মাইকেল মধুসূদন দত্ত

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রসঙ্গে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম, মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতামাতা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা, মাইকেল মধুসূদন দত্তের শিক্ষা জীবন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের কর্মজীবন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিবাহ, মাইকেল মধুসূদন দত্তের ধর্মান্তর, মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য কর্ম, মাইকেল মধুসূদন দত্তের শেষ জীবন, মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু, মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি ও সম্মান।

নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত

ঐতিহাসিক চরিত্রমাইকেল মধুসূদন দত্ত
জন্ম২৫ জানুয়ারি ১৮২৪ খ্রি
জন্মস্থানযশােহর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রাম
ছদ্দনামটিমোথি পেনপোয়েম
পিতা ও মাতারাজনারায়ণ দত্ত ও জাহ্নবীদেবী
পত্নীহেনরিটা সোফিয়া হোয়াইট
পেশাকবি, নাট্যকার
সময়কালবাংলার নবজাগরণ
মৃত্যু২৯ জুন ১৮৭৩ খ্রি

ভূমিকা :- ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি কবি নাট্যকার ও প্রহসন রচয়িতা হিসেবে বিবেচিত মাইকেল মধুসূদন দত্ত। বাংলার নবজাগরণ সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব হিসেবেও গণ্য করা হয় তাকে। ঐতিহ্যের অনুবর্তিতা অমান্য করে নব্যরীতি প্রবর্তনের কারণে তাকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম বিদ্রোহী কবি হিসেবেও অভিহিত করা হয়ে থাকে।

বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টিকারী মধুসূদন দত্ত

বাংলা সাহিত্যের এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব যিনি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে বাংলা সাহিত্যে ভিন্নচিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির ঢেউ তুলেছিলেন, তিনি বাংলা সাহিত্যের নবজাগরণের জনক এবং এক অনন্য নক্ষত্র, ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’। পুরাতন ধ্যান ধারণা বিচূর্ণ করে, নতুন ভাবধারা প্রতিষ্ঠা করে বাংলা সাহিত্যে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম

১৮২৪ খ্রিস্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের (বর্তমান বাংলাদেশের) যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ বংশে মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্মগ্রহণ করেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতামাতা

তার পিতা রাজনারায়ণ দত্ত ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের এক খ্যাতনামা উকিল। তার মায়ের নাম জাহ্নবী দেবীর। তিনি পিতামাতার একমাত্র সন্তান।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের কলকাতা আগমন

মহাকবি মধুসূদনের যখন তেরো বছর বয়স, সেই সময় থেকেই তিনি কলকাতায় বসবাস করতে থাকেন। খিদিরপুর সার্কুলার গার্ডেন রিচ রোড (বর্তমানে কার্ল মার্কস সরণী) এলাকায় তিনি এক বিরাট অট্টালিকা নির্মাণ করেছিলেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা

কবি ও নাট্যকার মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় তার মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। মা জাহ্নবী দেবীই তাকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতির সঙ্গে সুপরিচিত করে তোলেন। সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রামের শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। সেখানে তিনি বাংলা, ফারসি ও আরবি পড়েছেন। সাগরদাঁড়িতেই মধুসূদনের বাল্যকাল অতিবাহিত হয়।

শিক্ষাজীবন

  • (১) মাত্র তেরো বছর বয়সে মধুসূদন দত্ত কলকাতায় আসেন। স্থানীয় একটি স্কুলে কিছুদিন পড়ার পর তিনি তদনীন্তন হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন। মধুসূদন ছিলেন মেধাবী ছাত্র। তাই অচিরেই কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি. এল. রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন তিনি। রিচার্ডসন মধুসূদনের মনে কাব্যপ্রীতি সঞ্চারিত করেছিলেন।
  • (২) হিন্দু কলেজের প্রাক্তন অধ্যাপক ডিরোজিওর স্বদেশানুরাগের স্মৃতিও তাকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করত। এছাড়া হিন্দু কলেজে তার সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, প্যারীচরণ সরকার প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। আঠারো বছর বয়সেই মহাকবি হওয়ার ও বিলাতে যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তার মনে বদ্ধমূল হয়ে যায়।
  • (৩) খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের পর মধুসূদন শিবপুরের বিশপস কলেজে থেকে পড়াশোনা চালিয়ে যান। এখানে তিনি গ্রিক, লাতিন, সংস্কৃত প্রভৃতি ভাষা শিক্ষা করেন। রাজনারায়ণ দত্ত তাকে পরিত্যাগ করলেও, বিশপস কলেজে পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করছিলেন। চার বছর পর তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করেন। বিশপস কলেজে কয়েকজন মাদ্রাজি ছাত্রের সঙ্গে মধুসূদনের বন্ধুত্ব হয়েছিল।

মধুসূদন দত্তের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ

রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট মধুসূদন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। এরপর ১৮৪৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিশন রো-তে অবস্থিত ওল্ড মিশন চার্চ নামে এক অ্যাংলিক্যান চার্চে তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাকে দীক্ষিত করেছিলেন পাদ্রী ডিলট্রি। তিনিই তার ‘মাইকেল’ নামকরণ করেন। এরপর থেকে মধুসূদন পরিচিত হন ‘মাইকেল মধুসূদন দত্ত’ নামে। তার এই ধর্মান্তর তৎকালীন সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত তার বিধর্মী পুত্রকে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেন।

মধুসূদন দত্তের কর্মজীবন

  • (১) বিশপস কলেজে অধ্যয়ন শেষ করে যখন কলকাতায় চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মধুসূদন। তখন তার মাদ্রাজি বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজে (অধুনা চেন্নাই) যান মধুসূদন। আত্মীয়স্বজনের অজ্ঞাতসারে নিজের পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করে সেই টাকায় মাদ্রাজ গিয়েছিলেন তিনি।
  • (২) মধুসূদন মাদ্রাজেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেন নি। স্থানীয় খ্রিষ্টান ও ইংরেজদের সহায়তায় তিনি একটি স্কুলে ইংরেজি শিক্ষকের চাকরি পান। তবে বেতন যা পেতেন, তাতে তার ব্যয়সংকুলান হত না। এই সময় তিনি ইংরেজি পত্রপত্রিকায় লিখতে শুরু করেন। মাদ্রাজ ক্রনিকল পত্রিকায় ছদ্মনামে তার কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে।
  • (৩) হিন্দু ক্রনিকল নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছিলেন তিনি। কিন্তু অল্পকালের মধ্যেই অর্থাভাবে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে হয়। পঁচিশ বছর বয়সে নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যেই তিনি দ্য ক্যাপটিভ লেডি তার প্রথম কাব্যটির রচনা করেন। কবি ও দক্ষ ইংরেজি লেখক হিসেবে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।

মধুসূদত্তের বিবাহ

মাদ্রাজে আসার কিছুকাল পরেই মধুসূদন রেবেকা ম্যাকটিভিস নামে এক ইংরেজ যুবতীকে বিবাহ করেন। উভয়ের দাম্পত্যজীবন আট বছর স্থায়ী হয়েছিল। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়। মাদ্রাজ জীবনের শেষ পর্বে রেবেকার সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার অল্পকাল পরে মধুসূদন এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া নামে এক ফরাসি তরুণীকে বিবাহ করেন। হেনরিয়েটা মধুসূদনের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন।

লিয়েন্ডার পেজের সাথে মধুসূদন দত্তের সম্পর্ক

দ্বিতীয়া পত্নী হেনিরিয়েটা মাইকেল মধুসূদন দত্তের সারাজীবনের সঙ্গিনী ছিলেন। তাদের দুই সন্তান – নেপোলিয়ান নামে এক ছেলে এবং শর্মিষ্ঠা নামে এক মেয়ে। তার বংশধরদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিখ্যাত টেনিস খেলোয়াড় লিয়েন্ডার পেজ।

মধুসূদন দত্তের কলকাতায় প্রত্যাগমন

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত তার এক কপি দ্য ক্যাপটিভ লেডি বন্ধু গৌরদাস বসাককে উপহার পাঠালে, গৌরদাস সেটি জে ই ডি বেথুনের কাছে উপহার হিসেবে পাঠান। উক্ত গ্রন্থ পাঠ করে অভিভূত বেথুন মাইকেলকে চিঠি লিখে দেশে ফিরে আসতে এবং বাংলায় কাব্যরচনা করতে পরামর্শ দেন। ১৮৫৬ সালে মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন।

মধুসূদন দত্তের ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স গমন

কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ইংল্যান্ডে আইন বিষয়ে পড়ালেখা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানকার আবহাওয়া এবং বর্ণবাদিতার কারণে বেশি দিন ইংল্যান্ডে থাকেন নি। তারপর তিনি ১৮৬০ সালে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে চলে যান। কিন্তু তার আর্থিক অবস্থা ছিল খুব খারাপ। একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সহায়তায় তিনি তার আইন বিষয়ে পড়া শেষ করে ভারতে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ভাষাগত দক্ষতা

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত ছিলেন বহু ভাষাবিদ। মাতৃভাষা ছাড়াও তিনি আরো বারোটি ভাষা জানতেন। শিশু কালে গ্রামের টোল থেকে ফারসি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে তার ভাষা শিক্ষার শুরু হয়। তিনি ইংরেজি ছাড়াও ল্যাটিন, গ্রিক, ফারসি, হিব্রু, তেলুগু, তামিল ইত্যাদি ভাষায় অনায়াসে কথা বলতে পারতেন। এমনকি ফারসি ও ইতালীয় ভাষাতেও তিনি কবিতা লিখতে পারতেন।

অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টিকর্তা মধুসূদন দত্ত

মধুসূদন ইউরোপীয় কবি মিলটনের ‘Blank Verse’ ছন্দ অবলম্বনে বাংলা সাহিত্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ প্রবর্তন করেন। এই অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রথম প্রয়োগ তিনি ‘তিলোত্তমা সম্ভব’ কাব্যে’ করেন। তিনি মনে করেছিলেন, সেকালের পয়ার ছন্দের ৮ + ৬ যতিবন্ধনের ভাবধারাকে মুক্তি দিতে হলে সর্বপ্রথম পয়ারের ছেদ-যতি বন্ধনের ভাবধারাকে খুলে ফেলে চরণকে ভাবের আবেগে ছেড়ে দিতে হবে।

মধুসূদন দত্তের সাহিত্য জীবনের অনুপ্রেরণা

কবি ও নাট্যকার মধুসূদন দত্ত তাঁর সাহিত্য জীবনে বিশেষ করে ইংরেজ কবি লর্ড বায়রনের সাহিত্য কর্ম এবং তাঁর জীবন দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। মহান সৃষ্টি ‘মেঘনাদ বধ’ মহাকাব্যটির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে তিনি এক স্বতন্ত্রভাব প্রকাশ করেছিলেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি কাব্যে প্রথম হোমেরিক স্টাইলের লেখার প্রবর্তন করেন। তিনি এক সময় নিজেকে বলেছিলেন : “আমি এক সকালে উঠে নিজেকে সফল হিসেবে পাই নি, এই কাব্যের সফলতা বহু বছরের কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে।”

মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য জীবন

মহাকাব্য রচয়িতা মধুসূদন দত্ত নাট্যকার হিসেবেই প্রথম বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে পদার্পণ করেন। রামনারায়ণ তর্করত্ন রচিত ‘রত্নাবলী’ নাটকের ইংরেজি অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব বোধ করেন। এই অভাব পূরণের লক্ষ্য নিয়েই তিনি নাটক লেখায় আগ্রহী হয়েছিলেন। তাঁর রচিত ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটকটি ১৮৫৯ সালে ৩রা সেপ্টেম্বর বেলগাছিয়া নাট্যশালায় মহাসমারোহে অভিনীত হয়। এটিই প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে তিনি রচনা করেন দুটি প্রহসন – ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ এবং ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এরপর পদ্মাবতী নাটকেই তিনি প্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার করেন। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে অমিত্রাক্ষর ছন্দে তিনি লেখেন ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ কাব্য। এরপর একে একে রচিত হয় ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’ (১৮৬১), ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্য (১৮৬১), ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক (১৮৬১), ‘বীরাঙ্গনা’ কাব্য (১৮৬২), চতুর্দশপদী কবিতা (১৮৬৬), ১৮৭১ সালের শেষভাগে মহাকবি হোমারের ” ইলিয়ড ” মহাকাব্যের উপয়াখ্যান ভাগ অবলম্বন করে মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলায় ‘হেকটর বধ’ প্রকাশ করেন। তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণের উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত মেঘনাদবধ কাব্য নামক মহাকাব্য।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের নাটক রচনা

বাংলা নাটকে মাইকেল মধুসূদনের আবির্ভাব আকস্মিক। ১৮৫৮ সালে পাইকপাড়ার জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র সিংহ ও প্রতাপচন্দ্র সিংহের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতার বেলগাছিয়া নাট্যমঞ্চে রামনারায়ণ তর্করত্নের ‘রত্নাবলী’ নাটকটি অভিনীত হয়। শিল্পগুণবিবর্জিত এই সাধারণ নাটকটির জন্য জমিদারদের বিপুল অর্থব্যয় ও উৎসাহ দেখে মধুসূদনের শিক্ষিত মন ব্যথিত হয়ে ওঠে। এরপর তিনি নিজেই নাট্যরচনায় ব্রতী হন। রামনারায়ণ তর্করত্নের সংস্কৃত নাট্যশৈলীর প্রথা ভেঙে তিনি পাশ্চাত্য শৈলীর অনুসরণে প্রথম আধুনিক বাংলা নাটক রচনা করেন। মাইকেল মধুসূদনের নাট্যচর্চার কাল ও রচিত নাটকের সংখ্যা দুইই সীমিত। ১৮৫৯ থেকে ১৮৬১ সাল পর্যন্ত মাত্র তিন বছর তিনি নাট্যচর্চা করেন। এই সময়ে তার রচিত নাটকগুলি হল –

(১) মাইকেল মধুসূদন দত্তের শর্মিষ্ঠা নাটক

পৌরাণিক নাটক ‘শর্মিষ্ঠা’ ১৮৫৯ সালে রচিত হয়। এটিই আধুনিক পাশ্চাত্য শৈলীতে রচিত প্রথম বাংলা নাটক। নাটকের আখ্যানবস্তু মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত রাজা যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনী থেকে গৃহীত। অবশ্য পাশ্চাত্য নাট্যশৈলীতে লেখা হলেও, এই নাটকে সংস্কৃত শৈলীকে সম্পূর্ণ বর্জন করেন নি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এই নাটকের কাব্য ও অলংকার-বহুল দীর্ঘ সংলাপ, ঘটনার বর্ণনাত্মক রীতি, প্রবেশক, নটী, বিদুষক প্রভৃতির ব্যবহার সংস্কৃত শৈলীর অনুরূপ। আবার ইংরেজি সাহিত্যের রোম্যান্টিক ধারার প্রভাবও এই নাটকে স্পষ্ট। প্রথম রচনা হিসেবে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও, সেই যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত পাঠকসমাজে এই নাটকটি খুবই সমাদৃত হয়। বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে সাফল্যের সঙ্গে নাটকটি অভিনীতও হয়।

(২) মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রহসন

‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক রচনার পর ১৮৬০ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রচনা করেন ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নামে দুটি প্রহসন। এই প্রহসন দুটি তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যরচনা। প্রথম নাটকটির বিষয়বস্তু ছিল ইংরেজি শিক্ষিত নব্য বাবু সম্প্রদায়ের উচ্ছৃঙ্খলতা এবং দ্বিতীয় নাটকটির বিষয়বস্তু ছিল সনাতনপন্থী সমাজপতিদের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন। এই নাটকে মাইকেলের পর্যবেক্ষণ শক্তি, সমাজবাস্তবতাবোধ, কাহিনী, চরিত্র ও সংলাপ রচনায় কুশলতা বিশেষ প্রশংসা লাভ করে। কিন্তু নাটকের বিষয়বস্তু নব্য ও সনাতনপন্থী উভয় সমাজকেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। তাই বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চে নাটকটি অভিনীত হওয়ার কথা থাকলেও, শেষপর্যন্ত তা হয় নি। এর ফলে মাইকেল মধুসূদন দত্ত খুবই হতাশ হয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে প্রহসন রচনা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

(৩) মধুসূদন দত্তের নাটক পদ্মাবতী

১৮৬০ সালে মধুসূদন দত্ত রচনা করেন পদ্মাবতী নাটকটি। এটি একটি পৌরাণিক নাটক। গ্রিক পুরাণের ‘অ্যাপেল অফ ডিসকর্ড’ গল্পটি ভারতীয় পুরাণের মোড়কে পরিবেশন করেছেন মধুসূদন দত্ত। গ্রিক পুরাণের জুনো, প্যালাস ও ভেনাস এই নাটকে হয়েছেন শচী, মুরজা ও রতি। হেলেন ও প্যারিস হয়েছেন পদ্মাবতী ও ইন্দ্রনীল। তিন দেবীর মধ্যে রতিকে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী নির্বাচিত করলে অন্য দুই দেবী ইন্দ্রনীলের প্রতি ক্রোধিতা হন এবং ইন্দ্রনীলের জীবনে বিপর্যয় নেমে আসে। শেষে রতি ও ভগবতীর চেষ্টায় ইন্দ্রনীল উদ্ধার পান এবং বিচ্ছিন্না স্ত্রী পদ্মাবতীর সঙ্গে তার মিলন ঘটে। মূল গ্রিক উপাখ্যানটি বিয়োগান্তক হলেও, মাইকেল এই নাটকটিকে ইংরেজি ট্র্যাজিক-কমেডির ধাঁচে মিলনান্তক করেছেন। এই নাটকে সংস্কৃত নাট্যরীতির প্রভাব খুবই অল্প। প্লট-নির্মাণ, নাটকীয় দ্বন্দ্ব উপস্থাপনা ও চরিত্র চিত্রণে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এখানে আগের থেকে অনেক পরিণত হয়েছেন।

(৪) মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃষ্ণকুমারী নাটক

জেমস টডের রাজস্থানের ইতিহাস অবলম্বনে মধুসূদনের ঐতিহাসিক ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটকটি রচিত। এই নাটকের মধ্য দিয়ে মেবারের নির্বাপিতপ্রায় শেষ ম্লান রশ্মিটুকু মিলিয়ে যাওয়ার করুন কাহিনী ব্যক্ত হয়েছে।

(৫) মধুসূদন দত্তের মায়াকানন নাটক

ঐতিহাসিক কৃষ্ণকুমারী নাটক রচনার পর মাইকেল মধুসূদন দত্ত কাব্যরচনায় পুরোদমে মনোনিবেশ করেন। শেষ জীবনে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বেঙ্গল থিয়েটারের কর্ণধার শরৎচন্দ্র ঘোষের অনুরোধে তিনি মায়াকানন নাটকটি রচনায় হাত দেন। তবে এই নাটকটি তিনি শেষ করতে পারেন নি। ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এই নাটকটি শেষ করেন। এই নাটকটির শিল্পমূল্য বিশেষ নেই। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সৃষ্টিপ্রতিভার কোনো সাক্ষর এতে পাওয়া যায় না।

মধুসূদন দত্তের তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য

১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় মধুসূদন দত্তের তিলোত্তমা সম্ভব কাব্য। সংস্কৃত পুরান থেকে কবি এই কাব্যের উপাদান সংগ্রহ করেন। সুন্দ-উপসুন্দ দৈত্য ভ্রাতাদের বধের জন্য তিলোত্তমা অপ্সরার সৃষ্টি কাহিনীকে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে কবি চারটি সর্গে এই আখ্যান কাব্যটি রচনা করেন। তিলোত্তমার ভীরু ও লাজনম্র রোমান্টিক সৌন্দর্য বর্ণনা ইংরেজি কবি কীটসের সৌন্দর্য সৃষ্টির কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের মেঘনাদবধ কাব্য

কবি ও নাট্যকার মধুসূদন দত্তের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হল অমিত্রাক্ষর ছন্দে রামায়ণ উপাখ্যান অবলম্বনে রচিত মেঘনাদবধ কাব্য নামে মহাকাব্যটি। চরিত্র হিসেবে রয়েছেন রাবণ, ইন্দ্রজিৎ, সীতা, সরমা, প্রমীলা প্রমুখ। নয়টি সর্গে বিভক্ত করে সংস্কৃত অলঙ্কারশাস্ত্র অনুযায়ী এই কাব্যে নগর, বন, উপবন, শৈল, সমুদ্র, প্রভাত, সন্ধ্যা, যুদ্ধ, মন্ত্রণা প্রভৃতির সমাবেশও করেছেন। এই কাব্যে করুণ রসেরই জয় হয়েছে। মেঘনাদবধ কাব্য রামায়ণ-আহৃত কাহিনীর পুনরাবৃত্তি নয়, এই কাব্য নবজাগ্রত বাঙালির দৃষ্টি নিয়তি-লাঞ্ছিত নবমানবতাবোধের সকরুণ মহাকাব্যের রূপে অপূর্ব গীতি-কাব্য। মেঘনাদবধ কাব্য এ দিক দিয়ে বাংলা কাব্য সাহিত্যে অনন্য ও একক সৃষ্টি। এই কাব্যের তাৎপর্য রাবণ-চরিত্রের প্রতীকতায়। তার সৃষ্ট রাবণ চরিত্রে পরম দাম্ভিকতা প্রকট হয়ে উঠে নি। রামায়ণকে তিনি তার মানবতার আলোকে বিধৌত করে যে মহাকাব্য রচনা করেছেন, তা আসলে রোমান্টিক মহাকাব্য। এ কারণে আকারে ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মহাকাব্যোচিত হলেও, এর প্রাণ-নন্দিনী সম্পূর্ণ রোমান্টিক এবং মধুসূদন এই কাব্যে জীবনের যে জয়গান করেছেন তা বীররসের নয়, কারুণ্যের। তাই রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলা যায় –

‘সমুদ্রতীরের শ্মশানে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া কাব্যের উপসংহার করিয়াছেন।’

মধুসূদন দত্তের বীরাঙ্গনা কাব্য

বাংলা সাহিত্যে পত্র আকারে কাব্যরচনা প্রথম দেখা যায় বীরাঙ্গনা কাব্যে। ১৮৬২ সালে এই গ্রন্থ রচিত ও প্রকাশিত হয়। দুষ্মন্তের প্রতি শকুন্তলা, সোমের প্রতি তারা, দ্বারকনাথের প্রতি রুক্মিণী, দশরথের প্রতি কৈকেয়ী, লক্ষ্মণের প্রতি সূর্পণখা, অর্জুনের প্রতি দ্রৌপদী, দুর্যোধনের প্রতি ভানুমতী, জয়দ্রথের প্রতি দুঃশলা, শান্তনুর প্রতি জাহ্নবী, পুরুবার প্রতি উর্বশী, নীলধ্বজের প্রতি জনা এই ১১টি পত্ররূপী কবিতা নিয়ে কাব্যগ্রন্থটি রচিত। মধুসূদন তার কাব্যে এই নারীদের পুরাণ-পরিচিতির মূলে আঘাত করেছেন। তিনি মানবিক অনুভূতির আলোকে নারী-হৃদয়ের কথকতায় ব্যক্ত করিয়েছেন।

মধুসূদন দত্তের ব্রজাঙ্গনা কাব্য

কবি মধুসূদন দত্তের ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্য ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে রচিত ও প্রকাশিত হয়। রাধা-কৃষ্ণ সংক্রান্ত কাহিনী অবলম্বনে ওড জাতীয় কাব্য রচনার পরিকল্পনা নিয়ে মধুসূদন দত্ত এই কাব্য রচনা করেছেন। এই কাব্যে বিরহ শোকাতুরা কৃষ্ণ উন্মাদিনী ব্রজবধূ শ্রীরাধার মর্ম বেদনা ব্যাপ্ত হয়েছে। প্রথম সর্গে বিরহ এবং দ্বিতীয় সর্গে রাধা কৃষ্ণের মিলনে কাব্যটি সমাপ্ত করার ইচ্ছে ছিল কবি মধুসূদনের। কিন্তু সময়ের অভাবে তিনি প্রথম সর্গে শ্রীরাধার শোকাহত চিত্তের কয়েকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ফুটিয়ে তুলেছেন মাত্র, দ্বিতীয় সর্গ লেখার আর অবসর তিনি পাননি।

মধুসূদন দত্তের চতুর্দশপদী কবিতাবলী

১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে মধুসূদনের শেষ কাব্য ‘চতুর্দশপদী কবিতাবলী’ রচিত হয়। ফ্রান্সের ভার্সাই শহরে ঋণগ্রস্ত কবি ‘সনেট’ জাতীয় এই কবিতাগুলি রচনা করেছিলেন। এই সনেটগুলি পেত্রার্ক ও শেক্সপীরীয় রীতি অবলম্বনে রচিত। বিদেশে দুঃখের দিনে তিনি এ সনেটগুলি রচনা করেন। তাই এতে তাঁর দেশের কথা, কপোতাক্ষ নদের কথা, দেব দেউলের কথা, ব্যাস-বাল্মিকী-কালিদাস-মুকুন্দরাম-ভারতচন্দ্র প্রমুখের কথা জীবন্ত হয়ে উঠেছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাংলা রচনাবলী

কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাংলা রচনাবলী হল –

(১) নাটক ও প্রহসন

‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক (১৮৫৯), ‘একেই কি বলে সভ্যতা?’ প্রহসন (১৮৬০), ‘বুড়ো সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ প্রহসন (১৮৬০), ‘পদ্মাবতী’ নাটক (১৮৬০), ‘কৃষ্ণকুমারী’ নাটক (১৮৬১), ‘মায়া-কানন’ নাটক (১৮৭৪)

(২) কাব্য

তিলোত্তমাসম্ভব আখ্যানকাব্য (১৮৬০), মেঘনাদবধ মহাকাব্য (১৮৬১), ব্রজাঙ্গনা গীতিকাব্য (১৮৬১), বীরাঙ্গনা পত্রকাব্য (১৮৬২), চতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৫)।

(৩) অনুবাদ গ্রন্থ

হেক্টর-বধ (১৮৭১)।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ইংরেজি রচনাবলী

কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্তের ইংরেজি রচনা গুলি হল –

(১) কাব্য

কালেক্টেড পোয়েমস, দি অপ্সরি: আ স্টোরি ফ্রম হিন্দু মিথোলজি, দ্য ক্যাপটিভ লেডি, ভিশনস অফ দ্য পাস্ট।

(২) কাব্যনাট্য

রিজিয়া: ইমপ্রেস অফ ইন্ডে।

(৩) অনুবাদ নাটক

রত্নাবলী, শর্মিষ্ঠা, নীল দর্পণ অর দি ইন্ডিগো প্ল্যান্টিং মিরর

(৪) প্রবন্ধ সাহিত্য

দি অ্যাংলো-স্যাক্সন অ্যান্ড দ্য হিন্দু, অন পোয়েট্রি এটসেট্রা, অ্যান এসে।

(৫) অন্যান্য রচনা

আ সাইনপসিস অফ দ্য রুক্মিণী হরণ নাটক।

মধুসূদন দত্তের শেষ জীবন

শেষ জীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন তিনি। আইন ব্যবসায় তিনি তেমন সাফল্য লাভ করতে পারেন নি। তাছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন।

অন্তিম জীবনে জন্মভূমির প্রতি মধুসূদন দত্তের ভালোবাসা

মহাকবি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে জন্মভূমির প্রতি তার সুগভীর ভালোবাসার চিহ্ন রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় পংক্তিমালায়। তার সমাধিস্থলে লেখা আছে –

‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব

বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে

(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি

বিরাম) মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত

দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!

যশোরে সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ-তীরে

জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি

রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী’।

মধুসূদন দত্তের মৃত্যু

বিখ্যাত কবি মধুসূদনের ব্যক্তিগত জীবন ছিল নাটকীয় এবং বেদনাঘন। মাত্র ৪৯ বছর বয়সে কলকাতায় এক শোকাবহ অবস্থার মধ্য দিয়ে এই মহাকবির মৃত্যু হয়। ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে কপর্দকহীন (অর্থাভাবে) অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তাকে কলকাতার সার্কুলার রোডে সমাধি দেওয়া হয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্মৃতি ও সম্মান

  • (১) ১৯৫০ সালে মধু বোস নির্মিত একটি ভারতীয় বাংলা ভাষার ড্রামা ফিল্ম ‘মাইকেল মধুসূদন’। প্রধান চরিত্রে উৎপল দত্ত অভিনয় করেছিলেন।
  • (২) লেখিকা নমিতা গোখলে ২০২১ সালে ‘Betrayed by Hope’ নামে মধুসূদন সম্পর্কে একটি নাটক প্রকাশ করেন। এটি মূলত তার বন্ধুদের এবং অন্যান্য লেখকদের লেখা চিঠির উপর ভিত্তি করে রচিত।
  • (৩) মধুসূদন দত্তের সম্মানে প্রতি বছর তাঁর জন্মদিনে সাগরদাঁড়িতে তাঁর পৈতৃক বাড়িতে মেলা বসে। এই মেলার আয়োজন করে যশোর জেলা পরিষদ। প্রতি বছর বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বিভিন্ন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী এই মেলায় অংশগ্রহণ করেন।
  • (৪) মধুসূদন দত্তের সম্মানে যশোর জেলায় তাঁর নামে একটি স্কুল ও একটি কলেজের নামকরণ করা হয়েছে।

উপসংহার:- মধুসূদন দত্ত ছিলেন বাংলা সাহিত্যের যুগপ্রবর্তক কবি। তিনি তাঁর কাব্যের বিষয় সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানত সংস্কৃত কাব্য থেকে, কিন্তু পাশ্চাত্য সাহিত্যের আদর্শ অনুযায়ী সমকালীন ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির জীবনদর্শন ও রুচির উপযোগী করে তিনি তা কাব্যে রূপায়িত করেন এবং তার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে এক নবযুগের সূচনা হয়। উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণের অন্যতম পথিকৃৎ মধুসূদন তাঁর অনন্যসাধারণ প্রতিভার দ্বারা বাংলা ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি আবিষ্কার করে এই ভাষা ও সাহিত্যের যে উৎকর্ষ সাধন করেন, তার ফলেই তিনি বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। বাংলা সাহিত্যে তিনি ‘মধুকবি’ নামে পরিচিত।


প্রিয় পাঠক/পাঠিকা আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ সময় করে আমাদের এই “মাইকেল মধুসূদন দত্তে” পোস্টটি পড়ার জন্য। এই ভাবেই adhunikitihas.com ওয়েবসাইটের পাশে থাকুন। যে কোনো প্রশ্ন উত্তর জানতে এই ওয়েবসাইট টি ফলো করুণ এবং নিজেকে তথ্য সমৃদ্ধ করে তুলুন।

সবশেষে আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ যদি এই পোস্টটি আপনার ভালো লেগে থাকে তাহলে Comment ও Share করে দিবেন, (ধন্যবাদ)।

(FAQ) মাইকেল মধুসূদন দত্ত সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম কখন হয়?

২৫ জানুয়ারি ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে।

২. মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্মস্থান কোথায়?

বর্তমান বাংলাদেশের যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে।

৩. মাইকেল মধুসূদন দত্তের পিতামাতার নাম কি?

পিতা রাজনারায়ণ দত্ত, মাতা জাহ্নবী দেবী।

৪. অমিত্রাক্ষর ছন্দের সৃষ্টিকর্তা কে?

মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

৫. মাইকেল মধুসূদন দত্তের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্যের নাম কি?

মেঘনাদবধ কাব্য।

৬. মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু হয় কখন?

২৯ জুন ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment