অশোক স্তম্ভ

সম্রাট অশোক নির্মিত অশোক স্তম্ভ -এর উচ্চতা ও ওজন, ব্যবহৃত পাথর, শিল্পী, স্তম্ভের বিভিন্ন অংশ, ভিত্তিভূমি, প্রানীর অবস্থান, স্থাপনা কেন্দ্র, লিপি উৎকীর্ণ বর্তমানে অশোক স্তম্ভ গুলির অবস্থান সম্পর্কে জানবো।

অশোক স্তম্ভ

নির্মাতাসম্রাট অশোক
নির্মাণকালখ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতক
উচ্চতা৪০-৫০ ফুট
ওজন৫০ টন
অশোক স্তম্ভ

ভূমিকা :- খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে মৌর্য সম্রাট অশোক দ্বারা স্থাপিত ও ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত বিভিন্ন স্তম্ভের সমষ্টি বিশেষ হল অশোক স্তম্ভ।

অশোক স্তম্ভের সংখ্যা

বহু সংখ্যক স্তম্ভ নির্মিত হলেও বর্তমানে মাত্র উনিশটি স্তম্ভই অবশিষ্ট রয়েছে।

স্তম্ভের উচ্চতা ও ওজন

সাধারণত ৪০ থেকে ৫০ ফুট (১২ থেকে ১৫ মি) উচ্চ ও ৫০ টন ওজনের এই স্তম্ভগুলিকে অনেক সময় শত শত মাইল সরিয়ে নিয়ে গিয়ে স্থাপন করা হয়েছিল।

ব্যবহৃত পাথর

দুই ধরনের পাথর খোদাই করে অশোক স্তম্ভ নির্মিত হয়। মথুরা অঞ্চলে প্রাপ্ত লাল ও সাদা বেলেপাথর এবং চুনার অঞ্চলে প্রাপ্ত কালো ছিট ও ক্ষুদ্র দানাযুক্ত বেলেপাথর দ্বারা এই সমস্ত স্তম্ভ নির্মিত হয়।

শিল্পী

আগে মনে করা হত যে, সব স্তম্ভগুলিই চুনার অঞ্চলের শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত হয়ে তারপর বিভিন্ন স্থানে স্থানান্তর করা হত, কিন্তু বর্তমানে এই তত্ত্ব সত্য বলে মনে করা হয় না।

একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নির্মাণ

স্তম্ভগুলির নির্মাণশৈলী প্রায়ই একই রকম। তাই মনে করা হয় যে, পাথরগুলিকে মথুরা ও চুনার থেকে কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেখানকার শিল্পীদের দ্বারা নির্মিত হয় এবং নির্মাণের পর বিভিন্ন স্থানে সরানো হয়।

প্রত্যেকটি স্তম্ভের অংশ

স্তম্ভ দুইটি খণ্ড চারটি অংশ বর্তমান। এর মধ্যে স্তম্ভের মূল অংশটি একটি মাত্র পাথর খোদাই করে নির্মিত এবং বেশিরভাগ সময় অন্য পাথরে নির্মিত স্তম্ভশীর্ষটি তিনটি অংশে বিভক্ত।

স্তম্ভের মূল অংশ

স্তম্ভের মূল অংশটি মসৃণ, চোঙাকৃতি এবং ওপরের দিকে সামান্য সরু।

স্তম্ভ শীর্ষের নীচের অংশ

স্তম্ভশীর্ষের নিচের অংশে একটি ঘণ্টাকৃতি পদ্মফুলের ভাস্কর্য্য আছে। পদ্মফুলের ওপর ভিত্তিভূমিটি চতুর্ভুজাকৃতি ও কারুকার্য্যবিহীন নয়তো গোলাকৃতি ও কারুকার্য্যখচিত।

ভিত্তিভূমিতে প্রানীর অবস্থান

প্রতিটি স্তম্ভের শীর্ষে মৌর্য শিল্পকলার নিদর্শন হিসেবে একটি করে প্রাণীর মূর্তিকে ভিত্তিভূমিটির ওপর দাঁড়িয়ে বা বসে থাকতে দেখা যায়।

অনুপস্থিত শীর্ষ

ধারণা করা হয় যে, বর্তমানে যে সমস্ত স্তম্ভে স্তম্ভশীর্ষ নেই, সেগুলিতে এক সময় কোনো প্রাণীর ভাস্কর্য্য সংবলিত শীর্ষদেশ উপস্থিত ছিল।

ছয় স্তম্ভ শীর্ষ

বর্তমানে অবশিষ্ট ছয়টি স্তম্ভশীর্ষের ভাস্কর্য্যগুলি ভারতীয় প্রস্তর ভাস্কর্য্যের প্রথমদিককার নিদর্শন। মনে করা হয় যে, এগুলি কাঠের স্তম্ভের ওপর তামা দ্বারা নির্মিত প্রাণীর ভাস্কর্য্যের শিল্প থেকে গড়ে উঠেছে। অবশ্য এরকম কোনো স্থাপত্যের নিদর্শন এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয় নি।

আকিমিনিয় বা হাখমানেশী সাম্রাজ্যের প্রভাব

পার্সিপোলিস নগরীতে অবস্থিত ছাদের স্তম্ভশীর্ষগুলির সঙ্গে মিল দেখে অশোক স্তম্ভগুলির নির্মাণে হাখমানেশী সাম্রাজ্যের প্রভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

স্থাপনা কেন্দ্র

অশোক স্তম্ভগুলিকে গৌতম বুদ্ধ -এর সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন স্থান, বৌদ্ধ তীর্থস্থান ও বৌদ্ধবিহার গুলিতে স্থাপন করা হয়েছিল।

লিপি উৎকীর্ণ

বেশ কিছু স্তম্ভে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীর উদ্দেশ্যে লিপি উৎকীর্ণ করা আছে।

অশোকের স্মৃতিতে নির্মাণ

সম্রাট অশোক কোনো স্থানে যাত্রা করলে তার স্মৃতিতেও বেশ কয়েকটি স্তম্ভ স্থাপিত হয়।

অশোক স্তম্ভের সংখ্যা নির্দেশ

ফা-হিয়েন ছয়টি ও হিউয়েন সাঙ পাঁচটি অশোক স্তম্ভের অস্তিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।

বর্তমানে অবশিষ্ট অশোক স্তম্ভের অবস্থান

বর্তমানে অস্তিত্ব আছে এমন অশোক স্তম্ভ গুলি হল –

  • (১) সারনাথ, উত্তর প্রদেশ, ভারত। এই অশোক স্তম্ভে স্তম্ভ লিপি, বিভেদ লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে এবং স্তম্ভের শীর্ষে চারটি সিংহ আছে।
  • (২) সাঁচী, মধ্য প্রদেশ, ভারত। এই অশোক স্তম্ভে বিভেদ লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে এবং স্তম্ভের শীর্ষে চারটি সিংহ আছে।
  • (৩) বৈশালী, বিহার, ভারত। এই অশোক স্তম্ভের শীর্ষে একটি সিংহ আছে।
  • (৪) লৌরিয়া নন্দনগড়, বিহার, ভারত। এই অশোক স্তম্ভের শীর্ষে একটি সিংহ আছে।
  • (৫) সঙ্কিস্য বসন্তপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। এই অশোক স্তম্ভের শীর্ষে একটি হাতি আছে।
  • (৬) মকের, চম্পারণ, বিহার, ভারত। স্তম্ভের শীর্ষ অনুপস্থিত।
  • (৭) লৌরিয়া আররাজ, চম্পারণ, বিহার, ভারত। এই অশোক স্তম্ভে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ স্তম্ভ লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে।
  • (৮) এলাহাবাদ, উত্তর প্রদেশ, ভারত। পূর্বে এই অশোক স্তম্ভ কৌশাম্বী নগরে অবস্থিত ছিল। এই অশোক স্তম্ভে ১, ২, ৩, ৬ স্তম্ভ লিপি, বিভেদ লিপি, সম্রাজ্ঞীর লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে।
  • (৯) দিল্লি, ভারত। পূর্বে এই অশোক স্তম্ভ মীরাট নগরে অবস্থিত ছিল। এই অশোক স্তম্ভে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬ স্তম্ভ লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে।
  • (১০) ফিরোজ শাহ কোটলা, দিল্লি, ভারত। পূর্বে এই অশোক স্তম্ভ টোপরাতে অবস্থিত ছিল। এই অশোক স্তম্ভে ১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬, ৭ স্তম্ভ লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে।
  • (১১) রাণীগত, খাইবার পাখতুনখোয়া, পাকিস্তান। এই অশোক স্তম্ভ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেই।
  • (১২) কান্দাহার, আফগানিস্তান। এই অশোক স্তম্ভে ৭ স্তম্ভ লিপি উৎকীর্ণ রয়েছে।
  • (১৩) লুম্বিনী, রূপন্দেহী জেলা, নেপাল। এই অশোক স্তম্ভের শীর্ষে অশ্ব অবস্থান করে। কিন্তু বর্তমানে তা অনুপস্থিত।
  • (১৪) নিগলি সাগর, রূপন্দেহী জেলা, নেপাল। এই অশোক স্তম্ভ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেই।  

উপসংহার :- পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যের মধ্যে অন্যতম হল মৌর্য সম্রাট অশোক নির্মিত অশোক স্তম্ভ।

(FAQ) অশোক স্তম্ভ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ‘অশোক স্তম্ভ’ কে দিল্লি নিয়ে এসেছিলেন কে?

ফিরোজ শাহ তুঘলক।

২. অশোক স্তম্ভে কয়টি সিংহ আছে?

৪ টি।

৩. জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ কোথায় পাওয়া গেছে?

সারনাথ

Leave a Reply

Translate »