মৌর্য শাসন ব্যবস্থা

মৌর্য শাসন ব্যবস্থা প্রসঙ্গে পূর্ববর্তী শাসনের কাঠামো, রাজার ক্ষমতা, রাজার বিভিন্ন কর্তব্য, বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব, আইন রচনার দায়িত্ব, রাজার স্বৈর ক্ষমতা সম্পর্কে বিতর্ক, মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ, মন্ত্রী পরিষদের ক্ষমতা ও কর্তব্য, অমাত্য ও সচিব, অধ্যক্ষ, কর্মচারীদের বেতন, প্রদেশ, প্রদেশের শাসনকর্তা, পৌরশাসন ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে জানবো।

মৌর্য শাসন ব্যবস্থা

ঐতিহাসিক ঘটনামৌর্য শাসন ব্যবস্থা
প্রতিষ্ঠাতাচন্দ্রগুপ্ত মৌর্য
শ্রেষ্ঠ রাজাঅশোক
উপাদানঅর্থশাস্ত্র, ইন্ডিকা, অশোকের শিলালিপি
অর্থশাস্ত্রকৌটিল্য
ইন্ডিকামেগাস্থিনিস
মৌর্য শাসন ব্যবস্থা

ভূমিকা :- মৌর্য শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্যগুলি কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, মেগাস্থিনিসের ইণ্ডিকা, সম্রাট অশোকের শিলালিপিগুলি, গিরিনগর শিলালিপি এবং অন্যান্য সূত্র থেকে পাওয়া যায়।

পূর্ববর্তী শাসনের কাঠামো

  • (১) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তার বিশাল সাম্রাজ্যকে শাসন করতে যে শাসন ব্যবস্থা গঠন করেন তার সকল কিছু তিনি উদ্ভাবন করেন বলে মনে করা যায় না। অনেকে মনে করেন যে, অর্থশাস্ত্রের চিহ্নিত পথ ধরে চন্দ্রগুপ্ত তাঁর শাসন গড়ে তুলেন।
  • (২) অর্থশাস্ত্র খ্রি পূর্ব চতুর্থ শতকের ঔপজাতিক ও ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলিকে গ্রাস করে এক অতিকায় রাষ্ট্র ও শাসনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। চন্দ্রগুপ্তের শাসন ব্যবস্থা এই নিয়মেই চলে। কিন্তু অনেকে এই সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাকে স্বীকার করেন না। তারা বলেন যে, চন্দ্রগুপ্তের আগে থেকেই মগধের শাসন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
  • (৩) চন্দ্রগুপ্ত পূর্বের সেই কাঠামোকে কাজে লাগান। তবে তাতে তিনি অনেক নতুন জিনিস যোগ করেন। বৈদিক সভ্যতার উপজাতীয় রাজ্যগুলি ধ্বংস হয়ে উত্তর ভারত -এ বড় বড় রাজ্য গড়ে উঠলে শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ঘটে।
  • (৪) ক্রমে মগধ অন্য সকল রাজ্য গ্রাস করে সার্বভৌম শক্তিতে পরিণত হয়। সর্বশক্তিমান, সর্বময় ক্ষমতার আধার হিসেবে রাজাকে কল্পনা করা হয়। হিন্দু রাষ্ট্রচিন্তায় রাষ্ট্র ছিল একটি মণ্ডল বা চক্র। তার ছিল ৭টি অঙ্গ, যার দ্বারা রাষ্ট্রের চাকা চলত। রাষ্ট্রের পরিচালক ছিলেন রাজ চক্রবর্তী।

রাজার ক্ষমতা

  • (১) মৌর্য শাসন ব্যবস্থায় কেন্দ্রিকতা খুব প্রবল ছিল। এই শাসন ব্যবস্থার কেন্দ্রে বিরাজ করতেন রাজা, সকল ক্ষমতার আধার ও প্রতীক হিসেবে। যদিও মৌর্য রাজারা নিজেদের ঈশ্বরের অংশ বলে দাবী করতেন না, তবে তারা নিজেদের “দেবানাং প্রিয় অর্থাৎ দেবতাদের প্রিয় বলে দাবী করতেন। এর অর্থ হল তারা সাধারণ স্তরের লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠত্ব দাবী করতেন।
  • (২) রাজার হাতে এই ক্ষমতা অনেক দিন ধরে জড় হয়েছিল। বৈদিক যুগের ঔপজাতিক রাজ্যগুলি এবং তার সভা ও সমিতিগুলি নষ্ট হলে রাজার ক্ষমতা বেড়ে যায়। মগধ সাম্রাজ্য -এর প্রসার হলে স্থানীয় শাসনকেন্দ্রগুলি ভেঙে যায়, মগধের অর্থাৎ মগধ সম্রাটের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। অর্থশাস্ত্রে তাই আমরা রাষ্ট্র ও রাজার একচ্ছত্র ক্ষমতার কথা দেখতে পাই।
  • (৩) যে কোনো উপায়ে এমন কি পশুশক্তি ও প্রবঞ্চনার দ্বারাও রাজশক্তির বিস্তারকে অর্থশাস্ত্রে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। রাজার সেনাদল, রাজকোষে অর্থ তাঁর ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। এভাবে চন্দ্রগুপ্তের আমলে মৌর্য রাজতন্ত্র সকল শক্তির আধারে পরিণত হয়। রাজা বংশানুক্রমিক অধিকারে রাজ্য শাসন করতে থাকেন।

রাজার বিভিন্ন কর্তব্য

  • (১) ক্ষমতা ভোগ করার সঙ্গে সঙ্গে রাজার কর্তব্যের একটা ধারণা চন্দ্রগুপ্তের শাসন ব্যবস্থায় পাওয়া যায়। রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে শাসন, ধর্ম রক্ষক হিসেবে রাজার কাজ ছিল প্রজাদের ধন, প্রাণ রক্ষা করা, প্রবলের অত্যাচার হতে দুর্বলকে রক্ষা করা। এজন্য তাকে তার কর্মচারীদের দ্বারা সারা রাজ্যে শান্তি রক্ষার ব্যবস্থা করতে হত।
  • (২) দেশরক্ষার প্রয়োজন হলে রাজাকে প্রধান সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধযাত্রা করতে হত। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এরূপ বহু যুদ্ধ করে রাজ্যসীমা বাড়ান। অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। অর্থশাস্ত্রের মতে, রাজাকে যোগ্য লোক বাছাই করে মন্ত্রী, অমাত্য, সচিব প্রভৃতি পদে নিয়োগ করতে হত, তাদের নিয়মিত নির্দেশ দিতে হয়।
  • (৩) রাত্রিকালে তাকে গুপ্তচর বা প্রতিষেদকদের কাছ থেকে রাজ্যের অবস্থা জানতে হত। রাজ্যে যে কোনো কর্মচারী একমাত্র রাজার আদেশে নিযুক্ত হত। সপ্তম স্তম্ভলিপি ও পঞ্চম শিলালিপিতে একথা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ কর্মচারীরাও সম্রাটকে আনুগত্য জানাতে বাধ্য ছিল।
  • (৪) সর্বোপরি, তাকে তাঁর আদেশ বা শাসনগুলি স্থির করে রাজ্যের সর্বত্র তা জানিয়ে দিতে হত। আইন ভঙ্গকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হত। এছাড়া রাজস্ব আদায় ও কর্মচারীদের নগদ বেতন দেওয়া ছিল রাজার অপর একটি দায়িত্ব।
  • (৫) অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, রাজা হবেন তেজোময় ও সদা সতর্ক। প্রজার সুখকে তিনি নিজের সুখ বলে মনে করবেন। প্রতিদিন তিনি অধ্যয়ন ও মননে কিছু সময় ব্যয় করবেন। সেই মনন থেকে আসবে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা।
  • (৬) দিবা রাত্রি তিনি বিভিন্ন কর্তব্য কর্ম পালন করবেন। রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি স্থির করবেন। সেনাদলের প্রধান হিসেবে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা রচনায় অংশ নেবেন। বিভিন্ন বাহিনীর তত্ত্বাবধান ও পরিদর্শন করবেন।

বিচার বিভাগীয় দায়িত্ব

রাজার বিচার বিভাগীয় কর্তব্য কম ছিল না। কারণ, রাজা ছিলেন রাষ্ট্রের সর্বপ্রধান বিচারক। মেগাস্থিনিসের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, চন্দ্রগুপ্ত সারাদিন রাজসভায় বসে থেকে প্রজাদের আর্জি শুনতেন ও বিচার করতেন। এমন কি তার অঙ্গ সংবাহনের সময়ও তিনি সভা ছেড়ে যেতেন না। কৌটিল্যও বলেছেন যে, বিচারের রায় ত্বরায় না দিলে তা অবিচারে পরিণত হতে পারে।

আইন রচনার দায়িত্ব

  • (১) রাজার আইন রচনার দায়িত্বও ছিল। কোটিল্যর মতে, রাজশাসনগুলি বা রাজার হুকুমনামাগুলিই ছিল প্রকৃত আইন। কৌটিল্যর মতে, প্রয়োজন হলে তিনি প্রথা, রীতি পরিবর্তন করে নতুন আইন রচনা করতে পারতেন।
  • (২) নিরপেক্ষভাবে আইনের প্রয়োগ ও দোষীর শাস্তি বিধান ছিল রাজার দায়িত্ব। দেশ শাসনের জন্য তিনি দরকার হলে যে অনুশাসন দিতেন তা আইনে পরিণত হত। এজন্য অর্থশাস্ত্রে রাজশাসনকে আইনের উৎস বলা হয়েছে। রাজা ছিলেন ধর্ম অর্থাৎ ন্যায়বিচার ও আইনের প্রবর্তক।
  • (৩) মগধের রাজবংশগুলির রাজ্য বিস্তার নীতির ফলে গণরাজ্য ও সঙ্ঘ বা প্রজাতান্ত্রিক উপজাতি রাজ্যগুলি ধ্বংস হয়। এর ফলে মগধে কেন্দ্রিকতার প্রবণতা বাড়ে। মৌর্য শাসনের সময় এই কেন্দ্রিকতা চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়। তাই আমরা মৌর্য সম্রাটদের হাতে এত ক্ষমতা ন্যস্ত থাকতে দেখি।

রাজার স্বৈর ক্ষমতা সম্পর্কে বিতর্ক

উপরের বিবরণ থেকে প্রমাণিত হয় যে, মৌর্য সম্রাটরা ছিলেন স্বৈর ক্ষমতার অধিকারী। তারা ছিলেন একাধারে আইন, বিচার, শাসন সকল বিষয়ের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানে তাদের ক্ষমতার ওপর দৃশ্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না বলে ভিনসেন্ট স্মিথ মৌর্য রাজতন্ত্রকে বল্গাহীন স্বৈরতন্ত্র বলেছেন। ডঃ হেমচন্দ্র রায়চৌধুরী অবশ্য বলেন যে, রাজার ক্ষমতার ওপর পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। যেমন –

  • (১) ‘পোরান পকিতি’ অর্থাৎ প্রাকৃতিক আইন যা (Natural law) বহুকাল ধরে চলে আসছিল রাজা তা মানতে বাধ্য ছিলেন।
  • (২) সে যুগে রাজ-কর্তব্য ছিল প্রজাদের নিকট হতে করের বিনিময়ে প্রজাদের মঙ্গলের জন্য নিরন্তর চেষ্টা করা। অর্থশাস্ত্রে রাজকর্তব্যের এরূপ ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। মৌর্য সম্রাটরা প্রজাদের নিজ সন্তান বলে দাবী করতেন।
  • (৩) রাজা আইন ঘোষণা করলেও, তাকে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হত। নাহলে বিষম লোক নিন্দা হত, প্রজাবিদ্রোহ ঘটতে পারত।
  • (৪) মন্ত্রী ও মন্ত্রী পরিষদের পরামর্শ রাজাকে নিতে হত। যদিও মৌর্য মন্ত্রীরা জনপ্রতিনিধি ছিলেন না, তবুও তাদের পরামর্শ সহসা রাজা অগ্রাহ্য করতে পারতেন না।
  • (৫) অশোকের শিলালিপিগুলিতে মৌর্য সম্রাটদের রাজ-কর্তব্যের একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। তিনি ষষ্ঠ ও জুনাগড় শিলালিপিতে নিজেকে প্রজাদের কাছে ঋণে আবদ্ধ বলেছেন। যেহেতু প্রজারা তাকে কর ও আনুগত্য দিত সেহেতু তিনি তাদের প্রতি কর্তব্য পালনে বাধ্য ছিলেন। এই চিন্তাধারা সম্ভবত চন্দ্রগুপ্তের আমলেও ছিল। কোশাম্বী এই চিন্তাধারার মধ্যে চুক্তিতত্ত্ব বা Contract theory লুকিয়ে আছে বলে মনে করেন।
  • (৬) চন্দ্রগুপ্ত ও অশোক উভয়েই প্রজাদের সন্তানের মতই দেখতেন। এই পিতৃতান্ত্রিক রাজতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রকে প্রশমিত করেছিল। ভারতীয় রাষ্ট্রাদর্শে রাজারা প্রায়ই প্রজাদের সন্তানবৎ দেখতেন। ফলে রাজপদ শুধুমাত্র ক্ষমতার আস্ফালন ও ভোগবিলাসের জন্য ছিল না, প্রজাদের মঙ্গল করার জন্য এই পদে রাজা তাঁর শ্রম, চিন্তা, উদ্যোগ ব্যয় করতেন।
  • (৭) মৌর্য সম্রাটরা দৈবীসত্বের ধারণা পোষণ করতেন না। তারা ছিলেন “দেবতাগণের প্রিয়” (দেবানাম পিয়)। তাঁরা নিজেদের দেবতার আদেশ প্রাপ্ত বলে কখনও দাব করেননি।
  • (৮) অশোকের সাম্রাজ্যবাদী অভিধাগুলি যথা ‘মহারাজা’, ‘স্বরাজ্য’, ‘আধিপত্য’ প্রভৃতি শব্দ কখনও ব্যবহার করা হয়নি। অর্থাৎ মৌর্য সম্রাটরা তাদের তথাকথিত স্বৈরক্ষমতা জাহির করেন না। তারা শুধু নিজেদের ‘মগধের রাজা’ বলেছেন।
  • (৯) গুপ্ত অনুশাসনগুলির সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে গুপ্ত রাজাদের মত আড়ম্বরপূর্ণ অভিধা বা সাম্রাজ্যের আড়ম্বর অশোকের অনুশাসনে নেই। এখানে আছে, বিনয় ও নম্রতা।

মন্ত্রিণ ও মন্ত্রী পরিষদ

  • (১) মৌর্য সম্রাটদের অধীনে বিভিন্ন পদমর্যাদাভোগী মন্ত্রী ছিল। মন্ত্রিণগণ ছিল রাজার ব্যক্তিগত পরামর্শদাতা। এদের বেতন ছিল বার্ষিক ৪৮ হাজার পান। বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ, অত্যন্ত অভিজ্ঞ, বিশ্বাসী ব্যক্তি এই পদে নিযুক্ত হত। কৌটিল্য ছিলেন এরূপ একজন মন্ত্রী।
  • (২) মেগাস্থিনিস বর্ণিত কাউন্সিলার ও এসেসর বা উপদেষ্টা ও রাজস্ব নির্ধারকদের সঙ্গে এই সচিব বা মন্ত্রিণদের বিশেষ মিল দেখা যায়। মন্ত্রীণগণ রাজ্য শাসন নীতি, পররাষ্ট্র নীতি থেকে সকল বিষয়ে রাজাকে নিরন্তর পরামর্শ দিত।

সাধারণ মন্ত্রী

  • (১) মৌর্য সাম্রাজ্যে সাধারণ মন্ত্রীরাও ছিলেন। এই সাধারণ মন্ত্রীরা জরুরী অবস্থায় মন্ত্রী পরিষদের অধিবেশনে বসে রাজাকে পরামর্শ দিত। এই সভায় উচ্চমন্ত্রী বা মন্ত্রীণরাও থাকত। সাধারণ মন্ত্রীরা পদমর্যাদায় মন্ত্রিণ অপেক্ষা নীচু ছিল। এদের বেতন ছিল বার্ষিক ১২ হাজার পান।
  • (২) এরা ব্যক্তিগতভাবে রাজাকে পরামর্শ দিতে পারত না। জরুরী অবস্থায় এরা একত্রে মন্ত্রি পরিষদের সভায় বসে সিদ্ধান্ত নিত। মতবিরোধ হলে ‘ভূষিত’ অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠের মত গৃহীত হত।

মন্ত্রী পরিষদের ক্ষমতা ও কর্তব্য

  • (১) মন্ত্রী পরিষদের ক্ষমতা ও কর্তব্য সম্পর্কে অর্থশাস্ত্র ও পাণিনি এবং অশোকের শিলালিপি থেকে ধারণা করা যায়। অশোকের ষষ্ঠ শিলালিপির মতে রাজা অনুপস্থিত থাকলে মন্ত্রিপরিষদ প্রয়োজন হলে স্বইচ্ছায় মিলিত হত।
  • (২) রাজার আদেশের সঙ্গে মন্ত্রীপরিষদের মত বিরোধ হলে সেকথা রাজাকে জানাতে হত। রাজা মন্ত্রী পরিষদের মত মানতে বাধ্য ছিলেন এমন কথা বলা যায় না। ইচ্ছা করলে তিনি এই মত অগ্রাহ্য করতে পারতেন। মন্ত্রী পরিষদ বিভিন্ন পরিকল্পনাগুলির রূপায়নের সময়সীমা বেঁধে দিত।

অমাত্য ও সচিব

  • (১) রাজা একা এত বড় রাজ্য শাসন করতে পারতেন না। মন্ত্রিণ বা উচ্চমন্ত্রী এবং মন্ত্রী পরিষদের সদস্যদের দ্বারা এত বড় সাম্রাজ্য শাসন করা সম্ভব ছিল না। রাজ্যের শাসন পরিচালনার জন্য রাজা নানা বর্গের কর্মচারী নিযুক্ত করতেন। এই সকল উচ্চ কর্মচারীরা ছিল অমাত্য ও সচিব।
  • (২) মেগাস্থিনিস এঁদের একটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে গণ্য করে উপদেষ্টা ও রাজস্ব-সংগ্রাহক (Councillors and Assessors) বলেছেন। আসলে মৌর্য যুগে একটি বিশেষ শ্রেণী থেকে এসকল কর্মচারী নিযুক্ত হত। এরা একটি শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিল।
  • (৩) এজন্যই মেগাস্থিনিস এদের একটি স্বতন্ত্র জাতি বলে ভুল করেন। এরা সকলেই ছিল অভিজাত শ্রেণী। বৌদ্ধ সাহিত্যে ‘অমাত্যকুর্ল’ কথাটির উল্লেখ দেখা যায়।

অমাত্য

  • (১) রাজাকে সাহায্য করার জন্য মন্ত্রীরা ছাড়া অমাত্য নামে কর্মচারীরা থাকত। অমাত্যদের বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পদ পেতে হত। এদের হাতে রাজস্ব, অর্থ, বিচার, প্রশাসন প্রভৃতি বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হত। ডঃ রায়চৌধুরী এদের সঙ্গে অশোকের আমলের মহামাত্রদের তুলনা করেছেন।
  • (২) এই উচ্চ পদধারী অমাত্যদের মধ্যে অর্থশাস্ত্রে সমাহর্তা এবং সন্নিধাতা নামে দুই বিশেষ অমাত্যের উল্লেখ করা হয়েছে। ডঃ এন কে শাস্ত্রীর মতে, সন্নিধাতা ছিলেন রাজার কোষাধ্যক্ষ।
  • (৩) সমাহর্তা ছিলেন রাজস্ব বিভাগের প্রধান। রাজ্যের আয়-ব্যয়ের হিসাব সমাহর্তা রাখতেন। ভূমি রাজস্ব ও শুল্ক বিভাগের সকল অধ্যক্ষ তারই নির্দেশে চলত। অন্যান্য অমাত্যরা দেওয়ানী, ফৌজদারী ও প্রশাসন দপ্তরে নিযুক্ত হতেন।

অধ্যক্ষ

  • (১) অধ্যক্ষ নামে এক শ্রেণীর কর্মচারী ছিল যারা বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব পেত। অর্থশাস্ত্রে এরূপ ৩২ জন অধ্যক্ষের নাম আছে। অর্থশাস্ত্রের উল্লিখিত অধ্যক্ষদের সঙ্গে মেগাস্থিনিস উল্লিখিত এ্যাষ্টিনময় বা নগর অধ্যক্ষ এবং এগ্লোনমই বা কৃষি অধ্যক্ষের বেশ মিল দেখা যায়।
  • (২) অর্থশাস্ত্রের বিবরণ থেকে মনে হয় যে, মৌর্য শাসন ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব অধ্যক্ষরাই বহন করত। নগরাধ্যক্ষ ও কৃষি অধ্যক্ষ ছাড়া ছিল সেনাধ্যক্ষ বা সেনাবিভাগের অধ্যক্ষ, আকরাধ্যক্ষ বা খনির অধ্যক্ষ, গো-অধ্যক্ষ, অশ্ব-অধ্যক্ষ, হস্তী-অধ্যক্ষ, নৌ-অধ্যক্ষ প্রভৃতি।

নিচু পদের দায়িত্ব

যারা অমাত্য এবং অধ্যক্ষ পদের পরীক্ষায় সফল হতে পারত না তারা নীচু পদে খনি, গোশালা, অশ্বশালা, অরণ্য প্রভৃতি তদারকীর দায়িত্ব পেত।

নিম্নবর্গীয় কর্মচারী

এছাড়া রাজার গুপ্তচর, প্রতিবেদক, দৌবারিক, কুলিক, করনিক প্রভৃতি অসংখ্য নিম্নবর্গীয় কর্মচারী সরকারী কাজ চালাত।

কর্মচারীদের বেতন

  • (১) মৌর্য সম্রাটরা সকল কর্মচারীকে নগদ বেতন দিতেন। বংশানুক্রমিকভাবে পদে নিয়োগের প্রথা ছিল না। রাষ্ট্রের কাজে নিযুক্ত নিম্নতম শ্রমিকের বেতন ছিল ৬০ পান। ধর্ম-চর্মধারী সৈন্যের বেতন ছিল ৫০০ পান।
  • (২) লক্ষ্য করার বিষয় এই যে, বেতনের পরিবর্তে জমি বা মধ্যযুগের মত জাগীর দেওয়া হত না। অর্থশাস্ত্রে বেতনের স্থলে জমি দেওয়ার বিরুদ্ধে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছে। মৌর্য সম্রাটদের হাতে অনেক খনি থাকায় মুদ্রার জন্য রূপা ও তামার সরবরাহ অব্যাহত ছিল।

উপজাতি অঞ্চলের শাসন

মৌর্য সম্রাটের প্রত্যক্ষ শাসনের অধীনে বেশীর ভাগ অঞ্চল থাকলেও, কতকগুলি স্বায়ত্বশাসিত অঞ্চলও ছিল। এগুলি ছিল উপজাতি অঞ্চল। এই অঞ্চলগুলির চিরাচরিত শাসন ব্যবস্থায় সম্রাট সাধারণত হস্তক্ষেপ করতেন না। অশোকের শিলালিপিতে যোন, কম্বোজ, ভোজ প্রভৃতি উপজাতির নাম পাওয়া যায়।

প্রদেশ

  • (১) মৌর্য সাম্রাজ্যকে সুশাসনের জন্য কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যে অঞ্চলে রাজার প্রত্যক্ষ শাসন ছিল সে অঞ্চলকে কতকগুলি প্রদেশে ভাগ করা হয়। অশোকের আমলে ৫টি প্রদেশ ছিল। চন্দ্রগুপ্তের আমলে সম্ভবত ৪টি প্রদেশ ছিল।
  • (২) মৌর্য যুগে কখনও কখনও প্রদেশকে ‘দেশ’ বলা হত। প্রদেশগুলিকে শাসনের সুবিধার জন্যে ‘অহর’ বা ‘বিষয়ে’ (জেলা) ভাগ করা হত। বিষয়গুলিকে জনপদে ভাগ করা হত। কিছু সংখ্যক গ্রাম দিয়ে জনপদ গঠিত হত।
  • (৩) বনগার্ড লেভিনের মতে, মৌর্য সম্রাট সকল প্রদেশের ওপর সমানভাবে আধিপত্য ভোগ করতেন না। কতকগুলি প্রদেশ বিশেষ সুবিধা ভোগ করত, যথা- তক্ষশীলা, উজ্জয়িনী
  • (৪) লেভিনের মতে, চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য যখন গ্রীকদের হাত থেকে তক্ষশিলা জয় করেন তখন থেকে তক্ষশিলার অধিবাসীদের কিছু বিশেষ অধিকার দেওয়া হয়। অশোকের আমল পর্যন্ত তা বহাল ছিল। অবন্তীও রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কারণে বিশেষ সুবিধা ভোগ করত। অন্য তিনটি প্রদেশ এই সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল।

প্রদেশের শাসনকর্তা

  • (১) প্রদেশের শাসনকর্তারা সম্রাটের দ্বারা নিযুক্ত হত। চন্দ্রগুপ্তের আমলে সৌরাষ্ট্রের শাসনকর্তা ছিল বৈশ্য পুষ্যগুপ্ত। অশোকের আমলে যবন তুষাস্প এই প্রদেশ শাসন করত। প্রধান প্রধান প্রদেশের শাসনের দায়িত্ব সর্বদাই রাজপুত্র বা রাজ পরিবারের লোকেদের হাতে দেওয়া হত।
  • (২) সীমান্তবর্তী অথবা গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের দায়িত্ব রাজপরিবারের লোকদের দেওয়া হত। এদের উপাধি ছিল ‘আর্যপুত্র’। ডঃ রায়চৌধুরী অবশ্য ‘আর্যপুত্র’ শব্দটির ব্যাখ্যা করেছেন সম্ভ্রান্ত লোকের পুত্র। এই অর্থে তিনি বলেন যে, অভিজাত শ্রেণীর সন্তানরাই প্রাদেশিক শাসনের দায়িত্ব পেত।

অন্যান্য বিভাগের দায়িত্ব

মৌর্য রাজারা অর্থশাস্ত্রের নির্দেশ মতই জনপদগুলি গঠন করেন বলা যায়। জনপদগুলি নগর থেকে পৃথক ছিল তা অর্থশাস্ত্রে বলা হয়েছে। জনপদের শাসনের প্রধান দায়িত্ব ছিল রাজুকের হাতে। অর্থশাস্ত্রের মতে ৪ রকম জনপদ ছিল। যথা –

  • (ক) ৮০০ গ্রাম গিয়ে গঠিত জনপদ বা স্থানীয়,
  • (খ) ৪০০ গ্ৰাম নিয়ে গঠিত জনপদ বা দ্রোণমুখ,
  • (গ) ২০০ গ্রাম নিয়ে জনপদ বা কর্বাচিকা,
  • (ঘ) ১০টি গ্রাম নিয়ে গঠিত জনপদ বা সংগ্রহণ।

প্রদেশের উপর রাজার নিয়ন্ত্রণ

প্রদেশের শাসনের ওপর রাজা নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ রাখতেন। যেমন –

  • (১) প্রদেশের কর্মচারীরা বংশানুক্রমিকভাবে পদ পেত না।
  • (২) তাদের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বদলি করা হত।
  • (৩) রাজার প্রতিবেদক বা বিশেষ দূত ও গুপ্তচররা প্রদেশের কাজকর্মের ওপর কড়া নজর রাখত।
  • (৪) প্রদেশ থেকে নিয়মিত রাজস্ব কেন্দ্রে পাঠাতে হত।
  • (৫) প্রদেশে মহামাত্র নামে কর্মচারীরা ছিল রাজার প্রতি বিশেষ আনুগত্যপরায়ণ, রাজার দ্বারা নিযুক্ত কর্মচারী। তারা শাসনকার্যের দায়িত্ব নিত।
  • (৬) অশোক জেলার কর্মচারী রাজুকদের ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রদেশে ঊর্ধ্বতন কর্মচারীর একাধিপত্য নষ্ট করেন।

রাজুক

  • (১) প্রদেশের শাসনের জন্য বিভিন্ন বর্গের কর্মচারী ছিল। রাজুক ছিল আদিতে জমি জরিপ বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারী। রজ্জু বা দড়ি দিয়ে এরা জমি মাপত। মেগাস্থিনিস এদের এগোনোমোয় বলেছেন।
  • (২) অশোকের আমলে রাজুকরা জনপদের বিশেষ ক্ষমতাশালী কর্মচারীতে পরিণত হয়। তৃতীয় শিলালিপি থেকে বাজুকদের বিভিন্ন দায়িত্বের আভাস পাওয়া যায়। কূপ খনন, জলসেচের ব্যবস্থা, রাস্তা নির্মাণের দায়িত্ব রাজুকরা বহন করত।
  • (৩) এগোনোমোয় অর্থাৎ রাজুকগণ জমি জরিপ করত এবং দশ স্টেডিয়া অন্তর রাস্তায় দূরত্বের চিহ্ন স্থাপন করত। অশোক রাজুকদের ক্ষমতা বিশেষ বাড়ান। তারা অনুসংযান অর্থাৎ পরিক্রমা করে জনসাধারণের অভাব অভিযোগের নিষ্পত্তি করত।
  • (৪) অশোক রাজুকদের হাতে কিছু বিচার ক্ষমতা দেন। তারা অপরাধীকে দণ্ড দিত ও যোগ্য লোককে পুরস্কৃত করত। মোট কথা মৌর্য প্রাদেশিক শাসনে রাজুকরা এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।

মহামাত্র

প্রদেশে মহামাত্র নামে কর্মচারীরাও উচ্চপদে কাজ করত। মহামাত্রগণ জেলার গুরুত্বপূর্ণ কর্মচারী ছিল। তারা ছিল কেন্দ্রের নিযুক্ত বিশেষ কর্মচারী। রাজার আদেশগুলি তারা জেলায় জেলায় জারি করত। নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব তারা দিত।

করণিক ও প্রদেষ্ট্রি

মহামাত্রের অধীনে করণিক বা কেরানীরা রাজকীয় হুকুমনামা লিপিবদ্ধ করত। এছাড়া প্রদেষ্ট্রি বা প্রাদেশিকরা এক একটি অঞ্চলের উপর নিযুক্ত হত। তারা রাজুকদের মতই রাজ্য পরিক্রমা বা অনুসংযান করত এবং প্রজাদের অভিযোগের প্রতিকার করত।

ধর্ম মহামাত্র

ধর্ম মহামাত্ররা অশোকের ধম্ম এবং নৈতিক নিয়মগুলি প্রচার করত ও কার্যকরী করার এবং জনকল্যাণমূলক কাজ করত। অন্ত-মহামাত্রগণ সীমান্ত অঞ্চল শাসন করত।

গ্ৰামীণ কর্মচারী

  • (১) প্রদেশের শাসনের সর্বনিম্ন স্তরে ছিল গ্রাম। গ্রাম শাসনের জন্য গ্রামিক নামে কর্মচারী ছিল। অর্থশাস্ত্রে বেতনভোগী কর্মচারীদের তালিকায় গ্রামিকের নাম নেই। ডঃ রায়চৌধুরী এজন্য গ্রামিককে গ্রামবাসীদের নির্বাচিত কর্মচারী বলে মনে করেন।
  • (২) গ্রামে বৃদ্ধদের সঙ্গে পরামর্শ করে গ্রামের শাসন গ্রামিক চালাত। গ্রামিকের হাতে বেশী ক্ষমতা ছিল না বলে মনে করা হয়। গ্রাম বৃদ্ধদের সঙ্গে গ্রামিক অধিকার ভোগ করত। গ্রামে চুরি-ডাকাতির প্রতিকার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও ছোট-খাট মামলার বিচার গ্রামিক করত।
  • (৩) কয়েকটি গ্রামের ওপর অথবা জনপদের কিছু অংশের ওপর একজন করে গোপ নামে কর্মচারী থাকত। কয়েকজন গোপের ওপর অথবা জনপদের ১/৪ ভাগের উপর থাকত একজন স্থানিক। স্থানিক মৌর্য সমহর্তাকে তার কাজে সাহায্য করত, জনপদে রাজস্ব আদায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা প্রভৃতি সকল কাজ করত।
  • (৪) স্থানীয় শাসনের শীর্ষে ছিল সমাহর্তা। সমাহর্তাকে সাহায্য করার জন্য ছিল প্রদেষ্টি বা প্রাদেশিক। সমাহর্তার দায়িত্ব ছিল অনেক। রাজস্ব আদায়, শুল্ক আদায়, মদের ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ, বাণিজ্যের অনুমতি পত্র দান প্রভৃতি দায়িত্ব সমাহর্তা পালন করত। স্থানিকও সমাহর্তাকে সাহায্য করত।

রাজস্ব ব্যবস্থা

মৌর্য ভূমি রাজস্বের হার ছিল ১/৬ অথবা ১/৪ অংশ। জলসেচ যুক্ত অঞ্চলে করের হার ছিল বেশী। দুরকম কর ছিল – ভাগ ও বলি। এছাড়া খনি, বন, ফেরিঘাট, নদী, হাট-বাজার, আমদানি-রপ্তানি থেকে শুল্ক আদায় হত। গ্রামের উদ্বৃত্ত জমি গ্রামভৃতকদের দ্বারা আবাদ করা হত। গ্রামভৃতক কাদের বলা হত তা সঠিক জানা যায়নি। রোমিলা থাপার এদের ক্রীতদাস বলে মনে করেন।

পৌরশাসন

  • (১) মেগাস্থিনিস পাটলিপুত্রের নগর শাসনের জন্য ত্রিশ জন সদস্য দ্বারা গঠিত ছয়টি সমিতির উল্লেখ করেছেন। এই সমিতিগুলি ছিল স্বয়ং-শাসিত। প্রতি সমিতিতে থাকত ৫ সদস্য। সমিতিগুলি হল শ্রম-শিল্প সমিতি, বৈদেশিকদের তদারকি সমিতি, জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রক্ষা সমিতি, খুচরা ও পাইকারী বিক্রয় পরিচালনা সমিতি, শিল্পজাত দ্রব্যের উৎপাদন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থাপক সমিতি, বিভিন্ন দ্রব্যের বিক্রীত দাম হতে কর আদায় সমিতি।
  • (২) মেগাস্থিনিসের বর্ণিত পৌর শাসনকে ঐতিহাসিক বাসাম সমালোচনা করে বলেছেন যে, যদি মেগাস্থিনিসের বর্ণনা সত্য হয় তবে বুঝতে হবে মৌর্য শাসন ছিল পুলিশী শাসন। কারণ, ব্যক্তির জন্ম-মৃত্যু, শিল্প উৎপাদন সকল কিছুতেই রাষ্ট্র হাত দিত।
  • (৩) বনগার্ড লেভিন মেগাস্থিনিসের বর্ণিত মৌর্য পৌর শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বলেছেন যে, মৌর্য যুগে কেবলমাত্র পাটলিপুত্র নগরে পৌর শাসন ছিল একথা ভাবা উচিত হবে না। মৌর্য যুগে উত্তর ভারতে বহু নগরের উদ্ভব হয়। এগুলিতে বিশেষ শাসনের দরকার দেখা দেয়। এজন্য অর্থশাস্ত্রে নগর শাসন সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় রচিত হয়।
  • (৪) মেগাস্থিনিস যে দুটি সমিতির কথা বলেছেন তার কিছু কিছু তথ্য অর্থশাস্ত্রের দ্বারা সমর্থিত হয়। রাজধানী ও রাজার নিরাপত্তার জন্য বৈদেশিক ব্যক্তিদের শহরে আসা-যাওয়ার ওপর নজরদারির কথা অর্থশাস্ত্রে পাওয়া যায়।

সামরিক বিভাগ

মেগাস্থিনিস মৌর্য সামরিক বিভাগের জন্যে ত্রিশ সদস্যের ছয় সমিতির কথা বলেছেন। এই ছয় সমিতি হল নৌ-বহর, যোগাযোগ ও সরবরাহ বিভাগ, পদাতিক, অশ্বরোহী, রথ, হস্তী বিভাগের দায়িত্ব বহন করত। ডঃ বাসাম মেগাস্থিনিসের এই বর্ণনায় সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, অন্য কোনো সূত্র থেকে মেগাস্থিনিসের তথ্য সমর্থিত হয়নি। তবে এটা বোঝা যায় যে, মৌর্য সম্রাটদের বিরাট স্থায়ী সেনাদল ছিল।

বিচার ব্যবস্থা

  • (১) যদিও রাজা নিজে রাজসভায় বসে বিচারের কাজ করতেন, তবুও দূরবর্তী গ্রাম ও শহরের জন্য আলাদা বিচারালয় ছিল। নগরে পৌর ব্যবহারিক বা মহামাত্ররা বিচারের কাজ করত। গ্রামে রাজুকরাই প্রধানত বিচারের কাজ করত।
  • (২) ধর্মাস্থিয় ও কন্টকশোধন দুই রকম আদালত ছিল। প্রথমটি ছিল দেওয়ানি আদালত এবং দ্বিতীয়টি ছিল ফৌজদারি আদালত। সাম্রাজ্যের ভেতর জনপদগুলিতেও এই সকল আদালত ছিল।
  • (৩) মৌর্য ফৌজদারি শাসন ছিল কঠোর। কারাদণ্ড, অঙ্গচ্ছেদ, প্রাণদণ্ড প্রভৃতি শাস্তি দেওয়া হত। এছাড়া প্রচুর জরিমানা করার প্রথা ছিল। এই যুগে শাস্তির দ্বারা ভবিষ্যৎ অপরাধ নিবারণ হবে বলে মনে করা হত।

উপসংহার :- ড. ভিনসেন্ট স্মিথ -এর মতে, মৌর্য শাসনব্যবস্থা আকবর-প্রবর্তিত শাসন ব্যবস্থার চেয়েও উন্নত ছিল । চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এই শাসন ব্যবস্থার মূল কাঠামোটি গঠন করেন । পরবর্তীকালে সম্রাট অশোক মৌর্য শাসনব্যবস্থার মূল কাঠামোটিকে অপরিবর্তিত রেখে কিছু সংযোজন ঘটান।

(FAQ) মৌর্য শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।

২. মৌর্য শাসন ব্যবস্থার মূল কাঠামোটি গঠন করেন কে?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।

৩. চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের আমলে কতগুলি প্রদেশ ছিল?

চারটি।

৪. সম্রাট অশোকের আমলে কতগুলি প্রদেশ ছিল?

পাঁচটি।

Leave a Comment