রাজেন্দ্র প্রসাদ

ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ -এর জন্ম, বংশ পরিচয়, শিক্ষা, কর্মজীবন, ডন সোসাইটির সদস্য, স্টুডেন্ট কনফারেন্সে সহায়তা, রাজনীতিতে যোগদান, লেখালেখি, সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, চম্পারণ সত্যাগ্রহে যোগদান, ওকালতি ত্যাগ, কংগ্রেসের সভাপতি পদ গ্রহণ, কারাবরণ, রচিত গ্ৰন্থ ও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

রাজেন্দ্র প্রসাদ

জন্ম৩রা ডিসেম্বর ১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দ
পিতামাতামহাদেব সহাই শ্রীবাস্তব ও কমলেশ্বরী দেবী
বিশেষ অবদানভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি
মৃত্যু২৮শে ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ
রাজেন্দ্র প্রসাদ

ভূমিকা :- রাজেন্দ্র প্রসাদ ছিলেন একাধারে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী, আইনজীবী, পণ্ডিত। তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এক অবিচ্ছেদ্য় অংশ ছিলেন।

জন্ম

১৮৮৪ খ্রিস্টাব্দের ৩ ডিসেম্বর ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ বিহারের সিওয়ানে এক কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

বংশ পরিচয়

তার পিতা মহাদেব সহাই শ্রীবাস্তব ছিলেন সংস্কৃত ও পারশিয়ান ভাষায় সুপণ্ডিত। তার মায়ের নাম কমলেশ্বরী দেবী।

শিক্ষা

  • (১) পাঁচ বছর বয়সে তাকে মৌলভির কাছে পারশিয়ান ভাষা শিক্ষার জন্যে পাঠানো হয়। ১৮৯৬ সালে ছাপড়ার স্কুলে ভর্তি হন। পরবর্তী শিক্ষা সম্পন্ন হয় পাটনায়।
  • (২) তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেন ও বৃত্তি পান।
  • (৪) ১৯০২ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন বিজ্ঞান বিভাগে এবং ১৯০৫ সালে প্রথম শ্রেনীতে উত্তীর্ণ হয়ে কলা নিয়ে পড়তে শুরু করেন।
  • (৫)  ১৯০৭ সালে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর পাশ করেন।
  • (৬) আইন পড়ার উদ্দেশ্যে শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে তিনি ১৯০৯ সালে কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ আইন কলেজ) ভর্তি হন।
  • (৭) রাজেন্দ্র প্রসাদ ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় আইনের স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় স্বর্ণপদক সহ পাশ করেছিলেন।
  • (৮) ১৯৩৭ সালে এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পি এইচ ডি ডিগ্রী অর্জন করেন।

কর্মজীবন

  • (১) রাজেন্দ্র প্রসাদ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষকতার কাজ করেছেন। বিহারের মজফফরপুরের লংগত সিং কলেজে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে প্রথমে নিযুক্ত হয়ে পরবর্তীতে প্রিন্সিপাল হন।  
  • (২) তিনি কলকাতার সিটি কলেজে অর্থনীতির অধ্যাপনাও করেন কিছুকাল।
  • (৩) ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে আইনজীবী হিসেবে ওড়িশা ও বিহার হাইকোর্ট -এ কাজ শুরু করেন। কিছুকাল ভাগলপুর আদালত ও কলকাতা উচ্চ আদালতেও তিনি কাজ করেছেন।

ডন সোসাইটির সদস্য

ছাত্র থাকাকালীন তিনি সমাজসেবামূলক অনেক কাজ করেছিলেন এবং দ্য ডন সোসাইটির সদস্য ছিলেন। সেই সময় তিনি সার্ভেন্টস অফ ইন্ডিয়া সোসাইটি থেকে ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু পারিবারিক কারণবশত তিনি সেখানে যোগ দিতে পারেন নি।

স্টুডেন্ট কনফারেন্সে সহায়তা

১৯০৬ সালে রাজেন্দ্র প্রসাদ পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিহারী স্টুডেন্ট কনফারেন্স করতে সাহায্য করেছিলেন। এই সংগঠন থেকে উঠে আসা অনেক নেতৃত্ব স্বাধীনতা সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

রাজনীতিতে প্রবেশ

১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে ছাত্রাবস্থায় কলকাতার বার্ষিক সভায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

রাহুল সাংকৃত্যায়নের সঙ্গে আলাপ

স্বদেশী আন্দোলনে যোগ দিয়ে তার সাহিত্যিক ও দার্শনিক রাহুল সাংকৃত্যায়নের সাথে আলাপ হয়। রাহুলজি তার পান্ডিত্য ও ব্যক্তিত্বের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি তার রচনায় একাধিকবার রাজেন্দ্র প্রসাদের কথা উল্লেখ করেছেন।

লেখালেখি

তিনি বহু পত্রপত্রিকায় নানান বিষয় নিয়ে লেখালেখি করতেন। এর মধ্যে অন্যতম ছিল দেশ পত্রিকা এবং সার্চলাইট পত্রিকা।

সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো

১৯১৪ সালে বিহার এবং বাংলায় যে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল তিনি সেই বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের অনেক ভাবে সাহায্য করেছিলেন। তাঁর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল বিপদে আপদে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো।

চম্পারণ সত্যাগ্রহে যোগদান

১৯১১ সালে কংগ্রেসের সদস্য হন। ১৯১৬ সালে লখনৌতে মহাত্মা গান্ধীর সংস্পর্শে এসে চম্পারনে তথ্যনুসন্ধানে যান। চম্পারণ সত্যাগ্রহ -এ তিনি সাহসিকতা ও কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

ওকালতি ত্যাগ

অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়ে আইন পেশা পরিত্যাগ করেন ও সবসময়ের জন্যে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত মানুষের সহায়তা

১৯৩৪ সালে বিহার যখন ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল তিনি সেই সময় কারাবন্দি থাকলেও তাঁর বন্ধুদের সাহায্য নিয়ে ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

কংগ্রেসের সভাপতি

  • (১) ১৯৩৪ সালে কংগ্রেসের বোম্বে অধিবেশনের সময় তাঁকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত করা হয়।
  • (২) ১৯৩৯ সালে সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর রাজেন্দ্র প্রসাদকে আবার সেই পদে মনোনীত করা হয়।
  •  (৩) ১৯৪৭ সালে তিনি আবার ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি পদে নিযুক্ত হন।

কারাবরণ

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ভারত ছাড়ো আন্দোলন -এর সময় তিনি গ্রেফতার হন। জেলে বসে রচনা করেন আত্মজীবনী আত্মকথা।

খাদ্য ও কৃষি বিভাগের দায়িত্ব

১৯৪৬ সালে জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বে যে অন্তর্বর্তী সরকার গড়ে তোলা হয়েছিল সেখানে তিনি খাদ্য এবং কৃষি বিভাগের দায়িত্ব পালন করেছেন।

নেহেরুর সাথে ঠান্ডা লড়াই

শেষজীবনে সোমনাথ মন্দির নবনির্মাণকে কেন্দ্র করে জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে তিনি ঠান্ডা লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়েন।

ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি

স্বাধীনতার আড়াই বছর পর ১৯৫০ সালে ২৬শে জানুয়ারি ভারতে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালে রাজেন্দ্ৰ প্ৰসাদকে ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়।

রচিত গ্ৰন্থ

রাজেন্দ্র প্রসাদ রচিত বিখ্যাত গ্ৰন্থ গুলি হল President of Constituent Assembly, Satyagraha at Champaran (১৯২২), India Divided (১৯৪৬), আত্মকথা (১৯৪৬) (বাঁকিপুর জেলে তিন বছর বন্দী জীবনের কথা), Mahatma Gandhi and Bihar, Some Reminiscences (১৯৪৯), বাপু কে কদমোঁ মে (১৯৫৯), Since Independence (১৯৬০), ভারতীয় শিক্ষা, At the feet of Mahatma Gandhi।

মৃত্যু

২৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ সালে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ পরলোক গমন করেন।

সম্মাননা

ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করা হয়।

স্মৃতি

তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে পাটনা শহরে রাজেন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়।

উপসংহার :- তিনি ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলেন। ভারতের সাথে অন্যান্য দেশের সুসম্পর্ক গড়ে তোলাই ছিল তাঁর সেইসব বিদেশ সফরের মূল উদ্দেশ্য। ১৯৫৭ সালে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি হিসেবে পুনরায় নির্বাচিত হন।

(FAQ) ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. স্বাধীন ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?

ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।

২. ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ কতবার জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি হয়েছিলেন?

তিনবার।

৩. গণপরিষদের প্রথম সভাপতি কে ছিলেন?

ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ।

Leave a Reply

Translate »