গৌতম বুদ্ধের জীবনী – Gautam Buddha Biography in Bengali

শাক্য মুনি গৌতম বুদ্ধের জীবনী, জন্ম ও বংশ পরিচয় (Gautam Buddha Biography in Bengali) নিয়ে আলোচনা করা হল । পৌরাণিক মতানুসারে গৌতম বুদ্ধ ও গৌতম বুদ্ধের অহিংসা নীতি

Table of Contents

গৌতম বুদ্ধের জীবনী – Gautam Buddha Biography in Bengali

নামসিদ্ধার্থ (গৌতম)
জন্ম ৫৬৭-৫৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
জন্মস্থানলুম্বিনি উদ্যান
পিতা-মাতাপিতা – শুদ্ধোধন
মাতা – মায়াদেবী
মৃত্যু৪৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ
গৌতম বুদ্ধের জীবনী

গৌতম বুদ্ধের জীবনী

ভারত ভূখণ্ডের ইতিহাসের পাতা উল্টালে যে সংস্কৃতি ও দর্শনের কথা অনিবার্য ভাবে উঠে আসে, তা হলো বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও দর্শনের কথা। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রতিবাদী ধর্ম আন্দলন -এর পর যারা ভারত তথা বিশ্বে সর্বাধিক জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন গৌতম বুদ্ধ। এই কৃতিত্বের জন্য ইতিহাসবিদ ড. এ. এল. বাসাম বলেছেন যে, “বুদ্ধ ছিলেন এযাবৎকালের ভারতের শ্রেষ্ঠ সন্তান।”

গৌতম বুদ্ধের জীবনী সম্পর্কে জানতে ঐতিহাসিক উপাদান :-

বিভিন্ন বৌদ্ধ গ্রন্থ যেমন ‘জাতক’, ‘সূত্তনিকায়’,’মহাবংশ’, ‘দীপবংশ’, ‘ললিতবিস্তার’, ‘বুদ্ধচরিত’, প্রভৃতি থেকে গৌতম বুদ্ধ ও তার প্রবর্তিত বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য আমরা জানতে পারি।

গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে জীবনী গ্রন্থ :-

বিভিন্ন ঐতিহ্যশালী জীবনীগ্রন্থগুলি সিদ্ধার্থ গৌতমের জীবনীর মূল উপাদান। ত্রিপিটকে বুদ্ধবংস নামক গ্রন্থে গৌতম বুদ্ধের জীবনীও পাওয়া যায়। দ্বিতীয় শতাব্দীতে অশ্বঘোষ দ্বারা রচিত বুদ্ধচরিত মহাকাব্যটি বুদ্ধের প্রথম পূর্ণ জীবনীগ্রন্থ। তৃতীয় শতকে রচিত ললিতবিস্তার সূত্র গৌতম বুদ্ধের জীবনী নিয়ে লিখিত পরবর্তী গ্রন্থ। সম্ভবত চতুর্থ শতাব্দীতে রচিত মহাসাঙ্ঘিক লোকোত্তরবাদ ঐতিহ্যের মহাবস্তু গ্রন্থটি অপর একটি প্রধান জীবনী গ্রন্থ হিসেবে গণ্য হয়। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত ধর্মগুপ্তক ঐতিহ্যের অভিনিষ্ক্রমণ সূত্র গ্রন্থটি বুদ্ধের একটি বিরাট জীবনীগ্রন্থ। সর্বশেষে পঞ্চম শতাব্দীতে রচিত বুদ্ধঘোষ রচিত থেরবাদ ঐতিহ্যের নিদানকথা বিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য। ত্রিপিটকের অংশ হিসেবে জাতক, মহাপদন সূত্ত ও আচারিয়াভুত সুত্তে বুদ্ধদেবের জীবনের কিছু নির্বাচিত অংশের বর্ণনা আছে। আবার বুদ্ধঘোষের রচিত পদ্যচূড়ামণি গ্রন্থেও বুদ্ধদেবের জীবনী পাওয়া যায়। মহাবস্তু ও আরো অন্যান্য গ্রন্থে বুদ্ধদেবকে লোকোত্তর সর্বোৎকৃষ্ট চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি জাগতিক বিশ্বের সমস্ত ভার থেকে মুক্ত।

গৌতম বুদ্ধের জন্ম ও বংশ পরিচয় :-

বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে নেপালের তরাই অঞ্চলের কপিলাবস্তুর লুম্বিনী উদ্যানে শাক্য নামে এক ক্ষত্রিয় রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধন। তাঁর মায়ের নাম ছিল মায়াদেবী। বুদ্ধের জন্মকাল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অধিকাংশ ইতিহাসবিদ স্বীকার করেছেন যে ৫৬৭-৬৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন।

পৌরাণিক মতানুসারে গৌতম বুদ্ধ :-  

বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা গৌতম বুদ্ধ বিভিন্ন নামে আমাদের কাছে পরিচিত হয়ে থাকেন। বুদ্ধ, সিদ্ধার্থ অথবা পদ্মপাণি। বৌদ্ধ ধর্মমতে পদ্মফুল হাতে ধারণ করে থাকেন বলে তিনি পদ্মপাণি। আবার হিন্দু ধর্মমতে তিনি বিষ্ণুর নবম এবং কলিকালের প্রথম অবতার।

গৌতম বুদ্ধের জন্ম ইতিহাস :-

নেপালের দক্ষিণ অংশে এবং প্রাচীন ভারতবর্ষের যোধপুর রাজ্য নিয়ে একটি রাজপুত রাজ্য ছিল। এই রাজ্যের রাজধানী কপিলাবস্তু। এই রাজ্যের রাজা শুদ্ধোধনের ঔরসে মায়া দেবী’র গর্ভে খ্রিষ্টপুর্ব ৫৬৭-৫৬৩ অব্দের দিকে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্ৰহণ করেন। বৌদ্ধধর্মগ্রন্থ সূত্তনিকায়ে বলা হয়েছে যে শাক্যদের একটি গ্রাম লুম্বিনিয়া জনপদে গৌতম বুদ্ধের জন্ম হয়।

হিন্দু বর্ণ অনুযায়ী, শাক্যরা ছিলেন ক্ষত্রিয়। বৌদ্ধ পুরাণ অনুসারে গৌতম বুদ্ধের মা মায়াদেবী শাক্য রাজধানী কপিলাবস্তু থেকে তার পৈতৃক বাসগৃহে যাচ্ছিলেন। পথের মধ্যে লুম্বিনী গ্রামের একটি উদ্যানের ভিতর, একটি শালগাছের নিচে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর জন্মের আগে তাঁর মা মায়াদেবী এখানে একটি দীঘিতে স্নান করেন। গৌতমের জন্মের পর তাঁকেও এই দীঘিতে স্নান করানো হয়। সেই কারণে এই জলাশয়টিকে পবিত্র পুষ্করিণী মানা হয়।

গৌতম বুদ্ধের মাতা মায়াদেবীর মন্দির :-

লুম্বিনীতে পরে মায়াদেবীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মন্দিরের একটি স্থানকে গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি প্রাচীন মঠ ও মন্দির এবং একটি প্রাচীন পবিত্র বোধিবৃক্ষ আছে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে সম্রাট অশোক ২৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে এই তীর্থভূমি পরিদর্শনে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়। পরে তিনি তিনি এই গ্রামের প্রজাদের রাজস্ব এক-অষ্টমাংশ হ্রাস করেছিলেন। আগমনের স্মারক হিসেবে সম্রাট অশোক এখানে একটি অশোক স্তম্ভ স্থাপন করিয়েছিলেন।

গৌতম বুদ্ধের নামকরণ :-

দীর্ঘদিনের অনেক সাধনার পর এই পুত্র জন্মেছিল বলে রাজা শুদ্ধোধন তাঁর নাম রেখেছিলেন সিদ্ধার্থ। জন্মের অল্পকাল পরেই তিনি মাকে হারিয়েছিলেন। এরপর তিনি বিমাতা তথা মাসি  গৌতমীর কাছে লালিতপালিত হন। তাই তাঁর নাম হয় গৌতম। শাক্যবংশে জন্মেছিলেন বলে তাঁর আর এক নাম ছিল শাক্যসিংহ।

গৌতম বুদ্ধের প্রথম জীবন :-

শাক্য মুনি গৌতম বুদ্ধের জন্মগ্রহণের কিছু দিন পর একজন সাধু নবজাত শিশুকে দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই শিশু পরবর্তীকালে একজন রাজচক্রবর্তী অথবা একজন সিদ্ধ সাধক হয়ে উঠবেন। বুদ্ধের নামকরণের দিনে আমন্ত্রিত সর্বকনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ কৌণ্ডিন্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে বলেন যে, এই শিশু পরবর্তীকালে বুদ্ধত্ব লাভ করবেন। মায়ের মৃত্যুর পর তিনি বিমাতা মহাপ্রজাপতি গোতমীর দ্বারা লালিত হন। বৌদ্ধ পুঁথি সমূহ থেকে জানা যায় যে, পিতা শুদ্ধোধন গৌতম বুদ্ধের জীবনে বিলাসিতার সমস্ত রকম ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও তিনি সে সম্পর্কে ছিলেন একেবারে উদাসীন। বস্তুগত ঐশ্বর্য্য যে জীবনের লক্ষ্য হতে পারে না, তা তিনি খুব অল্প বয়স থেকেই উপলব্ধি করা শুরু করেন।

গৌতম বুদ্ধের বিবাহ :-

শৈশব থেকেই গৌতম বুদ্ধ ছিলেন সংসার বিবাগী। অধিকাংশ সময় তিনি ঈশ্বরচিন্তায় কাটিয়ে দিতেন। তাই রাজা শুদ্ধোধন পুত্রকে সংসারী করার জন্য, প্রতিবেশী কোলিয় রাজপরিবারের কন্যা গোপাল বা যশোধরার সাথে তাঁর বিবাহ দেন। বিবাহের সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর। ২৯ বছর বয়সে তাঁর একটি পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করে। এই পুত্রের নাম রাখা হয় রাহুল। এইভাবে সিদ্ধার্থ তার জীবনের প্রথম উনত্রিশ বছর রাজপুত্র হিসেবে অতিবাহিত করেন।

গৌতম বুদ্ধের ধর্মভাবনার উন্মেষ এবং গৃহত্যাগ :-

গৌতম বুদ্ধ একদিন নগর পরিদর্শনে বেরিয়ে রাজপথে ব্যাধিগ্রস্ত বৃদ্ধ এবং এক মৃতদেহ দেখে খুবই বিচলিত হয়ে পড়েন। এরপর থেকেই তিনি মানবজীবনের শোক, দুঃখ, জরা, ব্যাধি এবং মৃত্যুর হাত থেকে কিভাবে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, সে বিষয়ে ভাবতে শুরু করেন। এই ভাবনা থেকেই ৫৩৪ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে (মতান্তরে ৫৩৮ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে) তিনি ঘুমন্ত স্ত্রী ও পুত্রকে রেখে রাজপ্রাসাদ ছেড়ে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে পড়েন। কথিত আছে যে, এই সময় তাঁর পুত্র রাহুলের বয়স ছিল মাত্র সাত দিন।

মহাভিনিষ্ক্রমণ :-

রাজকীয় বিলাস-বৈভব গৌতম বুদ্ধের মনকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। মানবজীবনের হতাশা, দুঃখ, জরা-ব্যাধি প্রভৃতির চিন্তা তাকে আকুল করে তুলেছিল। ক্রমে সংসার জীবনে দুঃখ, জরা-ব্যাধি এবং মৃত্যুর বিষয়গুলি গৌতম বুদ্ধকে খুব ভাবিয়ে তোলে। বৌদ্ধধর্মে এই তিনটি বিষয়কে “ত্রিতাপ” বলা হয়। মানবজীবন থেকে “ত্রিতাপের যন্ত্রণা” মোচনের জন্য তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। এরপর ২৯ বছর বয়সে একদিন গভীর রাতে তিনি গোপনে গৃহত্যাগ করেন। তাঁর এই গৃহত্যাগের ঘটনাই ‘মহাভিনিস্ক্রমণ’ নামে পরিচিত।

গৌতম বুদ্ধের ধর্মশিক্ষা :-

গৃহত্যাগের পর প্রথম বৈশালী নগরে (বৃজি মহাজনপদের রাজধানী) যান এবং সেখানে থেকে আলারা কালাম নামে এক পণ্ডিতের কাছে হিন্দু দর্শন সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ করেন। কিন্তু এই জ্ঞানে তিনি পরিতৃপ্ত হতে পারেন নি। তাই সেখান থেকে তিনি উদ্দক রামপুত্তের কাছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য আসেন। এই গুরুর কাছে তিনি সাংখ্য এবং যোগবিদ্যা শিক্ষা লাভ করেন। কিন্তু এই নতুন জ্ঞানও তাঁকে শান্ত করতে পারলো না। এরপর তিনি চলে আসেন মগধের রাজধানী রাজগিরীতে।

গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ভারতের রাজা :-

প্রাচীন ভারতের কোশল রাজ্যের রাজা প্রসেনজিৎ, মগধের রাজা বিম্বিসার ও অজাতশত্রু গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক ছিলেন। রাজা বিম্বিসার এবং রাজা প্রসেনজিৎ তাঁর কাছে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন বলেও জানা যায়।

বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণকারী সম্রাটঃ-

প্রাচীন ভারতের রাজা বিম্বিসার, অজাত শত্রু, প্রসেঞ্জিৎ, কনিষ্ক, এমনকি কলিঙ্গ যুদ্ধ -এর পর সম্রাট অশোকও বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন ।

গৌতম বুদ্ধ ও মগধরাজ বিম্বিসারের সাক্ষাৎ :-

লোকমুখে নতুন সন্ন্যাসীর প্রশংসা শুনে বিম্বিসার গৌতম বুদ্ধের সাথে দেখা করেন এবং তাঁকে রাজপ্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু গৌতম বুদ্ধ এই আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে জানান যে, যদি কখনও সত্যের সন্ধান পান, তাহলে তিনি অবশ্যই রাজার আমন্ত্রণ রক্ষা করবেন। এই ঘটনার কিছুদিন পর, বিম্বিসার এক যজ্ঞানুষ্ঠানের জন্য ১০০০ মেষ বলির উদ্যোগ নেন। এই কথা জানতে পেরে গৌতম বুদ্ধ রাজার সাথে দেখা করেন এবং তাঁকে মেষ বলি বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। বিম্বিসার তাঁর এই অনুরোধে বলি বন্ধ করে দেন।

গৌতম বুদ্ধের বোধিলাভ :-

রাজা বিম্বিসারের সাথে গৌতম বুদ্ধ উরুবিল্ব গ্রামের নিকটবর্তী এক উপবনে এসে কঠোর তপস্যা শুরু করেন।

এই সময় পাঁচজন সন্ন্যাসীও তাঁর সাথে ধ্যান শুরু করেন।

গৌতম বুদ্ধের কঠোর তপস্যা দেখে এই পাঁচ সন্ন্যাসী তাঁর ভক্ত হয়ে পড়েন।

এরপর গৌতম বুদ্ধ ভারতের বর্তমান বিহার প্রদেশের গয়া জেলার একটি গভীর অরণ্যের ভিতর, নিরাঞ্জনা নদীর তীরে একটি অশ্বত্থ গাছের নিচে কঠোর তপস্যা শুরু করেন।

এই সময় অনাহারে অনিদ্রায় তাঁর শরীরের মেদ-মাংস ক্ষয়ে কঙ্কালসার হয়ে যায়। এই শারীরীক অক্ষমতার কারণে ধ্যানে মনোনিবেশ করতে পারছিলেন না।

তাই তিনি অল্প কিছু আহার করা শুরু করেন। এই সময় সুজাতা নামে এক গৃহবধু প্রথম পুত্র সন্তান লাভের পর বনদেবতার পূজা দিতে আসতেন।

তিনি সেখানে গৌতম বুদ্ধকে দেবতা ভেবে পূজা দিতে গেলে, গৌতম বুদ্ধ তাঁর ভুল ভেঙে দিয়ে বলেন যে, তিনি সাধারণ মানুষ।

গৌতম বুদ্ধ সুজাতার দেওয়া পায়েস গ্রহণ করে বলেন যে, তোমার মনস্কামনা যেমন পূর্ণ হয়েছে, এই পায়েস গ্রহণের পর আমার মনস্কামনাও যেন পূর্ণ হয়। গৌতম বুদ্ধের এই পায়েস খাওয়া দেখে, তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে, তাঁর সঙ্গী সন্ন্যাসীরা তাঁকে ত্যাগ করেন। এরপর থেকে তিনি একাই ধ্যান করতে থাকেন। প্রায় ৪৯ দিন ধ্যান করার পর বৈশাখী পূর্ণিমায় তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেন। এই সময় থেকে তিনি ‘গৌতম বুদ্ধ’ বা ‘তথাগত’ নামে পরিচিত হন। তখন তাঁর বয়স ছিল ৩৫ বৎসর। বোধিপ্রাপ্ত হলে তাঁর নাম হয় বুদ্ধ।

কথিত আছে যে বুদ্ধত্ব লাভের দিন তিনি রাতের প্রথম যামে পূর্বজন্মের জ্ঞান লাভ হয়, দ্বিতীয় যামে তাঁর দিব্যচক্ষু বিশুদ্ধ হয়, অন্তিম যামে দ্বাদশ প্রতীতসমুৎপাদ এবং অরুণোদয়ে সর্বজ্ঞাতা প্রত্যক্ষ করেন। বর্তমানে নিরঞ্জনা নদীকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ফল্গু নদী। বর্তমানে উরুবিল্ব গ্রামের নাম বুদ্ধগয়া এবং তিনি যে অশ্বত্থগাছের নিচে বসে বোধিত্ব লাভ করেছিলেন সেই গাছের নামকরণ করা হয় বোধিবৃক্ষ। বোধিবৃক্ষ এবং মন্দির ছাড়া এখানে একটি দীঘি আছে। কথিত আছে যে, এই দীঘির জলে স্নান করে গৌতম বুদ্ধকে পায়েস নিবেদন করেছিলেন তিনি। তাই এই দীঘির নাম রাখা হয় সুজাতা দিঘি।

গৌতম বুদ্ধের সারনাথ গমন :-

বোধিলাভের পর গৌতম বুদ্ধ উরুবিল্ব তথা বুদ্ধগয়াতে ছয় বছর ছিলেন। এরপর তাঁর গুরু আলারা কালাম, উদ্দক রামপুত্ত এবং তাঁকে ছেড়ে যাওয়া সেই পাঁচজন শিষ্যকে জ্ঞান দানের উদ্যোগ গ্ৰহণ করেন। কিন্তু এরই মধ্যে আলারা কালাম এবং উদ্দক রামপুত্ত দেহত্যাগ করেছিলেন। তাই পাঁচ শিষ্যকে জ্ঞান দানের উদ্দেশ্যে বুদ্ধদেব বোধিবৃক্ষ ত্যাগ করে বারাণসী -র অদূরবর্তী সারনাথ নামক স্থানে আসেন। এই স্থানেই পাঁচজন শিষ্যের সাথে বুদ্ধদেবের প্রথম দেখা হয়। এই স্থানটি বর্তমানে ‘চৌখণ্ডী স্তূপ’ নামে পরিচিত। পরবর্তী সময়ে সম্রাট অশোক এই স্তূপটি নির্মাণ করেছিলেন।

ধর্মচক্র প্রবর্তন :-

গৌতম বুদ্ধ আষাঢ় মাসের পূর্ণিমার দিন সর্বপ্রথম সারানাথের মৃগদাবে পাঁচজন সন্ন্যাসীকে প্রথম দীক্ষা দেন ও তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। এই পাঁচ জন সন্ন্যাসী  হলেন কৌন্ডিণ্য, ভদ্রিক, অশ্বজিৎ, বাষ্প এবং মহানাম। এই ধর্ম প্রচারের ঘটনা বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে ‘ধর্মচক্রপ্রবর্তন’ নামে পরিচিত। এই কারণে সারনাথ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। এই পাঁচ সন্ন্যাসীর দীক্ষাস্থানটিতে নির্মিত হয়েছিল ধামেখ স্তূপ। এই স্তূপটিও সম্রাট অশোক নির্মাণ করিয়েছিলেন। এর সংস্কৃত নাম ‘ধর্মচক্র স্তূপ’, পালিভাষায় এর নাম ধম্মখ এবং বর্তমানকালে ধামেখ স্তূপ নামে পরিচিত হয়।

গৌতম বুদ্ধের ধর্মপ্রচার :-

দিব্যজ্ঞান লাভের পর গৌতম বুদ্ধ মানবকল্যাণের উদ্দেশ্যে তাঁর মতাদর্শ প্রচার করেন। সারনাথের মৃগদাব ইসিপত্তনে ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন’ করে সেখানে তিনি বর্ষযাপন করেন। এই সময়কালে তিনি ৬০ জন শিষ্য তৈরি করতে সক্ষম হন। এরপর তিনি স্থানীয় এলাকায় সাধারণ গৃহীদের মধ্যে ধর্ম প্রচার করা শুরু করেন। এই সময় তিনি একটি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সঙ্ঘের জন্য তৈরি করা আইন উপসম্পদা নামে পরিচিত। প্রথম দিকে তিনি শুধু পুরুষদের দীক্ষা দিতেন। পরবর্তীতে প্রিয় শিষ্য আনন্দের অনুরোধে তিনি নারীদেরও দীক্ষা দেওয়া শুরু করেন। কথিত আছে যে, প্রথম ভিক্ষুণী হয়েছিলেন তাঁর বিমাতা গৌতমী।

গৌতম বুদ্ধের বাণীঃ-

ভগবান্ গৌতম বুদ্ধের বাণীগুলি নিম্নরূপ –

গৌতম বুদ্ধের বাণী

রাজগিরীতে গৌতম বুদ্ধ :-

সারনাথ থেকে ধর্ম প্রচার করতে করতে তিনি মগধ রাজ্যের রাজধানী রাজগিরীর সন্নিকটে আবার উরুবিল্বে উপস্থিত হন। এখানে কাশ্যপ তাঁর শিষ্যদের নিয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এই ঘটনার কিছুদিন পর নদীকাশ্যপ এবং গয়াকাশ্যপ নামে দুই জন হিন্দু ধর্মগুরু বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এরপর বুদ্ধদেব নবদীক্ষিত শিষ্যদের নিয়ে পূর্ব প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে মগধ রাজ্যের রাজধানী রাজগিরীতে আসেন। রাজা বিম্বিসার বুদ্ধদেবকে ধর্মগুরু হিসেবে মান্যতা দিয়ে করে প্রাসাদে নিয়ে যান। বুদ্ধদেব তাঁকে চতুর আর্য সত্য সম্বন্ধে উপদেশ প্রদান করেন। এইসময় রাজা বিম্বিসার বৌদ্ধ সংঘের সহস্রাধিক ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য বেণুবন নামক তার প্রমোদ উদ্যানটি বুদ্ধদেবকে প্রদান করেন। পরবর্তীতে রাজা বিম্বিসার সেখানে একটি বিহারও নির্মাণ করেন, যা ‘বেণুবন বিহার’ নামে পরিচিতি হয়েছিল।

রাজা বিম্বিসারের অনুরোধে বুদ্ধদেব অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপবাস ব্রত পালনের বিধি প্রচলন করেন। কথিত আছে যে, মগধরাজ বিম্বিসারের অনুরোধেই বুদ্ধদেব বর্ষাকালে পরিব্রাজন না করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে অবস্থান করেন। এইভাবে তিনি সাধনার ‘বর্ষাবাস’ নামক রীতি প্রচলন করেন। রাজা বিম্বিসার ভিক্ষুদের বর্ষাবাসের সুবিধার জন্য কুটীর নির্মাণ এবং বুদ্ধদেব ও ভিক্ষুদের চিকিৎসার জন্য রাজবৈদ্য জীবককে নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে রাজা বিম্বিসারের তৃতীয়া পত্নী ক্ষেমা ভিক্ষুণী সংঘে যোগদান করে মহত্ব লাভ করেন বলে মনে করা হয়।

গৌতম বুদ্ধের উদ্দেশ্যে জীবকাম্রবন :-

বুদ্ধদেব বেণুবনে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষ উদ্‌যাপন করেন। শেষ বছরে সারিপুত্র ও মৌদ্‌গলায়ন বুদ্ধের শিষ্য হয়েছিলেন। এই সময় রাজবৈদ্য জীবক তাঁর আম্রকাননে বুদ্ধ সংঘের জন্য একটি বিহার নির্মাণ করিয়েছিলেন। বর্তমানে এই বিহারটি ‘জীবকাম্রবন’ নামে পরিচিত।

নিজ রাজ্যে গৌতম বুদ্ধ :-

বোধি লাভের এক বছর পর পিতা শুদ্ধোধন তার পুত্র বুদ্ধদেবকে কপিলাবস্তু শহরে আমন্ত্রণ জানান। একসময়ের রাজপুত্র গৌতম রাজধানীতে উপস্থিত হয়ে সংঘের সাথে ভিক্ষা করে খাদ্য সংগ্রহ করেন। কপিলাবস্তুতে তাঁর পুত্র রাহুল তাঁর কাছে শ্রমণের দীক্ষাগ্রহণ করেন। এছাড়াও আনন্দ ও অনুরুদ্ধ নামে তাঁর দুইজন আত্মীয়ও তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মহাকশ্যপ, সারিপুত্ত, মৌদ্গলায়ন, আনন্দ, অনুরুদ্ধ ও রাহুল ছাড়াও উপলি, মহাকাত্যায়ন, পুণ্ণ ও সুভূতি বুদ্ধদেবের দশজন প্রধান শিষ্য ছিলেন।

গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক নারীদের সংঘে প্রবেশের অনুমতি :-

কয়েক বছর পরে রোহিণী নদীর জলের অংশ নিয়ে শাক্যদের সঙ্গে কোলীয়দের একটি বিবাদ উপস্থিত হয়। বুদ্ধদেব সেই বিবাদের মীমাংসা করেন বলে জানা যায়। এরপর কয়েকদিনের মধ্যে শুদ্ধোধন মৃত্যুবরণ করলে বুদ্ধদেবের বিমাতা মহাপ্রজাপতি গৌতমী সংঘে যোগদানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। বুদ্ধদেব প্রথমে নারীদের সংঘে যোগদানের ব্যাপারে অমত প্রকাশ করলেও আনন্দের উৎসাহে তিনি সংঘ গঠনের পাঁচ বছর পরে সংঘে নারীদের ভিক্ষুণী হিসেবে প্রবেশের অনুমতি দেন।

গৌতম বুদ্ধের দীর্ঘকাল ধর্মপ্রচার :-

এরপর তিনি দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন স্থানে তাঁর ধর্মমত প্রচার করেন। মগধের রাজা বিম্বিসার ও অজাতশত্রূ, কোশল-রাজ প্রসেনজিত ও তাঁর স্ত্রী মল্লিকা, পন্ডিত সারিপুত্ত, ব্যবসায়ী অনাথপিন্ডক, পতিতা আম্রপালি, নাপিত উপালি প্রমুখ অনেকেই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

গৌতম বুদ্ধের শেষ জীবন :-

মহাপরিনিব্বাণ সুত্ত অনুযায়ী গৌতম বুদ্ধের বয়স যখন আশি বছর, তখন তিনি নিজে তাঁর আসন্ন মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন। পওয়া নামক একটি স্থানে অবস্থান করার সময় চণ্ড নামে এক কামার তাকে খাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। এই খাবার খাওয়ার পরেই গৌতম বুদ্ধ আমাশয় দ্বারা আক্রান্ত হন। কিন্তু চণ্ডের দেওয়া খাবার যে তার মৃত্যু কারণ নয়, সেই ব্যাপারে গৌতম বুদ্ধ নির্দেশ দেন। এরপর প্রধান শিষ্য আনন্দের আপত্তি সত্ত্বেও তিনি অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় কুশীনগর যাত্রা করেন। সেখানে তিনি আনন্দকে নির্দেশ দেন দুইটি শাল বৃক্ষের মাঝখানের একটি জমিতে একটি কাপড় বিছিয়ে তাঁকে যেন শুইয়ে দেওয়া হয়। এরপর শায়িত অবস্থায় গৌতম বুদ্ধ উপস্থিত সকল ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষকে তার শেষ উপদেশ প্রদান করেন। তাঁর অন্তিম বাণী ছিল ‘বয়ধম্মা সঙ্খারা অপ্পমাদেন সম্পাদেথা” অর্থাৎ ‘সকল জাগতিক বস্তুর বিনাশ আছে। অধ্যাবসায়ের সাথে আপনার মুক্তির জন্য সংগ্রাম কর।’

গৌতম বুদ্ধের দেহত্যাগ তথা মহাপরিনির্বাণ :-

৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে আশি বছর বয়সে উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষপুর জেলার কুশীনগরে গৌতম বুদ্ধ দেহত্যাগ করেন। গৌতম বুদ্ধের এই দেহত্যাগের ঘটনা বৌদ্ধধর্মে ‘মহাপরিনির্বাণ’ নামে পরিচিত।

গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্ম :-

গৌতম বুদ্ধ নিজে বলতেন, “সমুদ্রের জলের যেমন একটাই স্বাদ, তা হল নোনা, তেমন আমার ধর্মেরও একটিই লক্ষ্য, আর তা হল মানুষকে দুঃখ থেকে মুক্ত করা।” তিনি তাঁর ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে যে সকল উপদেশ ও আদর্শ প্রচার করতেন সেগুলিই বৌদ্ধ ধর্মের মূল নীতি হয়ে ওঠে।

বৌদ্ধ ধর্মগ্ৰন্থ ত্রিপিটক :-  

বুদ্ধদেবের দেহত্যাগের পর রাজগৃহে প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি (সম্মেলন) অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে বুদ্ধের উপদেশগুলি তিনটি খণ্ডে সংকলিত করা হয়। এই খণ্ডগুলি বিনয় পিটক, সুত্র পিটক ও অভিধর্ম পিটক নামে পরিচিত। তিনটি পিটক একত্রে ত্রিপিটক নামে পরিচিত। বিনয় পিটক-এ বুদ্ধ নির্দেশিত ধর্মীয় আচার, সুত্র পিটকে তাঁর ধর্মীয় উপদেশাবলি এবং অভিধর্ম পিটকে বৌদ্ধদর্শনের কথা লিপিবদ্ধ আছে।

বৌদ্ধধর্মের প্রধান ধর্মীয় আদর্শ :-

পবিত্র বৌদ্ধ ধর্মগ্ৰন্থ ত্রিপিটক ছাড়াও অন্যান্য বৌদ্ধ ধর্মগ্ৰন্থে এই ধর্মের আদর্শগুলি উল্লেখিত আছে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রধান ধর্মীয় আদর্শগুলি হল আর্যসত্য, মঝঝিম পন্থা, অষ্টাঙ্গিক মার্গ, পঞ্চশীল, নির্বাণ প্রভৃতি।

(ক) আর্যসত্য :-

বুদ্ধদেবের মতে, আসক্তি থেকেই মানুষের সকল দুঃখের উৎপত্তি হয়। এই আসক্তির অবসান হলে দুঃখেরও অবসান ঘটেবে। আসক্তি দূর করার লক্ষ্যে বুদ্ধদেব মানুষকে চারটি ‘আর্যসত্য উপলব্ধি করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই চারটি আর্যসত্য হল –

  • [i] এই জগৎ দুঃখময়,
  • [ii] দুঃখের কারণ আছে,
  • [iii] দুঃখ নিবারণ সম্ভব এবং
  • [iv] দুঃখ নিবারণের উপায় বা মার্গ আছে।

এই চারটি বিষয় বৌদ্ধ ধর্মে আর্যসত্য নামে পরিচিত।

(খ) মঝ্ঝিম পন্থা :-

গৌতম বুদ্ধের মতে, অতিরিক্ত ভোগবিলাস বা চরম কৃচ্ছ্রসাধন কোনোটিই নির্বাণ বা মোক্ষ লাভের সঠিক পথ নয়। নির্বাণ লাভের জন্য এই দুইয়ের মধ্যবর্তী মধ্যপন্থার (মঝ্ঝিম পন্থা) কথা বলেছেন।

(গ) অষ্টাঙ্গিক মার্গ :-

দুঃখের অবসান ও মঝ্ঝিম পন্থা অনুসরণের জন্য বুদ্ধদেব আটটি নীতি বা আদর্শ পালনের কথা বলেছেন। ছই আটটি পথ হল – সৎবাক্য, সৎকর্ম, সৎসংকল্প, সৎচেষ্টা, সৎজীবিকা, সৎচিন্তা, সৎদৃষ্টি ও সৎসমাধি। এই আটটি পথ বৌদ্ধ ধর্মে অষ্টাঙ্গিক মার্গ নামে পরিচিত। সৎ পথে থেকে অহিংসার মাধ্যমে সত্যকে উপলব্ধি করাই ছিল অষ্টাঙ্গিক মার্গের মূল লক্ষ্য। সামাজিক সংঘাত বর্জন করে শান্তির বাতাবরণ তৈরি করার উদ্দেশ্যে বুদ্ধদেব এই মার্গ অনুশীলনের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।

এই অষ্টাঙ্গিক মার্গের সঙ্গে তিনটি বিষয় গভীরভাবে জড়িত। এগুলি হল – শীল, চিত্ত ও প্রজ্ঞা। ‘শীল’ হল নৈতিক শুদ্ধতা, ‘চিত্ত’ হল ধ্যানের দ্বারা মনের সংযম আর ‘প্রজ্ঞা’ হল পরম জ্ঞান। ত্রিপিটকে ‘শীল’, ‘চিত্ত’ ও ‘প্রজ্ঞা’ এই তিনটি বিষয়ের অনুশীলনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

(ঘ) পঞ্চশীল :-

গৌতম বুদ্ধ তাঁর অনুগামীদের পাঁচটি নৈতিক আচরণবিধি বা শীল পালনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এই পাঁচটি শীল হল – সুরা পান না করা, ব্যভিচারী না হওয়া, মিথ্যা কথা না বলা, পর দ্রব্যে লোভ না করা এবং হিংসা না করা। এই নীতিগুলি বৌদ্ধধর্মে ‘পঞ্চশীল’ নামে পরিচিত।

(ঙ) বৌদ্ধসংঘ :-

নিজের ধর্ম সুপ্রতিষ্ঠিত করতে গৌতম বুদ্ধ সংঘ ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। সংঘ হল ত্রিরত্ন (বুদ্ধ, ধর্ম, সংঘ) এর একটি রত্ন। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সংঘের সদস্য হতে পারতেন। সংঘের প্রতিটি সদস্যকে কয়েকটি নিয়ম মেনে চলতে হত। যেমন – মস্তক মুণ্ডন, হলুদ বস্ত্র ও উত্তরীয় পরিধান, সংঘের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ভিক্ষুদের শ্রদ্ধাশীল থাকা, সংঘের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সকলের শপথ গ্রহণ করা –

“वुद्धं शरणं गच्छामि

धर्मं शरणं गच्छामि

संघं शरणं गच्छामि।”

সংঘের বাণী

(চ) ত্রিরত্ন :-

বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘকে বৌদ্ধ ধর্মে ত্রিরত্ন আখ্যা দেওয়া হয়।

(ছ) নির্বাণ :-

বৌদ্ধ ধর্মে চূড়ান্ত পরিণতি হল নির্বাণ।

পূর্ব জন্মের কৃতকর্মের ফল ভোগ করার জন্য মানুষ বারবার জন্মলাভ করে।

বুদ্ধদেবের মতে অষ্টাঙ্গিক মার্গ অনুশীলন করলে জন্মমৃত্যুর কালচক্র থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

জন্মমৃত্যুর কালচক্র ও দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তি লাভ করাই হল নির্বাণ।

গৌতম বুদ্ধ প্রবর্তিত বৌদ্ধ সংগীতি :-

বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এবং অন্যান্য তথ্য থেকে জানা যায় যে, প্রাচীন ভারতে চারটি বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

(ক) প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি বা বৌদ্ধ সম্মেলন :-

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তার অনুগামীরা সমবেত হয়ে প্রথম বৌদ্ধ সম্মেলন আয়োজন করেন। সম্রাট অজাতশত্রুর রাজত্বকালে রাজগৃহে ৪৮৩ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন মহাকাশ্যপ। এই সম্মেলনের সিদ্ধান্ত অনুসারে গৌতম বুদ্ধের বাণী ও আদর্শ নিয়ে রচিত হয় বিনয় পিটক ও সুত্ত পিটক।

(খ) দ্বিতীয় বৌদ্ধ সংগীতি বা বৌদ্ধ সম্মেলন :-

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর একশ বছর পর সম্রাট কালাশোকের রাজত্বকালে আনুমানিক ৩৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বৈশালীতে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন আয়োজিত হয়। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন সাবাকামি।

(গ) তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি বা বৌদ্ধ সম্মেলন :-

মৌর্য  যুগের শ্রেষ্ঠ সম্রাট অশোক -এর সময়ে ২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাটলিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা যায়। এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন বিখ্যাত বৌদ্ধ সন্ন্যাসী উপগুপ্ত। এই সম্মেলনের ফলে অভিধর্ম পিটক সংকলিত হয়।

(ঘ) চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতি বা বৌদ্ধ সম্মেলন :-

চতুর্থ তথা শেষ বৌদ্ধ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ৭২ খ্রিস্টাব্দে কণিষ্কের আমলে কাশ্মীরে (মতান্তরে জলন্ধর)। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন বসুমিত্র। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের অনুগামীরা বিভিন্ন বিষয়ে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ ধর্ম হীনযান ও মহাযান দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়।

বৌদ্ধ ধর্মের বিস্তার :-

গৌতম বুদ্ধের দেহত্যাগের পর ভারতে ও ভারতের বাইরে মধ্য এশিয়া, সুদূর প্রাচ্যে ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বৌদ্ধ ধর্ম ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে একই সময়ে চীনে কনফুসিয়াস, পারস্যে জরাথুস্ট্র, ভারতে মহাবীর ও গৌতম বুদ্ধের আবির্ভাব ঘটেছিল। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্মের মতো অন্য কোন ধর্ম এত বিস্তার লাভ করে নি। এই কারণে ভারত ইতিহাসবিদ ব্যাসাম বুদ্ধকে কালের শ্রেষ্ঠ সন্তান বলে উল্লেখ করেছেন এবং বৌদ্ধ ধর্মকে বিশ্বধর্ম বলে অভিহিত করেছেন। আবার ইতিহাসবিদ কৌশাম্বী বুদ্ধকে বিদেশীদের কাছে ভারতের শ্রেষ্ঠ দান বলে চিহ্নিত করেছেন। বর্তমান কালেও চীন, জার্মান, কোরিয়া, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কার বহু মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী।

সম্রাট অশোকের উদ্যোগে বৌদ্ধ ধর্ম বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে পেরেছিল। অশোকের পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রা সিংহলে অর্থাৎ বর্তমান শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কুষাণ রাজত্বকালে মধ্য এশিয়া থেকে বৌদ্ধ ধর্ম ক্রমে চীনে প্রসারিত হয়। পরবর্তীতে চীন থেকে এই ধর্ম জাপান ও কোরিয়ায় প্রসারিত হয়। এই ভাবে ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্ম ক্রমশ বিশ্বধর্মে পরিনত হয়।

বৌদ্ধ ধর্মের পতন :-

খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে প্রচারিত হয়ে বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করলেও দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের ঘটেছিল। বৌদ্ধ ধর্মের অবলুপ্তির একাধিক কারণ উল্লেখ করা যায় –

(ক) রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতার অভাব :-

প্রথম দিকে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করার কারণে এই ধর্ম দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিল। কিন্তু মৌর্য পরবর্তী যুগে বৌদ্ধ ধর্ম রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে। সম্রাট কণিষ্ক ও হর্ষবর্ধন ছাড়া আর কোন সম্রাট এই ধর্মের প্রতি তেমন আকৃষ্ট হননি।

(খ) বৌদ্ধ ধর্মে কুসংস্কার প্রবেশ :-

ব্রাহ্মণ্য ধর্মের কুসংস্কারের প্রতিবাদে বৌদ্ধ ধর্মের উৎপত্তি ঘটেছিল। কিন্তু পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে বহু কুসংস্কার প্রবেশ করেছিল। তাছাড়া ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি গুপ্ত রাজাদের অনুরাগ ও শঙ্করাচার্য, কুমারিলভট্ট প্রমুখ বিশিষ্ট হিন্দু সংস্কারকদের বৌদ্ধ ধর্ম বিরোধী আন্দোলনের প্রভাবে এই ধর্ম ক্রমশ দূর্বল হয়ে পড়ে।

(গ) মহাযান মতের উদ্ভব :-

বৌদ্ধ ধর্ম মহাযান মতের উদ্ভব ও মূর্তিপূজার প্রচলন ঘটলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে ব্যবধান অনেক কমে যায়। হিন্দুরা বুদ্ধকে দশম অবতারের অন্তর্ভুক্ত করলে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের পার্থক্য কমে যায়।

(ঘ) মতবিরোধ :-  

গৌতম বুদ্ধের দেহত্যাগের পর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের পরস্পরের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয় যা বৌদ্ধ ধর্মের ঐক্যকে বিনষ্ট করে।

(ঙ) দুর্নীতি :-

কালক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যে নানা দূর্নীতি ও অনাচার প্রবেশ করে। এর ফলে জনগণের মধ্যে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি প্রতিকূল মনোভাব তৈরি হয়। বৌদ্ধ সংঘ গুলিতে অযাচিত ব্যক্তিদের আগমন ঘটে এবং অর্থের প্রাচুর্যের ফলে ভিক্ষুরা আরামপ্রিয় ও বিলাসী হয়ে পড়ে। মঠে সন্ন্যাসিনীদের প্রবেশাধিকার থাকার কারণে ভিক্ষুদের নৈতিক অধঃপতনও শুরু হয়। এইসব কারণে বৌদ্ধ ধর্মের মূল ভিত্তি নষ্ট হয়ে পড়ে।

(চ) বিদেশী আক্রমণ :-

খ্রীষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে তুর্কিরা ভারত আক্রমণ করে বৌদ্ধ মঠগুলির ধ্বংসসাধন করে। তারা বহু বৌদ্ধকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করলে ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতন ঘটে।

অবশ্য আজও সিংহল, চীন, জাপান, ব্রহ্মদেশ প্রভৃতি দেশে বৌদ্ধ ধর্ম তার অস্তিত্ব নিয়ে টিকে আছে।

বৌদ্ধধর্মের প্রভাব :-

ভারত তথা বিশ্বের কাছে বৌদ্ধ ধর্ম এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বৌদ্ধধর্মের প্রভাব বা গুরুত্ব সম্পর্কে নিম্নলিখিত ভাবে আলোচনা করা যেতে পারে। –

(ক) ধর্মবিপ্লব :-

বৈদিক ধর্মের বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বৌদ্ধধর্ম প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় ক্ষেত্রে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল তাকে ধর্মবিপ্লব আখ্যা দেওয়া যেতেই পারে।

(খ) বিশ্বব্যাপী প্রসার :-

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রসারিত হয়। সম্রাট অশোকের প্রচেষ্টায় বৌদ্ধ ধর্ম ভারতের বাইরে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত হয় এবং প্রকৃত অর্থেই তা বিশ্বধর্মে পরিণত হয়।

(গ) সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে প্রভাব :-

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণানের মতে গৌতম বুদ্ধ তাঁর ধর্মে পাশ্চাত্যের যুক্তিবাদের সঙ্গে প্রাচ্যের আধ্যাত্মবাদের সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। প্রাচীন ভারতের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব যে অপরিসীম এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

(ঘ) হিন্দুধর্মের নৈকট্য :-

গৌতম বুদ্ধের ধর্মমতে হিন্দু ধর্মের অনেক বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়।সেই কারণে ঐতিহাসিক ড. রোমিলা থাপার বৌদ্ধধর্মকে ‘হিন্দু ধর্মের একটি সংস্করণ বলে মনে করেন।

উপসংহার :-

যিনি সব সময় অহিংসার কথা বলে গেছেন, মানুষকে ত্যাগের শিক্ষা দিয়েছেন জীবনভর। তিনি গৌতম বুদ্ধ। তিনি ছিলেন একজন তপস্বী ও জ্ঞানী, যাঁর শিক্ষার ভিত্তিতে বৌদ্ধধর্ম প্রবর্তিত হয়। আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে এও শোনা যায় যে, গৌতম বুদ্ধ বর্তমান ভারতের কাশী বা বারানসীতে এসে বিশ্বনাথ মন্দিরের নিকট ঈশ্বর সাধনার জন্য কঠিন তপস্যায় মগ্ন হন।

গৌতম বুদ্ধের অহিংসা নীতি

শাক্য মুনি গৌতম বুদ্ধ হতে জিজ্ঞাস্য (FAQ) ?

গৌতম বুদ্ধের স্ত্রী ও পুত্রের নাম কী ?

স্ত্রীর নাম – যশোধরা ও পুত্রের নাম – রাহুল ।

গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থানের নাম কী ?

নেপালের রুম্মিনদেহি জেলার লুম্বিনি বাগানে ।

এই Post টি পাঠ করার জন্য আপনাকে আধুনিক ইতিহাস Website – এর পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Translate »