মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ প্রসঙ্গে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অভিমত ও তার মতের সমর্থনে যুক্তি, ডঃ রায়চৌধুরীর অভিমত, বনগার্ড লেভিনের অভিমত, অশোকের অহিংসা নীতি, অশোকের দায়িত্ব খণ্ডন, প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের বিদ্রোহ, সিংহাসন নিয়ে বিরোধ, অর্থনৈতিক কারণ, অশোকের বৌদ্ধ নীতির ফল, মৌর্য শাসন ব্যবস্থার ত্রুটি ও বৈদেশিক আক্রমণ সম্পর্কে জানবো।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

বিষয় মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ
সময়কাল ১৮৭ মতান্তরে ১৮৫ খ্রিস্ট পূর্ব
প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
শ্রেষ্ঠ রাজা অশোক
শেষ রাজা বৃহদ্রথ
মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ

ভূমিকা :- ২৩৬ খ্রি পূর্ব (মতান্তরে ২৩২ খ্রি পূর্ব) অশোকের মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছরের মধ্যে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। অনেকের মতে, তাঁর মৃত্যুর ২৫ বছরের মধ্যেই ব্যাকট্রীয় গ্রীক জাতি হিন্দুকুশ পার হয়ে ভারতে ঢুকে পড়ে।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর অভিমত

পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য অশোকের ধর্মনীতি ও ব্রাহ্মণ বিদ্বেষকে দায়ী করেছেন। তাঁর মতে, “অশোকের বৌদ্ধদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নীতির ফলে ব্রাহ্মণদের মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, তা মৌর্য সম্রাটদের কর্তৃত্বকে চূর্ণ করে ফেলে এবং সাম্রাজ্যকে বিভক্ত করে দেয়।

শাস্ত্রীর মতের সমর্থনে যুক্তি

পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তার মতের সমর্থনে নিম্নলিখিত যুক্তি দিয়েছেন। –

  • (১) পশুবলির বিরুদ্ধে অশোক যে নির্দেশ দেন তা ব্রাহ্মণদের অসন্তোষ সৃষ্টি করে। অশোকের ন্যায় শূদ্র শাসকের কাছ থেকে এই নির্দেশ নিতে তাঁরা রাজী ছিল না।
  • (২) অশোক ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে বলেন যে, “যাদের ভূদেব মনে করা হত তিনি তাদের মিথ্যা বা ভণ্ড দেবতা বলে প্রতিপন্ন করেছেন।” অশোকের এই মন্তব্য ব্রাহ্মণদের মর্যাদা নষ্ট করে।
  • (৩) অশোক ধর্মমহামাত্রের পদ সৃষ্টি করে ব্রাহ্মণদের যজন-যাজন ও অন্যান্য সুবিধায় হস্তক্ষেপ করেন।
  • (৪) অশোক দণ্ড সমতা ও ব্যবহার সমতা নীতি চালু করে বিচার ও আইনের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণদের বিশেষ অধিকার ভোগ লোপ করেন।
  • (৫) পুষ্যমিত্র শুঙ্গের বিদ্রোহের পশ্চাতে ব্রাহ্মণদের ষড়যন্ত্র ছিল যার ফলে শেষ মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথ নিহত হন। সুতরাং পণ্ডিত শাস্ত্রী বলেন যে, উপরোক্ত কারণে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।

ডঃ রায়চৌধুরীর অভিমত

ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতকে খণ্ডন করেছেন। তার যুক্তি গুলি হল –

  • (১) পশুবলি অশোকের বহু আগে শ্রুতিশাস্ত্রে ও উপনিষদে নিষিদ্ধ হয়েছিল। অশোক পশুবলি নিষিদ্ধ করে কোনো শাস্ত্রবিরোধী কাজ করেননি।
  • (২) অশোক শূদ্রবংশীয় ছিলেন না। তিনি ক্ষত্রিয় বংশীয় ছিলেন এমন প্রমাণ বৌদ্ধ, জৈন সাহিত্যে পাওয়া যায়। মুদ্রারাক্ষস নাটকে মৌর্য বংশের প্রতিষ্ঠাতা চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্র বলা হলেও মুদ্রারাক্ষস অনেক পরের যুগের রচনা। বৌদ্ধ মহাবংশ, মহাপরিনির্বাণ সূত্র ও জৈন পরিশিষ্ট পার্বনে চন্দ্রগুপ্তকে পিপ্পলীবনের ক্ষত্রিয় বংশের রাজা বলা হয়েছে।
  • (৩) অশোক ব্রাহ্মণদের “মিথ্যা বা ভণ্ড দেবতা” বলেন বলে যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় তা ঠিক নয়। কারণ, পণ্ডিত শাস্ত্রী যে পদটির এই অর্থ করেছেন, পণ্ডিত সিলভ্যাঁ লেভি তার অন্য অর্থ করেছেন। সিলভ্যাঁ লেভির ব্যাখ্যা অনুসারে “এতদিন যারা দেবতাদের সঙ্গে অমিশ্রিত ছিল তিনি তাদের মিশ্রিত করেছেন।” এর দ্বারা ব্রাহ্মণদের নিন্দা করা হয়নি।
  • (৪) ধর্মমহামাত্র নিয়োগ করার জন্য ব্রাহ্মণদের কোনো ক্ষতি হয়নি। তাঁরা শাসন বিভাগের কাজ করে ব্রাহ্মণদেরও উপকার করতেন, তাদের প্রতি উদারতা দেখাতেন। ব্রাহ্মণরাও সম্ভবত এই পদে নিযুক্ত হতে পারত।
  • (৫) দণ্ড সমতা ও ব্যবহার সমতার অর্থ পণ্ডিত শাস্ত্রী যা করেছেন তা নাও হতে পারে। এর অর্থ হতে পারে সমগ্র সাম্রাজ্যে একই দণ্ড ও আইনের প্রচলন। কারণ রাজুকদের হাতে অশোক বিচারের স্বাধীনতা দেন। যাতে সকল রাজুক একই আইন ও দণ্ড মেনে চলেন, সম্ভবত সেজন্যই অশোক এই নিয়ম চালু করেন।
  • (৬) দণ্ড সমতা নীতির দ্বারা বিচারালয়ে ব্রাহ্মণের বিশেষ অধিকার, যথা, ব্রাহ্মণের মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি নষ্ট হয়, পণ্ডিত শাস্ত্রীর এই মত ঠিক নয়। কারণ, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রাজদ্রোহের অপরাধী ব্রাহ্মণকে জলে ডুবিয়ে মারার বিধান দেখা যায়।
  • (৭) অশোকের বংশধরদের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের বিরোধ তীব্র হয়, ডঃ শাস্ত্রীর এই মতও ডঃ রায়চৌধুরী মানেননি। কারণ অশোকের বংশধর জলৌকার প্রতি কাশ্মীরের ব্রাহ্মণরা সদিচ্ছা দেখায়।
  • (৮) পুষ্যমিত্র শুঙ্গ বৌদ্ধ-বিদ্বেষী ও ব্রাহ্মণ বিদ্রোহের নেতা ছিলেন এবং তিনিই মৌর্য সম্রাট বৃহদ্রথের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণদের নেতৃত্ব দেন এমন প্রমাণ নেই। পুষ্যমিত্র ভারহুতের বৌদ্ধ স্তূপের যে বেস্টনী তৈরি করেন তা তার বৌদ্ধদের প্রতি শ্রদ্ধার পরিচয় দেয়। এই সকল যুক্তির সাহায্যে ডঃ রায়চৌধুরী, ব্রাহ্মণ বিদ্রোহের তত্ত্বকে নস্যাৎ করেছেন।

বনগার্ড লেভিনের অভিমত

সম্প্রতি রুশ গবেষক বনগার্ড লেভিন ব্রাহ্মণ্য বিদ্রোহের তথ্যের ওপর নতুনভাবে আলোকপাত করেছেন। যেমন –

  • (১) লেভিন অশোকাবদান, সূত্রালঙ্কার প্রভৃতি উপাখ্যানের সাহায্যে দেখাতে চেষ্টা করেছেন যে, অশোক তাঁর রাজত্বের শেষদিকে ধর্মসহিষ্ণুতা নীতি ও সকল ধর্মের প্রতি সমান আচরণ নীতি থেকে বিচ্যুত হন।
  • (২) তিনি এই সময় বৌদ্ধধর্মের প্রতি গোড়া আনুগত্য দেখান। তিনি রাজকোষের সমুদায় অর্থ বৌদ্ধ সঙ্ঘারাম ও বিহারে দান করা শুরু করেন। এজন্য তিনি অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায় বিশেষত, ব্রাহ্মণদের রোষে পড়েন।
  • (৩) লেভিন বলেন যে, “আমাদের মতে অশোকের রাজত্বের শেষ দিকে তাঁর বৌদ্ধদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নীতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্ষমতাশালী ব্রাহ্মণ সাম্প্রদায়ের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।”
  • (৪) পণ্ডিত শাস্ত্রী যে যুক্তিগুলির ভিত্তিতে ব্রাহ্মণ বিদ্রোহের সিদ্ধান্তে এসেছেন তাতে ভুল থাকলেও, তার সিদ্ধান্ত অন্য যুক্তি প্রমাণের ভিত্তিতে সমর্থনযোগ্য।

অশোকের অহিংসা নীতি

ডঃ রায়চৌধুরী ও আরও অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন যে, অশোকের অহিংসা ও ধর্মবিজয় নীতি মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের জন্য বাস্তবিকভাবে দায়ী ছিল। যেমন –

  • (১) অশোকের অহিংসা নীতি গ্রহণের জন্য সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। প্রাদেশিক শাসনকর্তারা স্বেচ্ছাচারী ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। অশোক ও তাঁর বংশধররা তাদের দমন করতে পারেননি। তক্ষশিলা ও কলিঙ্গের বিদ্রোহ একথা প্রমাণ করে। অশোক তাঁর কলিঙ্গ লিপিতে এজন্য অমাত্যদের সতর্ক করে দেন। তাতে কোনো ফল হয়েছিল বলে মনে করা যায় না। দিব্যাবদানেও দুষ্ট অমাত্যদের অত্যাচারের কাহিনী জানা যায়।
  • (২) ডঃ রায়চৌধুরী অশোকের অহিংসা নীতি গ্রহণের ফলে মৌর্য সাম্রাজ্যের ক্ষাত্রশক্তি নষ্ট হয় বলে মনে করেন। যে সম্রাট বিহার যাত্রার স্থলে ধর্ম যাত্রা প্রবর্তন করেন; যিনি ভেরী ঘোষকে, ধম্ম ঘোষে পরিণত করেন, তাঁর নীতির ফলে সেনাদল নির্বীর্য হয়ে পড়ে। তাদের মনোবল ভেঙে যায়।
  • (৩) উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে তখন ব্যাকট্রীয় গ্রীক আক্রমণের আশঙ্কা দেখা যায়। এই অবস্থায় ভারতের সিংহাসনে পুরু বা চন্দ্রগুপ্তের মত যোদ্ধার দরকার ছিল অশোকের মত ভাববাদী, স্বপ্ন-দর্শন কারী সম্রাট সাম্রাজ্য রক্ষায় অপারগ ছিলেন।

ড. রায়চৌধুরীর মত খণ্ডন

  • (১) রোমিলা থাপার নামে এক ঐতিহাসিক অবশ্য অশোকের অহিংসা নীতির ফলে প্রদেশে বিদ্রোহ হয় তা স্বীকার করেন না। তিনি বলেন যে, অশোককে যতটা শান্তিবাদী বলা হয় তিনি আদপেই ততটা অহিংস ছিলেন না। তিনি সেনাদল ভেঙে দেননি বা বিদ্রোহী আটবিকদের সতর্ক করে দিতে ছাড়েননি।
  • (২) তিনি কলিঙ্গ যুদ্ধে বহু লোক নিহত হওয়ায় অনুতপ্ত হলেও কলিঙ্গবাসীদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেননি। সুতরাং তাঁর অহিংসা নীতির ফলে মৌর্য সাম্রাজ্য ভেঙে যায় একথা মনে করা চলে না। অশোক যুদ্ধকে ত্যাগ করেন, যুদ্ধকে ঘৃণা করে নয়, যুদ্ধের আর দরকার ছিল না বলে।
  • (৩) বাসামের মতে, অশোক ঔপজাতিক বিদ্রোহী যথা আটবিকদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান না চালিয়ে জন কল্যাণমূলক কাজ এবং ধম্ম প্রচার করে তাদের সভ্য এবং সাম্রাজ্যের সঙ্গে সংহতিশীল হতে সাহায্য করেন।

অশোকের দায়িত্ব খণ্ডন

  • (১) অশোকের অহিংসা নীতির ফলে সাম্রাজ্য ভেঙে যায় এই মতকে ডঃ নীলকণ্ঠ শাস্ত্রী অন্যভাবে খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন যে, যুদ্ধ দ্বারা কেবল রাজ্য শক্তিশালী হয় না। অশোক প্রজাকল্যাণ ও অহিংসা নীতির দ্বারা সাম্রাজ্যকে প্রকৃতই শক্তিশালী করেন।
  • (২) তাঁর মৃত্যুর ৫০ বছর পরে যে সাম্রাজ্য ভেঙে যায় সেজন্য তাকে দায়ী করা অযৌক্তিক। তিনি দক্ষিণের তামিল রাজ্যগুলি জয় করেননি বলে অভিযোগও যুক্তিহীন। কারণ, এই রাজ্যগুলিতে অশোকের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তৃত হয়েছিল।
  • (৩) হিন্দুকুশের অপর পারে বালুকাময় মরুভূমিতে রথ ও হাতী নিয়ে রাজ্য জয় করার দাবী হল অযৌক্তিক। সুতরাং অশোকের আর যুদ্ধের প্রয়োজন ছিল না, এটাই বলা উচিত। সাম্রাজ্যকে তিনি সংস্কৃতি ও শাসন ব্যবস্থার বাঁধনে মজবুত করার প্রকৃত চেষ্টা করেন।

প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের বিদ্রোহ

  • (১) ডঃ রায়চৌধুরী প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের বিদ্রোহকে মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের একটি বড় কারণ বলেছেন। অশোক রাজুক ও মহামাত্রদের হাতে এত বেশী ক্ষমতা দেন যে, তার মৃত্যুর পর তাদের নিয়ন্ত্রণ করার মত কোনো শাসক ছিল না।
  • (২) উত্তর-পশ্চিমে সুভগসেন, মধ্যপ্রদেশে বীরসেন স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন। অশোকের উত্তরাধিকারীরা তার মত যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন না। বৃহৎ মৌর্য সাম্রাজ্যকে সুশাসন করার মত যোগ্যতা তাদের ছিল না।
  • (৩) তক্ষশিলায় প্রজাদের এক বিদ্রোহের কথা বনগার্ড লেভিন বলেছেন। অশোকাবদান থেকে জানা যায় যে, তক্ষশিলায় প্রজা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন কুঞ্জর কর্ণ নামে এক স্থানীয় নেতা। রাজপুত্র কুনালকে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য পাঠান হয়।
  • (৪) মোট কথা, অশোকের বংশধরেরা সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারান। এমনকি কোনো কোনো অঞ্চল মৌর্য শাসনমুক্ত হয়ে আত্ম নিয়ন্ত্রণ লাভ করে। অশোকের বংশধররা সেনাদলের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখায় সেনাদলের আনুগত্য হারিয়ে ফেলেন। তাদের সেনাপতি পুষ্যামিত্র শুঙ্গ এর পুরো সুযোগ নেন।

সিংহাসন নিয়ে বিরোধ

অশোকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিরোধের জন্য মৌর্য সাম্রাজ্য ভাগ হয়ে যায়। কুনাল, সম্প্রতি, জলৌকা প্রমুখ আলাদাভাবে রাজ্য শাসন করেন।

অর্থনৈতিক কারণ

  • (১) অশোক তার জনকল্যাণ প্রকল্প এবং স্তম্ভ নির্মাণের জন্য রাজকোষের বিরাট অর্থ ব্যয় করেন। কোশাম্বীর মতে, মৌর্য অর্থনীতির সঙ্কট যে ঘটেছিল তার প্রমাণ পরবর্তী মৌর্য রাজাদের মুদ্রায় খাদের ভাগ খুব বেশী ছিল।
  • (২) অর্থশাস্ত্রে দেখা যায় যে, অভিনেতা ও গণিকাদের ওপরও মৌর্য সম্রাটরা কর বসাতেন। আসলে বিরাট সংখ্যক কর্মচারীদের নগদ বেতন দিতে মৌর্য সরকারের প্রভূত অর্থের দরকার হত। মৌর্য সাম্রাজ্যের শেষ দিকে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য ছিল না। এজন্য মুদ্রায় খাদ দিতে হয়।
  • (৩) হস্তিনাপুর ও শিশুপালগড়ে খননকার্যের দ্বারা মৌর্য যুগের সমৃদ্ধি তার স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের দ্বারা প্রমাণিত হয়। সুতরাং অনেকে মৌর্য যুগে আর্থিক অবক্ষয় তত্ত্ব স্বীকার করেন না। কিন্তু যদিও মৌর্য অর্থনীতি প্রথমে বেশ উন্নতিশীল ছিল, পরের দিকে সেই উন্নতি অব্যাহত ছিল না।
  • (৪) তাছাড়া দক্ষিণের ভূমি ছিল উত্তরের তুলনায় অনুর্বরা। গাঙ্গেয় উপত্যকা সম্পদশালী, উর্বরা এবং এ অঞ্চলে অনেক নগর ছিল সত্য, তুলনামূলকভাবে দক্ষিণ ছিল অনুর্বরা ও অনগ্রসর।
  • (৫) সকল অঞ্চল থেকে প্রয়োজন মত রাজস্ব আদায় হত না। রোমিলা থাপার বলেন যে, মৌর্য যুগে শহরগুলির যেমন উন্নতি হয়, গ্রামগুলির সেরূপ উন্নতি হয়নি। এই কারণে সাম্রাজ্যের মধ্যে ঐক্য দৃঢ় ছিল না।

অশোকের বৌদ্ধনীতির ফল

  • (১) অশোকাবদানের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায় যে, তাঁর রাজত্বের শেষ দিকে অশোক বৌদ্ধসঙ্ঘে ব্যাপক দান-ধ্যান করে রাজকোষ শূন্য করে ফেলেন। এজন্য মন্ত্রীদের পরামর্শে তার উত্তরাধিকারী সম্প্রতি রাজকোষ থেকে অশোকের অর্থ ব্যয়ের অধিকার রদ করেন।
  • (২) অশোক এতে না দমে তাকে যে সোনা ও রূপার পাত্রে খাদ্য পরিবেশন করা হত সেই পাত্রগুলি সঙ্ঘে দান করে দেন। এর পর মন্ত্রীদের কাছে অশোক অভিযোগ করেন যে তার জীবিতকালেই তার ক্ষমতা হরণ করা হয়েছে।
  • (৩) বনগার্ড লেভিন বলেন যে, যদিও অশোকাবদানের এই কাহিনীর সমর্থনে কোনো শিলালিপির সাক্ষ্য নেই, তথাপি বিভিন্ন সাহিত্যিক উপাদান দ্বারা এই কাহিনী সমর্থিত হয়। অশোকের দ্বিতীয়া রানী করুবকীর শিলালিপিও অশোকের ক্ষমতা হ্রাসের প্রমাণ দেয়।

কাহিনী থেকে সিদ্ধান্ত

অশোকাবদানের এই কাহিনী থেকে আমরা নিম্নলিখিত সিদ্ধান্তগুলি নিতে পারি। যথা –

  • (১) অশোক শেষ বয়সে শাসনযন্ত্রের ওপর তার ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন।
  • (২) তার মন্ত্রী, অমাত্য ও তাঁর পৌত্র সম্প্রতি ক্ষমতা অধিকার করেন। হিউয়েন সাঙ একথা সমর্থন করেন।
  • (৩) সাম্রাজ্যে নিদারুণ অর্থসঙ্কট দেখা দেয়। অবদানের কাহিনী তা প্রমাণ করে।
  • (৪) অশোক সকল ধর্মের প্রতি সমান দৃষ্টি ত্যাগ করে বৌদ্ধ ঘেঁষা হয়ে পড়েন। বনগার্ড লেভিন বলেন যে, এই সকলের সম্মিলিত ফল মৌর্য সাম্রাজ্যের ভাঙ্গনের সূচনা করে।

মৌর্য শাসন ব্যবস্থার ত্রুটি

  • (১) রোমিলা থাপারের মতে, মৌর্য শাসন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত। আমলাতন্ত্র, একমাত্র রাজার নির্দেশেই চলত। অশোকের পর যোগ্য রাজা না থাকায় শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কর্মচারীরা রাজার প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য দিত।
  • (২) এক রাজার মৃত্যু হলে নতুন রাজার অনুগত কর্মচারী নিয়োগ করা হত। এর ফলে শাসন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা ঘটত। মৌর্য সরকারী কর্মচারীরা একটি বিশেষ শ্রেণী থেকে নিযুক্ত হত। মেগাস্থিনিস এদের কাউন্সিলার ও এসেসার বলেছেন।
  • (৩) এই কর্মচারী শ্রেণী রাষ্ট্র বা জনগণের প্রতি অনুগত ছিল না। রাজার প্রতি ব্যক্তিগত আনুগত্য দিত। এরা রাজা ও প্রজার মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করেনি। জনমতকে প্রকাশ করার জন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকায় শাসক ও প্রজাদের মধ্যে ব্যবধানও বাড়তে থাকে।
  • (৪) গণরাজ্যগুলি ধ্বংস হওয়ার ফলে মৌর্য যুগে লোকের মধ্যে রাষ্ট্র চেতনা তেমন ছিল না। মৌর্য সম্রাটরা জনমতকে গ্রহণ করার ব্যবস্থা করে রাষ্ট্র চেতনা বাড়াবার কোনো চেষ্টা করেননি। এর ফলে রাষ্ট্রে ঐক্যবোধ জাগতে পারে নি।

বৈদেশিক আক্রমণ

  • (১) এই সকল আভ্যন্তরীণ কারণেই মৌর্য সাম্রাজ্যের অথবা ভারতের প্রথম ঐতিহাসিক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এই সুযোগে ব্যাকট্রীয় গ্রীকজাতি উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়ে। ভারতের ইতিহাসে এটা বরাবর দেখা গেছে যে, কেন্দ্র দুর্বল হলেই বিদেশী শক্তি। ভারত আক্রমণ করে। এক্ষেত্রেও তাই ঘটে।
  • (২) দিমিত্র বা ডিমিট্রিয়াস পাটলিপুত্র পর্যন্ত তার বাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসেন। এই সময় খ্রিস্ট পূর্ব ১৮৭ বা ১৮৫ অব্দে মৌর্য রাজা বৃহদ্রথকে হত্যা করে তার ব্রাহ্মণ সেনাপতি পুষ্যামিত্র শুঙ্গ মৌর্য সিংহাসন দখল করেন।

উপসংহার :- আধুনিক ইতিহাস চর্চার জনক ইবনে খালদুন বলেছেন, ”প্রতিটি সাম্রাজ্যের জন্ম আছে, উত্থান আছে এবং পতনও আছে।” যাইহোক সভ্যজগতে অশোক ভারতের যে নৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দু’হাজার বছর পর আজও তা অম্লান।

(FAQ) মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনে ব্রাহ্মণদের বিরোধিতাকে দায়ী করেছেন কে?

পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী।

২. মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনে অশোকের অহিংসা নীতিকে দায়ী করেছেন কে?

ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী।

৩. মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনে অর্থনৈতিক কারণকে দায়ী করেছেন কে?

ডি ডি কোশাম্বী।

৪. মৌর্য শাসন ব্যবস্থার ত্রুটির কথা কে বলেছেন?

রোমিলা থাপার।

Leave a Reply

Translate »