স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দ -এর জন্ম পরিচয়, স্বামী বিবেকানন্দের পিতা ও মাতা, স্বামী বিবেকানন্দের বংশ পরিচয়, স্বামী বিবেকানন্দের বিভিন্ন নাম, ছেলেবেলা, শিক্ষাজীবন, রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের প্রথম সাক্ষাৎ

Table of Contents

স্বামী বিবেকানন্দ

জন্ম ১২ জানুয়ারি ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দ, কলকাতা
পিতাবিশ্বনাথ দত্ত
মাতাভূবনেশ্বরী দেবী
গুরুরামকৃষ্ণ
দর্শনঅদ্বৈত বেদান্ত, রাজযোগ
মৃত্যু৪ জুলাই ১৯০২ (বয়স ৩৯), বেলুড় মঠ, হাওড়া
স্বামী বিবেকানন্দ

ভূমিকা :- স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, দার্শনিক, লেখক, সংগীতজ্ঞ এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় অতীন্দ্রিয়বাদী রামকৃষ্ণ পরমহংসের প্রধান শিষ্য।

স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম পরিচয়

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি (২৯শে পৌষ ১২৬৯ বঙ্গাব্দ) পৌষ সংক্রান্তির দিন স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম হয়।

স্বামী বিবেকানন্দের পিতা ও মাতা

বিশ্বনাথ দত্ত ও ভূবনেশ্বরী দেবীর ষষ্ঠ সন্তান নরেন্দ্রনাথ দত্ত পরবর্তীকালে স্বামী বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন।

স্বামী বিবেকানন্দের বংশ পরিচয়

বিবেকানন্দের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার ডেরেটোনা গ্রামে। ব্রিটিশ আমলের শুরুতে তারা কলকাতায় চলে আসেন – প্রথমে গড় গোবিন্দপুরে, পরে উত্তর কলকাতার সিমলায়। তাঁর পিতা বিশ্বনাথ দত্ত নিজের চেষ্টায় বড় হয়ে ওঠেন ও অ্যাটর্নির পেশা গ্রহণ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দের বিভিন্ন নাম

  • (১) স্বামী বিবেকানন্দের পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল নরেন্দ্রনাথ দত্ত।
  • (২) স্বামী বিবেকানন্দের মায়ের বিশ্বাস ছিল কাশির বীরেশ্বর শিবের অনুগ্রহে এই পুত্রলাভ। তাই পুত্রের নাম রাখেন ‘বীরেশ্বর’। বীরেশ্বর থেকে ডাকনাম দাঁড়ায় ‘বিলে’।
  • (৩) নরেন্দ্রনাথ থেকে স্বামী বিবেকানন্দের ডাক নাম হয় নরেন।
  • (৪) আত্মগোপন করার জন্যও স্বামীজি বিভিন্ন নাম নিয়ে চলতেন। যেমন – বিবিদিষানন্দ, সচ্চিদানন্দ, বিবেকানন্দ।
  • (৫) শিকাগো মহাসভায় ‘বিবেকানন্দ’ নামে আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে বিশ্ববাসী সেই নামেই তাকে চেনে।

বিবেকানন্দের ছেলেবেলা

  • (১) ছোটবেলা থেকেই বিলের মধ্যে দেখা যেত অসাধারণ মেধা, তেজস্বিতা, সাহস, স্বাধীন মনোভাব, হৃদয়বত্তা, বন্ধু প্রীতি আর খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণ।
  • (২) সেই সঙ্গে ছিল প্রবল আধ্যাত্বিক তৃষ্ণা। ‘ধ্যান ধ্যান’ খেলতে খেলতে সত্যিই গভীর ধ্যানে ডুবে যেতেন স্বামী বিবেকানন্দ।
  • (৩) স্বামী বিবেকানন্দ পুজো করতেন রামসীতা আর শিবের। সাধু সন্ন্যাসী দেখলেই ছুটে যেতেন অজানা আকর্ষণে।
  • (৪) ঘুমানোর আগে জ্যোতিঃ দর্শন ছিল স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিদিনের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা।
  • (৫) বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নরেন্দ্রনাথ হয়ে উঠলেন স্কুলের বিতর্ক ও আলোচনা সভার মধ্যমণি, খেলাধুলাতে নেতা, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত ও ভজনে রীতিমতো প্রথম শ্রেণীর গায়ক, নাটকে কুশলী অভিনেতা, আর বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার ফলে অল্প বয়সেই গভীর চিন্তাশীল।
  • (৬) সন্ন্যাস জীবনের প্রতি আকর্ষণ ক্রমবর্ধমান, কিন্তু জগতের প্রতি নিষ্ঠুর তিনি ছিলেন না। স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন গভীর মমতাশীল। মানুষের বিপদে আপদে সর্বদা এগিয়ে যেতেন, সে বিপদ যেমনই হোক না কেন।

বিবেকানন্দের শিক্ষাজীবন

  • (১) ১৮৭৯ খ্রিস্টাব্দে মেট্রোপলিটন স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স পাশ করে নরেন্দ্রনাথ প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন।
  • (২) ম্যালেরিয়ায় ভুগে ডিসকলেজিয়েট হয়ে যাওয়ায় স্বামী বিবেকানন্দকে ভর্তি হতে হয় জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইন্সটিটিউশন (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) -এ। এখান থেকে ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে এফ.এ. এবং ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দে বিএ পাস করেন স্বামী বিবেকানন্দ।
  • (৩) স্কুল কলেজের পরীক্ষা কে বিশেষ গুরুত্ব না দিলেও নরেন্দ্রনাথের বিদ্যানুরাগ ছিল প্রবল এবং পড়াশোনার পরিধিও ছিল অত্যন্ত বিস্তৃত।
  • (৪) ছাত্রাবস্থাতেই স্বামী বিবেকানন্দ দার্শনিক হার্বাট স্পেন্সারের একটি মতবাদের সমালোচনা করে তাকে চিঠি দিয়েছিলেন এবং স্পেন্সার তার উপরে নরেন্দ্রনাথের যথেষ্ট প্রশংসা করে লিখেছিলেন যে বই এর পরবর্তী সংস্করণে তিনি সেই সমালোচনা অনুযায়ী কিছু কিছু পরিবর্তন করবেন।
  • (৫) কলেজের অধ্যক্ষ উইলিয়াম হেস্টি পর্যন্ত স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, “নরেন্দ্রনাথ সত্যিই একটি জিনিয়াস। আমি বহু জায়গায় ঘুরেছি, কিন্তু এর মত বুদ্ধি আর বহুমুখী প্রতিভা কোথাও দেখিনি।

রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের প্রথম সাক্ষাৎ

১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে কলকাতায় সুরেন মিত্রর বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণর সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের প্রথম দেখা হয়।

রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের দ্বিতীয় দর্শন

দক্ষিণেশ্বরে বিবেকানন্দের সাথে রামকৃষ্ণ পরমহংসের দ্বিতীয়বার সাক্ষাৎ হয়। সহজে তাঁকে মেনে নেননি নরেন্দ্রনাথ। বারবার পরীক্ষা করে যখন নিঃসংশয় হয়েছেন তার ত্যাগ, পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতা সম্বন্ধে, কেবল তখনই তাকে জীবনের পথ প্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

বিবেকানন্দ সম্পর্কে রামকৃষ্ণ পরমহংসের মত

স্বামী বিবেকানন্দের যাচাই করার প্রবণতা দেখে সবচেয়ে খুশি হয়েছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। তিনি প্রথম থেকেই বুঝেছিলেন, নরেন্দ্রনাথ একদিন বিশ্ব দরবারে ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি কে মেলে ধরবে।

রামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের ঘনিষ্ঠতা

নরেন্দ্রনাথ শ্রীরামকৃষ্ণের ঘনিষ্ঠ সঙ্গলাভ করেন প্রায় চার বছর। এই চার বছরে শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষায় এবং তার নিজের যোগ্যতা গুণে নানান আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়েছে স্বামী বিবেকানন্দের।

পিতৃবিয়োগ

১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে ফেব্রুয়ারি নরেন্দ্রনাথের বাবা বিশ্বনাথ দত্ত মারা যান। এরপর স্বামী বিবেকানন্দ প্রচন্ড আর্থিক কষ্টের মধ্যে পড়েন। কিন্তু এজন্য তার বিবেক বৈরাগ্য একটুকুও কমেনি।

শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগ

১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে রামকৃষ্ণের ক্যান্সার হয়। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাকে আনা হয় শ্যামপুকুরে, পরে কাশীপুরের এক ভাড়া বাড়িতে। এই বাড়িতে এসে নরেন্দ্রনাথ গুরুভাইদের নিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণের সেবা ও তীব্র আধ্যাত্মিকতায় ডুবে গেলেন। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ই আগস্ট শ্রীরামকৃষ্ণের দেহত্যাগ করেন।

স্বামী বিবেকানন্দের নির্বিকল্প সমাধি লাভ

রামকৃষ্ণ পরমহংসের কৃপায় কাশিপুরেই নরেন্দ্রনাথ একদিন ধর্ম জীবনের সর্বোচ্চ উপলব্ধি নির্বিকল্প সমাধি লাভ করেন।

শিবজ্ঞানে জীব সেবা

নরেন্দ্রনাথের সাথে একদিন বৈষ্ণব ধর্ম সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে শ্রীরামকৃষ্ণ বলেন যে, “জীবে দয়া নয়, শিবজ্ঞানে জীব সেবা।” এই কথায় মুগ্ধ হন স্বামী বিবেকানন্দ।

শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ

বস্তুত, স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিটি কাজই শ্রীরামকৃষ্ণ নির্দেশিত। শ্রীরামকৃষ্ণ সূত্র, স্বামীজি তাঁর ভাষ্য। সন্ন্যাসী গুরু ভাইদের নিয়ে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠার নির্দেশও তিনি নরেন্দ্র কে দিয়ে যান। যার ফল হল আজকের রামকৃষ্ণ মিশন।

স্বামী বিবেকানন্দ কর্তৃক রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা

পরবর্তীতে নরেন্দ্রনাথ কয়েকজন গুরু ভাইকে নিয়ে বরানগরের একটি পুরনো ভাঙ্গা বাড়িতে প্রথম শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ প্রতিষ্ঠা করেন।

স্বামী বিবেকানন্দের সন্ন্যাস গ্রহণ

১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নরেন্দ্রনাথ ও তার দশজন গুরু ভাই সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। নরেন্দ্রনাথের নাম হয় স্বামী বিবেকানন্দ।

পরিব্রাজক বিবেকানন্দ

সন্ন্যাস গ্রহণের পর স্বামী বিবেকানন্দ ও তার সন্ন্যাসী গুরু ভাইয়েরা মাঝেমাঝেই পরিব্রাজক হিসাবে বেরিয়ে পড়তেন। কখনো একাকী, কখনো কয়েকজন মিলে।

ভারত ভ্রমণ

পায়ে হেঁটে স্বামীজি প্রায় সারা ভারত পরিক্রমা করেন। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-নির্ধন, রাজা-মহারাজা, ব্রাহ্মণ, চন্ডাল প্রভৃতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

প্রকৃত ভারতের রূপ উপলব্ধি

স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিভা, তেজোদীপ্ত আকর্ষণীয় কান্তি এবং আধ্যাত্মিক প্রভাবে সকলেই মুগ্ধ হন। ভ্রমণকালে তিনিও প্রকৃত ভারতবর্ষের রূপটি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।

বিদেশ যাত্রা

১৮৯০ খ্রিস্টাব্দের ৩ রা আগস্ট তিনি যে ভ্রমণে বের হন, সেটিই ছিল সবচেয়ে দীর্ঘ কালের। এই ভ্রমণকালে তাঁর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই তাঁকে আমেরিকার বিশ্বধর্ম মহাসভায় যোগ দিতে অনুরোধ করেন।

আমেরিকা যাত্রা

স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকায় গিয়েছিলেন ভারতের সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হয়ে তাদেরই অর্থ সাহায্যে।

  • (১) ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দের ৩১ মে স্বামী বিবেকানন্দ বোম্বাই থেকে জাহাজে আমেরিকা যাত্রা করেন। ভ্যাঙ্কুবরে পৌছান ২৫ জুলাই। সেখান থেকে ট্রেনে করে 30 জুলাই সন্ধ্যায় শিকাগো পৌঁছান।
  • (২) ধর্মমহাসভার দেরি আছে জেনে কম খরচে থাকার জন্য স্বামীজি বস্টনে চলে যান। বস্টনে তিনি বিভিন্ন পন্ডিত ও অধ্যাপকের সংস্পর্শে আসেন।

স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে রাইট – এর অভিমত

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাইট স্বামীজীর নামে কোন পরিচয় পত্র নেই জেনে ধর্ম মহাসভা কমিটির চেয়ারম্যান ডঃ ব্যারোজকে একটি চিঠি লিখেন: “আমাদের সব অধ্যাপককে সম্মিলিত করলে যা হবে এই সন্ন্যাসী তার চেয়েও বেশি পন্ডিত।”

স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতা

১১ ই সেপ্টেম্বর ধর্ম মহাসভা শুরু হল। স্বামী বিবেকানন্দ বক্তৃতা দেন বিকেলে।

  • (১) ‘আমেরিকার বোন ও ভায়েরা‘ (Brothers and Sisters of America) এই সম্বোধন করার সঙ্গে সঙ্গে সাত হাজার শ্রোতা তাকে বিপুল অভিনন্দন জানাল।
  • (২) এরপর স্বামীজি একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তাতে সব ধর্মের প্রতি তার উদার প্রীতিপূর্ণ মনোভাবের অপূর্ব প্রকাশ দেখে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যান স্বামী বিবেকানন্দ।
  • (৩) ২৭ শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলল ধর্ম মহাসভা। প্রায় প্রতিদিনই স্বামী বিবেকানন্দ কে বক্তৃতা দিতে হত। তাঁর উদার যুক্তিমূলক চিন্তার জন্য সকলেই তাকে ধর্ম মহাসভার শ্রেষ্ঠ বক্তা হিসাবে স্বীকার করে নেন।
  • (৪) শিকাগোর রাস্তায় রাস্তায় লাগানো হয় স্বামী বিবেকানন্দের ছবি।

আমেরিকায় স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মপ্রচার

স্বামীজি আমেরিকার বড় বড় শহরে ধর্ম প্রচার করতে থাকেন। আমেরিকার জনসাধারণ, বিশেষ করে শিক্ষিত সম্প্রদায়, আরো বেশি করে তার অনুরাগী হয়ে ওঠে।

স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি ঈর্ষা

শুভ সংকীর্ণমনা কয়েকজন ভারতীয় ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের কিছু লোক ঈর্ষা পরবশ হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা বিষোদগার করতে থাকে। সাময়িকভাবে বিপন্ন হলেও স্বামীজির নিজের চরিত্র মাহাত্ম্যে সব ঝড়ঝাপটা কাটিয়ে ওঠেন।

স্বামী বিবেকানন্দের ইংল্যান্ডে ধর্মপ্রচার

দু বছর পরে ১৮৯৫ এর আগষ্ট মাসে তিনি ইউরোপে যান। প্যারিস ও লন্ডনে প্রচার করে ডিসেম্বর মাসে আবার আমেরিকায় ফিরে আসেন। ১৮৯৬ এর ১৫ই এপ্রিল আমেরিকা থেকে বিদায় নিয়ে আবার লন্ডনে আসেন।

বিপিনচন্দ্র পালের অভিমত

ইংল্যান্ডে স্বামীজীর প্রভাব সম্পর্কে বিপিনচন্দ্র পাল একটি চিঠিতে লিখেছেন: “ইংল্যান্ডের অনেক জায়গায় আমি এমন বহু লোকের সান্নিধ্যে এসেছি যারা স্বামী বিবেকানন্দের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভক্তি পোষণ করেন। সত্য বটে, আমি তাঁর সম্প্রদায়ভুক্ত নয় এবং তার সঙ্গে কোন কোন বিষয়ে আমার মত ভেদ আছে, তথাপি আমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, বিবেকানন্দের প্রভাব গুণে এখনে ইংল্যান্ডে অনেকের চোখ খুলছে…। তাঁর শিক্ষার ফলেই এখানকার অধিকাংশ লোক আজকাল বিশ্বাস করে যে, প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র গুলির মধ্যে বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক তত্ব নিহিত আছে।”

দেশবাসীর হীনমন্যতা দূরীকরণে স্বামী বিবেকানন্দ

পাশ্চাত্যে স্বামী বিবেকানন্দের অভাবনীয় সাফল্য দেশবাসীদের মনে যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা জাগিয়ে তুলেছিল, তাতে তাদের বহুযুগ সঞ্চিত হীনমন্যতা নিমেষে দূর হয়ে গিয়েছিল।

স্বামী বিবেকানন্দের দ্বারা দেশের তমোনিদ্রা ভঙ্গ

ভারতবাসী মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আবিষ্কার করেছিল যে’ বিশ্বের সভ্যতা ভান্ডারে তাদের অবদান পাশ্চাত্যের চেয়ে কম নয়, বরং বেশীই। এই উপলব্ধি যে এনে দিল, সমগ্র দেশের তমোনিদ্রা যে ভেঙে দিল, সেই যাদুকরের মত মানুষটিকে বরণ করার জন্য গোটা দেশ অধীর আগ্রহে কম্পমান।

অভিনন্দনের ঢেউ

স্বামীজী যখন কলম্বো এসে পৌঁছালেন, দেখলেন, গোটা দেশে কৃতজ্ঞতা এক অভূতপূর্ব অভিনন্দন এর রূপ নিয়েছে। সেই অভিনন্দনের ঢেউ তরঙ্গায়িত হয়ে বয়ে চললো রামনাদ, মাদ্রাজ, মাদ্রাজ থেকে কলকাতার পথে সর্বত্র।

স্বামী বিবেকানন্দের কলকাতা প্রত্যাবর্তন

১৯ ফেব্রুয়ারি কলকাতা পৌছলেন স্বামীজী। অভিনন্দনের পর অভিনন্দন – কলকাতা মাতাল হয়ে যায় তার বিশ্ববিজয়ী ছেলেকে নিয়ে।

স্বামী বিবেকানন্দের শরীরে ভাঙ্গন

পাশ্চাত্যে অবিরাম বক্তৃতা আর ভ্রমণ, তার উপর সমগ্র দেশবাসীর ‘স্নেহের অত্যাচার’ – এসবের ফলে স্বামী বিবেকানন্দের শরীর একেবারে ভেঙে পড়ে।

দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘ প্রতিষ্ঠা

বিবেকানন্দ ভগ্ন শরীরেও শ্রীরামকৃষ্ণ উপদিষ্ট পথে সন্ন্যাসী সংঘকে স্থায়ী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যান।

  • (১) স্বামী রামকৃষ্ণানন্দকে মাদ্রাজে পাঠালেন স্বামী বিবেকানন্দ শাখা কেন্দ্র গড়ে তোলার জন্য।
  • (২) মুর্শিদাবাদের সারগাছিতে স্থায়ী সেবাশ্রম গড়ে তুললেন স্বামী অখন্ডানন্দ। অন্যান্য সন্ন্যাসী ভাইদেরও নির্দিষ্ট দায়িত্ব দিলেন।
  • (৩) স্বামী সারদানন্দ ও স্বামী অভেদানন্দের উপর যথাক্রমে আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের কার্যভার দিলেন।

বিবেকানন্দের রামকৃষ্ণ মিশন স্থাপন

  • (১) ১৮৯৭ খ্রীস্টাব্দের ১ লা মে স্বামী বিবেকানন্দ রামকৃষ্ণ মিশনের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা করেন।
  • (২) বিদেশ থেকেই তাঁর চিন্তা ছিল ভাবি সংঘের জন্য গঙ্গাতীরে একটি স্থায়ী জমি কেনা। সেই স্বপ্ন সফল হল ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে।
  • (৩) ৯ ডিসেম্বর, ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে বেলুড়ে শ্রী রামকৃষ্ণ মঠ স্থাপিত হল।

বিবেকানন্দের পুনরায় বিদেশ যাত্রা

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ২০ জুন স্বামী বিবেকানন্দ তৃতীয় বারের জন্য পাশ্চাত্য যাত্রা করেন এবং দুই সপ্তাহ ইংল্যান্ডে থেকে আগস্ট মাসে আমেরিকা পৌঁছান।

  • (১) আমেরিকায় এবার প্রায় এক বছর ছিলেন এবং ৯০ টির ও বেশী বক্তৃতা দিয়েছিলেন।
  • (২) স্বামীজীর এই প্রাশ্চাত্য ভবনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ওই সব দেশে তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাজকর্ম কিরকম চলছে তা দেখাও এবং তার ভিত্তি সুদৃঢ় করা।
  • (৩) প্যারিস, ভিয়েনা, কনস্টান্টিনোপল, এথেন্স ও মিশর হয়ে স্বামী বিবেকানন্দ ৯ ডিসেম্বর (১৯০০) বেলুড়মঠে ফিরে আসেন।

স্বামী বিবেকানন্দের মায়াবতী গমন

দেশে ফিরেই ২৭ শে ডিসেম্বর স্বামীজি মায়াবতী রওনা হন। সেখান থেকে ফেরেন ২৪ জানুয়ারি (১৯০১)।

মহাসমাধির পথে স্বামী বিবেকানন্দ

  • (১) বেলুড় মঠ বিষয়ে ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাস্ট ডীড রেজিস্ট্রি হয়।
  • (২) ১০ ফেব্রুয়ারি মঠের ট্রাস্টিদের অনুমোদনক্রমে স্বামী ব্রহ্মানন্দ রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের অধ্যক্ষ এবং স্বামী সারদানন্দ সম্পাদক হন।
  • (৩) এইভাবে নিজেকে সংঘের সমস্ত কার্য পরিচালনার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে শেষ দু’বছর স্বামীজি মহাসমাধির জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন।
  • (৪) গুরুভাই কিংবা শিশ্যরা কোন পরামর্শ চাইলেও তিনি দিতে চাইতেন না। তাদের নিজেদের বুদ্ধিমত কাজ করতে বলতেন, যাতে তাঁর অবর্তমানে তাঁরা সংঘের পরিচালনায় ব্যাপারে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

স্বামী বিবেকানন্দের দেহত্যাগ

১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই স্বামী বিবেকানন্দ পরলোক গমন করেন। সন্ধ্যাবেলা বেলুড়মঠে নিজের ঘরে ধ্যান করেছিলেন। রাত ৯ টা ১০ মিনিটে সেই ধ্যানই মহাসমাধি তে পরিণত হয়। মৃত্যু কালে স্বামীজীর বয়স হয়েছিল ৩৯ বছর ৫ মাস ২৪ দিন।

স্বামী বিবেকানন্দের প্রতিশ্রুতি

পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বামীজি নিজেই দিয়ে গেছেন এক প্রতিশ্রুতি, “এমনও হতে পারে যে, এই শরীরটাকে পুরনো কাপড়ের মতো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে এর বাইরে চলে যাওয়াই আমি শ্রেয় মনে করব। কিন্তু কখনো আমি কাজ থেকে বিরত হব না। সর্বত্র আমি মানুষকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাব, যতদিন না প্রতিটি মানুষ বুঝতে শেখে যে সে ভগবান।”

স্বামী বিবেকানন্দ ও যুব সমাজ

দেশের প্রগতি ও অগ্রগতির জন্য স্বামী বিবেকানন্দ যুবকদের মধ্যে শক্তির সঞ্চার করেন। এইজন্য প্রতিবছর ১২ ই জানুয়ারি স্বামী বিবেকানন্দের জন্মদিন উপলক্ষে জাতীয় যুব দিবস উদযাপন করা হয়।

স্বামী বিবেকানন্দের শিক্ষা চিন্তা

স্বামী বিবেকানন্দের মতে, শিক্ষা হলো অভ্যন্তরীণ ব্রম্মা বা সত্তার বিকাশ বা পূর্ণতা লাভ। অর্থাৎ শিক্ষা হলো ব্যক্তিমনের অন্তরতম সত্তার বহিঃপ্রকাশ।

শিক্ষার সংজ্ঞাদানে স্বামী বিবেকানন্দ

শিক্ষার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন,

Education is the manifestation of perfection already in man.

  • (১) বিশ্বজগতের জ্ঞানের ভান্ডার ব্যক্তিরূপ সত্তার অন্তরের মধ্যে নিহিত থাকে তার শিক্ষা। তাঁর মতে জ্ঞান মানুষের অন্তরের বিষয়। বাইরে থেকে শিশুর মধ্যে জ্ঞান সঞ্চালন করা যায় না।
  • (২) সহজ কথায় বলা যায় যে, বিবেকানন্দের শিক্ষা বিষয়ক মতাদর্শে জ্ঞান সহজাত। মানব অভ্যন্তরে তার অবস্থান। মানব আত্মা হলো জ্ঞানের উৎস। শিক্ষার্থী আত্মর আবরণ উন্মোচন করে যা অনুভব করে, তাই শিখে ও প্রয়োগ করে কারণ জ্ঞান তারই মধ্যে অবস্থিত।

শিক্ষা সম্পর্কে স্বামী বিবেকানন্দের উদাহরণ

স্বামী বিবেকানন্দ একটি সুন্দর কথা বলেছেন – চকমকি পাথর এর মধ্যে আগুন জ্বলার সম্ভাবনা আছে বলেই ঘর্ষণের ফলে তারা জ্বলে ওঠে। আগুন বাইরে থেকে আসে না। শিক্ষক শিক্ষার সাহায্যে শিক্ষার্থীর মধ্যকার জ্ঞানভান্ডার উন্মোচন করবেন। শিক্ষার্থীর মনের মধ্যেই জ্ঞান সঞ্চিত আছে। যার প্রকাশের জন্য কোনো অনুভাবনের প্রয়োজন।

স্ত্রী শিক্ষা ও স্বামী বিবেকানন্দ

স্বামী বিবেকানন্দ স্ত্রী শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

  • (১) তিনি মেয়েদের জন্য গ্রামে গ্রামে পাঠশালা প্রতিষ্ঠা করে তাদের মানুষ করতে বলেছেন। মেয়েরা মানুষ হলে তবে ভবিষ্যতে তাদের সন্তান সন্ততি দ্বারা দেশের মুখ উজ্জ্বল হবে। তিনি এজন্য একদল ব্রহ্মচারিণী গঠন করতে বলেছেন, যারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে মেয়েদের শিক্ষা দেবেন।
  • (২) আমেরিকা ইংল্যান্ড এবং জাপানের মতো প্রগতিশীল দেশের প্রগতিতে তিনি নারীর বিশেষ ভূমিকা লক্ষ্য করেছেন।
  • (৩) ভারতবর্ষের নারীদের দুর্দশা দেখে তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন। সমাজে নারীর স্থান অবমূল্যায়নের জন্য তিনি অশিক্ষা কে দায়ী করেছেন।
  • (৪) তিনি বলেছেন, যে দেশ নারীকে শ্রদ্ধা করে না সেই দেশ বা জাতি কখনো বড় হতে পারে না।
  • (৪) There is no hope of rise for that family or country where there is no education of women, where they live in sadness.
  • For this reason they have to be raised first.

স্বামী বিবেকানন্দের জনশিক্ষা

  • (১) স্বামী বিবেকানন্দ উপলব্ধি করেছিলেন ভারতের মানুষের যথার্থ শিক্ষা ব্যবস্থা হল গণশিক্ষা। তিনি আরো মনে করতেন জনগণের প্রতি অবহেলা হলো আমাদের পতনের প্রধান কারণ।
  • (২) স্বামী বিবেকানন্দের মতে মানুষের প্রথম প্রয়োজন খাদ্য এবং শিক্ষা। এই দুটো জিনিস না থাকলে রাজনীতি দিয়ে কোন লাভ হবে না।
  • (৩) আধুনিক শিক্ষা মুষ্টিমেয় কে আলোকিত করে। তাই শিক্ষাকে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের মধ্যে আবদ্ধ না রেখে আপামর জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা স্বামীজি বলেছেন।
  • (৪) বিবেকানন্দ শিক্ষিত যুবকদের গ্রামে গিয়ে দেশের লোকদের আধুনিক বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য, ধর্ম শিক্ষা দিতে বলেছেন

স্বামীজি ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, “সর্বাঙ্গে রক্ত সঞ্চালন না হলে কোন দেশ কোন কালে কোথাও উঠেছে দেখেছিস? একটা অঙ্গ পড়ে গেলে, অন্য অঙ্গ সবল থাকলে ওই দেহ নিয়ে কোনো বড় কাজ করা যাবে না – এ নিশ্চই জানবে।”

স্বামী বিবেকানন্দের সাহিত্যকর্ম

  • (১) তার রচিত গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য চিকাগো বক্তৃতা, কর্মযোগ, রাজযোগ, জ্ঞানযোগ, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে বেদান্ত, ভারতে বিবেকানন্দ, ভাববার কথা, পরিব্রাজক, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, বর্তমান ভারত, বীরবাণী (কবিতা-সংকলন), মদীয় আচার্যদেব ইত্যাদি।
  • (২) স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন সংগীতজ্ঞ ও গায়ক। তার রচিত দুটি বিখ্যাত গান হল “খণ্ডন-ভব-বন্ধন” (শ্রীরামকৃষ্ণ আরাত্রিক ভজন) ও “নাহি সূর্য নাহি জ্যোতি”। এছাড়া “নাচুক তাহাতে শ্যামা”, “৪ জুলাইয়ের প্রতি”, “সন্ন্যাসীর গীতি” ও “সখার প্রতি” তার রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কবিতা।
  • (৩) “সখার প্রতি” কবিতার অন্তিম দুইটি চরণ– “বহুরূপে সম্মুখে তোমার ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর? / জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” – এটি সর্বাধিক উদ্ধৃত স্বামী বিবেকানন্দের বাণী

উপসংহার :- ভারতবর্ষের নবজাগরণের প্রতিটি ক্ষেত্রকে স্বামীজি বিরাট ভাবে প্রভাবিত করেছেন। সমগ্র পৃথিবীর জন্য রেখেছেন অমূল্য পথনির্দেশ। অনেক মনীষীই তাকে আধুনিক ভারতের শ্রেষ্ঠ মানুষ বলে মনে করেন।

(FAQ) স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

১. স্বামী বিবেকানন্দের জন্ম কত সালে ?

বিবেকানন্দ ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১২ জানুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন।

২. বিবেকানন্দের মায়ের নাম কি ?

স্বামী বিবেকানন্দের মায়ের নাম হল ভুবনেশ্বরী দেবী।

৩. বিবেকানন্দ কোন ধর্ম সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন ?

স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে শিকাগোয় অনুষ্ঠিত বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনে ভারত এবং হিন্দুধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

Leave a Reply

Translate »