চাণক্য কৌটিল্য

অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা কৌটিল্য বা চাণক্য -এর জন্ম পরিচয়, শিক্ষালাভ, মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থানে চাণক্যের ভূমিকা, মৌর্য্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় চাণক্যের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করা হল ।

চাণক্য কৌটিল্য

জন্ম ৩৭০ খ্রিস্টপূর্ব  
পেশাচন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপদেষ্টা
উল্লেখযোগ্য কর্মঅর্থশাস্ত্র, চাণক্যনীতি
মৃত্যু  ২৮৩ খ্রিস্টপূর্ব  
কৌটিল্য সম্পর্কে

ভূমিকা :- কৌটিল্য বা চাণক্য বা বিষ্ণুগুপ্ত একজন প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা এবং অর্থশাস্ত্র নামক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ক বিখ্যাত গ্রন্থের রচয়িতা ছিলেন।

কৌটিল্য সম্পর্কে উৎস

কৌটিল্য সম্বন্ধে খুব সামান্যই ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। অধিকাংশ উৎসে কল্প কথা স্থান করে নিয়েছে। থমাস ট্রটমান কৌটিল্য ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের সম্পর্ক নিয়ে চারটি উৎস চিহ্নিত করেছেন।

  • (১) সিংহলী বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ ও তার পালি টীকা বংসট্ঠপ্পকাসিনি।
  • (২) হেমচন্দ্র রচিত জৈন গ্রন্থ পরিশিষ্টপর্ব।
  • (৩) সোমদেব রচিত কথাসরিৎসাগর ও ক্ষেমেন্দ্র রচিত বৃহৎকথামঞ্জরী নামক দুইটি কাশ্মীরি গ্রন্থ।
  • (৪) বিশাখদত্ত রচিত সংস্কৃত নাটক মুদ্রারাক্ষস

কৌটিল্য বা চাণক্যের জন্ম পরিচয়

প্রাচ্যের রাষ্ট্রচিন্তার একজন উল্লেখযোগ্য দিকপাল কৌটিল্য ৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তক্ষশীলার এক বিদ্যোৎসাহী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

কৌটিল্যের জন্মস্থান নিয়ে মতভেদ

তার জন্মস্থান সম্বন্ধে বেশ কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত রয়েছে।

  • (১) বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশটীকা অনুসারে, তক্ষশীলায় তার জন্ম হয়।
  • (২) জৈন পুঁথি অদ্বিধন চিন্তামণি চাণক্যকে অভিহিত করেছে দ্রমিলা নামে , যার অর্থ তিনি দক্ষিণ ভারতের অধিবাসী ছিলেন।
  • (৩) হেমচন্দ্র রচিত পরিশিষ্টপর্ব গ্রন্থানুসারে, চাণক্য চণক নামক গ্রামে চণিন নামক এক ব্রাহ্মণ ও তার পত্নী চণেশ্বরীর গৃহে জন্মগ্রহণ করেন।
  • (৪) অন্য উৎস মতে, চণক তার পিতার নাম ছিল।

চাণক্যের শিক্ষালাভ

চাণক্য প্রাচীন ভারতের অন্যতম বিখ্যাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষালাভ করেন ও পরবর্তীকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি আচার্য্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

পণ্ডিত ও উপাসক চাণক্য

চাণক্য বেদ সম্বন্ধে একজন পণ্ডিত ছিলেন এবং বিষ্ণুর উপাসক ছিলেন।

অর্থনীতির দিকপাল কৌটিল্য

চাণক্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে প্রাচীন ভারতের একজন দিকপাল ছিলেন। তার তত্ত্বগুলি চিরায়ত অর্থনীতির বিকাশ লাভে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।

ভারতের মেকিয়াভেলি কৌটিল্য বা চাণক্য

রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অসাধারণ পাণ্ডিত্যের জন্য চাণক্যকে ভারতের মেকিয়াভেলি বলা হয়।

কৌটিল্যের রচনা অবলুপ্তি ও পুনরাবিষ্কার

চাণক্যের রচনা গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসনের শেষ দিকে অবলুপ্ত হয় এবং ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে পুনরাবিষ্কৃত হয়।

মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থানে চাণক্য

প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক চাণক্য পরবর্তীকালে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন।

রাজ-উপদেষ্টা কৌটিল্য

চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তার পুত্র বিন্দুসার -এর রাজ-উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মৌর্য্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় চাণক্য

বিশাখদত্ত রচিত মুদ্রারাক্ষস নামক সংস্কৃত নাটকে নন্দ সাম্রাজ্য পতনে চাণক্যের ভূমিকা বর্ণিত রয়েছে।

  • (১) এই গ্রন্থানুসারে হিমালয়ের একটি পার্বত্য রাজ্যের অধীশ্বর পর্বতেশ্বরের সঙ্গে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা চাণক্য কূটনৈতিক মিত্রতা স্থাপন করে নন্দ সাম্রাজ্যকে পরাজিত করতে সক্ষম হন।
  • (২) এই সময় পর্বতেশ্বরকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হলে মলয়কেতু তার স্থানে সিংহাসনে আরোহণ করেন।
  • (৩) নন্দ সাম্রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী রাক্ষসের সঙ্গে মিলিত ভাবে মলয়কেতু নন্দ সাম্রাজ্যের অধিকৃত এলাকা দাবি করেন।
  • (৪) শেষ নন্দ সম্রাট ধননন্দ -এর হত্যার প্রতিশোধ নিতে মলয়কেতুর সহায়তায় রাক্ষস রাজধানী আক্রমণ করে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।
  • (৫) এই পরিস্থিতিতে চাণক্য যেন তেন প্রকারে রাক্ষসকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করাতে চেয়েছিলেন।
  • (৬) রাক্ষসের প্রতীক মুদ্রাটি হস্তগত করে চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে উদ্দেশ্য করে একটি নকল চিঠি প্রস্তুত করেন। এই চিঠিতে রাক্ষসের মুদ্রার ছাপ (সীলমোহর) দিয়ে লেখা হয় যে তিনি চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের শিবিরে যোগ দিতে ইচ্ছুক।
  • (৭) চাণক্য প্রথমেই মলয়কেতুর নিকট এই চিঠির বিষয়ে বার্তা পাঠালে তাতে বিশ্বাস করে মলয়কেতু রাক্ষসের সঙ্গত্যাগ করেন। এই ভাবে চাণক্য রাক্ষসকে তার সঙ্গীদের থেকে দূরে সরিয়ে দেন।
  • (৮) পরবর্তী কৌশল হিসেবে তিনি রাক্ষসের বন্ধু চন্দনদাসের মৃত্যুদণ্ড দিলে রাক্ষস তাকে বাঁচাতে, আত্মসমর্পণে ও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনে বাধ্য হন।

বিন্দুসারের সঙ্গে চাণক্যের সম্পর্ক

  • (১) জৈন প্রবাদ অনুসারে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপদেষ্টা চাণক্য শত্রু দ্বারা বিষপ্রয়োগে হত্যা করার চেষ্টার বিরুদ্ধে শারীরিক প্রতিষেধক তৈরী করার উদ্দেশ্যে প্রতিদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে তার অজান্তে অল্প মাত্রায় বিষ পান করাতেন।
  • (২) একদিন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তার বিষযুক্ত খাবার নিজ অন্তঃসত্ত্বা পত্নী দুর্ধরার সঙ্গে ভাগ করে খেলে দুর্ধরার মৃত্যু হয়।
  • (৩) চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও দুর্ধরার সন্তানকে বাঁচাতে চাণক্য সদ্যমৃত দুর্ধরার পেট কেটে তাকে বের করে আনলে বিন্দুসারের জন্ম হয়।
  • (৪) পরবর্তীকালে বিন্দুসার মৌর্য সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করলে চাণক্য তার রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
  • (৫) হেমচন্দ্রের পরিশিষ্ট পার্বন অনুসারে বিন্দুসারের একজন মন্ত্রী সুবন্ধু চাণক্যকে অপছন্দ করতেন।
  • (৬) বিন্দুসারকে জানানো হয় যে, তার মাতা দুর্ধরার মৃত্যুর জন্য চাণক্য দায়ী ছিলেন। ফলে বিন্দুসার প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।
  • (৭) এরপর বৃদ্ধ চাণক্য জৈন আচার সল্লেখনা বা স্বেচ্ছা-উপবাস পালন করে দেহত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
  • (৮) পরে অনুসন্ধান করে বিন্দুসার জানতে পারেন যে, চাণক্য তার মাতার মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী ছিলেন না। তখন তিনি সুবন্ধুকে চাণক্যের নিকট পাঠান যাতে চাণক্য তার মৃত্যু সঙ্কল্প ত্যাগ করেন।  
  • (৯) সম্রাটের নির্দেশ না মেনে সুযোগসন্ধানী সুবন্ধু এই সময় চাণক্যকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন।

কৌটিল্য বা চাণক্যের রচনা

অর্থশাস্ত্র এবং চাণক্য নীতি নামক দুটি গ্রন্থ চাণক্য রচনা করেছিলেন বলে মনে করা হয়।

চাণক্যের অর্থশাস্ত্র

অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে অর্থনীতি, রাষ্ট্রের কল্যাণকারী ভূমিকা, পররাষ্ট্রনীতি, সামরিক কৌশল, শাসকের ভূমিকা সম্বন্ধে বিশদে বর্ণনা করা হয়েছে।

অর্থশাস্ত্রের রচয়িতা নিয়ে মতভেদ

  • (১) অর্থশাস্ত্রের অধিকাংশ শ্লোকের রচয়িতা হিসেবে কৌটিল্যের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু একটি শ্লোকে বিষ্ণুগুপ্তের নাম পাওয়া যায়।
  • (২) থমাস ট্রটমানের মতে, অর্থশাস্ত্র -এর রচয়িতার প্রকৃত নাম বিষ্ণুগুপ্ত ও গোত্র নাম কৌটিল্য।  
  • (৩) বিষ্ণুশর্মা রচিত পঞ্চতন্ত্র গ্রন্থে চাণক্য ও বিষ্ণুগুপ্ত যে একই ব্যক্তির বিভিন্ন নাম তা উল্লেখ করা হয়েছে।
  • (৪) থমাস বারো ইত্যাদি কয়েকজন ঐতিহাসিকের মতে, অর্থশাস্ত্র আসলে বেশ কিছু পুরনো রচনার সঙ্কলন এবং চাণক্য এই গ্রন্থের বেশ কয়েকজন লেখকের একজন। অর্থাৎ তাদের মতে চাণক্য ও কৌটিল্য ভিন্ন ব্যক্তি।

জনসংস্কৃৃতিতে চাণক্য বা কৌটিল্য

  • (১) ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে বাঙালি নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায় চন্দ্রগুপ্ত নামে একটি বাংলা নাটক রচনা করেন।
  • (২) ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত নামে একটি তেলুগু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়, যেখানে অক্কিনেনী নাগেশ্বর রাও চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
  • (৩) ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত চাণক্য নামক একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে মীতেশ সফারি ও চন্দ্রপ্রকাশ দ্বিবেদী চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
  • (৪) ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত চক্রবর্তী অশোক সম্রাট নামক একটি টেলিভিশন ধারাবাহিকে মনোজ জোশী চাণক্যের ভূমিকায় অভিনয় করেন।
  • (৫) স্টার প্লাসের চন্দ্র নন্দিনী ধারাবাহিকে চাণক্যের চরিত্রে অভিনয় করেন মনোজ কোলাৎকার।

মৃত্যু

আনুমানিক ২৮৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে কৌটিল্য বা চাণক্য বা বিষ্ণুগুপ্ত মৃত্যুবরণ করেন বলে মনে করা হয়।

উপসংহার :- প্রাচীন ভারতীয় পণ্ডিত, দার্শনিক, ও রাজউপদেষ্টা কৌটিল্য বা বিষ্ণু গুপ্ত চানক্য নামেই অধিক পরিচিত।

কৌটিল্য সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য (FAQ) ?

১. কৌটিল্য বা চাণক্য কার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ?

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ।

২. কৌটিল্যের বিখ্যাত গ্রন্থের নাম কি?

অর্থশাস্ত্র ।

৩. কৌটিল্য কার নাম?

বিষ্ণুগুপ্তের নাম ।

৪. অর্থশাস্ত্র কে রচনা করেন?

কৌটিল্য বা চাণক্য।

৫. চাণক্য কে ছিলেন?

কৌটিল্যের অপর নাম।

Leave a Reply

Translate »