নিকলো ম্যাকিয়াভেলি

নিকলো ম্যাকিয়াভেলি প্রসঙ্গে তার জন্ম, বংশ পরিচয়, শিক্ষা ও কর্মজীবন, নিকলো ম্যাকিয়াভেলির সাথে বিভিন্ন শাসকদের সংস্পর্শ, তার ভাগ্য বিপর্যয়, ইতালির রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ, নিকলো ম্যাকিয়াভেলির গ্ৰন্থে অভীষ্ট শাসকের প্রতিচ্ছবি, গ্ৰন্থ রচনা, গ্ৰন্থের বিষয়বস্তু, মানবতাবাদী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ম্যাকিয়াভেলি, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত ম্যাকিয়াভেলি, ম্যাকিয়াভেলির রচনায় মানবজীবনের চিত্র, ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, ম্যাকিয়াভেলির কাছে মানব ধর্ম, ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে রাজনীতি, ম্যাকিয়াভেলি কর্তৃক বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি বিচার, ম্যাকিয়াভেলির গ্ৰন্থে পরীক্ষিত বাস্তব সত্যের অভিজ্ঞতার প্রকাশ, ম্যাকিয়াভেলির প্রচেষ্টায় রেনেসাঁসের প্রভাব ও ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার সমালোচনা সম্পর্কে জানবো।

ইতালির নিকোলো ডি বার্নার্ডো দেই ম্যাকিয়াভেলি প্রসঙ্গে নিকলো ম্যাকিয়াভেলির জন্ম পরিচয়, নিকলো ম্যাকিয়াভেলির ইতালির রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ, আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত ম্যাকিয়াভেলি, ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে রাজনীতি, ম্যাকিয়াভেলির প্রচেষ্টায় রেনেসাঁসের প্রভাব ও ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার সমালোচনা ও ম্যাকিয়াভেলি কর্তৃক বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি বিচার সম্পর্কে জানব।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলি

ঐতিহাসিক চরিত্রনিকলো ম্যাকিয়াভেলি
পরিচিতিআধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত
দেশইতালি
জন্ম৩ মে, ১৪৬৯ খ্রি
গ্ৰন্থThe Prince
রাষ্ট্রদর্শনলোকায়ত রাষ্ট্রচিন্তা
মৃত্যু২১ জুন, ১৫২৭ খ্রি
নিকলো ম্যাকিয়াভেলি

ভূমিকা :- চতুর্দশ ও ষোড়শ শতাব্দীর ইউরোপীয় রেনেসাঁস আন্দোলনের ফলশ্রুতি হিসাবে মানবিক নীতিসমূহ ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব পাশ্চাত্য রাষ্ট্রচিন্তায় অত্যন্ত প্রকট হয়ে উঠেছিল। আলোচ্য পর্বে যে স্বদেশী সাহিত্য বিকশিত হয়েছিল, তাতে মানুষ ও দেবতা অপেক্ষা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল। মধ্যযুগীয় ব্যবস্থার অবসান ঘোষণা করে নবজাগরণ যে নবজগতের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, তাতে মানুষ হয়েছিল সকল বিষয়ের নিয়ামক।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলি

ইউরোপীয় তথা ইতালীয় নবজাগরণের চরম বিকাশের মহূর্তে ফ্লোরেন্স নগরে ভূমিষ্ঠ হয়েছিলেন নিকলো ম্যাকিয়াভেলি, বহু বিতর্কিত ও সমালোচিত হওয়া সত্ত্বেও যিনি তাঁর জীবদ্দশাতেই এক বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও চিন্তাবিদরূপে স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন।

ম্যাকিয়াভেলির জন্ম

৩ মে, ১৪৬৯ খ্রিস্টাব্দে সেই যুগের ফ্লোরেন্সের এক সম্পন্ন ও শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন ম্যাকিয়াভেলি।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলির বংশ পরিচয়

তাঁর পিতা একজন মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত আইনজীবী ছিলেন।

চিন্তাবিদ নিকলো ম্যাকিয়াভেলির কর্মজীবন

কৈশোর থেকেই ম্যাকিয়াভেলি সরকারি চাকরির জন্য প্রশিক্ষণ পেতে থাকেন। এই প্রশিক্ষণ ব্যর্থ হয় নি এবং ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে ২৫ বছর বয়সে তিনি চ্যান্সারির বিভাগীয় করণিক হিসাবে যোগদান করেছিলেন। কর্মচারীরূপে তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া গিয়েছিল অচিরেই এবং মাত্র চার বছরের মধ্যে তাঁর পদোন্নতি ছিল চমকপ্রদ। তিনি ১৫১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একাধারে দ্বিতীয় চ্যান্সেলর ও সচিবের পদ অলংকৃত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলির সময়ে ফ্লোরেন্স

আলোচ্য পর্বে ফ্লোরেন্স একটি স্বাধীন, শক্তিশালী ও প্রগতিশীল প্রজাতন্ত্র ছিল। এছাড়া ফ্লোরেন্স ছিল রেনেসাঁস শিল্প-সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। মাইকেল অ্যাঞ্জেলোলিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি উভয়েই ফ্লোরেন্সের কৃতী সন্তান ছিলেন।

চিন্তাবিদ নিকলো ম্যাকিয়াভেলির সাথে বিভিন্ন শাসকদের সংস্পর্শ

  • (১) যাইহোক, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হিসাবে ম্যাকিয়াভেলিকে বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হত। এই সূত্রে তাঁকে বহু বিদেশি রাষ্ট্রের দরবারে যেতে হয়েছিল। এদের মধ্যে অন্যতম ছিল ফ্রান্স-এর দ্বাদশ লুইয়ের রাজসভা ও পবিত্র রোমান সম্রাট প্রথম ম্যাক্সিমিলিয়নের দরবার।
  • (২) এছাড়া ইতালির মধ্যে পোপ দ্বিতীয় জুলিয়াস ও ভ্যালেনটিনোর ডিউক তথা রোম-এর শাসক সিজার বর্জিয়ার (Cesare Borgia) সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। এই শাসকপর্ব ও তাদের রাজদরবারের অভিজ্ঞতা ম্যাকিয়াভেলিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল এবং তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারায় এর প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায়।
  • (৩) এদের মধ্যে সিজার বর্জিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শাসকরূপে সফল কিন্তু নীতি ও নৈতিকতার ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত এই মানুষটির (Realpolitik-এর ধারক ও বাহক) প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা যায় ম্যাকিয়াভেলি সৃষ্ট Prince-এর মধ্যে।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলির ভাগ্য বিপর্যয়

ফ্লোরেন্সের প্রজাতন্ত্র থেকে ক্ষমতাচ্যুত মেডিচি শাসক পরিবার স্পেনীয় সমর্থনে সেখানে ক্ষমতাসীন হলে অন্যান্য প্রশাসকদের সঙ্গে ম্যাকিয়াভেলিরও ভাগ্য বিপর্যয় ঘটেছিল। এই পর্বে (অর্থাৎ ১৫১২-২১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) নির্বাসনে থাকাকালীন তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন। ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে অবশ্য মেডিসিরা তাঁকে পুনর্নিয়োগ করেন।

ইতালির রাজনীতিতে নিকলো ম্যাকিয়াভেলির আত্মপ্রকাশ

ম্যাকিয়াভেলি প্রশাসক থাকাকালীন ইতালির বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রকট হয়ে উঠেছিল নগর রাষ্ট্রগুলির তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্বের মধ্যে। এই পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করে নিজ সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ইতালিতে হস্তক্ষেপ করতে উদ্যত হয়েছিল স্পেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো দেশগুলি। এই পরিস্থিতিতেই ইতালির রাজনীতিতে ম্যাকিয়াভেলি আত্মপ্রকাশ করেছিলেন।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলির গ্ৰন্থে অভীষ্ট শাসকের প্রতিচ্ছবি

  • (১) প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সচিব রূপে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তিনি তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা ও কূটকৌশলকে ব্যবহার করে ইতালির শক্তিকে সংহত করার ব্যাপারে সচেষ্ট হন। এক্ষেত্রে তিনি তেমন সফল হন নি কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও কূটনৈতিক কর্মতৎপরতা লক্ষ্য করার মতো।
  • (২) এছাড়া সমকালীন ইতালির রাজনৈতিক অনৈক্য ও অরাজকতা খুব সম্ভবত তাঁকে উদ্বুদ্ধ করেছিল এমন একজন সর্বশক্তিমান শাসকের কথা চিন্তা করতে তিনি রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ন্যায়-অন্যায় যে-কোনো নীতি অনুসরণ করতে প্রস্তুত থাকবেন। ম্যাকিয়াভেলি রচিত The Prince গ্রন্থে এই শাসকের প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা যায়।

রাষ্ট্রচিন্তাবিদ নিকলো ম্যাকিয়াভেলি রচিত গ্ৰন্থ সমূহ

  • (১) রাজনীতি ও প্রশাসন থেকে সাময়িককালের জন্য নির্বাসিত হওয়া সত্ত্বেও তিনি হতাশায় ভেঙে পড়েন নি। জগৎ সংসার ও মানবজাতি সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সাহায্যে তিনি এই সময় তাঁর অন্যতম প্রসিদ্ধ (কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিতর্কিত) গ্রন্থগুলি রচনা করেছিলেন। রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে এগুলি অমূল্য সম্পদ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।
  • (২) এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল The Prince (১৫১৩), The Discourses on the First Ten Books of Titus Livius (১৫১৩-১৬), History of Florence (১৫২৫), Art of War (১৫২০) এবং Mandragola (১৫১৮)। আলোচ্য রচনাবলিতে যে বিদগ্ধ ও বিশিষ্ট লেখককে পাওয়া যায় তিনি একাধারে রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, ইতিবৃত্তকার, কবি ও সমালোচক।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলির গ্ৰন্থগুলির বিষয়বস্তু

তাঁর উপরোক্ত গ্রন্থগুলিতে ন্যায়-অন্যায় ও প্রচলিত নীতিবোধের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত সর্বশক্তিমান শাসক, রাজতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক শাসননীতি, রাষ্ট্র, ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিভঙ্গি, ফ্লোরেন্সের ইতিহাস প্রভৃতি বিষয় আলোচিত হয়েছে।

মানবতাবাদী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ম্যাকিয়াভেলি

  • (১) মধ্যযুগের ধর্মীয় নেতা ও প্রচারকদের মতো ম্যাকিয়াভেলি ঈশ্বরকে তাঁর চিন্তার কেন্দ্রস্থলে স্থাপন করেন নি। দেবতত্ত্ব বা ঐশ্বরিক মতবাদ নয়, মানবিক সমস্যা ও মানুষের কীর্তি কাহিনির উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তাঁর রাষ্ট্রতত্ত্বে। ম্যাকিয়াভেলি প্রকৃত অর্থে একজন যথার্থ মানবতাবাদী রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ছিলেন।
  • (২) বলাবাহুল্য, এই মানবতাবাদ ছিল রেনেসাঁস বা নবজাগরণ প্রসূত মানবতাবাদ। নবজাগরণের প্রভাবে ইতালি তথা পশ্চিম ইউরোপ তখন উত্তাল হয়ে উঠেছিল। ম্যাকিয়াভেলির জন্মস্থান ফ্লোরেন্সই ছিল নবজাগরণের কেন্দ্র। তাঁর চিন্তার বিকাশে ফ্লোরেন্স এবং নবজাগরণের প্রভাব ছিল অপরিসীম।

আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত ম্যাকিয়াভেলি

পুরোহিততন্ত্র তথা সামন্ততান্ত্রিক সংস্কারমুক্ত, বুর্জোয়া সংস্কৃতি-প্রসূত, লোকায়ত চিন্তার প্রবক্তা এই অর্থেও ম্যাকিয়াভেলি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত ছিলেন। গ্রিক চিন্তায় ও মধ্যযুগীয় চিন্তায় ঐশ্বরিক ও মানবিক সবকিছুকেই একই মঞ্চে স্থাপন করার চেষ্টা করা হয়েছে। খ্রিস্টধর্মতত্ত্ব ঐশ্বরিক জগতের পবিত্রতা এবং ঐহ্যিক জগতের অপবিত্রতা সম্পর্কে এক বিভ্রান্তিকর ধারণার সৃষ্টি করেছিল। ম্যাকিয়াভেলি সর্বপ্রথম এই বিভ্রান্তি থেকে রাষ্ট্রচিন্তা মুক্ত করেছিলেন।

ম্যাকিয়াভেলির রচনায় মানবজীবনের চিত্র

  • (১) রাজনীতির প্রথম ও শেষকথা মানুষ, মানবিক সমস্যাই রাজনীতির সমস্যা, মানবিকতার প্রচারই রাজনীতির একমাত্র ধর্ম, ম্যাকিয়াভেলি নির্দ্বিধায় এই কথা প্রচার করেছিলেন। যে জীবনকে ম্যাকিয়াভেলি তাঁর রচনায় চিত্রিত করেছিলেন তা ছিল মানবজীবন।
  • (২) যে মানুষের প্রতি ম্যাকিয়াভেলি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন সে ছিল একাধারে আপসহীন, পরাক্রমশালী, জ্ঞানী, স্বাধীনচেতা ও আত্মসচেতন মানুষ। খ্রিস্টধর্ম অজ্ঞতা ও অজ্ঞানতা, কুসংস্কার ও অসংখ্য বাধানিষেধের জালে মানুষকে আবদ্ধ করে রেখেছে।
  • (৩) ম্যাকিয়াভেলি এই খ্রিস্টীয় চিন্তার বিরোধী ছিলেন কারণ এই চিন্তা মানুষকে ভ্রান্ত পরকালের চিন্তায় ও কঠোর অনুশাসনে আবদ্ধ রেখেছে এবং পাপ-পুণ্য বোধ, ঐশ্বরিক মহিমা, কুহকিনী মায়াবী মোহ এবং ত্যাগের ধারণায় মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।
  • (৪) ম্যাকিয়াভেলি মানুষের পরকালের সুখ বা পুণ্যের ধারণা নিয়ে চিন্তিত নন। বাস্তব জগতের রক্ত-মাংসের শরীরের মানুষকে নিয়েই তাঁর চিন্তাভাবনা। ম্যাকিয়াভেলির মানুষ ঈশ্বরভীরু ও পরকালের সুখের চিন্তায় আচ্ছন্ন মানুষ নয়। সে ছল, বল ও কৌশলে দক্ষ মানুষ, সে স্বাধীনচেতা, সংগ্রামী ও শক্তিশালী। এই মানুষের প্রতিচ্ছবি লক্ষ্য করা যায় তাঁর The Prince-এ।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলি প্রসঙ্গে Maxey এর মন্তব্য

C. C. Maxey মনে করেন ম্যাকিয়াভেলি মূলত খ্রিস্টীয় নৈতিকতার বিরোধী ছিলেন না কিন্তু তাঁর (ম্যাকিয়াভেলি) মনে হয়েছিল এর দ্বারা যুদ্ধ জয়, ষড়যন্ত্রের মূলোচ্ছেদ, কূটনৈতিক বিজয় অথবা অন্য কোনো প্রকার কঠিন রাষ্ট্রীয় কর্তব্য সম্পাদন সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, “He (Machiavelli) does not condemn Christian ethics per se, he simply points out that they do not win wars, quell conspiracies, secure diplomatic victories or accomplish any of the other difficult tasks of statecraft”

ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিভঙ্গি

ম্যাকিয়াভেলির লোকায়ত চিন্তার বিশেষত্ব হল ধর্ম ও নৈতিকতার প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। তিনিই প্রথম রাষ্ট্রচিন্তাবিদ যিনি ধর্ম ও নীতিশাস্ত্র থেকে রাজনীতির আনুষ্ঠানিক ও সচেতন পৃথকীকরণ ঘটাতে পেরেছিলেন। তিনি প্লেটো, এরিস্টটল, সেন্ট টমাস অ্যাকুইনাস প্রভৃতি চিন্তাবিদদের রাষ্ট্রের নৈতিক উদ্দেশ্যের উপর অগাধ আস্থা ও বিশ্বাসের উপর আঘাত হেনেছিলেন এবং নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী রাজনীতিকে ধর্ম ও নীতিবিদ্যা থেকে বিভাজিত করেছিলেন।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে Murray এর মন্তব্য

Murray যথার্থই মন্তব্য করেছেন, “Machiavelli made deliberate and complete separation between ethics and politics”

ম্যাকিয়াভেলির কাছে মানব ধর্ম

অবশ্য, ম্যাকিয়াভেলির লোকায়ত চিন্তায় ধর্মের কোনো স্থান নেই বলা হলেও বা তাঁকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির প্রথম প্রবক্তা বলে অভিহিত করা হলেও, ম্যাকিয়াভেলি যে ধর্ম থেকে রাজনীতিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করেছেন তা নয়। ম্যাকিয়াভেলি যে ধর্মের প্রচার করেছিলেন, তা ছিল মানবধর্ম। কর্তব্য, সাহস ও সংগ্রামের মধ্যেই সেই মানবধর্মের বিজয়।

চিন্তাবিদ ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে রাজনীতি

সাধারণ মানুষ ম্যাকিয়াভেলির লোকায়ত চিন্তার উৎস হলেও, যে লোকায়ত রাজনীতিকে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তার প্রধান লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা অর্জন ও সংরক্ষণ। ম্যাকিয়াভেলির দৃষ্টিতে রাজনীতি এক সংগ্রাম এবং এই সংগ্রাম প্রতিনিয়ত ক্ষমতার জন্য সংগ্রাম। The Prince যে রাজনীতি উপস্থাপিত হয়েছিল, তা ক্ষমতার রাজনীতি ছলে, বলে, কৌশলে ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতাসীন থাকার রাজনীতি। কূটনীতিই যে রাজনৈতিক লক্ষ্য সাধনের উপায়, তাতে তাঁর সন্দেহের কোনো অবকাশ ছিল না।

ম্যাকিয়াভেলি কর্তৃক বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতি বিচার

লোকায়ত রাষ্ট্রনীতির প্রবক্তা রূপে ম্যাকিয়াভেলি নিজেকে একজন আধুনিক চিন্তাবিদ রূপে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাস্তব অবস্থার কষ্টিপাথরে তিনি রাজনীতিকে বিচার করতে চেয়েছিলেন। মধ্যযুগের মানুষ হলেও মধ্যযুগীয় ভাববাদী আদর্শ ও ঈশ্বরচিন্তায় নিমগ্ন থাকেন নি তিনি। উদীয়মান নগর সংস্কৃতি ও বুর্জোয়া ভাবধারার আলোকে আলোকিত মানুষ ছিলেন তিনি।

নিকলো ম্যাকিয়াভেলির গ্ৰন্থে পরীক্ষিত বাস্তব সত্যের অভিজ্ঞতার প্রকাশ

  • (১) The Prince-এর ২৬টি সংক্ষিপ্ত অধ্যায়গুলিতে কোনো সূক্ষ্ম সুতোয় বোনা মতবাদ, কোনো বিমূর্ত জল্পনা-কল্পনা অথবা কোনো জটিল তত্ত্ব উপস্থাপিত হয় নি। সেখানে বর্ণিত হয়েছে শুধুমাত্র পরীক্ষিত বাস্তব সত্যের অভিজ্ঞতা, যে অভিজ্ঞতা প্রাত্যহিক বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে যাচাই করা হয়েছে।
  • (২) নিজ মতকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি তন্নতন্ন করে ঘেঁটেছেন ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত, গ্রিক, রোমান ও ইতালির নগর-রাষ্ট্রগুলির অসংখ্য ইতিহাস গ্রন্থে উল্লিখিত তথ্যের সাহায্যে গ্রহণ করেছেন তিনি। অলংকরণ বা বাগাড়ম্বরের ধার ধারতেন না এই বাস্তবধর্মী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। প্রিন্সের সূচনায় তিনি লিখছেন… “I have not embellished with swelling or magnified words”I

ম্যাকিয়াভেলির প্রচেষ্টায় রেনেসাঁসের প্রভাব

  • (১) মানবতাধর্মী রাজনৈতিক দর্শনের প্রবক্তারূপে আধুনিকতার দাবি করা সত্ত্বেও ম্যাকিয়াভেলি কিন্তু ইউরোপীয় ধ্রুপদী ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করেন নি। মধ্যযুগীয় কুসংস্কার, স্থবিরতা ও নানা প্রতিবন্ধকতাকে অতিক্রম করতে গেলে প্রাচীন গ্রিস ও রোমের সাহিত্য, দর্শন ও শিল্পকলার নিদর্শনগুলিকে বিস্মৃত হলে চলবে না।
  • (২) ধ্রুপদী ভাবাদর্শই যে মানুষকে দিতে পারে মুক্ত জীবনের অভিজ্ঞতা ম্যাকিয়াভেলি সে বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ইউরোপের নতুন সমাজে প্রাচীনের বাস্তবধারাকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করার যে প্রচেষ্টা ম্যাকিয়াভেলি চালিয়েছিলেন তা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। বলাবাহুল্য, তাঁর এই প্রচেষ্টার মধ্যে রেনেসাঁসের সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায় ।

ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার সমালোচনা

  • (১) ম্যাকিয়াভেলির এই লোকায়ত রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা অবশ্যই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এর বিরুদ্ধে সব চাইতে বড়ো অভিযোগ হল এই যে এতে নৈতিকতার কোনো স্থান ছিল না। এবিষয়ে Maxey বলেছেন, “No wonder moralists abhor Machiavelli. Under his withering logic moral platitude crambles”।
  • (২) Realpolitik এবং আদর্শবাদী রাজনীতির মধ্যে সংঘাত ও বিতর্ক ইতিহাসের নানা পর্বে লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমোক্ত রাজনীতির প্রবক্তা বিসমার্ককাভুর। তাঁদের অনুসৃত পথেই জার্মানি ও ইতালির একীকরণ সম্ভব হয়েছিল এবং তাঁদের রাজনৈতিক দর্শনে ম্যাকিয়াভেলির সুস্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।
  • (৩) অন্যদিকে আদর্শবাদী রাজনীতির প্রবক্তা ছিলেন ম্যাৎসিনি। তাঁর প্রজাতান্ত্রিক আদর্শ বা একলা চলার নীতি কিন্তু ইতালিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে নি। অন্যদিকে ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্টের সদিচ্ছা প্রণোদিত প্রচেষ্টা জার্মানির একীকরণে তেমন সহায়ক হয় নি।

উপসংহার :- খুব সম্ভবত বাস্তবের তাগিদেই ম্যাকিয়াভেলি এক পাশবিক জীবনদর্শনের অবতারণা করেছিলেন। তাঁর মতে চলমান জগত ও জীবন এই শিক্ষাই দেয় যে জীবন যুদ্ধে মানুষকে জয়ী হতে হলে, সাফল্য অর্জন করতে গেলে এবং নিজ আধিপত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করে তুলতে হলে অবশ্যই পাশবিক বৃত্তির চর্চা করতে হবে। কারণ, মানব সমাজ স্বর্গরাজ্য নয়।

(FAQ) নিকলো ম্যাকিয়াভেলি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার অগ্রদূত কাকে বলা হয়?

নিকলো ম্যাকিয়াভেলি।

২. নিকলো ম্যাকিয়াভেলি রচিত গ্ৰন্থের নাম কি?

The Prince.

৩. নিকলো ম্যাকিয়াভেলির রাষ্ট্রচিন্তা কি নামে পরিচিত ছিল?

লোকায়ত রাষ্ট্রচিন্তা।

৪. নিকলো ম্যাকিয়াভেলি কোন দেশের নাগরিক ছিলেন?

ইতালি।

Leave a Comment