মানবতাবাদ

মানবতাবাদ প্রসঙ্গে মানবতাবাদী চিন্তানায়কদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দান, লেখার উপর মানবতাবাদীদের গুরুত্ব, মানুষের কীর্তির উপর মানবতাবাদের গুরুত্ব, নবজাগরণ বা রেনেসাঁস দর্শন, মানবতাবাদীদের মানুষের গুণাবলির প্রশংসা, মানবতাবাদীর দৃষ্টি, মানবতাবাদের যুগে ভাষাচর্চা, মানবতাবাদীদের অনুসন্ধিৎসা, মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাকে মানবতাবাদীদের আক্রমণ, ধ্রুপদী সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্ব চর্চার আদি রূপ বিশ্লেষণে মানবতাবাদীদের গুরুত্ব আরোপ, শিল্পীদের উপর মানবতাবাদের প্রভাব, নব্যদর্শন রূপে মানবতাবাদ, মানবতাবাদের উৎপত্তি স্থান, মানবতাবাদের ধর্মীয় দিক, মানবতাবাদের সাথে ইতিহাস বোধের উন্মেষ, মানবতাবাদী সংস্কৃতি, মানবতাবাদে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন, সভ্যতা ও সংস্কৃতির জগতে মানবতাবাদের ইতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে জানবো।

মানবতাবাদ

ঐতিহাসিক ঘটনামানবতাবাদ
সময়কালরেনেসাঁস পর্ব
উৎপত্তিস্থলইতালি
বৈশিষ্ট্যস্বাধীন চিন্তার বিকাশ
মানবতাবাদীইরাসমাস
Platonic Academyফ্লোরেন্স
মানবতাবাদ

ভূমিকা :- রূপান্তরের পর্বে ইউরোপে রেনেসাঁস চিন্তাধারার এক অন্যতম অঙ্গ ছিল মানবতাবাদ (Humanism)। রেনেসাঁস পর্বে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অনুশাসন ও বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে মানুষ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জন করার শিক্ষা লাভ করে। মানুষের চিন্তার জগতে এই স্বাধীন ভাবধারা মানবতাবাদ নামে পরিচিত।

মানবতাবাদ সম্পর্কে Stephen এর মন্তব্য

Aspect of European History গ্রন্থে Stephen, J. Lee মন্তব্য করেছেন যে মানবতাবাদ হল নবজাগরণের যুগে সবরকম সাংস্কৃতিক অনুপ্রেরণার উৎস, যা সাহিত্য, ইতিহাস, চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও রাজনৈতিক ধ্যানধারণাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

মানবতাবাদী চিন্তানায়কদের মাতৃভাষায় শিক্ষা দান

গ্রিক ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পের দ্বারা অনুপ্রাণিত হলেও মানবতাবাদী চিন্তানায়করা মাতৃভাষার মাধ্যমে সাহিত্য সাধনা করে তাঁদের শিষ্যদের শিক্ষাদান করতেন। তাই আলোচ্য পর্বে ধ্রুপদী শিল্প ও বিদ্যাচর্চার পুনর্জন্মের পাশাপাশি মাতৃভাষার বা স্থানীয় ও আঞ্চলিক ভাষারও বিকাশ ও উন্নতি সাধন সম্ভব হয়েছিল।

মানবতাবাদীদের লেখার উপর গুরুত্ব

রেনেসাঁস প্রসূত মানবতাবাদ মানুষের মর্যাদাকে সসম্মানে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করেছিল। মধ্যযুগের বাংলা কবি চণ্ডীদাসের মতো রেনেসাঁসেরও ব্যঞ্জনা ছিল ‘সবার ওপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপরে নাই’। রেনেসাঁসের মানবতাবাদীরা মার্জিত, সুরুচিপূর্ণ এবং সুন্দর বাচনভঙ্গি ও লেখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। তাঁদের মতে এর দ্বারাই মানুষের অভিনবত্ব, তার অনুভূতি ও বিশেষ দক্ষতার যথার্থ বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

মানুষের কীর্তির উপর মানবতাবাদের গুরুত্ব

আলোচ্য পর্বে মানবতাবাদের বৌদ্ধিক পরিধি সম্প্রসারিত হয়েছিল এবং কোনো প্রকার দিব্যজ্ঞান বা মহিমা নয়, মানবতাবাদ গুরুত্ব আরোপ করেছিল মানুষের কীর্তির ওপর। মানবতাবাদ ছিল ধর্মীয় থেকে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারায় উত্তরণ এবং ধ্রুপদী পুথিপত্রের নব উদ্যমে পাঠ ও অনুশীলন।

নবজাগরণ বা রেনেসাঁস দর্শন

  • (১) রেনেসাঁস দর্শন মানুষের মর্যাদার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিল। এর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্রের প্রশ্নটি। রেনেসাঁস একেও উপেক্ষা করে নি। এই বিষয়ে রেনেসাঁসের বক্তব্য সুস্পষ্ট। প্রত্যেক মানুষের অধিকার আছে স্বাধীন ও সুষ্ঠুভাবে নিজ ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশে, এবং এই বিকাশের ক্ষেত্রে যুক্তিবিদ্যা ও অধিবিদ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল নৈতিকতার ওপর।
  • (২) এই যুগে স্বাধীন ইচ্ছার ওপরেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু রেনেসাঁস এটাও বিশ্বাস করত স্বাধীন মানুষের এবং তার ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার মধ্যে। যে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবধারার উদ্ভব ঘটাতে রেনেসাঁস সহায়তা করেছিল তার অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল সম্পদ, সুস্বাস্থ্য এবং সৌন্দর্যচর্চা।
  • (৩) অবশ্য এর পাশাপাশি ভক্তি, ধর্মানুরাগ, চিরাচরিত মূল্যবোধ ও নৈতিক উৎকর্ষকেও পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয় নি। অর্থাৎ প্রকৃত সুখের অর্থ সম্পদ ও নৈতিকতা উভয়ের গুরুত্ব। প্রকৃত জ্ঞান তথা ঈশ্বরতত্ত্বের অর্থ, ইতিহাসবোধ, সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাচীন ভাষা ও জ্ঞান, বিশেষত লাতিন ও হিব্রু ভাষার সঙ্গে সম্যক পরিচয়।

মানবতাবাদীদের মানুষের গুণাবলির প্রশংসা

মধ্যযুগীয় তাত্ত্বিকগণ মানুষের অক্ষমতার দ্বারা তার ব্যাখ্যা করেছিলেন। মানুষের অক্ষমতাই তাকে ঈশ্বরের কাছ থেকে পৃথক করে রেখেছিল। অন্যদিকে মানবতাবাদী প্রবক্তাগণ মানুষের গুণাবলির প্রশংসা করেছিলেন এবং তাঁদের মতে ঈশ্বর ছিলেন এই গুণাবলির স্রষ্টা।

মানবতাবাদ সম্পর্কে জনৈক জার্মান মানবতাবাদীর মন্তব্য

১৫২১ খ্রিস্টাব্দে জনৈক জার্মান মানবতাবাদী লিখেছিলেন, “মানবজাতির সৃষ্টিতে ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা উদ্ভাসিত হয়েছে।” তাঁর মতে ইন্দ্ৰিয়গ্রাহ্য এবং বৌদ্ধিক জগতের মধ্যে যোগসূত্র রচনার উদ্দেশ্যে ঈশ্বরই মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন এবং এই মানুষকে তিনি দুটি অপূর্ব গুণের অধিকারী করেছিলেন, যথা যুক্তি এবং স্বাধীনতার স্পৃহা।

মানবতাবাদীর দৃষ্টি

মধ্যযুগে সাধারণত তিনটি শ্রেণিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখা হত, যথা, সাধক, যাজক এবং বীরযোদ্ধা বা নাইট। মানবতাবাদীর দৃষ্টিতে বিশেষ কোনো মানুষকে শ্রদ্ধা-সম্ভ্রমের পাত্র মনে করা হয় নি। আদর্শ মানুষ অবশ্যই মহৎ হবেন কিন্তু এই মাহাত্ম্য তিনি কখনোই মধ্যযুগের মতো জন্মসূত্রে অর্জন করবেন না। বিশেষ কিছু গুণের অধিকারী যিনিই হোন না কেন (শ্রেণি বা সম্প্রদায় নির্বিশেষে) তিনিই প্রকৃত মহৎ। Humanist দৃষ্টিতে বিশেষ গুণের অধিকারী perfect man হবেন সুস্বাস্থ্য, শ্রী এবং সম্পদের অধিকারী।

মানবতাবাদের যুগে ভাষাচর্চা

  • (১) এই যুগে রোমের পোপরা ভাষাচর্চার পৃষ্ঠপোষকতা করতে কার্পণ্য করেন নি। তাঁরা হারিয়ে যাওয়া লাতিন গ্রন্থ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করতেন। প্রয়োজনে তাঁরা এব্যাপারে অর্থ ব্যয়ও করতেন। এছাড়া তাঁরা বিধ্বস্ত বাইজানটাইন সাম্রাজ্য থেকে গ্রিক পুথি উদ্ধারেও সাহায্য করতেন। এক্ষেত্রে শাসকরাও পিছিয়ে ছিলেন না।
  • (২) শাসকদের সংগৃহীত পুথিপত্র তাঁদের গ্রন্থাগারগুলিকে সমৃদ্ধ করেছিল এবং সেগুলি অচিরেই নীরব অথচ উচ্চমার্গের সারস্বত সাধনার কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে পিকোদেল্লা মিরানদোলার (১৪৬৩-১৪৯৪) কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। বলাবাহুল্য অধিকাংশ পুস্তক সংগ্রাহক ছিলেন ইতালীয়।

মানবতাবাদী বলার সংশয়

Humanist-কে নিছক মানবতাবাদী বলার ব্যাপারে কিছু সংশয় প্রকাশ করেছেন সাম্প্রতিক কালে Myron Gilmore, E. Garin, Hans Baron এবং P. O Kristeller-এর মতো লেখক ও সমালোচকবৃন্দ। Kristeller-এর দৃষ্টিতে এই আন্দোলন ছিল “…essentially scholarly, educational and literary movement.” তিনি এর মধ্যে তিনটি ধারা লক্ষ্য করেছেন। যথা –

  • (১) মধ্যযুগে চিঠিপত্র, দলিল বক্তৃতা ইত্যাদি লেখার জন্য Rhetoric পড়ার ঐতিহ্য ছিল। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ইতালিতে Rhetoric-এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল ভার্জিল, সিসেরো ও হোরেসের সাহিত্য পঠনপাঠন।
  • (২) চতুর্দশ শতকে দ্বিতীয় ধারায় Classic গ্রিক সাহিত্য এর সঙ্গে যুক্ত হল। সৃষ্টি হল একটি মিশ্র পাঠ্যসূচি যার অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল লাতিন ও গ্রিক ব্যাকরণ, Rhetoric, কাব্য, ইতিহাস এবং নীতিশাস্ত্র। এই নতুন পাঠ্যসূচির নামকরণ হল Studia humanitatis (আজকাল বলা হয় humanities)।
  • (৩) তৃতীয় এবং শেষ উপরোক্ত পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল Neo-Platonic চিন্তাধারা।

মানবতাবাদীদের অনুসন্ধিৎসা

এই যুগের মানবতাবাদীরা শুধুমাত্র ভাষাচর্চায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁদের অনুসন্ধিৎসা সাহিত্যিক ও শৈল্পিক সৃজনশীলতা এবং ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও অনুভত হয়েছিল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা তত্ত্ব নিয়েও তাঁরা চিন্তাভাবনা করেছিলেন। একদিকে এঁদের প্রেরণার উৎস ছিল লিভি, সিসেরো ও প্লেটোর মতো অখ্রিস্টান ও অধার্মিকদের চিন্তাধারা। অন্যদিকে এদের একাংশ অবশ্য প্রাচীন খ্রিস্টান মনীষীদের অবদানকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন নি। বিশেষত তাঁরা সেন্ট অগস্টাইন এবং সেন্ট জেরোমের কাছে ঋণী ছিলেন।

মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাকে মানবতাবাদীদের আক্রমণ

চতুর্দশ শতক থেকে মানবতাবাদীরা মধ্যযুগীয় ধ্যানধারণাকে আক্রমণ করতে থাকেন। ইতিপূর্বে মধ্যযুগীয় পণ্ডিতরা তাঁদের সময়কে প্রাচীন যুগের চেয়ে উন্নততর বলে মনে করতেন। তাঁদের দৃষ্টিতে খ্রিস্টীয় ধ্যানধারণার দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত মধ্যযুগের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো ছিল দৈবানুগ্রহভিত্তিক। রোমান সাম্রাজ্য খ্রিস্টধর্মের স্বীকৃতি ও প্রতিষ্ঠার পূর্বাবধি ছিল প্রাচীন, জ্ঞানদীপ্তির বিরোধী এবং বিশৃঙ্খল। কিন্তু নব্য মানবতাবাদের আলোকে এখন মধ্যযুগই ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ এবং অনগ্রসর বলে প্রতিপন্ন। সেই যুগের ধর্মীয় রক্ষণশীলতা ছিল সর্বপ্রকার প্রগতির পরিপন্থী।

ধ্রুপদী সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্ব চর্চার আদি রূপ বিশ্লেষণে মানবতাবাদীদের গুরুত্ব আরোপ

  • (১) ধ্রুপদী সাহিত্য ও ভাষাতত্ত্ব চর্চার ক্ষেত্রে তাদের আদিরূপ বিশ্লেষণের ওপর মানবতাবাদী পণ্ডিতরা বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। অতঃপর ব্যাকরণগত বিশুদ্ধি ও সর্বাঙ্গ সুন্দর রচনাশৈলীর ওপর আরও বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হতে থাকে। ভাল্লা (Valla) ভাষাতত্ত্ব বিষয়ক গবেষণা ও গ্রন্থ আধুনিক ভাষাতত্ত্বের ভিত্তিস্থাপন করেছিল।
  • (২) অতঃপর ঐতিহাসিক দলিল-দস্তাবেজকেও ভ্রান্ত এবং জাল বলে প্রমাণ করা সম্ভব হয়। কারণ সেগুলির মধ্যে অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। ইতিপূর্বেই বলা হয়েছে যে আলোচ্য পর্বে গ্রিক ভাষা ও সাহিত্যচর্চা পুনরুজ্জীবিত হয়েছিল এবং এর মূলে ছিল বাইজানটিয়াম থেকে হারিয়ে যাওয়া গ্রিক গ্রন্থের আবিষ্কার। এক্ষেত্রে ইতালিতে আগত বাইজানটাইন পণ্ডিতদেরও অবদান ছিল।
  • (৩) ১৩৯০-এর দশকে ম্যানুয়েল ক্রাইসোলোরাস (Manuel Chrysoloras) রোম এবং ফ্লোরেন্সে গ্রিক ভাষার ওপর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দিতেন। ওই ফ্লোরেন্সেই পরবর্তীকালে ১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দে প্লেটোর ভাবধারাচর্চার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান Platonic Academy গড়ে উঠেছিল।

শিল্পীদের উপর মানবতাবাদের প্রভাব

মানবতাবাদের প্রভাবে এই যুগের শিল্পীরা মানবদেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সম্বন্ধে বিজ্ঞানসম্মত ধারণালাভে সক্ষম হয়েছিলেন। স্বভাবতই তাঁদের শিল্পে নর-নারীরা আরও স্বাভাবিক ও বাস্তবরূপে চিত্রিত হয়েছিল। স্থাপত্যের ক্ষেত্রে বৃত্ত ও গম্বুজ নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। এটাই ছিল পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ইতালির স্থাপত্য রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। লেখকরা তাঁদের রচনায় মানুষের ভাবাবেগ ও যুক্তি দুটোই বিশ্লেষণ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।

নব্যদর্শন রূপে মানবতাবাদ

  • (১) মানবতাবাদকে ঐতিহাসিকদের একাংশ একটি নব্যদর্শন রূপে বর্ণনা করেছেন। তাঁরা আরও বলেছেন যে ওই নব্যদর্শনে শুধুমাত্র মানব প্রকৃতিকেই গৌরবান্বিত করা হয়েছিল, কোনো বহির্জাগতিক বা অতীন্দ্রিয় অস্তিত্ব নয়, মানুষের জাগতিক অস্তিত্ব এবং রক্তমাংসের মানুষের ওপরে অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছিল।
  • (২) অবশ্য এই ধারণা পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয় না। পেত্রার্ক থেকে শুরু করে প্রথম যুগের মানবতাবাদীরা পুরোপুরি বহির্জাগতিক ধর্মীয় চেতনাকে অস্বীকার করেন নি। তখনও মানবতাবাদী দর্শনের ভিত্তি ছিল অ্যারিস্টটলের স্কলাস্টিসিজম। অবশ্যই এই স্কলাস্টিসিজম সমালোচিত হয়েছিল।
  • (৩) কিন্তু এই সমালোচনার ভিত্তি কখনোই মতাদর্শগত বা দার্শনিক ছিল না। তা ছিল শিক্ষাগত এবং পাঠক্রম বিষয়ক। তথাকথিত মানবতাবাদী দর্শন আদৌ কোনো দর্শন ছিল কিনা সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন পণ্ডিতদের একাংশ। তাঁদের দৃষ্টিতে এটি ছিল বিশিষ্ট বৌদ্ধিক প্রণালী মাত্র।

মানবতাবাদের উৎপত্তি স্থান

  • (১) রেনেসাঁসের মতো রেনেসাঁস প্রসূত মানবতাবাদেরও উৎপত্তি হয়েছিল ইতালিতে। পরবর্তীকালে মানবতাবাদ ইতালির ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপীয় মহাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল, মানবতাবাদ বিশিষ্ট অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং যাজকদের মাধ্যমে আল্পস পেরিয়ে উত্তর ইউরোপে প্রসারিত হয়েছিল। অবশ্য এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে একতরফা ছিল না।
  • (২) পরবর্তীকালে ইংল্যান্ড, জার্মানি ও ফ্রান্সের মানবতাবাদ ইতালিতেও প্রসারিত হয়েছিল। ভাবের আদানপ্রদানে সমৃদ্ধতর হয়েছিল মানবতাবাদ এবং এর ফল হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন একাধিক মনীষী, যেমন – ইংল্যান্ডে কোলেট এবং টমাস মোর; জার্মানিতে সেলটিস, এগ্রিকোলা ও ফন হুটেন; ফ্রান্সে লেফে, দেতাপ্লে ও বুঁদ এবং নেদারল্যান্ডসে এরাসমাস।

মানবতাবাদের ধর্মীয় দিক

  • (১) অপর একটি ক্ষেত্রেও রেনেসাঁসের সঙ্গে মানবতাবাদের সাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়, সেটি হল ধর্মীয়। সে যুগের অন্যান্য পণ্ডিতদের মতো মানবতাবাদীরাও ধর্মীয় বিরোধ ও বিতর্ক প্রসূত উত্তেজনার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন কিন্তু তাঁরা এই উত্তেজনা প্রশমনে মানসিক প্রশান্তির কথা চিন্তা করেছিলেন।
  • (২) এই যুগের মানবতাবাদ প্রধানত দুটি রূপ ধারণ করেছিল যথা ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদ (যা মূলত ঐতিহাসিকদের প্রভাবিত করেছিল) এবং ধর্মাশ্রিত মানবতাবাদ (যা মৌলিক খ্রিস্টীয় মতবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের মধ্যে সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করেছিল। ধ্রুপদী সংস্কৃতির রসাস্বাদনে আগ্রহী পোপদের একাংশ ছিলেন যার পৃষ্ঠপোষক ও প্রবক্তা)।

মানবতাবাদের সাথে ইতিহাস বোধের উন্মেষ

  • (১) মানবতাবাদী ধ্যানধারণার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসবোধের উন্মেষ ঘটেছিল। পেত্রার্ক রচনা করেছিলেন Letters to the Ancient Dead এবং এতে সমকালীন যুগে লেখকের অবস্থান উপলব্ধি করা যায়। আলোচ্য যুগে বিশেষত পঞ্চদশ শতকে লিওনার্দো ব্রুনি, ফ্লাভিও বিওন্ডো ও ষোড়শ শতকের প্রথম পর্বে গুইসিয়ারডিনি ও ম্যাকিয়াভেলি একটি পৃথক বিষয় হিসাবে ইতিহাসের উন্নয়নে সহায়তা করেছিলেন।
  • (২) ম্যাকিয়াভেলি তাঁর Prince এবং Discourses-এ যে নৈতিকতার ঊর্ধ্বে স্থাপিত সর্বশক্তিমান শাসক ও তার সঙ্গে সম্পর্কিত তত্ত্বের উদ্ভাবনে সাহায্য করেছিলেন তা ছিল একাধারে খ্রিস্টীয় নৈতিকতার বিরোধী ও ধর্মনিরপেক্ষ। ব্রুনির পরবর্তীকালে ইতিহাস একটি বর্ণনামূলক রূপ ধারণ করেছিল এবং এটি রাজনীতির একটি অন্যতম উপাদান রূপে বিবেচিত হতে থাকে। ব্রুনি তাঁর সমসাময়িক গবেষকদের শিখিয়েছিলেন অতীতকে অতীত রূপেই গণ্য করতে।

মানবতাবাদী সংস্কৃতি

মধ্য পঞ্চদশ শতকের মধ্যে মানবতাবাদী সংস্কৃতিই উত্তর ইতালির ধনী ও বিশেষ অধিকারপ্রাপ্ত মানুষের সাংস্কৃতিক অবস্থানের মানদণ্ড রূপে বিবেচিত হতে থাকে। এমনকি সামাজিক দিক থেকে কিছুটা অনগ্রসর নেপলস ও রোম এই সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল না। বলাবাহুল্য রেনেসাঁস প্রসূত মানবতাবাদ রেনেসাঁস মানুষের উদ্ভবে সাহায্য করেছিল। এই মানুষের কাছে প্রত্যাশিত ছিল প্রাচীন রোমের ভাষা হিসাবে লাতিন পাঠ ও লেখার দক্ষতা, প্রাচীন ইতিহাস ও সাহিত্যের ধারা সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান, এমনকি (সীমিত হলেও) গ্রিক ভাষার ওপর কিছু দখল।

মানবতাবাদে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্ন

  • (১) এই সাংস্কৃতিক তথা শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি, যাকে পণ্ডিতরা Civic humanism আখ্যা দিয়েছেন। আরও প্রত্যাশিত ছিল চিরাচরিত সমরবিদ্যা ও অশ্বারোহণে পারদর্শিতা।
  • (২) মাতৃভাষাচর্চা, কণ্ঠসংগীতচর্চা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানোর ক্ষমতা থাকবে এবং সবশেষে এই মানুষ অবশ্যই অন্য বিদগ্ধ মানুষের সঙ্গে কোনো বিষয়ে মনোজ্ঞ ও চিত্তাকর্ষক কথপোকথনে সক্ষম হবেন এটাও প্রত্যাশিত ছিল। বলাবাহুল্য, রেনেসাঁস মানুষ এই প্রত্যাশা অনেকটাই পূরণ করতে পেরেছিল।
  • (৩) মধ্যযুগে যে সারস্বতচর্চা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এখন তা প্রসারিত হয় মানবতাবাদীর গ্রন্থাগারে। মুদ্রণযন্ত্রের আবিষ্কার এবং চিনের কাছ থেকে আরবদের মাধ্যমে কাগজ নির্মাণ কৌশল মানবতাবাদী সংস্কৃতির দিগন্ত আরও সম্প্রসারিত করতে সাহায্য করেছিল। এই প্রক্রিয়া রিফরমেশন আন্দোলনকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

সভ্যতা ও সংস্কৃতির জগতে মানবতাবাদের ইতিবাচক প্রভাব

  • (১) নবজাগরণ প্রসূত মানবতাবাদ শুধু ইউরোপের সমাজ ও সভ্যতাকে নয়, সমগ্র পৃথিবীর সভ্যতা ও সংস্কৃতির জগতে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। অতএব মানবতাবাদের তাৎপর্য বা গুরুত্ব অপরিসীম। মানবতাবাদীর চেতনায় গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিল মানবমন।
  • (২) প্রাচীন দর্শনের আলোয় নবীন জগতের পথকে খুঁজে বার করার জন্য ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে জ্ঞানের আলো জ্বেলেছিলেন এঁরা। আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি যে, কনস্টানটিনোপলের পতনের পর বহু বাইজানটাইন পণ্ডিত তাঁদের যাবতীয় পুস্তক সঙ্গে নিয়ে ইতালির বহু নগরে আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন।

উপসংহার :- প্রধানত এইসব পণ্ডিতদের চেতনার স্পর্শে ইউরোপের জ্ঞানী মানুষ আবার প্রাচীন গ্রিক ও রোমান যুগের ধ্রুপদী বিদ্যাচর্চাকে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন, এর পাশাপাশি ঘটেছিল বিজ্ঞান, নব্যদর্শন ও ইতিহাসচর্চার প্রসার, যা কুসংস্কারমুক্ত স্বাধীন চিন্তার উন্মেষে সহায়তা করেছিল। এগুলি ছিল মানবতাবাদের প্রাণশক্তির অন্যতম উৎস।

(FAQ) মানবতাবাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মানবতাবাদ কি?

রেনেসাঁস পর্বে মধ্যযুগীয় ধর্মীয় অনুশাসন ও বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করে মানুষ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কোনো কিছু গ্রহণ বা বর্জন করার শিক্ষা লাভ করে। মানুষের চিন্তার জগতে এই স্বাধীন ভাবধারা মানবতাবাদ নামে পরিচিত।

২. মানবতাবাদের উৎপত্তি হয় কোথায়?

ইতালিতে।

৩. দুজন মানবতাবাদী প্রবক্তার নাম লেখ।

ইরাসমাস, টমাস মোর।

৪. প্লেটোর ভাবধারাচর্চার জন্য Platonic Academy প্রতিষ্ঠান কখন কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?

১৪৩৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্লোরেন্সে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment