রাজা বিম্বিসার

রাজা বিম্বিসারের জন্ম পরিচয়, বংশ পরিচয়, সিংহাসনে আরোহণ, সামরিক অভিযান, রাজ্যের বিস্তার প্রভৃতি দিক সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হল ।

Table of Contents

রাজা বিম্বিসার

 জন্ম৫৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
রাজত্বকাল ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৯২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
উত্তরাধিকারঅজাতশত্রু (পুত্র)
মৃত্যু৪৯১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
বিম্বিসার

ভূমিকা :- হর্যঙ্ক রাজবংশের রাজা ছিলেন বিম্বিসার, যিনি ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ৪৯২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মগধ শাসন করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় উত্তর ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার সম্ভব হয়েছিল।

বিম্বিসারের জন্ম পরিচয়

আনুমানিক ৫৫৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বিম্বিসার জন্মগ্রহণ করেন বলে মনে করা হয়।

বিম্বিসারের বংশ পরিচয়

রাজা বিম্বিসার ছিলেন একজন সর্দার ভাট্টিয়ার পুত্র। তাঁর মায়ের নাম ছিল বিশ্ব। প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে বিম্বিসারকে সেনিয় নামে উল্লেখ করা হয়েছে। টীকাকার বুদ্ধঘোষের মতে সেনিয় তার ব্যক্তিগত নাম ছিল। আবার ধম্মপালের মতে সেনিয় ছিল তার গোত্রের নাম।

জৈন ঐতিহ্য

বিম্বিসারকে জৈন ঐতিহ্যে ভবিষ্যত মহাজাগতিক যুগের ২৪ তম তীর্থঙ্করের মধ্যে প্রথম তীর্থঙ্কর (পদ্মনাভ) বলা হয়। তিনি প্রায়শই ভগবান মহাবীর – এর সমাবাসরণে যেতেন এবং তাঁর প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেন।

বৌদ্ধ ঐতিহ্য

বিম্বিসার বৌদ্ধ ঐতিহ্য অনুসারে সাংস্কৃতিক কৃতিত্বের জন্যও পরিচিত এবং তিনি বুদ্ধের একজন মহান বন্ধু ও রক্ষক ছিলেন। হিউয়েন সাং-এর মতে বিম্বিসার রাজগির (রাজগৃহ) নগরী নির্মাণ করেন।

বিম্বিসারের সিংহাসনে আরোহণ

রাজা বিম্বিসার ৫৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজ্য হর্যঙ্ক বা হর্ষঙ্ক রাজবংশ নামে পরিচিত।

বিম্বিসার কর্তৃক পাটলিপুত্র নগরীর গোড়াপত্তন

রাজা বিম্বিসার একটি গ্রামের দুর্গের মাধ্যমে মগধের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা পরে পাটলিপুত্র নগরীতে পরিণত হয়।

বিম্বিসারের রাজধানী

রাজা বিম্বিসারের প্রথম রাজধানী ছিল গিরিব্রজ।

বিম্বিসারের সামরিক অভিযান

রাজা বিম্বিসার পিতার পূর্বের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে অঙ্গ রাজ্যের বিরুদ্ধে একটি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। অঙ্গ রাজ্যের রাজা ব্রহ্মদত্ত পরাজিত হয়।

মগধ ও অঙ্গ রাজ্যের সংযুক্তি

যুদ্ধ জয়ের পর অঙ্গকে মগধের সাথে সংযুক্ত করা হয় এবং রাজকুমার কুনিক বা অজাতশত্রু অঙ্গরাজ্যের রাজধানী চম্পায় গভর্নর নিযুক্ত হন।

অঙ্গরাজ্য বিজয়ের গুরুত্ব

রাজা বিম্বিসারের অঙ্গ বিজয় মগধকে গঙ্গা ব-দ্বীপে যাওয়ার রাস্তার উপর নিয়ন্ত্রণ এনে দেয়, ভারতের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত বন্দরগুলিতে প্রবেশাধিকার দেয়।

মৌর্য সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের ভিত্তি

বিম্বিসারের রাজ্যের সম্প্রসারণ, বিশেষ করে পূর্বে অঙ্গ রাজ্য দখল মৌর্য সাম্রাজ্যের পরবর্তী সম্প্রসারণের ভিত্তি স্থাপন করেছে বলে মনে করা হয়।

গান্ধার রাজ ও বিম্বিসার

তৎকালীন গান্ধার রাজা পুক্কুসতি বিম্বিসারকে একটি দূতাবাস পাঠান।

বিম্বিসারের রাজসভায় বিশিষ্ট ব্যক্তি

রাজা বিম্বিসারের রাজসভায় সোনা কলিভিসা, সুমনা (ফুল সংগ্রহকারী), কোলিয়া (মন্ত্রী), কুম্ভঘোষক (কোষাধ্যক্ষ) এবং জীবক (চিকিৎসক) অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা যায়।

বিবাহ নীতি

বিম্বিসার তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে বিবাহ মৈত্রীর নীতি গ্রহণ করেছিলেন।

  • (১) রাজা বিম্বিসারের প্রথম স্ত্রী ছিলেন কোশলা দেবী, যিনি কোশলের রাজা মহাকোশলের কন্যা এবং প্রসেনজিতের বোন। তার বধূ যৌতুক হিসেবে তাকে কাশী নিয়ে আসে। এই বিয়ে মগধ ও কোশল -এর মধ্যে বৈরিতার অবসান ঘটায় এবং অন্যান্য রাজ্যের সাথে লেনদেনের ক্ষেত্রে তাকে স্বাধীনভাবে সাহায্য করে।
  • (২) বিম্বিসারের দ্বিতীয় স্ত্রী চেল্লনা ছিলেন বৈশালীর একজন লিচ্ছবি রাজকুমারী এবং জৈন রাজা চেতকের কন্যা।
  • (৩) রাজা বিম্বিসারের তৃতীয় স্ত্রী ক্ষেমা ছিলেন পাঞ্জাবের মাদ্রা গোত্রের প্রধানের কন্যা।

গৌতম বুদ্ধ ও রাজা বিম্বিসার

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ অনুসারে, রাজা বিম্বিসার বুদ্ধের জ্ঞানার্জনের আগে প্রথমবার বুদ্ধের সাথে সাক্ষাত করেছিলেন এবং পরে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ শিষ্য হয়েছিলেন যা কিছু নির্দিষ্ট বৌদ্ধ সূত্তে বিশিষ্টভাবে দেখা যায়।

বুদ্ধের নখ ও চুল আবেদন

বিম্বিসার তার প্রাসাদের মহিলাদের জন্য বুদ্ধের একটি চুল এবং নখের স্তুপ চেয়েছিলেন, যে কোনও সময় বুদ্ধের উপাসনা করতে তা ব্যবহার করতে পারবে। বুদ্ধ এই অনুরোধ মেনে নিয়েছিলেন।

জীবনানন্দের কবিতায় বিম্বিসার

“অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে।” কবি জীবনানন্দ দাশের কালজয়ী এই কবিতার রাজা বিম্বিসারের হাত ধরে শক্তিশালী সাম্রাজ্য মগধের সূচনা হয়েছিল।

অধুনা মগধ রাজ্য

বর্তমানকালের ভারতের বিহার রাজ্যই ছিল মগধ রাজ্য। এই রাজ্যের মাটি উর্বর ছিল এবং প্রচুর ফসল হতো। এ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে হিরণ্যবতী বা শোন নদী।

মগধরাজ শ্রেণিক বিম্বিসার

বিম্বিসার ছিলেন মগধ রাজ্যের হর্যঙ্ক বংশের খ্যাতিমান নৃপতি। তাঁর নামের সাথে ‘সেনিয়’ বা ‘শ্রেণিক’ বিশেষণ যুক্ত হয়ে তিনি ‘মগধরাজ শ্রেণিক বিম্বিসার’ নামে খ্যাত ছিলেন।

বিম্বিসারের সেনাবাহিনী

যুদ্ধবিদ্যায় রাজা বিম্বিসারের সৈন্যবাহিনী খুব পারদর্শী ছিল। যুদ্ধে তিনি হাতি ব্যবহার করতেন। ফলে তিনি সহজেই যুদ্ধে জয়লাভ করতেন।

বিম্বিসারের রাজ্যের বিস্তার

রাজা বিম্বিসারের রাজ্যসীমা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। জানা যায়, তাঁর রাজ্যে আশি হাজার শহর ছিল। শহরগুলোর মধ্যে তিনি সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

রাজগৃহ নগরী নির্মাণ

রাজা বিম্বিসার প্রাচীন রাজগৃহ নগরী নির্মাণ করেছিলেন। রাজগৃহ পাঁচটি পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত ছিল। তাঁর রাজপ্রাসাদের চারদিক পাথরের প্রাচীর দ্বারা ঘেরা ছিল।

বিম্বিসারের রাজগৃহে গৌতম বুদ্ধ

রাজা বিম্বিসার প্রতিষ্ঠিত রাজগৃহে বুদ্ধ অনেকদিন বসবাস করেছিলেন এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধর্মোপদেশ দান করেছিলেন। এখানে প্রথম ত্রিপিটক সংকলিত হয়েছিল। এ নগরীর ধ্বংসাবশেষ এখনও আছে। রাজগৃহের নিকটেই অবস্থিত ছিল নালন্দা।

সুশাসক ও ন্যায় বিচারক

রাজা বিম্বিসার সুশাসক ও ন্যায়বিচারক ছিলেন। সর্বদা প্রজাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা করতেন।

পিতৃবিরোধী অজাতশত্রু

গৌতম বুদ্ধ -এর দূরসম্পৰ্কীয় ভাই দেবদত্তের প্ররোচনায় বিম্বিসার পুত্র অজাতশত্রু পিতৃবিরোধী হয়ে ওঠেন। একসময় পিতাকে কারারুদ্ধ করে নিজে রাজা হন।

বিম্বিসার শান্তিপ্রিয় ও সংগঠক রাজা

রাজা বিম্বিসার একজন শান্তিপ্রিয় রাজা ও উত্তম সংগঠক ছিলেন। পার্শ্ববর্তী অন্য রাজারাও তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় তৎপর ছিলেন।

অবন্তীরাজ প্রদৌত ও বিম্বিসার

অবন্তী রাজ্যের রাজা প্রদৌতের চিকিৎসার জন্য তিনি তদানীন্তন ভারতবর্ষের খ্যাতিমান চিকিৎসক জীবককে প্রেরণ করেছিলেন।

জৈন ও বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ

বিম্বিসারের রাজ্যে জৈনধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম উভয়েই সমসাময়িককালে বিকাশ লাভ করে। রাজা বিম্বিসার বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করলেও জৈনধর্মসহ সে সময়ে প্রচলিত অন্যান্য ধর্মের পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।

জনসেবা

রাজা বিম্বিসার নিয়মিত গ্রাম পরিদর্শন, রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং সেবামূলক প্রতিষ্ঠান তৈরিতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন।

বুদ্ধের শিষ্যত্ব গ্ৰহণ

রাজা বিম্বিসার বুদ্ধের বাণী ও উপদেশ শুনে মুদ্ধ হন। তিনি বুদ্ধের গৃহী শিষ্য বা উপাসক হন। এ সময় রাজা বিম্বিসারের বয়স হয়েছিল ঊনত্রিশ বছর।

রাজপ্রাসাদে বুদ্ধকে নিমন্ত্রণ

ভিক্ষুসঙ্ঘসহ বুদ্ধকে রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণ গ্রহণের জন্য রাজা বিম্বিসারের অনুরোধে বুদ্ধ প্রাসাদে গিয়ে রাজাকে নানা ধর্মকথা শোনান।

বিম্বিসারের শৈশব কামনা

রাজা বিম্বিসার ধর্মকথা শুনে আনন্দচিত্তে বুদ্ধকে বলেন যে, ‘প্রভু! ছোটবেলা আমার পাঁচটি কামনা ছিল। তা আজ পূর্ণ হলো।’ এই কামনা গুলি হল –

  • (১) আমি ভবিষ্যতে রাজপদে অভিষিক্ত হব।
  • (২) আমার রাজ্যে অর্হৎ সম্যকসম্বুদ্ধ অবতীর্ণ হবেন।
  • (৩) আমি সেই বুদ্ধকে সেবা ও পরিচর্যা করব।
  • (৪) সেই ভগবান বুদ্ধ আমাকে ধর্মোপদেশ দান করবেন।
  • (৫) আমি বুদ্ধের ধর্ম উপলব্ধি করব।

গৌতম বুদ্ধকে বেনুবন দান

রাজা বিম্বিসার অত্যন্ত শ্রদ্ধাচিত্তে তাঁর রাজ্যে অতি মনোরম বেনুবন উদ্যান বুদ্ধ এবং তাঁর ভিক্ষুসঙ্ঘকে দান করেন।

বুদ্ধ ও বৌদ্ধ ধর্মের সেবা

বুদ্ধের উপাসক হওয়ার পর থেকে রাজা বিম্বিসার নানাভাবে বৌদ্ধধর্মের প্রচার-প্রসারে সহযোগিতা করতে থাকেন। তিনি ছত্রিশ বছর বুদ্ধ ও তাঁর ধর্মের সেবা করেন।

মৃত্যু

বৌদ্ধধর্ম অনুসারে বৌদ্ধ ভিক্ষু দস্তবন্ধু দিবাদত- এর প্রভাবে বিম্বিসার তাঁর পুত্র অজাতশত্রু কর্তৃক নিহত হন ৪৯১ খ্রিস্টপূর্বব্দে। আবার জৈন ধর্ম অনুসারে বিম্বিসার আত্মহত্যা করেছিলেন।

উপসংহার :- হর্যঙ্ক বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা বিম্বিসারের হাত ধরেই শুরু হয় মগধ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা। আর এই সাম্রাজ্যবাদ পরিণতি লাভ করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য, অশোক -এর হাতে।

[FAQ] রাজা বিম্বিসার সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য ?

বিম্বিসারের উপাধি কী ছিল ?

শ্রেণিক ।

বিম্বিসারের রাজবৈদ্যের নাম কী ?

জীবক ।

Leave a Reply

Translate »