ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ

ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ প্রসঙ্গে রাজশক্তির সাহায্য লাভে অক্ষমতা, শঙ্করাচার্যের ভূমিকা, পুষ্যমিত্র শূঙ্গের ভূমিকা বিচার, শশাঙ্কের ভূমিকা বিচার, নিজস্ব দুর্বলতা, সাম্প্রদায়িক বিভেদ, দুর্নীতি ও অনাচারের প্রবেশ এবং তুর্কী আক্রমণ সম্পর্কে জানবো।

ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ

বিষয় ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ
প্রবর্তক গৌতম বুদ্ধ
ধর্মগ্ৰন্থ ত্রিপিটক
সমকালের অন্য ধর্ম জৈন ধর্ম
পূর্ববর্তী ধর্ম ব্রাহ্মণ্যধর্ম
বৌদ্ধ সংগীতি চারটি
ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ

ভূমিকা :- বৌদ্ধধর্ম একসময় ভারতের বৃহৎ অঞ্চল জুড়ে এবং ভারতের বাইরে বিরাজিত ছিল। এই ধর্মের সামাজিক ও মানবিক দিকগুলি বহু তাপিত হৃদয়কে শান্তি দেয়। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের ধীরে ধীরে অবনতি ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতে এই ধর্মের পতন হয়।

রাজ শক্তির সাহায্য লাভে অক্ষমতা

বৌদ্ধধর্মের পতনের কারণ হিসেবে বলা হয় যে, এই ধর্ম বিম্বিসার, অশোক, কণিষ্ক প্রভৃতি রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিস্তার লাভ করেছিল। কণিষ্কের পর এই ধর্ম রাজাদের অনুগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে এই ধর্মের প্রভাব কমে যায়। যদিও হর্ষবর্ধন বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তথাপি তিনি তেমন কার্যকরী সাহায্য করতে পারেন নি।

মতের দুর্বলতা

উপরোক্ত মতের বহু দুর্বলতা আছে। যেমন –

  • (১) হিন্দু রাজারা ধর্ম-সহিষ্ণুতায় বিশ্বাস করতেন। যে সকল রাজা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন নি তারা বৌদ্ধদের নিগ্রহ করতেন এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের রাজত্বকালে ফা-হিয়েন বৌদ্ধদের শান্তিতে বসবাস করতে দেখেন।
  • (২) কেউ কেউ বলেন যে, পুষ্যমিত্র শূঙ্গ বা শশাঙ্ক প্রভৃতি হিন্দু রাজা বৌদ্ধদের নিগ্রহ করেছিলেন। এর উত্তরে অনেকে বলেন যে, যদি তারা বৌদ্ধধর্মকে উৎখাত করে থাকেন। তবে কিভাবে পাল যুগে বৌদ্ধ ধর্মের এত প্রসার ঘটেছিল? কিভাবে পালযুগে বিক্রমশীলা বিহারের মত মহাবিহার স্থাপন এবং তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করা সম্ভব হয়।
  • (৩) কিভাবে বাঙালী পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর বৌদ্ধধর্ম সংস্কারের জন্যে তিব্বত যাত্রা করলেন।

শঙ্করাচার্যের ভূমিকা

  • (১) বৌদ্ধধর্মের পতনের কারণ হিসেবে হিন্দুধর্মের সংস্কারক শংকরাচার্যের ও কুমারিল ভট্টের ভূমিকার কথা বলা হয়। শঙ্কর ছিলেন কেরালার অধিবাসী। তিনি ছিলেন অদ্বৈত দর্শনের ও বেদান্তের প্রচারক। তাঁর প্রচারের ফলে হিন্দুধর্মের জাগরণ ঘটে।
  • (২) শঙ্কর বৌদ্ধ পণ্ডিতদের বিতর্কে পরাস্ত করে হিন্দুধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেন বলে কিংবদন্তী আছে। শঙ্কর দক্ষিণ থেকে উত্তরে হিমালয় পর্যন্ত তাঁর পদযাত্রা চালান এবং লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধ তাঁর প্রভাবে হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন বলে কিংবদন্তী আছে।

শঙ্করাচার্যের ভূমিকার ঐতিহাসিক বিচার

  • (১) বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে শঙ্করাচার্যের জয়যাত্রা সম্পর্কে কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ পাওয়া যায় নি। এমন কি সমকালীন সাহিত্য বা দর্শনে এই বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই। শঙ্করাচার্য ছিলেন অষ্টম খ্রিস্টাব্দের লোক।
  • (২) এই সময় বিখ্যাত পণ্ডিত শান্ত রক্ষিত জীবিত ছিলেন। তিনি তত্ত্বসংগ্রহ গ্রন্থে সমকালীন সকল প্রকার দার্শনিক তত্ত্বের উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁর গ্রন্থে শঙ্করাচার্যের মতামতের উল্লেখ দেখা যায় না। সম্ভবত শঙ্করাচার্য তখন বিশেষ খ্যাতি পান নি।
  • (৩) শঙ্করাচার্যের মৃত্যুর পর বাচস্পতি মিশ্র শঙ্করের মতকে জনপ্রিয় করেন। বাচস্পতি মিশ্রও বৌদ্ধধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বলেন নি। আনন্দগিরি এবং মাধবাচার্য শঙ্করের বৌদ্ধ বিদ্বেষের কাহিনী পরবর্তীকালে প্রচার করেন। সুতরাং শঙ্করাচার্যের বৌদ্ধ বিদ্বেষী ভূমিকা সম্পর্কে সন্দেহের অবকাশ আছে।

পূষ্যমিত্রের ভূমিকা বিচার

  • (১) শৈব ও ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী রাজাদের দ্বারা বৌদ্ধ নির্যাতন, বৌদ্ধধর্মের পতনের কারণ বলে অনেকে মনে করেন। মৌর্য বংশের পতনের পর পুষ্যামিত্র শুঙ্গ মগধের সিংহাসনে বসে বৌদ্ধদের নির্যাতন করেন।
  • (২) দিব্যাবদানে একটি কাহিনী আছে যে, পুষ্যমিত্র ঘোষণা করেন তাকে শ্রমণ বা ভিক্ষুর মস্তক এনে দিতে পারলে তিনি তাকে শত দিনার দিবেন। পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও মনে করেন যে, অশোকের বৌদ্ধ নীতির প্রতিবাদে ব্রাহ্মণ বিদ্রোহ ঘটে। পুয্যামিত্র শুঙ্গ ছিলেন এই বিদ্রোহের নায়ক।
  • (৩) দিব্যাবদানের এই অভিমত অন্য সূত্র দ্বারা সমর্থিত হয় নি। যদি পুষ্যামিত্র সত্যই বৌদ্ধবিদ্বেষী হবেন তবে তিনি কেন সাঁচীর স্তূপের বিখ্যাত প্রস্তর বেষ্টনী তৈরি করে স্তুপটিকে সজ্জিত করেন।
  • (৪) হয়তো কোনো রাজনৈতিক কারণে তিনি কোনো বিশেষ বৌদ্ধ শ্রমণকে নির্যাতন করতে পারেন। ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী, পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অভিমত বিচার করে অগ্রাহ্য করেছেন।

শশাঙ্কের ভূমিকা বিচার

গৌড়রাজ শশাঙ্ক ছিলেন শৈব। তাঁর সম্পর্কে হিউয়েন সাঙ অভিযোগ করেছেন যে, তিনি বৌদ্ধ বিদ্বেষবশত গয়ার বোধিবৃক্ষ কেটে ফেলেন। শশাঙ্কের সাথে বৌদ্ধ হর্ষবর্ধনের রাজনৈতিক বিরোধের এটা পরিণাম। এর দ্বারা শশাঙ্কের বৌদ্ধধর্মের প্রতি বিদ্বেষ প্রমাণিত হয় নি।

নিজস্ব দুর্বলতা

  • (১) আসলে বৌদ্ধধর্ম ধ্বংস হয় এই ধর্মের নিজস্ব দুর্বলতার জন্য। বাহ্যিক কারণগুলি বৌদ্ধধর্মের পতনের জন্যে অকিঞ্চিৎকর বলা যায়। বুদ্ধের মৃত্যুর পর, বৌদ্ধসঙ্ঘে আর কোনো সর্বজনমান্য ধর্মগুরুর আবির্ভাব হয় নি।
  • (২) খ্রিস্টধর্মে যেরূপ পোপ আছেন বা ইসলামে যেরূপ খলিফা, কোরান ও শরিয়ত আছেন, বৌদ্ধধর্মে এরূপ কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এই কারণে বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলির মধ্যে একতা রক্ষা করা সম্ভব হয় নি।
  • (৩) বৌদ্ধসংঘের গণতান্ত্রিক চরিত্র সঙ্ঘের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবাদ সৃষ্টি করে। বৌদ্ধ সম্প্রদায়গুলি স্ব-স্ব প্রধান হয়ে ওঠে। সঙ্ঘগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার মত কোনো কেন্দ্রীয় ব্যক্তি বা গুরু ছিলেন না।

সাম্প্রদায়িক বিভেদ

  • (১) বৌদ্ধদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক মতভেদ এই ধর্মের পতনের প্রধান কারণ ছিল। বুদ্ধের মৃত্যুর পর ভিক্ষুদের মধ্যে বহু সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়। এদের মধ্যে প্রধান ছিল থেরবাদী ও মহাসঙ্ঘিকা। থেরবাদীরা আবার বহু উপ-সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। মহাসঙ্ঘিকাও বহু উপসঙ্গে ভাগ হয়ে যায়। এদের মধ্যে অন্তর্বিবাদ বৌদ্ধধর্মকে দুর্বল করে ফেলে।
  • (২) মৌর্য সম্রাট অশোক পাটলিপুত্রের ধর্মসভায় এই বিরোধ দূর করার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করেন। কিন্তু থেরবাদীরা এই সভায় মহাসঙ্ঘিদের কোণঠাসা করে রাখেন। বৈশালীর ধর্মসভার পর বৌদ্ধ ভিক্ষুরা দুই প্রধান সম্প্রদায়ে ভাগ হয়ে যান – হীনযান ও মহাযান। বৌদ্ধধর্মের ভেতর এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ এই ধর্মের প্রাণশক্তিকে ক্ষয় করে দেয়।

দুর্নীতি ও অনাচারের প্রবেশ

  • (১) বৌদ্ধ ভিক্ষু সঙ্ঘে কালক্রমে বহু অবাঞ্ছিত লোক ঢুকে পড়ে। অবাঞ্ছিত ভিক্ষুদের মধ্যে দুর্নীতি ও অনাচার দেখা দিলে বৌদ্ধধর্মের আবেদন কমে যায়। সঙ্ঘে অর্থের প্রাচুর্য দেখা দিলে শ্রমণরা বিলাসী ও আরামপ্রিয় হয়ে পড়েন।
  • (২) বজ্রযান ও সহজযান প্রভৃতি মতবাদ বৌদ্ধধর্মে দেখা দিলে তন্ত্র-মন্ত্রের প্রাধান্য বাড়ে। এর ফলে বৌদ্ধধর্ম তার যুক্তিবাদী চরিত্র হারায়। ভিক্ষুদের মধ্যে নীতিবোধ ও তপস্যা অপেক্ষা তন্ত্র ও অলৌকিক শক্তি প্রকাশের ঝোঁক বাড়ে।
  • (৩) আচার-সর্বস্বতা বৌদ্ধধর্মকে আচ্ছন্ন করে। দেব-দেবীর পুজো, বোধিসত্বের পুজো, মন্ত্র উচ্চারণই প্রাধান্য পায়। অষ্টমার্গের সাধনা ক্রমে হারিয়ে যায়। অবতারবাদ, মন্ত্র-সর্বস্ব, আচারমার্গী বৌদ্ধধর্ম তার আবেদন হারিয়ে ফেলে।

হিন্দুধর্মের সঙ্গে স্বাতন্ত্র্য লোপ

  • (১) বৌদ্ধধর্মে কালক্রমে বুদ্ধের মূর্তিপুজো, মন্দিরে বুদ্ধ মূর্তি প্রতিষ্ঠা, তারাকে বোধিসত্বের স্ত্রীরূপে কল্পনা করা হলে হিন্দুধর্মের সঙ্গে বৌদ্ধধর্মের পার্থক্য কমে যায়। মহাযান বৌদ্ধ শাস্ত্রগুলি সংস্কৃত ভাষায় রচিত হলে হিন্দু শাস্ত্রের সঙ্গে এগুলির মিলনের পথ রচিত হয়।
  • (২) হিন্দুধর্ম সংস্কারকরা বৌদ্ধ দেব-দেবীকে হিন্দু দেবদেবীর বিকল্প বলে প্রচার করতে থাকেন। বৌদ্ধ তারাকে দেবী দুর্গার অন্যরূপ বা অবতার বলে কল্পনা করেন। এমন কি জ্ঞানী বুদ্ধকে মহাযোগী শিব বলে প্রচার করা হতে থাকে।
  • (৩) সেন যুগের কবি জয়দেব দশাবতার স্তোত্রে বুদ্ধকে কৃষ্ণের অবতার বলে বর্ণনা করেন। সুতরাং হিন্দু ধর্মগুরু ও পণ্ডিতরা বৌদ্ধধর্মকে হিন্দুধর্মের শাখা বলে গণ্য করলে বৌদ্ধধর্মের স্বাতন্ত্র্য নষ্ট হয়ে যায়।

তুর্কী আক্রমণ

  • (১) বৌদ্ধধর্ম যখন এরূপ দুর্বল হয়ে পড়ে সেই সময় ভারতে তুর্কী আক্রমণকারীরা প্রবেশ করে। এ কে ওয়ার্ডারের মতে, আরব ও তুর্কী আক্রমণের ফলে ভারতে বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটে। যেহেতু মধ্য ও উত্তর-পশ্চিম ভারত ছিল বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র, এই অঞ্চলে ইসলামীয় বিজয় বৌদ্ধধর্মের পতন ঘটায়।
  • (২) তুর্কী আক্রমণকারীরা বহু বৌদ্ধ মঠ ও বিহার ধ্বংস করে। বখতিয়ার খলজি বিহার আক্রমণের সময় বিখ্যাত বিক্রমশীলা বিহার ধ্বংস করেন। বাংলায় তুর্কী শাসন স্থাপিত হলে বাংলা থেকে বৌদ্ধ পণ্ডিতরা তাদের ধর্মশাস্ত্র নিয়ে নেপালে আশ্রয় নেন।

উপসংহার :- ভারতে প্রায় সমকালে একই প্রেক্ষাপটে গৌতম বুদ্ধের বৌদ্ধ ধর্ম ও জৈন ধর্মের উত্থান ঘটে। জৈন ধর্ম আজও ভারতে বিদ্যমান। কিন্তু বৌদ্ধ ধর্ম তার স্থান ধরে রাখতে পারে নি।

(FAQ) ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের পতনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক কে?

গৌতম বুদ্ধ।

২. বৌদ্ধ ধর্মগ্ৰন্থের নাম কি?

ত্রিপিটক।

৩. প্রথম বৌদ্ধ সংগীতি কবে কোথায় আয়োজিত হয়?

৪৮৭ খ্রিস্টপূর্বে রাজগৃহের সপ্তপর্ণী গুহায়।

৪. গৌতম বুদ্ধ কোন ভাষায় তার ধর্মমত প্রচার করেন?

প্রাকৃত ভাষা।

Leave a Reply

Translate »