ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ

ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ -এর জন্ম, পিতা মাতার নাম , সর্বপল্লী নামের ব্যবহার, ড. রাধাকৃষ্ণণ শিক্ষা দর্শন , আদর্শ, কর্মজীবন, রাজনীতিতে যোগদান, ইউনেস্কোর ভারতীয় দূত, সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের দূত, গণপরিষদের সদস্য, রাষ্ট্রপতি মেয়াদকালে যুদ্ধ, শিক্ষায় অবদান, শিক্ষক দিবস, যদুনাথ সিংহের সাথে মোকদ্দমা, গ্ৰন্থ রচনা, পুরস্কার ও সম্মাননা এবং তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ জীবনী

জন্ম৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দ
পিতা ও মাতার নাম সর্বপল্লী বীরাস্বামী / সিতাম্মা
উপরাষ্ট্রপতি১৯৫২-৬২ খ্রিস্টাব্দ
রাষ্ট্রপতি১৯৬২-৬৭ খ্রিস্টাব্দ
মৃত্যু১৭ এপ্রিল, ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দ
ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ

ভূমিকা :- স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি এবং দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক, মহান দার্শনিক এবং হিন্দু চিন্তাবিদ।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্ম

১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ ই সেপ্টেম্বর তামিলনাডুর তিরুট্টানিতে এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ জন্মগ্রহণ করেন।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের পিতা ও মাতার নাম

তাঁর  পিতা সর্বপল্লী বীরাস্বামী একজন পণ্ডিত ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং রাজস্ব বিভাগে কাজ করতেন। তাঁর মাতার নাম সিতাম্মা।

সর্বপল্লী নামের ব্যবহার

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের পূর্বপুরুষরা সর্বপল্লী নামে একটি শহরে বাস করতেন, তাই রাধাকৃষ্ণণের পরিবারের সমস্ত সদস্য তাদের নামের সামনে সর্বপল্লী নামটি ব্যবহার করতেন।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের শিক্ষা

ছাত্রজীবনে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ অতি মেধাবী ছিলেন। জীবনে কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি। বিভিন্ন বৃত্তির মাধ্যমে তার ছাত্র জীবন এগিয়ে চলে। ১৯০৫ সালে তিনি মাদ্রাজ খ্রিস্টান কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের আদর্শ

ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ তার জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ এবং বীর সাভারকরকে তার আদর্শ বলে মনে করতেন।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের কর্মজীবন

  • (১) প্রথম জীবনে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ মাইসোর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করেন (১৯১৮)। এই সময় তিনি বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য পত্রিকায় লিখতেন।
  • (২) এই সময়েই ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ লেখেন তার প্রথম গ্রন্থ ‘The Philosophy of Rabindranath Tagore’ বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর -এর দর্শন।
  • (৩) ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও অধ্যাপনা করেন। দেশ–বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বারবার অধ্যাপনার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন।
  • (৪) অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয় এবং বারাণসী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের ভূমিকাও পালন করেছেন তিনি।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের রাজনৈতিক জীবন

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের রাজনীতিতে যোগদান

১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার পর ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ পন্ডিত জওহরলাল নেহরুর কৃতিত্বে রাজনীতিতে যোগদান করেন।

ইউনেস্কোর ভারতীয় দূত

১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কোর ভারতের দূত হয়েছিলেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ।

সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের দূত

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ সোভিয়েত ইউনিয়নে ভারতের দূত হন।

গণপরিষদের সদস্য

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ১৯৪৭থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত গণপরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি

একজন আদর্শ শিক্ষক ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ স্বাধীন ভারতের প্রথম উপরাষ্ট্রপতি ছিলেন। তার কার্যকালের মেয়াদ ছিল ১৯৫২-১৯৬২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।

ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ছিলেন স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি। তাঁর কার্যকালের মেয়াদ ছিল ১৯৬২-৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।তাঁর পূর্বে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের রাষ্ট্রপতি ছিলেন।

রাষ্ট্রপতি মেয়াদ কালে যুদ্ধ

তার রাষ্ট্রপতির মেয়াদকালে দুটি যুদ্ধে যেতে হয় ভারতকে। প্রথমটি ছিল ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে চিনের সঙ্গে যুদ্ধ। রাষ্ট্রপতির আসনে বসার কয়েক মাসের মধ্যেই সেই যুদ্ধ। দ্বিতীয়টি ছিল ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের শিক্ষায় অবদান

নিজের সমস্ত জীবন শিক্ষার জন্য, প্রগতির জন্য, মানবকল্যাণের কাজে নিবেদন করেন ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। তাই জাতীয় শিক্ষক সংস্থা তাঁর জন্মদিনটি সারাদেশ জুড়ে পালন করার জন্য উদ্যোগী হয়।

শিক্ষক দিবস

রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর তার গুণমুগ্ধ ছাত্র ও বন্ধুরা তাঁর জন্মদিন পালন করতে চাইলে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ বলেন ‘জন্মদিনের পরিবর্তে ৫ই সেপ্টেম্বর যদি শিক্ষক দিবস উদ্‌যাপিত হয় তবে আমি বিশেষরূপে অনুগ্রহ লাভ করবো।’

প্রথম শিক্ষক দিবস পালন

১৯৬২ সালে প্রথম বার ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিন শিক্ষক দিবস হিসেবে পালিত হয়েছিল।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের অমূল্য বাণী

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ছাত্র সমাজ ও বর্তমান সমাজের উদ্দেশ্যে কিছু উক্তি প্রদান করেছেন যা সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের বাণী নামে পরিচিত। বাণীগুলি হল-

  • (১) “বইয়ের তাৎপর্য হল আমাদের সংস্কৃতির মধ্যে সেতু নির্মাণ করা।”
  • (২) “জীবনের আনন্দ এবং সুখ শুধুমাত্র জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ভিত্তিতে সম্ভব।”
  • (৩) আমাদের দেশের বেকারত্বের একটি অন্যতম কারণ হলো কৃষিকাজে ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিজ্ঞানকে প্রয়োগ না করা।
  • (৪) ধন সম্পদ ব্যক্তিকে পরিপূর্ণতা দেয় না। আত্মিক উন্নতির মাধ্যমে ব্যক্তি পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে।

যদুনাথ সিংহের সঙ্গে ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের মোকদ্দমা

  • (১) ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে অধ্যাপক যদুনাথ সিংহ ভারতের সারস্বত সমাজকে নাড়িয়ে দিয়ে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের বিরুদ্ধে থিসিস চুরির অভিযোগে কলকাতা উচ্চ আদালতে মামলা করেন।
  • (২) যদুনাথ সিংহ প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ বৃত্তির জন্য যে গবেষণা পত্রটি ইন্ডিয়ান সাইকলজি অব পারসেপশন প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড জমা দিয়েছিলেন, সেই গবেষণাপত্র থেকে ব্যাপকভাবে টুকে ধরা পড়েছিলেন সর্বপল্লী সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ।
  • (৩) ১৯২৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের সাড়া জাগানো বই “ইন্ডিয়ান ফিলজফি“র দ্বিতীয় খণ্ড, যা ছিল ডঃ যদুনাথ সিংহের গবেষণাপত্রটির পুনর্মুদ্রণ।
  • (৪) ডঃ সিংহ এই চুরির বিষয়টি জানতে পারেন যখন ১৯২৮ সালে সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের দ্য বেদান্ত অ্যাকর্ডিং টু শংকর অ্যান্ড রামানুজ নামে আরো একটি বই প্রকাশিত হয়। এই বইটি ছিল সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের ইন্ডিয়ান ফিলজফি দ্বিতীয় খণ্ডের অষ্টম এবং নবম অধ্যায়ের একটি স্বতন্ত্র পুনর্মুদ্রণ।
  • (৫) এই বইটি থেকেই যদুনাথ সিংহ সবিস্ময়ে জানতে পারেন যে তার গবেষণার প্রথম দুটি অধ্যায় থেকে অনেক অনুচ্ছেদ খ্যাতনামা অধ্যাপক সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ চুরি করেন।
  • (৬) ডঃ সিংহ মর্ডান রিভিউ পত্রিকায় রাধাকৃষ্ণনের এই চৌর্যবৃত্তির ইতিবৃত্ত তুলনামূলক ভাবে প্রকাশ করেন। সিংহপুরুষ যদুনাথ সিংহ মরিসন রিভিউ পত্রিকার মাধম্যে ও কলকাতা হাইকোর্টে মামলা করে রাধাকৃষ্ণনের মতো মহান মানুষের প্রকৃত মুখোশ খুলে দেন।
  • (৭) কলকাতা হাইকোর্ট এই মামলাটির রায় না বের করেই মামলার স্থগিতাদেশ দিয়ে দেন। কিন্তু ডঃ সিংহ মানুষদের জানিয়ে দিয়েছিলেন রাধাকৃষ্ণনের চৌর্যবৃত্তির কথা।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের গ্ৰন্থ রচনা

সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ বেশ কিছু গ্ৰন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্ৰন্থ হল – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দর্শন (1918), ভারতীয় দর্শন (1923), দ্য হিন্দু ভিউ অফ লাইফ (1927), জীবনের আদর্শবাদী দৃষ্টিভঙ্গি (1929), গৌতম বুদ্ধ (1938), ধর্ম এবং সমাজ (1947), ভগবদ্গীতা, রিকভারি অফ ফেইথ (1956), ধর্ম, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি (1968)।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের পুরস্কার এবং সম্মাননা

তিনি সারা জীবনে বেশ কিছু পুরস্কার ও সম্মান অর্জন করেন। যেমন –

  • (১) ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে নাইট উপাধিতে ভূষিত হন।
  • (২) ১৯৩৩-৩৭ খ্রিস্টাব্দে পাঁচবার সাহিত্য বিভাগে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।
  • (৩) ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ একাডেমীর ফেলো হিসেবে মনোনীত হন।
  • (৪) ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে ভারত রত্ন উপাধিতে ভূষিত হন।
  • (৫) ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির কলা ও বিজ্ঞান বিভাগের সাম্মানিক পুরস্কার লাভ করেন।
  • (৬) ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে German Book Trade প্রদত্ত শান্তি পুরস্কার অর্জন করেন।
  • (৭) ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে রাধাকৃষ্ণানকে সম্মান জানানোর জন্য ভারতবাসী ১৯৬২ সাল থেকে শিক্ষক দিবস পালন করা শুরু করে।
  • (৮) ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনের Order of Merit উপাধি লাভ করেন।
  • (৯) ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার অর্জন করেন।
  • (১০) ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর কিছুদিন আগে Templeton Prize লাভ করেন।

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের মৃত্যু

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ দীর্ঘকালীন অসুস্থতার পর ১৯৭৫ সালের ১৭ এপ্রিল চেন্নাইতে মারা যান।

উপসংহার :- ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ তাঁর কর্মের মধ্য দিয়ে অমর হয়ে থাকবেন প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে।তাঁর শিক্ষা, তাঁর  দর্শন আবাল বৃদ্ধ বণিতা সকল ভারতবাসীর জীবনচলার পাথেয়, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরো সমৃদ্ধ করবে ও আলোর পথ দেখাবে।

(FAQ) ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শিক্ষক দিবস কবে পালন করা হয়?

৫ই সেপ্টেম্বর।

২. প্রতি বছর ৫ই সেপ্টেম্বর কেন শিক্ষক দিবস পালন করা হয়?

ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ১৮৮৮ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য প্রতি বছর ৫ই সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবস হিসাবে পালন করা হয়।

৩. ভারতবর্ষে কোন সাল থেকে শিক্ষক দিবস পালন করা শুরু হয়?

১৯৬২ সাল।

৪. কত সালে ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ব্রিটিশ নাইটহুড এ সম্মানিত হন?

১৯৩১ সালে।

৫. কত সালে ডক্টর সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ ভারতরত্নে ভূষিত হন?

১৯৫৪ সালে।

Leave a Reply

Translate »