কাশী বিশ্বনাথ মন্দির

ভারতের বিখ্যাত হিন্দু মন্দির কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের ইতিহাস, অবস্থান, নামকরণ ও মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে আলোচনা করা হল । বারানসী কাশী বিশ্বনাথ মন্দির বা ধাম অর্থ ও কিংবদন্তি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।

কাশী বিশ্বনাথ মন্দির

ধর্মহিন্দুধর্ম
অবস্থানউত্তরপ্রদেশের বারাণসী
সৃষ্টিকারী মহারানি অহল্যাবাই হোলকর
ধরণজ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির
কাশী বিশ্বনাথ মন্দির

ভূমিকা :- ভারতের একটি বিখ্যাত হিন্দু মন্দির হল কাশী বিশ্বনাথ মন্দির। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, কাশী বিশ্বনাথ মন্দির “জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির” নামে পরিচিত শিবের বারোটি পবিত্রতম মন্দিরের অন্যতম।

অবস্থান

উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বারাণসীতে অবস্থিত। মন্দিরটি গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। মন্দিরের প্রধান দেবতা শিব “বিশ্বনাথ” বা “বিশ্বেশ্বর” নামে পূজিত হন।

নামকরণ

বারাণসী শহরের অপর নাম “কাশী” তাই এই মন্দিরটি “কাশী বিশ্বনাথ মন্দির” নামে পরিচিত।

স্বর্ণমন্দির

এই মন্দিরের ১৫.৫ মিটার উঁচু চূড়াটি সোনায় মোড়া। তাই মন্দিরটিকে স্বর্ণমন্দিরও বলা হয়ে থাকে।

পুরাণে উল্লেখ

হিন্দু পুরাণে এই মন্দিরটির উল্লেখ পাওয়া যায়। মন্দিরটি শৈবধর্মের প্রধান কেন্দ্রগুলির অন্যতম। অতীতে বহুবার এই মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে।

আদি মন্দিরটির অবস্থান

বর্তমানে মন্দিটির পাশে জ্ঞানবাপী মসজিদ নামে একটি মসজিদ রয়েছে। আদি মন্দিরটি এই মসজিদের জায়গাটিতেই অবস্থিত ছিল।

মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা

বর্তমান মন্দিরটি ১৭৮০ সালে ইন্দোরের মহারানি অহল্যা বাই হোলকর তৈরি করে দেন। ১৯৮৩ সাল থেকে উত্তরপ্রদেশ সরকার এই মন্দিরটি পরিচালনা করে আসছেন।

কিংবদন্তি

কাশী বিশ্বনাথ মন্দির সম্পর্কে কিছু কিংবদন্তি প্রচলিত আছে।

  • (১) শিবপুরাণ অনুসারে, একবার সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা ও রক্ষাকর্তা বিষ্ণু তাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ তা নিয়ে বিবাদে রত হন। তাদের পরীক্ষা করার জন্য শিব ত্রিভুবনকে ভেদ করে জ্যোতির্লিঙ্গ নামে এক বিশাল অন্তহীন আলোকস্তম্ভ রূপে আবির্ভূত হন।
  • (২) বিষ্ণু ও ব্রহ্মা এই লিঙ্গের উৎস অনুসন্ধান করতে যান। ব্রহ্মা যান উপর দিকে এবং বিষ্ণু নামেন নিচের দিকে। কিন্তু তারা কেউই এই লিঙ্গের সন্ধান পান না।
  • (৩) ব্রহ্মা মিথ্যা বলেন যে তিনি উৎসটি খুঁজে পেয়েছেন। কিন্তু বিষ্ণু তার পরাজয় স্বীকার করে নেন।
  • (৪) শিব তখন একটি দ্বিতীয় জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে আবির্ভূত হয়ে মিথ্যা বলার জন্য ব্রহ্মাকে শাপ দেন যে অনুষ্ঠানে তার কোনো স্থান হবে না।
  • (৫) অন্যদিকে সত্য কথা বলার জন্য তিনি বিষ্ণুকে আশীর্বাদ করে বলেন যে সৃষ্টির অন্তিমকাল পর্যন্ত তিনি পূজিত হবেন। জ্যোতির্লিঙ্গ হল সেই অখণ্ড সর্বোচ্চ সত্যের প্রতীক, যার অংশ শিব নিজে।
  • (৬) হিন্দু বিশ্বাস অনুসারে, জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরগুলিতে শিব স্বয়ং অগ্নিময় আলোকস্তম্ভ রূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন। শিবের ৬৪টি রূপভেদ রয়েছে। তবে এগুলির সঙ্গে জ্যোতির্লিঙ্গকে এক করা হয় না।
  • (৭) প্রত্যেক জ্যোতির্লিঙ্গের নির্দিষ্ট নাম আছে – এগুলি শিবের এক এক রূপ। প্রতিটি মন্দিরেই শিবলিঙ্গ শিবের অনন্ত প্রকৃতির প্রতীক এক আদি ও অন্তহীন স্তম্ভের প্রতিনিধিত্ব করে।
  • (৮) বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির হল গুজরাতের সোমনাথ, অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীশৈলমের মল্লিকার্জুন, মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী -র মহাকালেশ্বর, মধ্যপ্রদেশের ওঙ্কারেশ্বর, হিমালয়ের কেদারনাথ, মহারাষ্ট্রের ভীমশংকর, উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর বিশ্বনাথ, মহারাষ্ট্রের ত্র্যম্বকেশ্বর, ঝাড়খণ্ডের দেওঘরের বৈদ্যনাথ, গুজরাতের দ্বারকায় নাগেশ্বর, তামিলনাড়ুর রামেশ্বরমের রামেশ্বর এবং মহারাষ্ট্রের আওরঙ্গাবাদের ঘৃষ্ণেরশ্বর।

মণিকর্ণিকা ঘাট

কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছে মণিকর্ণিকা ঘাট শাক্তদের পবিত্র তীর্থ ও অন্যতম শক্তিপীঠ। শৈব সাহিত্যে দক্ষযজ্ঞের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা শক্তিপীঠের উৎস-সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক আখ্যান। কথিত আছে, সতীর দেহত্যাগের পর শিব মণিকর্ণিকা ঘাট দিয়ে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরে এসেছিলেন।

কাশী খন্ড

স্কন্দ পুরাণের কাশীখণ্ডে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের উল্লেখ পাওয়া যায়। একাদশ শতাব্দীতে হরি চন্দ্র মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেছিলেন।

মহম্মদ ঘোরির আক্রমণ

১১৯৪ সালে মহম্মদ ঘোরি বারাণসীর অন্যান্য মন্দিরগুলির সঙ্গে এই মন্দিরটিও ধ্বংস করে দেন। এরপরেই আবার মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়।

আইবকের আক্রমণ

কুতুবুদ্দিন আইবক মন্দিরটি ধ্বংস করেন। আইবকের মৃত্যুর পর মন্দিরটি আবার নির্মিত হয়।

ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণ

১৩৫১ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলক মন্দিরটি আবার ধ্বংস করেন।

আকবরের অবদান

১৫৮৫ সালে আকবর -এর রাজস্বমন্ত্রী টোডরমল আবার মন্দিরটি পুনর্নির্মাণ করেন।

ঔরঙ্গজেবের আক্রমণ

১৬৬৯ সালে ঔরঙ্গজেব পুনরায় মন্দিরটি ধ্বংস করে জ্ঞানবাপী মসজিদ তৈরি করান। এই মসজিদটি আজও মন্দিরের পাশে অবস্থিত। মসজিদের পিছনে পুরনো মন্দিরের কিছু ধ্বংসাবশেষ আজও দেখা যায়।

রঞ্জিত সিংহের অবদান

১৮৩৫ সালে পাঞ্জাবের শিখ সম্রাট রঞ্জিত সিংহ মন্দিরের চূড়াটি ১০০০ কিলোগ্রাম সোনা দিয়ে মুড়ে দেন।

কাশী বিশ্বনাথ মন্দির

মূল মন্দির চত্বরটি অনেকগুলি ছোটো ছোটো মন্দির নিয়ে গঠিত। এই মন্দিরগুলি গঙ্গার তীরে “বিশ্বনাথ গলি” নামে একটি গলিতে অবস্থিত।

  • (১) প্রধান মন্দিরের মধ্যে একটি ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু ও ৯০ সেন্টিমিটার পরিধির শিবলিঙ্গ রুপোর বেদির উপর স্থাপিত।
  • (২) ছোটো মন্দিরগুলির নাম কালভৈরব, দণ্ডপাণি, অবিমুক্তেশ্বর, বিষ্ণু, বিনায়ক, শনীশ্বর, বিরূপাক্ষ ও বিরূপাক্ষ গৌরী মন্দির।
  • (৩) মন্দিরের মধ্যে জ্ঞানবাপী নামে একটি ছোটো কুয়ো আছে। কথিত আছে, মুসলমান আক্রমণের সময় প্রধান পুরোহিত স্বয়ং জ্যোতির্লিঙ্গটি রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সেটি নিয়ে এই কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছিলেন।

বিখ্যাত ব্যক্তির মন্দির দর্শন

আদি শঙ্করাচার্য, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, গোস্বামী তুলসীদাস, স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী, গুরু নানক প্রমুখ ধর্মনেতারা এই মন্দির দর্শনে এসেছিলেন।

গুরুত্ব

কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরটি হিন্দুদের বিশ্বাস অনুযায়ী পবিত্রতম মন্দিরগুলির অন্যতম। হিন্দুরা বিশ্বাস করেন, গঙ্গায় একটি ডুব দিয়ে এই মন্দির দর্শন করলে মোক্ষ লাভ করা সম্ভব।

উপসংহার :- কাশী বিশ্বনাথকে সাধারণত হিন্দু ধর্মে প্রেমের অন্যতম প্রধান স্থান হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের ভিতরে রয়েছে শিব, বিশ্বেশ্বর বা বিশ্বনাথের জ্যোতির্লিঙ্গ। বিশ্বেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ ভারতের অন্য জগতের ইতিহাসে অত্যন্ত অসাধারণ এবং আকর্ষণীয় গুরুত্ব রয়েছে।

(FAQ) কাশী বিশ্বনাথ মন্দির সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. কাশী কোথায় অবস্থিত ?

উত্তর প্রদেশে গঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।

২. কাশী বিশ্বনাথ মন্দির কোথায় অবস্থিত ?

উত্তর প্রদেশের বারাণসীতে গঙ্গা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত।

৩. কার্যাবলী ভিত্তিতে কাশী শহরটিকে কী বলা হয় ?

ধর্মীয় শহর।

কাশী, স্বামী বিবেকানন্দ

Leave a Reply

Translate »