অশোকের কৃতিত্ব

অশোকের কৃতিত্ব প্রসঙ্গে প্রথম জীবন, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, পরধর্ম সহিষ্ণুতা, অহিংসা নীতি, ধর্মবিজয়, সংগঠক ও জাতীয় সংহতি স্থাপন সম্পর্কে জানবো।

অশোকের কৃতিত্ব

বিষয় অশোকের কৃতিত্ব
রাজা সম্রাট অশোক
ধর্ম বৌদ্ধ ধর্ম
পূর্বসূরি বিন্দুসার
উত্তরসূরি কুণাল
অশোকের কৃতিত্ব

ভূমিকা :- মৌর্য সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট দেবানাম প্রিয় প্রিয়দর্শী অশোক প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে এক অসাধারণ গৌরবে মণ্ডিত হয়েছেন। অশোকের শিলালিপিগুলি তাঁর কৃতিত্বের সাক্ষ্য বহন করে। এর আগে ভারতের কোনো সম্রাট রাজ্য শাসন নীতিকে কার্যকরী করার জন্য শিলালিপির এরূপ ব্যাপক ব্যবহার করেন নি।

প্রথম জীবন

  • (১) বৌদ্ধ সাহিত্যে দেখা যায় যে, প্রথম জীবনে অশোক ছিল রক্ত-পিপাসু ও নিষ্ঠুর। পরে বৌদ্ধধর্মের প্রভাবে ‘চণ্ডাশোক’, ‘ধর্মাশোকে’ পরিণত হয়। ডাঃ ভাণ্ডারকর বলেন যে, বাস্তবক্ষেত্রে অশোক সম্ভবত এত খারাপ ছিলেন না। বৌদ্ধ লেখকরা তাঁদের ধর্মের মহিমা প্রচারের জন্য অশোককে এভাবে চিহ্নিত করেছেন।
  • (২) অশোকের ভ্রাতা তিষ্য বহুকাল জীবিত ছিলেন বলে জানা যায়। যদি অশোক ভ্রাতৃহন্তা হতেন তাহলে এটা সম্ভব হত না। তাছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম শিলালিপিতে অশোক ভ্রাতা ও আত্মীয়দের ওপর নিষ্ঠুর আচরণকে নিন্দা করতেন না। আসলে কিংবদন্তীর চণ্ডাশোক সত্য নাও হতে পারে, ইতিহাসের ধর্মাশোক জীবন্ত চরিত্র।

রাজনৈতিক দূরদর্শিতা

  • (১) সমরকুশলী ও রাজনীতিবিদ হিসেবে অশোক তার যোগ্যতার অনেক প্রমাণ দিয়েছেন। কলিঙ্গের মত শক্তিশালী দেশকে তিনি এক বছরের মধ্যে পদানত করেন। ভাণ্ডারকরের মতে, কলিঙ্গের মিত্র হিসেবে চোল ও পাণ্ড্যরাও এই যুদ্ধে যোগ দেয়। মৌর্যবাহিনী তাদের ধ্বংস করে মৌর্য সাম্রাজ্যের সংহতি বাড়ায়।
  • (২) অশোক তাঁর গভীর রাজনীতি জ্ঞানের পরিচয় দেন কলিঙ্গ যুদ্ধের পর। রোমিলা থাপারের মত যদি সত্য হয়, তবে অশোক তাঁর কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য, যা blood and iron বা রক্ত ও লৌহ নীতির ওপর দাঁড়িয়েছিল তাকে গভীর সংস্কৃতির বাঁধনে বেঁধে সাম্রাজ্যের সংহতি দৃঢ় করেন।
  • (৩) তাঁর ধর্ম প্রচার ও জনহিতকর কাজ দ্বারা তিনি কেন্দ্রীয় সরকার ও সাধারণ প্রজার মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগ স্থাপন করে সাম্রাজ্যের ভিত্তি দৃঢ় করেন। এজন্য ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী প্রকৃতই বলেছেন যে, “অশোকের মধ্যে ছিল চন্দ্রগুপ্তের উদ্যম, সমুদ্রগুপ্তের বিবিধমুখী প্রতিভা এবং আকবরের ঔদার্য। যুদ্ধ নীতি ও শান্তি নীতি উভয় ক্ষেত্রেই তিনি তার পারদর্শিতার স্বাক্ষর রাখেন।

পরধর্ম সহিষ্ণুতা

  • (১) অশোক নিজে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও তার পর-ধর্মসহিষ্ণুতা ছিল অসাধারণ। তার সাম্রাজ্যের সংহতি সাধনের জন্য এটা মে প্রয়োজন তা তিনি জানতেন। সুতরাং ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্দ্ধে উঠে তিনি মানবধর্মকেই শ্রেষ্ঠত্ব দেন। তিনি নিজ ধর্মকে শ্রেষ্ঠ ও পরধর্মকে নিকৃষ্ট জ্ঞান না করতে তাঁর প্রজাদের পরামর্শ দেন।
  • (২) ব্রাহ্মণ, শ্রমণ, জৈন ও আজীবিক সকলেই তাঁর কাছে সমান আদর পেত। প্রজাদের সন্তানের মত জ্ঞান করে তাদের মঙ্গলের জন্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়োজিত করার পরিকল্পনা সর্বপ্রথম তার মাথায় আসে। Welfare state বা কল্যাণ রাষ্ট্রের আদর্শকে তিনি মূর্ত করেন।
  • (৩) প্রজাদের ইহলোক ও পরলোকের মঙ্গল সাধনের জন্য তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তিনি মনে করতেন যে, তিনি প্রজাদের কাছে ঋণে আবদ্ধ। সে ঋণ ছিল তাদের মঙ্গল সাধন।
  • (৪) কোশাম্বি অশোকের এই রাজ কর্তব্যের মধ্যে Contract theory বা চুক্তিতত্ত্বের অস্তিত্ব দেখতে পেয়েছেন। এই চুক্তি তত্ত্ব অনুসারে রাজা তাঁর সিংহাসনকে প্রজাদের কল্যাণমূলক কাজ করার চুক্তির বিনিময়ে লাভ করেন এই ধারণা দেখা যায়।

অশোকের অহিংসা নীতির সমালোচনা

  • (১) রাজাশাসন ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে অশোক অহিংসা নীতিকেই প্রাধান্য দেন। ডঃ রায়চৌধুরীর মতে, এই অহিংসা দুর্বল ক্লীবের অহিংসা ছিল না। কলিঙ্গ যুদ্ধে জয়ের পর তিনি হিংসা ও রাজ্যজয় নীতি ত্যাগ করেন।
  • (২) তথাপি ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী প্রমুখ অশোকের অহিংসা নীতিকে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য দায়ী করেছেন। যে রাজা সেনাদলকে অলসভাবে বসিয়ে রাখেন এবং ভেরীঘোষকে, ধর্মঘোষে পরিণত করেন, তার এই নীতির ফলে সেনাদলের মনোবল নষ্ট হতে বাধ্য।
  • (৩) ভারতের সীমানায় যখন বিদেশী আক্রমণের কালো মেঘ ঘনাচ্ছে, তখন এরূপ-স্বপ্ন বিলাসী, অহিংসপন্থী সম্রাটের উপস্থিতি সাম্রাজ্যকে ভাঙতে সাহায্য করে। এই অভিমত ডঃ রায়চৌধুরীর।

অশোকের অহিংসা নীতির সমর্থন যুক্তি

  • (১) কোনো কোনো ঐতিহাসিক ডঃ রায়চৌধুরীর মত খণ্ডন করেছেন। অশোক অহিংসা নীতি নিলেও সেনাদল ভেঙে দেননি বা বিদ্রোহকে সহ্য করেন নি। আটবিক রাজ্য বিদ্রোহ করলে তিনি তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন। তার মৃত্যুর ৫০ বছর পরে সাম্রাজ্যে ভাঙন আসে।
  • (২) সুতরাং সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনের জন্য তাকে দায়ী করা উচিত নয় বলে মনে করা হয়। ডি ডি কোশাম্বী ও রোমিলা থাপার প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেন যে, সাম্রাজ্যের সংহতি বাড়াতেই অশোক অহিংসা নীতি নেন, সাম্রাজ্যের ক্ষতি করতে নয়। তাঁর অহিংসা নীতি ও প্রজা কল্যাণমূলক কাজ সরকারের সঙ্গে সাধারণ লোকের সম্পর্ক দৃঢ় করেছিল।
  • (৩) তাছাড়া ভারতের অনেকটা অঞ্চল জয় করার পর অশোক যুদ্ধ নীতির প্রয়োজনীয়তা দেখেন নি। ব্যয় বহুল যুদ্ধের চেয়ে, প্রজাকল্যাণে খরচ করলে ভাল ফল পাওয়া যায়, একথা তিনি ভেবেছিলেন।

ধর্মবিজয়

  • (১) ভাণ্ডারকর প্রমুখ ঐতিহাসিকের চোখে অশোকের ধর্মবিজয় নীতি তাকে এক অসাধারণ সম্রাটের খ্যাতি দান করে। তিনি প্রজা কল্যাণকে তার প্রধান ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি বলেন যে, ‘সকল মানুষ তার সন্তান’। প্রজাদের কাছে তিনি ঋণী ছিলেন বলে মনে করতেন।
  • (২) রাজকর্তব্য সম্পর্কে তাঁর এই উচ্চ ধারণা তাকে মহিমান্বিত করেছে। কোশাম্বী তার এই ‘ঋণ’ তত্ত্বের মধ্যে চুক্তিতত্ত্বের বীজ নিহিত ছিল বলে মনে করেন। ক্ষমতা তার মানসিকতাকে বিকৃত করেনি, ঐশ্বর্য তাকে সেবাপরায়ণ করে। আড়ম্বর ও আরামের জীবন ছেড়ে তিনি ধর্ম প্রচারের জন্য পথের ধূলায় নেমে আসেন।

সংগঠক

  • (১) অশোক শাসন সংগঠক হিসেবেও অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য যে শাসন ব্যবস্থা গড়েন তার মূল নীতিকে অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি তার সংস্কারগুলি চালু করেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি নিঃসন্দেহে বৃদ্ধি করেধ।
  • (২) তিনি উচ্চ কর্মচারীদের অনুসংযানের ব্যবস্থা করেন। তিনি পালি ভাষাকে ভারতের সাধারণ ভাষায় পরিণত করেন এবং ব্রাহ্মী লিপিকে ভারতের সর্বত্র চালু করেন।

জাতীয় সংহতি স্থাপন

তাঁর তৈরি স্তম্ভ, স্তম্ভের অলংকার, সারনাথের সিংহমূর্তি, অশোক সংস্কার এবং জাতীয় সংহতি স্থাপন চক্র, শিলালিপি, স্তূপ, বিহারগুলি ভারতীয় শিল্প ও স্থাপত্যের অসাধারণ অগ্রগতি ঘটায়।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক এইচ জি ওয়েলস অশোককে “ইতিহাসের অসংখ্য রাজাদের নামের মধ্যে উজ্জ্বল নক্ষত্র বলেছেন। ভল্গা থেকে জাপান আজও তার নাম স্মরণ করে।” তার শক্তিকে তিনি রাজ্য জয় বা আত্মগৌরব স্থাপনে নিয়োজিত না করে বহুজন হিতায় ব্যয় করেন। এরূপ উদাহরণ ইতিহাসে খুব বেশী নেই।

(FAQ) অশোকের কৃতিত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তৃতীয় মৌর্য সম্রাট কে ছিলেন?

অশোক।

২. অশোক কোন ধর্ম গ্ৰহণ করেন?

বৌদ্ধ ধর্ম।

৩. অশোক কার কাছে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন?

উপগুপ্ত।

৪. অশোক ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে কোন কোন কর্মচারী নিয়োগ করেন?

রাজুক, যুত, ধর্মমহামাত্র।

৫. অশোক স্তম্ভ কে তৈরি করান?

মৌর্য সম্রাট অশোক।

Leave a Reply

Translate »