রাষ্ট্রপতি

ভারতের রাষ্ট্রপতি -র নির্বাচন, নাম সর্বস্ব প্রধান, মেয়াদকাল, শপথগ্রহণ, রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট, প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি, প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি, শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা, আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা, নিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষমতা, অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা, বিচার-সংক্রান্ত ক্ষমতা, জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা, সামরিক ক্ষমতা, কূটনৈতিক ক্ষমতা, ভেটো ক্ষমতা, বিশেষ সুবিধা লাভ ও তার পদমর্যাদা সম্পর্কে জানবো।

রাষ্ট্রপতি

বাসভবনরাষ্ট্রপতি ভবন
মনোনয়নদাতাইউপিএ
মেয়াদকালপাঁচ বছর, পুনর্নির্বাচনযোগ্য
সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতিড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ)
রাষ্ট্রপতি

ভূমিকা :- ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপ্রধান হলেন ভারতের রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি ভারতের আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগের সকল শাখার আনুষ্ঠানিক প্রধান এবং ভারতের সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক।

নির্বাচন

রাষ্ট্রপতি এক নির্বাচকমণ্ডলীর দ্বারা পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন। এই নির্বাচকমণ্ডলী গঠিত হয় ভারতীয় সংসদ (লোকসভারাজ্যসভা) এবং বিভিন্ন রাজ্যের বিধানসভার সদস্যদের নিয়ে।

সংবিধানে উল্লেখ

ভারতীয় সংবিধান -এর ৫৩ ধারায় বলা হয়েছে যে, রাষ্ট্রপতি তার ক্ষমতা সরাসরি প্রয়োগ করতে পারেন। তা সত্ত্বেও কয়েকটি ব্যতিক্রমী ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতাই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিপরিষদের কর্তৃত্বাধীন।

নাম সর্বস্ব প্রধান

বাস্তবে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা রাষ্ট্রপতির নামে শাসনকার্য পরিচালনা করে। প্রধানমন্ত্রী হলেন ভারতের প্রকৃত শাসক এবং স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রপতি হলেন ভারতের নিয়মতান্ত্রিক বা নামসর্বস্ব প্রধান।

রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ

রাষ্ট্রপতি তার পদে প্রবেশ করার তারিখ থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদের জন্য পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।

শপথ গ্রহণ

সুপ্রিম কোর্ট -এর প্রধান বিচারপতি ভারতের রাষ্ট্রপতিকে শপথ বাক্য পাঠ করান।

রাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট

  • (১) ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে কমনওয়েলথ অফ নেশনস-এর অধিভুক্ত একটি অধিরাজ্য বা ডোমিনিয়নে পরিণত হয়। যদিও ভারতের ডোমিনিয়ন মর্যাদা ছিল সাময়িক।
  • (২) ভারতে ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রতিনিধি ছিলেন গভর্নর-জেনারেল। এই পদে প্রথম নিযুক্ত হন লুই মাউন্টব্যাটেন। তিনিই ছিলেন ভারতের শেষ ব্রিটিশ ভাইসরয়।
  • (৩) কিছুদিন পর মাউন্টব্যাটেনের স্থলাভিষিক্ত হন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী। তিনিই একমাত্র ভারতীয় যিনি ভারতে ব্রিটিশ গভর্নর-জেনারেলের পদ অলংকৃত করেছিলেন।
  • (৪) এরপর স্বাধীন ভারতের সংবিধান রচনার জন্য ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের নেতৃত্বে গঠিত হয় ভারতীয় গণপরিষদ।
  • (৫) ভারতের সংবিধান সাক্ষরিত ও গৃহীত হয় ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর। এই সংবিধান কার্যকর হয় ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি।
  • (৬) নতুন সংবিধানে ভারতকে একটি প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয় এবং গভর্নর-জেনারেলের পদ ও রাজার ক্ষমতা অবলুপ্ত করা হয়। পরিবর্তে একটি নতুন রাষ্ট্রপতির পদ চালু করা হয়। ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হন।

দণ্ড সংক্রান্ত অধিকার

ভারতের রাষ্ট্রপতির দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডাদেশ স্থগিত, হ্রাস বা দণ্ডিতকে ক্ষমা করার অধিকার রয়েছে।

প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি

২৫ জুলাই, ২০০৭ সালে প্রতিভা দেবী সিংহ পাতিল ভারতের দ্বাদশ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনিই দেশের প্রথম মহিলা রাষ্ট্রপতি।

প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি

১৯ জুলাই, ২০১২ সালে ভারতের ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়লাভের মাধ্যমে প্রণব মুখোপাধ্যায় ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও কার্যাবলী

সংবিধান অনুসারে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রভূত ক্ষমতার অধিকারী । তাঁর হাতে যে সকল ক্ষমতা ন্যস্ত আছে সেগুলি হল –

(১) শাসন সংক্রান্ত ক্ষমতা

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের শাসন সংক্রান্ত সকল কাজই রাষ্টপতির নামে সম্পাদিত হয়। ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন দেশের সর্বোচ্চ শাসন বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ। তিনি নিজে বা তাঁর অধীনস্থ কর্মচারীদের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন।

(২) নিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষমতা

রাষ্টপতির নিয়োগ সংক্রান্ত ও ব্যাপক ক্ষমতা আছে প্রধানমন্ত্রীসহ কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সকল সদস্য এবং সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী গণও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হন।

(৩) আইন সংক্রান্ত ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতি পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের অধিবেশন আহ্বান করতে কিংবা অধিবেশন স্থগিত এবং প্রয়োজনবোধে লোকসভা ভেঙে দিতে পারেন। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর ছাড়া কোনো বিল আইনে পরিণত হয় না। পার্লামেন্টের উভয় কক্ষের পাশ হওয়ার পর প্রত্যেকটি বিলকে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর এর জন্য পাঠাতে হয় । রাষ্ট্রপতি তাতে সম্মতি দিতেও পারেন আবার নাও দিতে পারেন।

(৪) অর্থ সংক্রান্ত ক্ষমতা

সংবিধান অনুসারে প্রত্যেক আর্থিক বছরের জন্য রাষ্ট্রপতিকে আনুমানিক আয়-ব্যয়ের বাজেট পার্লামেন্টে পেশ করতে হয়। সাধারণত কেন্দ্রের অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির পক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের বাজেট পার্লামেন্টে পেশ করেন। রাষ্ট্রপতির সম্মতি ছাড়া কোনো ব্যয় মঞ্জুরী পার্লামেন্টে উত্থাপন করা যায় না ।

(৫) বিচার বিষয়ক ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতির কিছু বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা আছে।  তিনি সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট -এর বিচারপতিদের নিযুক্ত করেন। ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তির দণ্ডাদেশ স্থগিত রাখতে, হ্রাস ও ক্ষমা প্রদর্শন করতে পারেন। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড রদ করেদিতে পারেন।

(৬) জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতির কতগুলি জরুরি অবস্থা সংক্রান্ত ক্ষমতা রয়েছে। এই জরুরি অবস্থাকে দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবিলা করার জন্য  ভারতীয় সংবিধানে  রাষ্ট্রপতিকে তিন ধরনের জরুরি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এগুলি হল – জাতীয় জরুরি অবস্থা, রাজ্য শাসনতান্ত্রিক অচলাবস্থা, আর্থিক জরুরি অবস্থা।

(৭) সামরিক ক্ষমতা

রাষ্ট্রপতি হলেন ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তিনি স্থলবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানদের নিয়োগ করেন। জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিটির প্রধান হিসেবে তাঁকে কার্য সম্পাদন করতে হয়। ওই কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে তিনি যুদ্ধ ঘোষণা কিংবা শান্তি স্থাপন করতে পারেন।

(৮) কূটনৈতিকগতভাবে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা

সমস্ত আন্তর্জাতিক সন্ধি ও চুক্তি রাষ্ট্রপতির নামেই সম্পাদিত হয়। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তিনিই ভারতীয় কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের পাঠান। আবার বিদেশি প্রতিনিধি বা রাষ্ট্রদূত যখন ভারতে আসেন তখন তারা ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সর্বপ্রথম শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

(৯) ভেটো ক্ষমতা

সাংবিধানিকভাবে ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি কয়েকটি ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী। যেমন –

  • (ক) চরম ভেটো :- রাষ্ট্রপতি যে কোনো বিলে সম্মতি প্রদান বা স্বাক্ষর না-ও করতে পারেন যা চরম ভেটো হিসেবে পরিচিত।
  • (খ) ভেটো প্রয়োগের ফলে তিনি বিলকে পুনরায় সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। এটি স্থগিতকারী ভেটো। এই ভেটোকে পাশ কাটানোর জন্যে সংসদে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে উতরানো সম্ভব।
  • (গ) রাষ্ট্রপতি কখনো কখনো অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিলের উপর কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা পকেট ভেটো নামে পরিচিত।

(১০) অন্যান্য ক্ষমতা

উপরোক্ত কার্যাবলী ছাড়াও রাষ্ট্রপতিকে অন্যান্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্য সম্পাদন করতে হয়। যথা –

  • (ক) অর্থ কমিশন, সরকারি ভাষা কমিশন প্রভৃতির মত কমিশন নিয়োগ করা।
  • (খ) পার্লামেন্টের সংশোধনী ক্ষমতার অধীনে থেকে যে কোনো অঞ্চলকে তপশিলি অঞ্চল কিংবা কোনো তপশিলি অঞ্চলকে অ-তপশিলি অঞ্চল বলে ঘোষণা করা।
  • (গ) যে কোনো তপশিলি অঞ্চলের সীমানা পরিবর্তন করা।
  • (ঘ) যে রাজ্যে তপশিলি অঞ্চল আছে সেই রাজ্যে একটি উপজাতি পরিষদ গঠনের জন্য নির্দেশ দেওয়া।
  • (ঙ) জনস্বার্থের দিক থেকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কোনো আইনগত বিষয় সুপ্রিমকোর্টের পরামর্শ গ্রহণ করা।

রাষ্ট্রপতির বিশেষ সুবিধা

ভারতের রাষ্ট্রপতি বিশেষ কিছু সুবিধা ভোগ করেন। যেমন –

  • (১) রাষ্ট্রপতি তার কার্য সম্পাদনের জন্য কোনো আদালতের কাছে জবাবদিহি করতে পারেন না।
  • (২) রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতার করা যাবে না বা তার মেয়াদকালে কোনো আদালতে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা দায়ের করা যাবে না।
  • (৩) রাষ্ট্রপতিকে তার মেয়াদকালে কোনো আদালতে উপস্থিত থাকতে বলা যাবে না।

পদমর্যাদা

ভারতীয় সংবিধানে রাষ্ট্রপতির প্রকৃত ভূমিকা ও পদমর্যাদা সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা নেই। ডঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের সময় থেকেই রাষ্ট্রপতির প্রকৃত ভূমিকা সম্পর্কে বিতর্ক আছে। অধ্যাপক পাইলি বলেছেন যে, “পৃথিবীর অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে এত ক্ষমতা দেওয়া হয়নি যা দেওয়া হয়েছে ভারতের রাষ্ট্রপ্রধানকে”।

মন্তব্য

আমরা একথা অবশ্যই বলতে পারি যে ভারতের রাষ্ট্রপতি যদি উচ্চাকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিত্ববান ও দৃঢ়চেতা সম্পন্ন হন তাহলে তিনি অনেকটাই স্বাধীন হয়ে উঠতে পারেন। যেমন – নিলাম সঞ্জীব রেড্ডি, জৈল সিং, ডক্টর এপিজে আবদুল কালাম প্রমূখ।

উপসংহার :- পরিশেষে বলা যেতে পারে যে, ভারতের রাষ্ট্রপতি ব্রিটেনের রাজা বা রানীর মতো জাঁকজমকপূর্ণ সাক্ষীগোপাল নন । মন্ত্রিসভাকে পরামর্শ দেওয়ার, উৎসাহিত করার এবং সতর্ক করে দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।

(FAQ) রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভারতের রাষ্ট্রপতির বাসভবনের নাম কি?

রাষ্ট্রপতি ভবন।

২. রাষ্ট্রপতি হওয়ার ন্যুনতম বয়স কত?

৩৫ বছর।

৩. ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন? – ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ

ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।

Leave a Reply

Translate »