ভারত নামের উৎপত্তি

ভারত নামের উৎপত্তি প্রসঙ্গে ইন্ডিয়া নামকরণ, ভারত, হিন্দুস্থান, অলহিন্দ, আর্যদেশ, তেনুজিক ও জম্বুদীপ নামকরণ সম্পর্কে জানবো।

ভারত নামের উৎপত্তি

বিষয় ভারত নামের উৎপত্তি
ইন্ডিয়া ইংরেজি নাম
ভারত রাজা ভরত
হিন্দুস্থান সিন্ধু নদ
আর্যদেশ আর্য জাতি
জম্বুদীপ পুরোনো লিপি
ভারত নামের উৎপত্তি

ভূমিকা :- জন্মলগ্ন থেকেই আমাদের দেশ ভারতবর্ষ নামের সঙ্গে কোনো বিশেষ জাতি বা ধর্মসম্প্রদায়ের সম্পর্ক নেই। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী হিমালয়ের দক্ষিণে ও ভারত মহাসাগরের উত্তরে যে দেশ তার নাম ভারতবর্ষ এবং এখানকার অধিবাসীদের ভারতসন্ততি বলা হয়েছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় বিষ্ণুপুরাণে –

“উত্তরং যৎ সমুদ্রস্য হিমাদ্রেশ্চৈব দক্ষিণম্।

বর্ষং তৎ ভারতং নাম ভারতী যত সন্ততিঃ।।”

ইন্ডিয়া (India)

  • (১) ভারতের ইংরেজি নাম হল ইন্ডিয়া। হেরোডোটাস (খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতক) -এর সময়ে গ্রিক শব্দ India থেকে উদ্ভূত হয়ে ল্যাটিন ও পার্সিয়ান ভাষার মধ্য দিয়ে বিকাশ লাভ করেছে। India বলতে Indus river (সংস্কৃত, সিন্ধু নদ) এর তীরবর্তী এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকাকে নির্দেশ করা হত।
  • (২) আ্যংলো-সেক্সনদের কাছে India শব্দটি পরিচিত ছিল এবং রাজা আলফ্রেডের Orosius অনুবাদে শব্দটি পাওয়া যায়। Middle English-এ ফরাসি প্রভাবে শব্দটি Ynde বা Inde-তে পরিণত হয়, যা Early Modern English-এ Indie হিসেবে প্রবেশ করে। ১৭ শতক থেকে বর্তমান India নামটি প্রচলিত।
  • (৩) ইংরেজিতে ইন্ডিয়া (India) কথাটি সিন্ধু নদের আদি ফার্সি নাম হিন্দু থেকে এসেছে। প্রাচীন গ্রিকরা ভারতীয়দের বলত ইন্দোই, বা ইন্দাস (সিন্ধু) নদী অববাহিকার অধিবাসী। ‘ইন্দাস’ নাম থেকেই ‘ইন্ডিয়া’ নামটির উৎপত্তি।

ভারত

  • (১) ভারত নামটি বিভিন্ন প্রাচীন সংস্কৃত পুরাণ থেকে এসেছে। যেমন, বায়ু পুরাণে নামটি পাওয়া যায়। ভারত মূলত দেবতা ‘অগ্নি’র একটি নাম। ঋগ্বেদ -এ ভারতী হিসেবে এখানকার অধিবাসীদের, বিশেষ করে যারা দশ রাজার যুদ্ধ -এ অংশগ্রহণ করেছিল তাদের বোঝানো হয়েছে।
  • (২) মহাভারতে ভরতের রাজ্যকে বলা হয় ভারতবর্ষ। ভগবত পুরাণে ভারত শব্দটি রাজা ভরতের নাম থেকে এসেছে বলে বর্ণনা করা হয়েছে।
  • (৩) ভারত নামটির উৎপত্তি হয়েছে হিন্দু পৌরাণিক রাজা ভরতের (দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার পুত্রের) নামানুসারে। কথিত আছে এই অঞ্চল বা বর্ষ রাজা ভরতকে দান করা হয়েছিল বলে এর নাম ভারতবর্ষ।
  • (৪) ভারত নামে সিন্ধু নদ অঞ্চলে বসবাসকারী বৈদিক জাতির থেকে “ভারত” নামকরণ করা হয়ে থাকতে পারে বলে অনেকেই মনে করেন।

হিন্দুস্থান

সিন্ধু নদের আদি ফার্সি নাম হিন্দু থেকে হিন্দুস্থান নামটির উৎপত্তি হতে পারে। সেই থেকে সিন্ধু নদের অববাহিকাতে বসবাসকারীরা হিন্দের বংশধর বা হিন্দু নামে পরিচিত ছিল। সেই হিন্দুদের থাকার জায়গাই পরবর্তী কালে হিন্দুস্থান অথবা ‘হিন্দুদের দেশ’ নামে পরিচিত হয়।

হিন্দু

সিন্ধু বা হিন্দু নদের অববাহিকায় যারা বসবাস করত তাদের হিন্দু বলা হত৷ হিন্দু বলতে কোনো ধর্মের অনুসারী বোঝাত না৷ অর্থাৎ সমস্ত ভারতে বসবাসকারীদের হিন্দু বলা হত৷

অল হিন্দ

প্রাচীন কালে পারসিকরা বাণিজ্যিক সূত্রে আমাদের দেশে এসে এদেশের নাম দেন ‘অল-হিন্দ’, যার অর্থ হল সিন্ধুনদের ওপারের অঞ্চল। এই ‘হিন্দ’ থেকেই ‘হিন্দু’ ও ‘হিন্দুস্থান’ নামের উদ্ভব ঘটেছে। পারস্যের (বর্তমান ইরান) পার্সেপোলিশ এবং সাসনীয় শাসক প্রথম শাহপুর-এর ‘নকস্-ই-রুস্তম্’ লেখতে (২৬২ খ্রি.)-ও হিন্দু বা সিন্ধু নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

আর্যদেশ

ভারতবর্ষের নাম আর্যদেশ হবার পেছনে দুটি যুক্তি বিদ্যমান। যেমন –

  • (১) ইউরোপ -এর পণ্ডিতদের মতে এবং বিজ্ঞানীদের গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যমতে, আর্যগণ ছিল একদল কৃষিজীবী যাযাবর জাতি। এই জনগোষ্ঠী ককেশীয় শ্রেণীভুক্ত আফ্রিকান জাতি। এরা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৭৫ হাজার বছর পূর্বে আফ্রিকা থেকে বেরিয়ে সারা বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বিশেষত তারা তাদের পশুচারণের জন্য বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতো। এরই ধারাবাহিকতায় খ্রিষ্টপূর্ব ২৫ হাজার বছর পূর্বে তারা বর্তমানের ইরান অঞ্চলে আসে। কথিত আছে, তাদেরই একটি দল কোনো এককালে ভারতবর্ষে আগমন করে এবং বসতি গড়ে। মূলত তাদের হাত ধরেই সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং বিকশিত হয়। এইভাবে আর্যগণ ভারতবর্ষে বসতি শুরু করলে এর নামকরণ হয় আর্যদেশ। এই যুক্তিটি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ দ্বারা প্রাপ্ত।
  • (২) সংস্কৃত ভাষায় লিখিত শ্লোক তথা পৌরাণিক গ্রন্থ সমূহতে আর্যদের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে আর্য বলতে জ্ঞানী বা বুদ্ধিমান লোকদের বোঝানো হয়েছে। আবার কারও মতে, আর্য শব্দের অর্থ ঈশ্বরের পুত্র। ঈশ্বরের অনেক পুত্রদের মধ্যে যে পিতার আজ্ঞাবহ, অনুগত, ও জ্ঞানশীল সে আর্য নামে অভিহিত হত। এই ধারণা অনুয়ায়ী ভারতবর্ষে বসবাসকারী লোকদের ঈশ্বরের পুত্র তথা অত্যন্ত জ্ঞানী মনে করা হয়। ভারতবর্ষে এই শ্রেণীর লোকদের বসবাসের কারণে তা আর্যদেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই যুক্তিটি পৌরাণিক কাহিনী ও সংস্কৃত শ্লোক হতে প্রাপ্ত।

তেনজিকু

হিন্দু শব্দের চীন দেশীয় অপভ্রংশের নাম তেনজিকু বা তিয়ানযহু। প্রাচীন কয়েকটি ভাষায় তেনজিকু নামেও ভারতকে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

জম্বুদ্বীপ

  • (১) পুরনো লিপি থেকে জানা যায় যে, ভারতবর্ষ নামটির পরিচিতির পূর্বে জম্বুদ্বীপ নামেই ভারত পরিচিত ছিল। সূর্যসিদ্ধান্তের লেখায় জম্বুদ্বীপ নাম পাওয়া যায়। এর আক্ষরিক অর্থ হল জাম গাছে ভরা দ্বীপ কিন্তু সনাতন সৃষ্টিতত্ব (হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা জৈন) অনুযায়ী জম্বুদ্বীপ কথার অর্থ হল ‘সাধারণ মানুষের বাসস্থান’।
  • (২) দার্শনিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশের এই নাম সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারত। পুরাণ অনুযায়ী এই জায়গা নয়টি পর্বত ও আটটি বর্ষ নিয়ে তৈরি। বৌদ্ধ লিপি মহাবংশ অনুযায়ী সম্রাট অশোক -এর পুত্র মহেন্দ্র অনুরাধাপুরের (সিংহল) অধিপতির কাছে নিজেকে জম্বুদ্বীপ থেকে আসছেন বলেই জানিয়েছিলেন।
  • (৩) অশোকের মৌর্য সাম্রাজ্য -এর বিস্তারের ফলে উত্তর পূর্ব আর তামিলনাড়ু ছাড়া মোটামুটি পুরো দেশটাই তার আয়ত্ত্বাধীন হয়ে যায়। তাছাড়া উত্তরপ্রদেশের হস্তিনাপুরে জৈন তীর্থ জম্বুদ্বীপের স্তাপত্যশৈলীতেও জম্বুদ্বীপের মোটামুটি একটা গাঠনিক ধারণা পাওয়া যায়।

উপসংহার :- ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের সরকারি এবং জনপ্রিয় উভয় ইংরেজি ব্যবহারের জন্য দুটি প্রধান সংক্ষেপণ রয়েছে – “ইন্ডিয়া” এবং “ভারত”। দুটিই ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের প্রথম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে ইন্ডিয়া, অর্থাৎ ভারত, রাজ্য সমূহের ইউনিয়ন হবে, সেই কারণে ইন্ডিয়া এবং ভারত সমানভাবে প্রজাতন্ত্রের সরকারি সংক্ষেপণ রূপে স্বীকৃত।

(FAQ) ভারত নামের উৎপত্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পুরোনো লিপিতে ভারতের নাম কি ছিল?

জম্বুদীপ।

২. কোন নদীর নাম থেকে হিন্দু ও হিন্দুস্থান নাম এসেছে?

সিন্ধু নদ।

৩. কোন রাজার নাম অনুসারে আমাদের দেশের নাম হয় ভারত?

রাজা ভরত।

৪. রাজা ভরত কে ছিলেন?

দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার পুত্র।

Leave a Reply

Translate »