শৈব্যা

ত্রেতা যুগের মহীয়সী নারী শৈব্যা প্রসঙ্গে তার পরিচিতি, শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্র ও ঋষি বিশ্বামিত্রের সাক্ষাৎ, শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রকে শাপ দিতে উদ্যত বিশ্বামিত্র, বিশ্বামিত্র ও শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রের কথোপকথন, ভিখারিনী শৈব্যা, শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রের ধর্ম রক্ষা, ক্রীতদাসী শৈব্যা, পতিদেবতার প্রতি শৈব্যার শ্রদ্ধা, শৈব্যার পুত্রের মৃত্যু, শবের সৎকারে নিয়োজিত শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্র, হরিশ্চন্দ্রের শ্মশানে মৃত পুত্রের সাথে শৈব্যার আগমন, শ্মশানে শৈব্যা ও হরিশ্চন্দ্রের সাক্ষাৎ, হরিশ্চন্দ্র ও শৈব্যার পুত্রের পুনর্জীবন লাভ সম্পর্কে জানবো।

ত্রেতা যুগের মহীয়সী নারী শৈব্যা

ঐতিহাসিক চরিত্রশৈব্যা
পরিচিতিরাজা হরিশ্চন্দ্রের স্ত্রী ও রাণী
সময়কালত্রেতাযুগ
পুত্ররোহিতাশ্ব
সর্বহারাবিশ্বামিত্রের অভিশাপ
ত্রেতা যুগের মহীয়সী নারী শৈব্যা

ভূমিকা :- ত্রেতাযুগে সূর্যবংশে হরিশ্চন্দ্র নামে এক রাজা ছিলেন। শৈব্যা ছিলেন তার মহিষী বা রানী। বহুদিন রাজপ্রণয় উপভোগ করে শৈব্যা এক পুত্র লাভ করেন, নাম রোহিতাশ্ব। শৈব্যার সুখের সীমা রইল না।

শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্র ও ঋষি বিশ্বামিত্রের সাক্ষাৎ

কিন্তু স্বপ্নের দিন চিরকাল থাকে না। শৈব্যারও থাকিল না। হরিশ্চন্দ্র একদিন মৃগয়া করিতে করিতে বনমধ্যে ভ্রমণ করছেন এমন সময়ে একস্থানে রমণীর আর্তনাদ শ্রবণ করলেন। সে স্থানে উপস্থিত হয়ে দেখেন এক ঋষি ত্রিবিদ্যা সাধন করছেন। ত্রিবিদ্যা ঐরূপ আর্তনাদ করছেন। হরিশ্চন্দ্ৰ ব্যথিত হয়ে ঋষিকে ঐ জঘন্য পৈশাচিক কাজের জন্য বিলক্ষণ তিরস্কার করেন। কিন্তু সেই ঋষি অন্য কেউ নয়, রাজর্ষি বিশ্বামিত্র।

শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রকে শাপ দিতে উদ্যত বিশ্বামিত্র

বিশ্বামিত্র ক্রোধে জ্ঞানহারা হয়ে রাজাকে শাপ দান করতে উদ্যত হলেন, পরে অনেক অনুনয় করায় তিনি শান্ত হলেন। এরপর হরিশ্চন্দ্র আত্মপরিচয় দিলেন।

বিশ্বামিত্র ও শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রের কথোপকথন

বিশ্বামিত্র: “তোর কর্তব্য বুদ্ধি কি?

রাজা হরিশ্চন্দ্র: উত্তর দিলেন “দান।”

বিশ্বামিত্র: “আমাকে কি দান করিবি?”

রাজা হরিশ্চন্দ্র: তৎক্ষণাৎ তাকে সসাগরা পৃথিবী দান করলেন এবং দানের উপযুক্ত দক্ষিণা সহস্র সুবর্ণ মুদ্রাও দিতে স্বীকৃত হলেন।

সর্বহারা শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্র

কিন্তু রাজা রাজকোষ পর্যন্ত দান করেছেন সুতরাং অর্থ কোথায় পাবেন ? অধিকন্তু বিশ্বামিত্র তাঁকে তাঁর প্রদত্ত পৃথিবীর মধ্যেও বাস করতে দিলেন না। হরিশ্চন্দ্র তিনদিনের ভিতর দক্ষিণা দেবেন বলে প্রতিশ্রুত হলেন। বারাণসী পৃথিবীর বাইরে সুতরাং তার বারাণসি গমনই স্থির হল।

ভিখারিনী শৈব্যা

রাজমহিষী শৈব্যা, যিনি সসাগরা সদ্বীপা পৃথিবীশ্বরের পত্নী, আজ ভিখারিণীর বেশে প্রকাশ্য রাজপথে বাহির হলেন। রাজকুমার রোহিতাশ্ব আজ ভিখারী। বসন-ভূষণে পর্যন্ত তাঁদের অধিকার নাই, কেননা সমস্তই বিশ্বামিত্রকে দান করেছেন।

শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রের ধর্ম্মরাজকে আহ্বান

দক্ষিণাদানের শেষ দিন উপস্থিত। সহস্র সুবর্ণমুদ্রা দান করতে হবে, অথচ ভিখারী হরিশ্চন্দ্রের হাতে এক কপর্দকও নেই ! হরিশ্চন্দ্র একমনে ধৰ্ম্মকে, ভগবানকে ডাকতে লাগলেন। বলতে লাগলেন, “হে ধৰ্ম্মরাজ! যেন অধম্মে পতিত না হই।”

শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্রের ধর্ম রক্ষা

ধৰ্ম্মরাজ সদয় হলেন। সেই সময়ে দাসদাসী বিক্রয় প্রথা প্রচলিত ছিল। বারাণসির এক ব্রাহ্মণ এসে শৈব্যাকে দাসীরূপে সুবর্ণ মুদ্রায় ক্রয় করলেন। হরিশ্চন্দ্র স্বয়ং এক চণ্ডালের নিকট স্বর্ণ মুদ্রায় বিক্রীত হলেন। বিশ্বামিত্র নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দক্ষিণা পেলেন। হরিশ্চন্দ্রের ধর্ম রক্ষা হল।

ক্রীতদাসী শৈব্যা

রোহিতাশ্ব মায়ের সাথে থাকল। রাজনন্দিনী শৈব্যা এক্ষণে ক্রীতদাসী। যে দেহ একদিন নিত্য নব বসন-ভূষণে আচ্ছাদিত হত, রাজভোগে পরিপুষ্ট হত, তা এক্ষণে ছিন্ন মলিন বস্ত্রে অর্ধেক আবৃত হতে লাগল, অনাহারে অর্ধাহারে সে দেহ শুষ্ক হতে লাগল।

শৈব্যার স্বামী শোক

তার প্রভুর প্রদত্ত মুষ্টিমেয় অন্নের অধিকাংশই রোহিতাশ্বকে দিয়ে নিজে কোনো প্রকারে জীবন ধারণ করতে লাগলেন। ব্রাহ্মণ শৈব্যাকে ক্রয় করেছেন, রোহিতাশ্বকে ক্রয় করেন নি, সুতরাং রোহিতাশ্বকে খেতে দিতেন না। রাজার সম্মান, কাঙ্গালের ধন রোহিতাশ্বকে নিয়ে তিনি স্বামীশোক সহ্য করতে লাগলেন।

পতিদেবতার প্রতি শৈব্যার শ্রদ্ধা

স্বামীর এই অযথা দান ও দক্ষিণায় তাঁর বিন্দুমাত্র বিরক্তি ভাব আসত না, বরং স্বামীর যে ধৰ্ম্ম রক্ষা হয়েছে এই চিন্তাতে তিনি সকল কষ্ট ভুলে যেতেন।

শৈব্যার পুত্রের মৃত্যু

কিন্তু এখনও দুঃখের শেষ এল না। রোহিতাশ্ব একদিন বাগানে ফুল তুলতে গিয়ে সর্পাঘাত হল। দেখতে দেখতে শৈব্যার নয়নমণি, বিপদের অবলম্বন শৈব্যার কোলেই নিভে গেল। অনাথিনী শৈব্যাকে নিজেই পুত্রের শবদেহ সৎকারের জন্য শ্মশানে নিয়ে যেতে হল।

শবের সৎকারে নিয়োজিত শৈব্যা পতি হরিশ্চন্দ্র

চণ্ডাল, হরিশ্চন্দ্রকে ক্রয় করে তাঁকে শ্মশানে শবদেহ সৎকারের কার্য্যে নিযুক্ত করল। মহারাজ হরিশ্চন্দ্র রাজধর্ম ত্যাগ করে, প্রজাপালন ত্যাগ করে, শবের সৎকারে নিয়োজিত হলেন। শবদাহকারীদের কাছ থেকে উপযুক্ত পারিতোষিক গ্রহণ, তাদের শবদাহ কাজে সহায়তা – এসবই এখন তার নিত্য কর্ম।

হরিশ্চন্দ্রের শ্মশানে মৃত পুত্রের সাথে শৈব্যার আগমন

রাত্রি ভীষণ অন্ধকারময়ী। আকাশ ঘনঘটাচ্ছন্ন, মধ্যে মধ্যে বিদ্যুতের চমকে রাত্রির ভীষণভাকে যেন আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রকৃতির সেই ভীষণতার মধ্যে চণ্ডাল হরিশ্চন্দ্র তার প্রভুর কার্য্য করবার জন্য শ্মশানে গমন করছেন। অদূরে বামা-কণ্ঠের করুণ ক্রন্দনধ্বনি শুনে অগ্রসর হয়ে দেখেন এক নারী একটা মৃত বালককে কোলে নিয়ে রোদন করছে। সেই নারী আর কেউ নয় – শৈব্যা, রোহিতাশ্বকে কোলে নিয়ে কাঁদছেন।

শ্মশানে শৈব্যা ও হরিশ্চন্দ্রের কথোপকথন

হরিশ্চন্দ্র: “আমার প্রাপ্য রাখিয়া তুমি চলিয়া যাও, আমি তোমার পুত্রের সৎকার করিব।”

শৈব্যা: “আমার এক কপর্দকও দিবার ক্ষমতা নাই, আমার স্বামী জীবিত, আমি এক ব্রাহ্মণের কৃতদাসী।”

হরিশ্চন্দ্র: স্বামী জীবিত! স্ত্রী ব্রাহ্মণ -এর ক্রীতদাসী শুনে বিচলিত হয়ে “ইহার পিতা কি নিষ্ঠুর! পুত্র মৃত, স্ত্রী উন্মাদিনী, সে এখানে এখনও উন্মাদ হয়ে ছুটে এসে পড়ে নি?”

শৈব্যা: চণ্ডালের মুখে পতিনিন্দা শুনে বিচলিত হয়ে “চণ্ডালরাজ ! আপনি এস্থানে আমার একমাত্র বন্ধু। আপনি বন্ধু হইয়া আমার স্বামীর নিন্দা করিতেছেন কেন? জানেন কি স্ত্রীলোকের স্বামী কত বড়? স্ত্রীলোকের ইহকাল পরকাল যে স্বামী, তাহার নিন্দা স্ত্রীলোকের কাছে করা উচিত নয়। মা! সতী, স্বামী নিন্দা শুনিয়া দেহত্যাগ করিয়াছিলেন, এসব আপনারা বোধহয় জানেন না ? স্ত্রীলোকেরা সেই সতীর অংশ হইতে জন্মিয়াছে, অতএব তাহারা স্বামী নিন্দা শুনিলে স্থির থাকিবে কিরূপে? আর আমার স্বামী একমাত্র ধর্মের অন্ত এরূপ অবস্থায় আমাদের রাখিয়াছেন।”

হরিশ্চন্দ্র ও শৈব্যার পুনরায় সাক্ষাৎ

পরে শৈব্যার ক্রন্দনে প্রকাশ পেল যে পুত্রের নাম রোহিতাশ্ব, স্বামীর নাম হরিশ্চন্দ্র। হরিশ্চন্দ্র স্তম্ভিত হলেন। জগতে আরও হরিশ্চন্দ্র আছে ? আরও রোহিতাশ্ব আছে ? হরিশ্চন্দ্র বড়ই অস্থির হলেন। মুহূর্তে বিদ্যুৎ চমকিত হল। সকল সন্দেহ ভঞ্জন হল। সেই আলোকে হরিশ্চন্দ্র দেখলেন যে, তাঁরই পত্নী শৈব্যা তাঁরই একমাত্র বক্ষের ধন রোহিতাশ্বকে নিয়ে ক্রন্দন করিতেছেন। সেই মৃত্যুবিবর্ণ দেহের উপর হরিশ্চন্দ্র মূর্চ্ছিত হয়ে পড়লেন।

হরিশ্চন্দ্র ও শৈব্যার পুত্রের পুনর্জীবন লাভ

মূৰ্চ্ছা ভঙ্গ হলে সেই আকুল বিলাপের মধ্যে হরিশ্চন্দ্র সমস্ত অবগত হয়ে শোকে জ্ঞানহারা হয়ে ভাগিরথি গর্তে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হলেন। কিন্তু প্রভু চণ্ডালের আদেশ গ্রহণ করেন নি বলে ক্ষান্ত হলেন। এই ভীষণ স্থানে, ভীষণ সময়ে বিশ্বামিত্র সহসা উপস্থিত হলেন এবং তপঃপ্রভাবে রোহিতাশ্বকে পুনর্জীবিত করলেন।

উপসংহার:- এরপর রাজর্ষির আশীর্বাদ নিয়ে হরিশ্চন্দ্র স্ত্রী-পুত্র সকলে মিলে স্বরাজ্যে ফিরে এলেন। বিশ্বামিত্র তাঁকে সমস্ত পৃথিবী প্রত্যার্পণ করলেন। শৈব্যার দুঃখের রজনী শেষ হল।

(FAQ) ত্রেতা যুগের মহীয়সী নারী শৈব্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শৈব্যা কে ছিলেন?

পুরাকালে সূর্যবংশের রাজা হরিশ্চন্দ্রের স্ত্রী ও রানী ছিলেন শৈব্যা।

২. হরিশ্চন্দ্র ও শৈব্যার পুত্রের নাম কি ছিল?

রোহিতাশ্ব।

৩. কার অভিশাপে হরিশ্চন্দ্র ও শৈব্যা সর্বহারা হয়েছিলেন?

ঋষি বিশ্বামিত্র।

৪. সর্বহারা হরিশ্চন্দ্র কি কাজ করতেন?

শ্মশানে শবদাহ।

৫. সর্বহারা শৈব্যা কি কাজ করতেন?

ক্রীতদাসীর কাজ।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment