বাঞ্চল

মেচী অঞ্চল, কোশী অঞ্চল, সগরমাথা অঞ্চল।

(২) মধ্যাঞ্চল

জনকপুর অঞ্চল, বাগমতী অঞ্চল, নারায়ণী অঞ্চল।

(৩) পশ্চিমাঞ্চল

গণ্ডকী অঞ্চল, লুম্বিনী অঞ্চল, ধলাগিরি অঞ্চল।

(৪) মধ্যপশ্চিমাঞ্চল

রাপ্তী অঞ্চল, কর্ণালী অঞ্চল, ভেরী অঞ্চল

(৫) সুদুর পশ্চিমাঞ্চল

সেতী অঞ্চল, মহাকালী অঞ্চল।

ভৌগোলিক দিক

  • (১) নেপালের ভূ-প্রকৃতি অত্যন্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ। নেপালের আকৃতি অনেকটা চতুর্ভুজের মত, প্রায় ৮০০ কিমি (৫০০মাইল) দৈর্ঘ্য এবং ২০০ কিমি (১২৫ মাইল) প্রস্থ। নেপালের মোট আয়তন প্রায় ১৪৭,১৮১ বর্গকিমি (৫৬,৮২৭ বর্গমাইল)।
  • (২) ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্য অনুসারে নেপাল তিন ভাগে বিভক্ত – পর্বত, পাহাড়ী উঁচু ভূমি এবং নিচু সমতল ভূমি অর্থাৎ তরাই।
  • (৩) নেপালের প্রধান ভৌগোলিক ক্ষেত্রগুলি হল –

(ক) হিমালয় :- নেপালের সিংহভাগ জুড়ে আছে হিমালয় পর্বতমালা।

(খ) পাহাড় :- পার্বত্য দেশ নেপালের ভূপ্রকৃতির ধরণ হল পাহাড়ী উঁচু ভূমির মত।

(গ) তরাই :- সীমান্তঘেঁষা তরাই নিম্নভূমি নারায়ণী ও কর্ণালী নদীবিধৌত।

অর্থনৈতিক দিক

নেপালের অর্থনীতি মূলত পর্যটন শিল্পের উপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক বছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে বহু মানুষ নেপাল ভ্রমণ করে।

জনবসতি

সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর লোক দক্ষিণের সমতল ভূমি অর্থাৎ তরাই-এ বসবাস শুরু করলেও এখনো দেশের সিংহভাগ মানুষ বাস করে মধ্য উচ্চভূমিতে। উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল জনবিরল। রাজধানী কাঠমান্ডু দেশের সবচেয়ে বড় শহর এবং এর জনসংখ্যা প্রায় ৮ লক্ষ। নেপালের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৩ কোটি।

ভাষা

নেপালের সরকারি ভাষা হল নেপালি ভাষা। এখানকার প্রায় ৬০% লোক নেপালি ভাষাতে কথা বলেন। নেপালে আরও প্রায় ১২০টি ভাষা প্রচলিত। এদের মধ্যে মৈথিলী ভাষা, ভোজপুরি ভাষা, মুর্মি ভাষা, নেওয়ারি ভাষা, এবং মগর ভাষা উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ডে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়।

সংস্কৃতি

  • (১) হিন্দু এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির মিশ্রণে তৈরি হয়েছে নেপালের সংস্কৃতি। নেপালের প্রধান উৎসব বিজয়া দশমী, বুদ্ধ জয়ন্তী, তিহার। নেপালের রাষ্ট্রীয় পোশাক দৌরা সুরুবাল (পুরুষ) এবং সারী (মহিলা)।
  • (২) নেপালের সংস্কৃতি অনেকগুলো দেশীয় ও আদিবাসী গোষ্ঠীর সংস্কৃতির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, ফলে নেপাল এক বহুসাংস্কৃতিক রাষ্ট্র। নেপালের সংস্কৃতি বেশ সমৃদ্ধ এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ, বিশেষকরে নেওয়ার জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি। নেওয়ার জনগোষ্ঠী অনেকগুলো পার্বণ পালন করে এবং তারা তাদের গান ও নাচের জন্য সুপরিচিত।
  • (৩) নেপালের সাধারণ খাদ্যতালিকা হল ডাল-ভাত-তরকারী, এর সাথে থাকে আচার বা চাটনী। নিচু সমতল ভূমিতে ঘরের কাঠামো তৈরির প্রধান উপকরণ বাঁশ এবং গোবর মিশ্রিত কাদা দিয়ে ঘরের দেওয়াল তৈরি করা হয়। এই ধরনের ঘর শীতের দিনে বেশ গরম এবং গরমের দিনে বেশ ঠান্ডা থাকে।
  • (৪) নেওয়ারী সঙ্গীতে ঐকতান সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হয়, অধিকাংশই বাজাতে হয় ঘষে ঘষে, তবে বাঁশি ও বাঁশিজাতীয় আরো কিছু বাদ্যযন্ত্র রয়েছে। তারযুক্ত বাদ্যযন্ত্র খুব কম ব্যবহৃত হয়।
  • (৫) সঙ্গীত রয়েছে বিভিন্ন ব্যঞ্জনার, যা ভিন্ন ভিন্ন ঋতু এবং উৎসবকে মূর্ত করে তোলে। যেমন, পাহান চারে সঙ্গীত পরিবেশিত হয় অত্যন্ত দ্রুত লয়ে এবং ডাপা সঙ্গীত পরিবেশিত হয় খুব ধীর লয়ে।
  • (৬) কিছু বাদ্যযন্ত্র আছে যেগুলো শুধুমাত্র যন্ত্রসঙ্গীতেই ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ধিমাই বাজে সবচেয়ে উচ্চগ্রামে। পাহাড়গুলোতে ভিন্ন ভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সঙ্গীত রয়েছে, লোকগীত বা লোক দোহারী অত্যন্ত জনপ্রিয়।
  • (৭) লোকগাঁথা নেপালী সমাজ ও সংস্কৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। চিরায়ত লোকগল্পগুলোর মূলে রয়েছে দৈনন্দিন বাস্তবতা, প্রেম-ভালবাসা, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দানব, দেবতা যার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় প্রচলিত বিশ্বাস ও সংস্কৃতি। অনেক নেপালী লোককাহিনী গান ও নাচ সহযোগে পরিবেশিত হয়।

পর্যটন কেন্দ্র বা দর্শনীয় স্থান

নেপাল এবং চীনের সীমান্ত জুড়ে যে অঞ্চল সেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১০ টি পর্বতের ৮ টিই অবস্থিত। এখানেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অবস্থিত। তাছাড়া নাগরকোট, পোখরা, কাঠমান্ডু প্রভৃতি এখানকার উল্লেখযোগ্য পর্যটনকেন্দ্র।

উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ

  • (১) বন্যপ্রাণী বৈচিত্র্য নেপালের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। অত্যন্ত ঠান্ডা থেকে উষ্ণপ্রধান আবহাওয়ার তারতম্যের জন্য নেপালে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে এক বিরাট বিভিন্নতা বা বৈচিত্র্য আছে।
  • (২) বন্যপ্রাণী পর্যটন এই দেশের অন্যতম পর্যটন। এখানে কিছু বন্যপ্রাণী আছে যা একমাত্র নেপালে দেখা যায় যেমন স্পিনি ব্যাব্লার। নেপালেই বিভিন্ন প্রজাতির রডোডেন্ড্রন দেখা যায়।
  • (৩) নেপালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য অনেকগুলি জাতীয় উদ্যান স্থাপন করা হয়। যার মধ্যে গুরত্বপূর্ণ ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হল সাগরমাথা জাতীয় উদ্যান ও চিতওয়ান জাতীয় উদ্যান।

গণমাধ্যম

নেপাল থেকে প্রকাশিত পত্রিকা গুলি হল কান্তিপুর ন্যাশনাল ডেইলি, নেপাল সমাচারপত্র, হিমালয়ান টাইমস, কাঠমান্ডু পোস্ট রাজধানী ডেইলী, বুধবার সাপ্তাহিক, জন আস্থা সপ্তাহিক।

উপসংহার :- বেশ ছোট আয়তনের একটি দেশ হলেও নেপালের ভূমিরূপ অত্যন্ত বিচিত্র। আর্দ্র আবহাওয়া বিশিষ্ট অঞ্চল তরাই থেকে শুরু করে সুবিশাল হিমালয় সর্বত্রই এই বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়।

(FAQ) নেপাল সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আজকের নেপালের প্রতিষ্ঠাতা কাকে বলা হয়?

গোর্খারাজ পৃথ্বীনারায়ণ শাহ।

২. নেপালের প্রধান ভাষা কি?

নেপালি।

৩. নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে?

শের বাহাদুর দেউবা।

৪. নেপালের বর্তমান রাষ্ট্রপতি কে?

বিদ্যা দেবী ভাণ্ডারি।

৫. নেপালে অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের নাম কি?

মাউন্ট এভারেস্ট।

Leave a Reply

Translate »