ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি

ঔরঙ্গজেবের ধর্ম নীতি প্রসঙ্গে জিন্দাপির ঔরঙ্গজেব, ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় আদর্শ, পরস্পর বিরোধী মতবাদ, ইসলাম বিরোধী প্রথা রদ, হিন্দুদের প্রতি নীতি, আধুনিক মত ও আকবরের সমদর্শী আদর্শ থেকে ঔরঙ্গজেবের বিচ্যুতি সম্পর্কে জানবো।

ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি (Religious Policy of Aurangzeb)

ঐতিহাসিক ঘটনাঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি
রাজত্বকাল১৬৫৮-১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ
উপাধিজিন্দাপির
জিজিয়া কর পুনরায় চালুঔরঙ্গজেব, ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু১৭০৭ খ্রিস্টাব্দ
ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি

ভূমিকা :- সম্রাট ঔরঙ্গজেব ব্যক্তিগত জীবনে একজন নিষ্ঠাবান সুন্নি মুসলমান ছিলেন এবং শরিয়ৎ-এর বিধান অনুসারে নিজে অতি সংযমী ও অনাড়ম্বর জীবনযাপন করতেন। তিনি নিজেকে ‘গাজি’ বা ধর্মযোদ্ধা বলে অভিহিত করতেন।

জিন্দাপির

তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা ও ধর্মের প্রতি নিষ্ঠা দেখে সমকালীন সুন্নি মুসলিমরা তাঁকে ‘জিন্দাপির’ বা জীবন্ত সাধু বলে মনেকরতেন।

ধর্মীয় আদর্শ

  • (১) তাঁর সম্পর্কে বলা হয় যে, তাঁর একমাত্র ব্রত ছিল ‘দার-উল্-হারব’ (অ মুসলমানের দেশ)-কে ‘দার-উল-ইসলাম’ (মুসলমানের দেশ)-এ পরিণত করা এবং তাঁর সমস্ত কাজ এই আকাঙ্ক্ষার দ্বারা প্রভাবান্বিত হয়েছিল।
  • (২) তিনি এমন একটি রাষ্ট্র স্থাপন করতে চেয়েছিলেন, যার মূল সঞ্জীবনী হবে মহম্মদ ও কোরান। স্যার যদুনাথ সরকার বলেন যে, এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য সর্বপ্রকার রাজনৈতিক বিপদ বরণ করতে ও রাজস্বের ক্ষতি স্বীকারেও তিনি প্রস্তুত ছিলেন, কিন্তু তাঁর ধর্ম ও শাসননীতি পরিবর্তনে রাজি ছিলেন না।

পরস্পর-বিরোধীমতবাদ

ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি নিয়ে দু’টি পরস্পর-বিরোধী ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে। –

  • (১) একদিকে স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ শ্রীবাস্তব, জে. এন. চৌধুরী, ঈশ্বরী প্রসাদ, ভিনসেন্ট স্মিথ প্রমুখ ঐতিহাসিকরা মনে করেন যে, ঔরঙ্গজেব আকবর-অনুসৃত উদার ধর্মীয় নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে ভারতে একটি ধর্মাশ্রয়ী সাম্রাজ্য গঠনে উদ্যোগী হন এবং এর ফলে সাম্রাজ্যের সর্বনাশ ডেকে আনেন।
  • (২) অন্যদিকে আধুনিক ঐতিহাসিক স্পিয়ার, সতীশ চন্দ্র, আতাহার আলি, ইরফান হাবিব, ফারুকি তাঁর ধর্মনীতির এক ভিন্নতর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, এক বিশেষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঔরঙ্গজেব তার ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেন। তাঁকে নিছক হিন্দু-বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করা অযৌক্তিক।

ইসলাম-বিরোধী প্রথারদ

  • (১) কোরান ও শরিয়ৎ-বিরোধী বলে তিনি দরবারে পারসিক নওরোজ’ বা বসন্তোৎসব, জন্মদিনে সম্রাটকে সোনা ও রূপা দিয়ে ওজন করা, ‘ঝরোখা দর্শন’ ও নৃত্য-গীত বন্ধ করে দেন।
  • (২) দরবারে নিযুক্ত গায়ক ও বাদকদের পদচ্যুত করা হয়। পদচ্যুত গায়ক ও বাদকরা লক্ষ্ণৌয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। চিত্রাঙ্কন ইসলাম বিরোধী, তাই চিত্রাঙ্কন নিষিদ্ধ হয় এবং দরবারের চিত্রশিল্পীরা বিতাড়িত হন।
  • (৩) জ্যোতিষীদেরও দিল্লি থেকে বিতাড়িত করা হয় এবং তাঁদের বার্ষিক পঞ্জিকা তৈরি করা নিষিদ্ধ হয়। মদ্যপান, গাঁজা ভাঙের ব্যবহার, জুয়া খেলা, পিরের দরগায় বাতি দেওয়া ও মহরমের শোভাযাত্রা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ হয়।
  • (৪) মুদ্রায় ‘কলিমা’ খোদাই নিষিদ্ধ হয়। তিনি চাইতেন না যে, মুদ্রা ব্যবহারের সময় বিধর্মীরা ‘কলিমা’ স্পর্শ করে। নর্তকী ও গণিকাদের তিনি দিল্লি থেকে বহিষ্কৃত করেন এবং তাদের গার্হস্থ্য জীবনে প্রবেশের পরামর্শ দেন।
  • (৫) জনসাধারণ কোরান-নির্দিষ্ট পথে জীবনযাত্রা পরিচালিত করছেন কিনা তা লক্ষ্য করার জন্য তিনি ‘মুহতাসিব’ নামক কর্মচারীদের নিযুক্ত করেন। তিনি পেশকার’, ‘ক্রোরি’ প্রভৃতি রাজপদ সৃষ্টি করে তা কেবলমাত্র মুসলিমদের জন্যই সংরক্ষিত করেন।
  • (৬) তাঁর আমলে পুরোনো মসজিদগুলি সংস্কার করা হয় এবং সেগুলি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তিনি বৃত্তিধারী লোক নিযুক্ত করেন। তাঁর শাসনকালে মোল্লা, মৌলবি ও উলেমাদের মর্যাদা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়। দরবারে তাঁদের বিশেষ সম্মান দেওয়া হয়। ১৫৮০ খ্রিস্টাব্দে ‘মহাজরনামা’ দ্বারা উলেমাদের যে ক্ষমতা হরণ করা হয়েছিল, তা তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
  • (৭) ‘প্রধান সদর ও “প্রধান কাজি’ সম্রাটকে পরামর্শ দেওয়ার অধিকার পান। মোল্লা ও মৌলবিদের বিভিন্ন ধর্মীয় পদে নিয়োগ করে বেতনের ব্যবস্থা করা হয় এবং তাদের নিষ্কর জমি দেওয়া হয়।

হিন্দুদের প্রতি নীতি

  • (১) ঔরঙ্গজেব-কল্পিত ঐস্লামিক রাষ্ট্রে হিন্দুদের বসবাসের অধিকার ছিল না। তারা ছিল ‘জিম্মি’ বা দ্বিতীয় শ্রেণীর বিধর্মী নাগরিক। তিনি হিন্দুদের হোলি, দেওয়ালি, ধর্মমেলা, যাত্রা, সতীদাহ প্রভৃতি বন্ধ করে দেন।
  • (২) ১৬৯৫ খ্রিস্টাব্দের এক নির্দেশ দ্বারা রাজপুত ব্যতীত অপর হিন্দুদের পালকি-চড়া, হস্তি বা অশ্বারোহণ ও অস্ত্রবহন নিষিদ্ধ হয়। ১৬৬৯ খ্রিস্টাব্দে এক নির্দেশ দ্বারা হিন্দুদের নতুন মন্দির নির্মাণ নিষিদ্ধ হয়।
  • (৩) তিনি অসংখ্য মন্দির ধ্বংস করেন। এক বছরের মধ্যে কেবলমাত্র মেবারেই তিনি ২৪০টি মন্দির ধ্বংস করেন। কাশীর বিশ্বনাথ মন্দির, গুজরাটের সোমনাথ মন্দির, মথুরার কেশবদেবের মন্দির, বৃন্দাবনে গোবিন্দ জীউর মন্দির তিনি ধ্বংস করেন।
  • (৪) সিংহাসনে বসার বাইশ বছর পর ১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি হিন্দুদের ওপর জিজিয়া’ কর পুনঃপ্রবর্তন করেন। ১৬৬৫ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু বণিকদের পণ্যের ওপর পাঁচ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেন।
  • (৫) ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক নির্দেশ জারি করে হিন্দু কেরানি, পেশকার, কানুনগো প্রভৃতিদের চাকরি থেকে বহিষ্কৃত করেন এবং ঐ সকল পদে মুসলিমদের নিয়োগ করার আদেশ দেন। বিভিন্ন বৃত্তি ও উচ্চপদ দান করে তিনি সর্বদাই হিন্দুদের মুসলিম ধর্ম গ্রহণে উৎসাহ দিতেন।

আধুনিক মত

সাম্প্রতিককালে সতীশ চন্দ্র, জাহিরউদ্দিন ফারুকি, আতাহার আলি, গৌতম ভদ্র প্রমুখ ঐতিহাসিক ও গবেষকরা ঔরঙ্গজেবকে নিছক হিন্দু-বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করতে রাজি নন। তাঁদের মতে,

  • (১) সমকালীন সামাজিক, রাজনৈতিক ওঅর্থনৈতিক পটভূমিকায় কেবলমাত্র বিশেষ সময়ের জন্য তিনি এই ধরনের নীতি গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন।
  • (২) গোঁড়া সুন্নি ও উলেমাদের সমর্থন নিয়ে তিনি দারা-র বিরুদ্ধে জয়যুক্ত হয়েছিলেন। সুতরাং সিংহাসন-লাভের পর ঔরঙ্গজেবের পক্ষে তাদের উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।
  • (৩) এস. এম. জাফর বলেন যে, তাঁর রাজত্বকালের প্রথম একুশ বছর ‘জিজিয়া’ কর ছিল না। পরে তিনি উলেমাদের চাপেই এই কর প্রবর্তনে বাধ্য হন।
  • (৪) তিনি সিংহাসনে বসে ৮০ প্রকার কর বাতিল করেন। এতে রাষ্ট্রের আয় হ্রাস পায় এবং যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। সুতরাং এই সব কারণেও তিনি ‘জিজিয়া’ আরোপে বাধ্য হন।
  • (৫) ডঃ সতীশ চন্দ্র বলেন যে, ইসলামি ধর্মশাস্ত্রে সুপণ্ডিত হয়েও ঔরঙ্গজেব ‘জিজিয়া’ কর আরোপ করেন নি। আসলে দাক্ষিণাত্যের রাজনৈতিক সংকট ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির জন্যই ‘জিজিয়া’ আরোপ করে তিনি পরিস্থিতি সামাল দিতে চান। কেবলমাত্র হিন্দুই নয়—মুসলমানদের ওপরেও তিনি ‘জাকাৎ’ কর আরোপ করেন।
  • (৬) সতীশ চন্দ্র বলেন যে, তিনি ‘পেশকার’, ‘ক্রোরি’ প্রভৃতি পদ মুসলিমদের জন্য সংরক্ষিত করেছিলেন ঠিকই, তবে উপযুক্ত মুসলিম না পাওয়া গেলে তখন সেখানে হিন্দুদের নিযুক্ত করা হত।
  • (৭) তিনি মন্দির ধ্বংস করতেন কারণ, তাঁর ধারণা জন্মেছিল যে, হিন্দু মন্দিরগুলিই সম্রাট-বিরোধী ষড়যন্ত্রের উৎস। তিনি ‘বারাণসী নির্দেশনামা’-য় স্পষ্ট করে বলেন যে হিন্দুদের পুরোনো মন্দির অক্ষত থাকবে, কিন্তু নতুন মন্দির নির্মাণের অনুমতি সওয়া হবে না।
  • (৮) বহু ক্ষেত্রে অতি-উৎসাহী কর্মচারীরা ধর্মীয় অনুদারতার কারণে পুরোনোমন্দির ধ্বংস করে। অনেক সময় আবার বিদ্রোহী হিন্দুদের মনোবল ভাঙার জন্যও মন্দির ভাঙ্গা হত।
  • (৯) ডঃ আতাহার আলি দেখিয়েছেন যে, তাঁর আমলে বহু হিন্দু উচ্চ প্রশাসনিক ও সামরিক পদে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর রাজত্বকালের প্রথম ২০ বছরে মোট ৪৮৬ জন অভিজাতের মধ্যে ১০৫ জন ছিলেন হিন্দু। পরের ২৯ বছরে (১৬৭৮-১৭০৭ খ্রিঃ) ৫৭৫ জন অভিজাতের মধ্যে হিন্দু ছিলেন ১৮৪ জন।
  • (১০) ডঃ ইরফান হাবিব মনে করেন যে, তাঁর আমলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বিদ্রোহগুলি ছিল মূলত সামাজিক অর্থনৈতিক সমস্যাপ্রসূত—ধর্মীয় কারণ ছিল গৌণ। কেবলমাত্র হিন্দুই নয়—শিয়া, খোলা ও বোরা সম্প্রদায়ের মুসলিমরাও তাঁর হাত থেকে রক্ষা পায় নি।
  • (১১) তাঁর রাজত্বকালের একটি বিশেষ পর্যায়ে তিনি হিন্দু-বিরোধী নীতি গ্রহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালের একটি বিশেষ পর্যায়ে অনুসৃত নীতিকে কখনোই তাঁর সমগ্র রাজত্বকালের নীতি হিসেবে আখ্যায়িত করা যুক্তিসম্মত নয়।
  • (১২) তাঁর আমলে বহু হিন্দু উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত ছিলেন, তিনি ব্রাহ্মণদের নিষ্কর জমি দান করতেন এবং এক সময়ে হিন্দু মন্দির ধ্বংস করলেও, পরবর্তীকালে বহু হিন্দু মন্দির তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা অর্জন করেছিল।

আকবরের সমদর্শী আদর্শ থেকে বিচ্যুত

এই কথা ঠিকই যে, তিনি আকবরের সমদর্শী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছিলেন এবং তাঁর লক্ষ্য ছিল ভারতে মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ইসলামের অনুশাসনগুলিকে কার্যকর করে তোলা। এর ফলে হিন্দু মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং তাঁকে সারা জীবন বিদ্রোহ দমনে ব্যয় করতে হয়।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক স্যার উলসলি হেইগ বলেন যে, ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি সাম্রাজ্যের পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকারক ছিল। এর ফলে সারা হিন্দুস্থানে বিপ্লবাগ্নি প্রজ্বলিত হয়। তাঁর হিন্দু-বিদ্বেষী নীতির ফল যে মারাত্মক হয়েছিল সেই সম্পর্কে কোনও সন্দেহ নেই।

(FAQ) ঔরঙ্গজেবের ধর্মনীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ঔরঙ্গজেবের ধর্মীয় আদর্শ কি ছিল?

দার-উল-হারব -কে দার-উল-ইসলাম -এ পরিণত করা।

২. জিন্দাপির কাকে বলা হত?

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে।

৩. কোন মোগল সম্রাট জিজিয়া কর পুনরায় চালু করেন?

মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেব।

৪. কত খ্রিস্টাব্দে জিজিয়া কর পুনরায় চালু করা হয়?

১৬৭৯ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment