শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কা দেশটি প্রসঙ্গে অবস্থান, আয়তন ও জনসংখ্যা, সামুদ্রিক সীমান্ত, রাজধানী ও বৃহত্তম নগর, নামকরণ, ঐতিহাসিক দিক, ভৌগোলিক দিক, জলবায়ু, সরকার ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক দিক, সামরিক বাহিনী, যোগাযোগ, খেলাধুলা, ভাষা ও ধর্ম সম্পর্কে জানবো।

শ্রীলঙ্কা

দেশ শ্রীলঙ্কা
রাজধানী শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে
বৃহত্তম নগর কলম্বো
রাষ্ট্র ভাষা সিংহল, তামিল
রাষ্ট্রপতি রনিল বিক্রমসিংহে
প্রধানমন্ত্রী দিনেশ গুনবর্ধনে
শ্রীলঙ্কা

ভূমিকা :- দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপরাষ্ট্র হল শ্রীলঙ্কা। এর সাবেক নাম ছিল সিংহল। দেশটির দাফতরিক নাম শ্রীলঙ্কা প্রজাতান্ত্রিক সমাজবাদী জনরাজ্য।

অবস্থান

শ্রীলঙ্কা দেশটি  ভারত মহাসাগরে, বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমে ও আরব সাগরের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।

আয়তন ও জনসংখ্যা

শ্রীলঙ্কার আয়তন ৬৫ বর্গকিলোমিটারেও বেশি। দেশটির জনসংখ্যা ২ কোটিরও বেশি।

ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন

মান্নার উপসাগর ও পক প্রণালী দ্বারা ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।

সামুদ্রিক সীমান্ত

ভারত এবং মালদ্বীপের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার সামুদ্রিক সীমান্ত রয়েছে।

রাজধানী ও বৃহত্তম শহর

শ্রীলঙ্কা দেশটির বিধানিক রাজধানী শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে এবং বৃহত্তম শহর ও অর্থনৈতিক কেন্দ্র হল কলম্বো।

নামকরণ

  • (১) প্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা বহু নামে পরিচিত হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রীক ভূগোলবিদরা একে তপ্রোবান এবং আরবরা সেরেনদীব নামে ডাকত। ১৫০৫ সালে পর্তুগিজরা এই দ্বীপে পৌঁছে নাম দেয় শেইলাও, যার ইংরেজি শব্দ হল সিলন।
  • (২) ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ইংরেজদের অধীনে থাকা অবস্থায় দেশটি সিলন নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৪৮ সালে এই নামেই স্বাধীনতা পায় এবং পরে ১৯৭২ সালে দাপ্তরিক নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়, সার্বভৌম ও স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী শ্রীলঙ্কা।
  • (৩) শ্রীলঙ্কা নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ “শ্রী” ও “লংকা” থেকে। শ্রী শব্দের অর্থ পবিত্র এবং লংকা অর্থ দ্বীপ। পুরো অর্থ পবিত্র দ্বীপ।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ

শ্রীলঙ্কায় প্রাগৈতিহাসিক মানববসতির প্রমাণ রয়েছে। দেশটির একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে। শ্রীলঙ্কার প্রাচীনতম পরিচিত বৌদ্ধ রচনাবলি, যা সম্মিলিতভাবে পালি ত্রিপিটক নামে পরিচিত, চতুর্থ বৌদ্ধ সংগীতির সময় রচিত।

ঐতিহাসিক দিক

  • (১) শ্রীলঙ্কার ইতিহাস বৌদ্ধ সভ্যতার সাথে বেশ সম্পর্কযুক্ত। বৌদ্ধ ঐতিহাসিক গ্রন্থ দীপবংশ, মহাবংশের তথ্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। গৌতম বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পর ভারতীয় শাক্যজাতির বিজয়বাহু তার হাজার সৈন্য নিয়ে প্রথম এখানে এসেছিলেন বলে মনে করা হয়। জীবিত অবস্থায় বুদ্ধ শ্রীলঙ্কায় এসেছিলেন বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য থেকে প্রমান পাওয়া যায়।
  • (২) প্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা বণিকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সৈকত ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশ এখানে ব্যবসা করত।
  • (৩) ১৫০৫ সালে পর্তুগিজরা এখানে সর্বপ্রথম পৌঁছায়। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে ডাচরা আসে। ১৭৯৬ সালে এই দ্বীপটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। ১৮১৫ সালে সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (৪) ইউরোপীয় উপনিবেশ হিসেবে এখানে চা, রাবার, চিনি, কফি এবং নীলের চাষ শুরু হয়। তখন কলম্বোকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তারা আধুনিক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, রাস্তাঘাট এবং চার্চ তথা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল।
  • (৫) ১৯৩০ সালে অধিবাসীদের প্রতি ব্রিটিশদের নির্যাতন-অত্যাচারের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সিলন নামে দেশটি স্বাধীনতা পায়।

স্বাধীন শ্রীলঙ্কা

১৯৬০ সালের ২১শে জুলাই শ্রীমাভো বন্দেরনায়েক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ছিলেন পৃথিবীর প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। ১৯৭২ সালে শ্রীমাভো বন্দেরনায়েকের প্রধানমন্ত্রীত্বে সিলন থেকে শ্রীলঙ্কা নামকরণ করা হয়।

ভৌগোলিক দিক

শ্রীলঙ্কা দেশটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল। দক্ষিণ দিকের বেড়ে ওঠা পর্বতমালা ছাড়া দ্বীপটির বেশির ভাগই উপকূলীয় সমতল ভূমি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫২৪ মিটার উঁচু পেড্রুতালাগালা শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ বিন্দু। শ্রীলঙ্কায় একশোরও অধিক নদী রয়েছে। শ্রীলঙ্কার দীর্ঘতম নদী মহাবলিগঙ্গা যা ৩৩৫ কিলোমিটার বিস্তৃত।

জলবায়ু

শ্রীলঙ্কার গড় তাপমাত্রা ১৬ সেলসিয়াস। সাধারণত দক্ষিণাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় আর্দ্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে। কলম্বোর মত জায়গায় সারা বছর প্রায় ৭০% আর্দ্রতা থাকে। জুন মাসের দিকে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ৯০% পর্যন্ত আর্দ্রতা থাকে।

জীববৈচিত্র্য

  • (১) শ্রীলঙ্কা ইন্দোমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের ২৫ টি জীববৈচিত্র্য হটস্পটগুলির মধ্যে একটি। এশিয়ার সর্বোচ্চ জীববৈচিত্র্য শ্রীলঙ্কায় দেখতে পাওয়া যায়। বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণী উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায়। এখানে এশিয়ান হাতি, চিতাবাঘ, শ্লথ ভালুক, অনন্য ছোট লরিস, বিভিন্ন ধরনের হরিণ, বিপন্ন বন্য শূকর, পোর্কিউপাইনস এবং ভারতীয় বনরুই সংরক্ষণ করা হয়েছে।
  • (২) অনুর্বর জাফনা উপদ্বীপে প্রচুর পরিমাণে বাবলা গাছ জন্মায়। শুষ্ক মৃত্তিকার গাছগুলির মধ্যে সাটিনউড, আবলুস, মেহগনি এবং সেগুন অত্যন্ত মূল্যবান প্রজাতি। আর্দ্র অঞ্চলে গ্রীষ্মমন্ডলীয় চিরহরিৎ বন সৃষ্টি হয়েছে। এখানে লম্বা গাছ, প্রশস্ত বৃক্ষপত্রাবলী, আঙ্গুর ও শাক লতাগুল্মের ঘন জঙ্গল দেখা যায়।

সরকার ব্যবস্থা

সংবিধান অনুযায়ী শ্রীলঙ্কা দেশটি গণতান্ত্রিক, সামজতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত। দেশটির সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সংসদীয় ও রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার সমন্বয়ে। দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক বাহিনীর প্রধান প্রশাসক ও সরকার প্রধান শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি।

অর্থনৈতিক দিক

চিনামন, রাবার, সিলন চা রপ্তানির জন্য শ্রীলঙ্কা দেশটি বিখ্যাত। ব্রিটিশ শাসনের সময় স্থাপিত আধুনিক সমুদ্রবন্দর এই দেশটিকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। চা, কফি, চিনি, রাবার এবং অন্যান্য কৃষি পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে দেশটি বেশ উন্নত। তাই সরকারীভাবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরন, বস্ত্রশিল্প, টেলিযোগাযোগ এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয়।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক

শ্রীলঙ্কা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেমন তৎপর নয়। এই দেশ জাতিসংঘের সাথে যুক্ত। কমনওয়েলথ,সার্ক, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন তহবিল, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক এবং কলম্বো পরিকল্পনার সদস্য দেশ শ্রীলঙ্কা। বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থায় যোগদানের মূল উদ্দ্যেশ্য হল নিজের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়ন বেগবান করা।

সামরিক বাহিনী

শ্রীলঙ্কা সেনাবাহিনী, শ্রীলঙ্কা নৌবাহিনী এবং শ্রীলঙ্কা বিমানবাহিনী – এই তিন শক্তির সমন্বয়ে শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী গঠিত। এখনো পর্যন্ত দেশটিতে কখনই সামরিক শাসন জারি হয়নি। শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের অন্তর্গত।

শিক্ষা ব্যবস্থা

উন্নয়নশীল দেশ গুলির মধ্যে শ্রীলঙ্কা সর্বোচ্চ সাক্ষর জনসংখ্যার একটি দেশ। দেশটির সাক্ষরতার হার ৯২ শতাংশ। শ্রীলঙ্কায় কলোম্ব বিশ্ববিদ্যালয়, পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জয়বর্ধনপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, জাফনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

যোগাযোগ

শ্রীলঙ্কার বেশির ভাগ শহরের মধ্যেই রেলপথ যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে। ভারতে চেন্নাই ও জাফনার মধ্যবর্তী সংযোজ সেতু করার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে। দেশটি কলম্বো, ত্রিকামেলি, গালে প্রভৃতি গভীর সমুন্দ্রবন্দরের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত। তাছাড়া শ্রীলঙ্কায় উন্নত বিমান বন্দরও রয়েছে।

ভাষা ও ধর্ম

শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় ভাষা সিংহলি ও তামিল। এখানকার বার্ঘার সম্প্রদায়ের লোকজন পর্তুগিজ ও ডাচ ভাষা আলাদা উচ্চারণে বলে থাকে। মালয় সম্প্রদায়ের লোকজন মালয়ের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে থাকে। শ্রীলঙ্কার ৭০ শতাংশ মানুষ বৌদ্ধ, ১৫ শতাংশ হিন্দু ও ৭.৫ শতাংশ ইসলাম ধর্মাবলম্বী।

খেলাধুলা

শ্রীলঙ্কার জাতীয় খেলা ভলিবল হলেও ক্রিকেট এখানে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়। এছাড়া রাগবি, ফুটবল, আথলেটিক্স, টেনিস ও নানা রকম জলক্রীড়া প্রচলিত আছে। ক্রিকেটে অনেক উল্লেখযোগ্য জয়ের মধ্যে রয়েছে ১৯৯৬ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জয়।

উপসংহার :- নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংবলিত সমুদ্রসৈকত, ভূদৃশ্য, তদুপরী সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শ্রীলঙ্কাকে সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

(FAQ) শ্রীলঙ্কা দেশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শ্রীলঙ্কার রাজধানীর নাম কি?

শ্রী জয়বর্ধনপুর কোট্টে।

২. শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় ভাষা কি?

সিংহল ও তামিল।

৩. শ্রীলঙ্কার পূর্ব নাম কি ছিল?

সিংহল।

৪. শ্রীলঙ্কার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে?

দিনেশ গুনাবর্ধনে।

৫. শ্রীলঙ্কার বর্তমান রাষ্ট্রপতি কে?

রনিল বিক্রমসিংহ।

Leave a Reply

Translate »