মঠজীবনবাদ

মঠজীবনবাদ প্রসঙ্গে সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নতিতে মঠজীবনবাদের ভূমিকা, উদ্ভব ও বিকাশের আলোচনা, মঠজীবনবাদের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক বিকাশ, ঈশ্বরের চিন্তা, মঠজীবনবাদে যীশু খ্রিস্টের বাণীর প্রভাব, সন্ন্যাসীদের গোষ্ঠী, ধর্মচর্চার জন্য মঠ স্থাপন ও পাশ্চাত্য সভ্যতায় মঠজীবনবাদের অবদান সম্পর্কে জানবো।

মঠজীবনবাদ

ঐতিহাসিক ঘটনামঠজীবনবাদ
অন্য নামমঠতন্ত্র, সন্ন্যাসবাদ, Monasticism
উদ্ভবকালতৃতীয় শতাব্দী
মঠ স্থাপনসেন্ট অ্যান্টনি
Monkনিঃসঙ্গ
মঠজীবনবাদ

ভূমিকা :- মধ্যযুগের ইউরোপে সাধু এবং সাধকদের নিঃসঙ্গ জীবনযাপন থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রধান উপায় ছিল ঈশরের চিন্তাভাবনার মধ্যে দিয়ে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করা। খ্রিস্টান ধর্মের সাধু ও সাধকরা একত্রিত হয়ে ‘মঠ’ গঠন করেছিল। খ্রিস্টান ধর্মে মঠকে কেন্দ্র করে যে কার্যকলাপ সংগঠিত হয়েছিল তা মঠজীবনবাদ, মঠতন্ত্র, সন্ন্যাসবাদ বা “Monasticism” নামে পরিচিত।

সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নতিতে মঠজীবনবাদের ভূমিকা

মঠ ছিল ধর্মীয় চর্চা, সমাজকল্যাণমূলক কাজ, শিল্প ও বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র। ‘Monasticism’ বলতে প্রধানত সাধু বা সন্ন্যাসীদের জীবনযাপনকেই বোঝায়। মধ্যযুগের ইউরোপে এই সন্ন্যাসী ও সাধকরা সমাজ ও সংস্কৃতির উন্নতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন।

মঠজীবনবাদের উদ্ভব ও বিকাশের আলোচনা

David Knowles তাঁর “Christian Monasticism” গ্রন্থে খ্রিস্টান মঠজীবনবাদের উদ্ভব ও বিকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস আলোচনা করেছেন।

মঠজীবনবাদের ক্ষেত্রে আধ্যাত্মিক বিকাশ

  • (১) তৃতীয় শতাব্দী থেকেই মঠজীবনবাদের উদ্ভব হয়েছিল বলে মনে করা হয়। ইউরোপে বহিরাগতদের আক্রমণের ফলে জনগণের চরম ক্ষতি হয়েছিল। শাসকদল জনগণকে রক্ষা তো করেইনি বরং তাদের উপর অত্যাচার শুরু করেছিল।
  • (২) এইরকম পরিস্থিতিতে নৈতিকতার অবক্ষয় ঘটে। ভোগবিলাস ও চূড়ান্ত অনৈতিকতার পরিবর্তে আধ্যাত্মিকতার প্রতি জনগণ আকৃষ্ট হয়। পাপ থেকে মুক্তি লাভের জন্য, আত্মার শাস্তিলাভের জন্য মঠজীবনবাদই ছিল একমাত্র অবলম্বন।
  • (৩) ঈশ্বরের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধার মধ্যে থেকেই জনগণ নিজেদের জগৎকে খুঁজে পেয়েছিল। তাই মঠজীবনবাদের উদ্ভবে আধ্যাত্মিকতার বিকাশ উল্লেখযোগ্য ছিল।

মঠজীবনবাদ

Monasticism বা মঠজীবনবাদ এসেছে Monk থেকে। গ্রীক শব্দ Monakos থেকেই Monk শব্দটির উদ্ভব হয়েছিল। এর অর্থ হল নিঃসঙ্গ। সংসার ত্যাগ করে যে সন্ন্যাসীরা মঠে আশ্রয় নিত তাদের Monk বলা হত।

মঠজীবনবাদে ঈশ্বরের চিন্তা

  • (১) মধ্যযুগের ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মের বিকাশের ক্ষেত্রে দুটি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল – চার্চ বা গীর্জা ও মঠ। তৃতীয় শতাব্দীর আগেই মঠজীবনবাদের উদ্ভবের উপযুক্ত প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।
  • (২) মধ্যযুগের উল্লেখযোগ্য শহর এ্যান্টিয়োক, আলেকজান্দ্রিয়া এতই কোলাহলে পরিপূর্ণ ছিল যে খ্রিস্টান ধর্মগুরুরা ঈশ্বর আরাধনার জন্য শান্তিপূর্ণ এবং নিরিবিলি মিশর ও সিরিয়ার মরু অঞ্চলে চলে গিয়েছিলেন। সন্যাসীরা সমস্ত সুখ, বিলাস, ভোগ বাসনা ত্যাগ করে ঈশ্বরের চিন্তাতে মগ্ন থাকতেন।

মঠজীবনবাদে যীশু খ্রিস্টের বাণীর প্রভাব

  • (১) R.A. Markus তাঁর “Christianity in the Roman World” গ্রন্থে খ্রিস্টানধর্ম সম্পর্কে তাঁর মতামত লিপিবদ্ধ করেন। জেরুজালেমের “বেথেলহাম” শহরে যীশুখ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মঠব্যবস্থার উদ্ভবের ক্ষেত্রে যীশুখ্রিস্টের উপদেশগুলি বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল।
  • (২) যীশুখ্রিস্টের শিষ্য পল খ্রিস্টধর্মের যে মূল বক্তব্যগুলি জনসাধারণের কাছে তুলে ধরেছিলেন তা থেকে অনুমান করা যায় যীশুখ্রিস্ট সাংসারিক জীবনের পরিবর্তে নিঃসঙ্গ জীবনযাপনকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। নিঃসঙ্গ জীবনযাপনের মধ্যে দিয়ে শান্তির পরিবেশে ঈশ্বরের উপাসনা বা ঈশ্বরের সান্নিধ্যলাভ সহজেই সম্ভব হবে।
  • (৩) সংসারজীবনে সম্পূর্ণভাবে ঈশ্বরের আরাধনা করা সম্ভব নয়। আধ্যাত্মিক জীবনযাপন করতে হলে নিরিবিলি শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই করা উচিত। এই জগতের সমস্ত ভোগবিলাস ত্যাগ করে ঈশ্বরের চিন্তার মধ্যে দিয়েই আত্মা শুদ্ধ হবে। এর ফলে সাধু বা সন্ন্যাসীরা মঠ স্থাপন করে নির্জনে একান্তভাবে ঈশ্বরের চিন্তায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছিলেন।

মঠজীবনবাদে সন্ন্যাসীদের গোষ্ঠী

ইউরোপে মঠজীবনবাদের উদ্ভবের ফলে জনগণ মঠের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। মঠগুলির সহজ সরল জীবনযাপন পদ্ধতি জনগণ সহজেই গ্রহণ করেছিল। তৃতীয় শতাব্দীর আগে থেকেই পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যে মঠজীবনবাদের উদ্ভবের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়কালে সন্ন্যাসীরা দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল – Anchorites বা ধ্যানী সন্ন্যাসী এবং Cenobites বা সিনোবাইট সন্ন্যাসী।

মঠজীবনবাদে ধ্যানী সন্ন্যাসীগণ

Anchorites বা ধ্যানী সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা নিঃসঙ্গ জীবনযাপন পদ্ধতি গ্রহণ করেছিল। ধ্যানের মধ্যে দিয়ে তারা নিজেদের নিয়োজিত রাখতেন। এই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা সমাজের সমস্ত স্তরের সহায়তা বা সহানুভূতি না পেলেও তাদের ধর্মীয় উন্মাদনা যে অন্য প্রকৃতির ছিল তা সহজেই অনুমান করা যায়। পাপ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এরা নিজেদের দেহের প্রতি অমানুষিক নির্যাতন সহ্য করতেন। যেমন –

  • (১) কাঁচা ধ্যানী সন্ন্যাসীগণ গাছ-পাতা খেয়ে তারা অন্য প্রাণীদের খাওয়া-দাওয়ার পদ্ধতি গ্রহণ করেছিলেন।
  • (২) মরুভূমির ক্যাকটাস বা কাঁটা জাতীয় গাছগুলিতে নিজেদের দেহ ক্ষতবিক্ষত করতেন।
  • (৩) শীত ও ঠাণ্ডার মধ্যে জলের মধ্যে নেমে গলা অবধি ডুবিয়ে অসহ্য ঠাণ্ডা সহ্য করতেন।
  • (৪) মরুভূমিতে রোদে বালির উপর দাঁড়িয়ে সূর্যের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকতেন।
  • (৫) ছোট একটি জায়গার মধ্যে বছরের পর বছর কাটানো। এর উদাহরণ হিসেবে বলা যায় St. Symeon Stylite একটি অপরিসর স্তম্ভের উপর প্রায় ৩৩ বছর কাটিয়েছিলেন। তাঁর শিষ্য ড্যানিয়েলও তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন।

মঠজীবনবাদে সিনোবাইট সন্ন্যাসীগণ

Cenobites সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা সমাজ ত্যাগ করলেও সকলে একসাথে ধর্মচর্চা করতেন। এই সম্প্রদায় চার্চের জাঁকজমকপূর্ণ ধর্ম অনুষ্ঠানগুলি মেনে চলার পক্ষপাতি ছিল না। নিঃসঙ্গতা এই সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীরা মেনে চললেও পরবর্তীকালে এরা সংঘবদ্ধ জীবনযাপনকেই বেশী গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

ধর্মচর্চার জন্য মঠ স্থাপন

সম্ভবত ৩১৫ খ্রিস্টাব্দে মিশরের সেন্ট অ্যান্টনি ধর্মচর্চার জন্য মঠ স্থাপন করেছিলেন। বহু সন্ন্যাসীরা তাঁকে অনুসরণ করেছিলেন।

পাশ্চাত্য সভ্যতায় মঠজীবনবাদের অবদান

  • (১) মধ্যযুগের মঠজীবনবাদ বা সন্ন্যাসধর্মের অবদান পাশ্চাত্য সভ্যতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ছিল। কারণ মধ্যযুগীয় এবং আধুনিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তা সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করেছিল। মধ্যযুগের মঠজীবনবাদ সম্পর্কিত গ্রন্থগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মঠ জীবনের গুরুত্ব বা এর প্রয়োজনীয়তা ছিল।
  • (২) চার্চের দুর্নীতির পরিবর্তে মঠগুলি নৈতিকতার আধার ছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতার ক্ষেত্রে মঠজীবনবাদের অবদান এক্ষেত্রে যে, সমাজে বিভিন্ন ধরনের কল্যাণমূলক কাজ, নৈতিকতা প্রভৃতি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল। চার্চ ছাড়াও খ্রিস্টান ধর্মের প্রসার যে মঠের মাধ্যমে করা যায় তা জানতে পারা গিয়েছিল।
  • (৩) শিক্ষামূলক বিভিন্ন বিষয় মঠে আলোচনার মাধ্যমে এই বিষয়গুলির প্রতি সন্ন্যাসীগণ আকৃষ্ট হয়েছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতায় ভোগবিলাসকেই জীবনের অঙ্গ হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল। মঠজীবনবাদ বা সন্ন্যাসধর্মে নৈতিকতা গুরুত্ব পাওয়ার পাশাপাশি ভোগ বিলাসকেও ত্যাগ করা হয়েছিল।
  • (৪) ভোগবিলাসকে ত্যাগ করে ঈশ্বর সাধনার বা ঈশ্বরের চিন্তার মধ্যে দিয়েও যে জীবন অতিবাহিত করা যায় তা জানা গিয়েছিল। পাশ্চাত্য সভ্যতার এই ধরনের ধারণা আগে ছিল না। ফলে মঠজীবনবাদ পাশ্চাত্য সভ্যতায় নতুন এক ধরনের পরিবর্তন এনেছিল।

উপসংহার :- পাশ্চাত্য সভ্যতার ক্ষেত্রে মঠজীবনবাদের অবদান এখানেই যে, সমাজকল্যাণমূলক কাজ ছাড়াও শিক্ষাচর্চার কেন্দ্র ও ধর্মীয় চর্চা কেন্দ্র হিসাবে মঠগুলি গড়ে উঠেছিল।

(FAQ) মঠজীবনবাদ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মঠজীবনবাদ বলতে কী বোঝায়?

মধ্যযুগের ইউরোপে খ্রিস্টান ধর্মের সাধু ও সাধকদের প্রতিষ্ঠিত মঠকে কেন্দ্র করে যে কার্যকলাপ সংঘটিত হয়েছিল তা মঠজীবনবাদ বা মঠতন্ত্র বা সন্ন্যাসবাদ বা Monasticism নামে পরিচিত।

২. মঠজীবনবাদের উদ্ভব হয়েছিল কখন থেকে?

 তৃতীয় শতাব্দী থেকে।

৩. মধ্যযুগের ইউরোপের ধর্মের বিকাশে অগ্রণী দুটি প্রতিষ্ঠান কি ছিল?

চার্চ বা গির্জা ও মঠ।

৪. ধর্মচর্চার জন্য কে কোথায় মঠ স্থাপন করেছিলেন?

 মিশরের সেন্ট অ্যান্টনি ৩১৫ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক ঘটনাগুলি

Leave a Comment