ভাইকিংদের অভিযান

ভাইকিংদের অভিযান প্রসঙ্গে ভাইকিংদের পরিচিতি, ভাইকিংদের অভিযানের কারণ, ভাইকিংদের আধিপত্য বিস্তার, নরম্যান বা ভাইকিংদের অভিযানের উদ্দেশ্য, চারটি অঞ্চলে ভাইকিংদের আধিপত্য, রাশিয়া সৃষ্টিতে ভাইকিংদের ভূমিকা, অষ্টম নবম শতকে ভাইকিং আক্রমণ, ভাইকিংদের আধিপত্য, নেদারল্যান্ডে ভাইকিংদের পরাজয়, ভাইকিংদের নর্মাণ্ডি লাভ, ভাইকিংদের ইংল্যান্ডে প্রবেশ, ভাইকিংদের দ্বারা খ্রিস্টান ধর্মকে প্রধান্য দান, ভাইকিংদের নৌ বিদ্যা ও বাণিজ্যিক কৃতিত্ব এবং তাদের অবদান সম্পর্কে জানবো।

নরম্যান বা ভাইকিংদের অভিযান

ঐতিহাসিক ঘটনানরম্যান বা ভাইকিংদের অভিযান
ভাইকিং অর্থজলদস্যু
আয়ারল্যান্ড দখল৮৪৩ খ্রি
প্যারিস দখল৮৮৫-৮৬ খ্রি
ইংল্যান্ড আক্রমণ১০৬৬ খ্রি
নর্মাণ্ডির ডিউকপ্রথম উইলিয়াম
নরম্যান বা ভাইকিংদের অভিযান

ভূমিকা :- নরওয়ে, ডেনমার্ক, সুইডেন প্রভৃতি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অধিবাসীদের নর্ম্যান বলা হত। ভাইকিং নামেও নর্ম্যানরা পরিচিত ছিল। ‘ভাইকিং’ শব্দটির অর্থ হল জলদস্যু। নর্মানরা ছিল আদি জার্মান জাতির একটি অংশ। ভাইকিংদের প্রধান শক্তি ছিল জাহাজ।

নরম্যান বা ভাইকিংদের পরিচিতি

  • (১) ভাইকিংরা ছিল লম্বা, শক্তিশালী এবং অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। লোহার দ্বারা তৈরী রক্ষাবরণ বা বর্ম, ঢাল এবং মাথায় পশুশৃঙ্গ ভাইকিংদের পরিচয় বহন করত। তারা যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ার, কাঠের দণ্ড, ছোরা, যুদ্ধ-কুঠার ব্যবহার করত। ভাইকিংদের জাহাজগুলি ছিল লম্বায় অনেক বড় কিন্তু অপ্রশস্ত বা সরু। ড্রাগনের মাথাবিশিষ্ট জাহাজ এবং জাহাজের সামনের দিকে ড্রাগনের মাথা খোদাই করা থাকত।
  • (২) জাহাজের পাশে তাদের ঢালগুলি লাগানো থাকত। এগুলি ভাসাভাসা অবস্থায় থাকত এবং জাহাজে চড়ে স্বচ্ছন্দ গতিতে জলযাত্রা সম্ভব হত। জলপথে যাওয়ার সময় জলের গভীরতা চারফুট হলে স্বচ্ছন্দ গতিতে যাওয়া যেত না। তখন ভাইকিংরা সংকীর্ণ জলপথ দেখে ফিরে আসত বা জলের গভীরতা যেখানে বেশী সেখান থেকে জাহাজের যাত্রা শুরু করত।
  • (৩) ভাইকিংরা উন্নত মানের নাবিক ছিল না। একজন আধুনিক নাবিক জানে কি করে হাওয়ার বিপরীতে যাত্রা করতে হয়। স্রোতের বিপরীতে যাত্রা করতে গেলে কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় তাও গুরুত্বপূর্ণ। ভাইকিংরা স্রোতে বা হাওয়ার বিপরীতে যাত্রা করতে পারত না।
  • (৪) ভাইকিংদের জাহাজ গোলাকার পথে যেত এবং যখন স্রোতের অনুকূল পরিস্থিতি বা হাওয়ার গতি বিপরীত দিকে নেই তখনই জলপথে যেত। কিন্তু কখনো যদি হাওয়ার গতি বিপরীত দিকে হত বা স্রোতের প্রতিকূলে যাওয়ার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি হত তাহলে তৎক্ষণাৎ তারা জাহাজ বন্ধ করে দিত।

নরম্যানদের অভিযানের কারণ

স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় নর্মানরা নতুন অঞ্চলে গিয়ে বাস করতে শুরু করেছিল। George Duby কিন্তু এ প্রসঙ্গে বলেছেন যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে নর্ম্যানরা অন্য দেশগুলোতে অভিযান করেছিল। এই ধারণা সপ্তম শতকে নরওয়ের ক্ষেত্রে সত্য হলেও ডেনমার্কের ক্ষেত্রে এমনটা হয় নি।

নরম্যানদের আধিপত্য বিস্তার

একাদশ শতক পর্যন্ত নর্ম্যানরা উত্তরদিকে ফ্রিসিয়া, বাল্টিক সাগর থেকে দক্ষিণে ইতালি, পূর্বদিকে কিয়েভ, নভগোরড, কনস্টান্টিনোপল এবং সুদূরে আইসল্যাণ্ড, গ্রীনল্যাণ্ড, আমেরিকা পর্যন্ত তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল।

নরম্যান বা ভাইকিংদের অভিযানের উদ্দেশ্য

ভাইকিংরা মদ, নারী লুণ্ঠন, যুদ্ধ, আমোদ-প্রমোদ প্রভৃতি বিষয়গুলিকেই বেশী প্রাধান্য দিয়েছিল। ভাইকিংরা দাস-ব্যবসার ক্ষেত্রেও দক্ষতা অর্জন করেছিল। ধনসম্পদ লুণ্ঠনের আশায় তারা খ্রিস্টান মঠ এবং গির্জাগুলি আক্রমণ করত। ভাইকিংরা চেয়েছিল যুদ্ধের মাধ্যমে ধনসম্পদ অর্জন করতে। যার ফলে তাদের মর্যাদা বেড়ে যাবে এমন ধারণাও তারা পোষণ করত।

চারটি অঞ্চলে ভাইকিংদের প্রাধান্য

ভাইকিং-রা প্রধানত চারটি অঞ্চলে তাদের আধিপত্য সুদৃঢ় করতে পেরেছিল। পূর্বদিকের রুশ অঞ্চল, পশ্চিমদিকের ফ্রাঙ্কিয়া বা গল, ইংল্যান্ড, এবং উত্তর আটলান্টিক অঞ্চল।

রাশিয়া সৃষ্টিতে ভাইকিংদের ভূমিকা

সুইডেন থেকে আসা ভাইকিংদের মধ্যে যারা ‘ভারাঙ্গিয়ান’ নামে পরিচিত তারা রাশিয়া সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। ভারাঙ্গিয়ানরা কনস্টান্টিনোপলে ব্যবসা এবং লুণ্ঠন দুটোই করেছিল। নবম শতকে ভাইকিংদের একটি শাখা নভগোরডে বসতি স্থাপন করেছিল। অপর একটি শাখা কিয়েভ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। পরবর্তী সময়কালে এই অঞ্চলটি ‘রাশিয়া’ নামে পরিচিত হয়।

অষ্টম-নবম শতকে ভাইকিং আক্রমণ

  • (১) অষ্টম শতকের শেষভাগে ভাইকিংরা পশ্চিম ইউরোপে আক্রমণ চালিয়েছিল। পশ্চিম ফ্রাঙ্ক এবং গল রাজ্য সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল। ৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের দক্ষিণ দিকে এবং ৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে লিডিসফার্নে ভাইকিংরা আক্রমণ চালায়। আয়ারল্যান্ড ছিল ভাইকিংদের আক্রমণের প্রধান ক্ষেত্র।
  • (২) ৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই আয়ারল্যান্ড ভাইকিংদের দখলে চলে এসেছিল। ভাইকিংদের ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই অঞ্চল থেকেই ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলগুলিতে বিশেষ করে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ পরিচালনা করা সহজ হয়ে গিয়েছিল।
  • (৩) ভাইকিংরা ৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে নোয়ারমুতিয়ের বাণিজ্যিক কেন্দ্র ও মঠগুলিতে লুণ্ঠনকার্য চালায়। ভাইকিং আক্রমণ নেমে এসেছিল রি, রুয়েন, ইউট্রেকট, নান্ত, অ্যান্টওয়ার্প প্রভৃতি অঞ্চলেও। নবম শতকে ভাইকিং জাহাজ গলের নদীপথ অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।
  • (৪) ৮৫৯-৬২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভাইকিং-রা মরক্কোর নেকার, বেলারিক দ্বীপপুঞ্জ, রৌসিলন দখল করেছিল। ৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিংরা ইংল্যান্ডে আক্রমণ করার পর পূর্ব অ্যাঙ্গলিয়া, নর্দামব্রিয়া, মার্শিয়া দখল করে নিয়েছিল।
  • (৫) ৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে রাজা আলফ্রেডের নেতৃত্বে সংগঠিত পশ্চিম স্যাক্সনদের কাছে এডিংটনের যুদ্ধে ভাইকিংরা বাধা পেয়েছিল। নবম শতকের শেষদিকে মরক্কোর বিভিন্ন শহর ও ইটালী ভাইকিংদের দ্বারা লুণ্ঠিত হয়েছিল। আখেনে শার্লামেনের প্রাসাদও তাদের হাত থেকে রেহাই পায় নি।

ভাইকিংদের আধিতপত্য

নোয়ারমুতিয়ের মেন্টারিয়াস ভাইকিংদের আক্রমণ ও অত্যাচার সম্পর্কে বর্ণনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, “এদের এই ধরনের সর্বনাশী হত্যা, লুণ্ঠন ও অমানবিক অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় নেই। George Duby-ও বলেন, “অল্প কয়েকটি শহর সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হলেও বেশীরভাগ শহরেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন অবাধে চলেছিল।’ তুলুস, তুর, বোরদো, অর্লিয় প্রভৃতি অঞ্চল তারা বিধ্বস্ত করেছিল। কোঁদে, লুভেঁ, অ্যামিয়্যাতেও তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। আনুমানিক ৮৮৫-৮৬ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিং-রা প্যারীস দখল করেছিল।

নেদারল্যান্ডে ভাইকিংদের পরাজয়

ভাইকিংদের আক্রমণের বিরুদ্ধে কিছু কিছু অঞ্চল সক্রিয় হয়ে ওঠে। ৮৯১ খ্রিস্টাব্দে ভাইকিংরা নেদারল্যান্ডে আক্রমণ চালায়। পূর্ব ফ্রাঙ্ক রাজ্যের রাজা আনুলফ প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর প্রতিরোধের ফলে ভাইকিং-রা পরাজিত হয়েছিল।

ভাইকিংদের নর্মাণ্ডি লাভ

কিন্তু শার্লামেনের দুর্বল উত্তরাধিকারীদের পক্ষে ভাইকিংদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। সেক্ষেত্রে তারা আক্রমণকারীদের অর্থ দিয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেছিল। এর ফলে কিন্তু সমস্যা আরও বেড়ে গিয়েছিল। অর্থের লোভে ভাইকিংরা প্রতিবছরই আক্রমণ করতে থাকে। ৯১১ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম ফ্রাঙ্ক রাজ্যের রাজা ‘চার্লস দ্য সিম্পল’ তাঁর রাজ্যের একটি অঞ্চলে নর্মান বা ভাইকিংদের স্থায়ীভাবে বসতি করার অনুমতি দিয়েছিলেন। ভাইকিংদের নেতা রোল্লোকে সরকারিভাবে এই অঞ্চলটি দেওয়া হয় যার অবস্থান ছিল উত্তর ফ্রান্সে। পরবর্তী সময়কালে নর্মানদের নামানুসারে এই অঞ্চলটি ‘নর্ম্যান্ডি’ নামে পরিচিতি লাভ করেছিল। এই অঞ্চল থেকে ভাইকিংরা তাদের কার্যধারাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়। দক্ষিণ ইতালি, আন্টিয়োক, সিসিলি প্রভৃতি অঞ্চলও তারা অধিকার করেছিল।

ভাইকিংদের ইংল্যান্ডে প্রবেশ

R. W. Southern তাঁর “The Making of the Middle Ages” গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন যে, “যে সময় যেখানে গেলে লাভবান হওয়া যাবে সেইখানে যাবার একটা অসাধারণ ক্ষমতা ভাইকিংদের মধ্যে ছিল।” উদাহরণ হিসাবে ইংল্যান্ড, দক্ষিণ ইতালির কথা বলা যায়। ১০৬৬ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডে আক্রমণ করেন নর্ম্যান্ডির ডিউক প্রথম উইলিয়াম। তিনি ইংল্যান্ড আক্রমণ করে তা দখল করে নিয়েছিলেন। Marc Bloch-এর মতে, “ইংল্যান্ডে নর্মানরা প্রবেশ করে নতুন মানবসত্তার জন্ম দিয়েছিল।”

ভাইকিংদের দ্বারা খ্রিস্টান ধর্মকে প্রধান্য দান

একাদশ শতক থেকেই নর্মানরা দস্যুতা, হিংস্রতার পরিবর্তে খ্রিস্টধর্মকে প্রাধান্য দিতে শুরু করেছিল। P. M. Sawyer এর মতে, ভাইকিংদের আক্রমণ এবং হিংস্রতা ইউরোপের সমগ্র অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল, এই বিষয়টি অতিকথনমাত্র। ক্যারেলিঞ্জীয় সাম্রাজ্যের অবক্ষয়ের জন্য ভাইকিংদের দায়ী করা হলেও ক্যালোরিঞ্জীয় সাম্রাজ্যের পতন ও অবক্ষয়ের জন্য অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাই ছিল প্রধান। একাদশ শতকে নর্মানদের চারিত্রিক দিক থেকে পরিবর্তন এসেছিল। এর প্রধান দুটি কারণ ছিল –

  • (১) ভাইকিংদের মধ্যে অধিকাংশই খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করেছিল। খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণ করার ফলে তাদের দস্যুতা এবং হিংস্রতার পরিমাণ কমে এসেছিল।
  • (২) ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের উত্থানের ফলে সামন্তপ্রভুরা ভাইকিং আক্রমণের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সামন্ত প্রভুদের দুর্গগুলিতে আক্রমণ করার মতো সাহস ভাইকিংদের ছিল না। এদিক থেকে ভাইকিংদের দুর্বলতাই চোখে পড়েছিল। সামন্তপ্রভুদের আশ্রিত বর্ম ও অস্ত্রে সজ্জিত ঘোড়সওয়ার যোদ্ধারা সহজেই ভাইকিংদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং ভাইকিংদের বিতাড়িত করে।

নৌবিদ্যা ও বাণিজ্যক কৃতিত্ব

  • (১) ভাইকিংদের জলদস্যুতা ছিল সর্বজনবিদিত। মঠ ধ্বংস, আয়ারল্যান্ডে বিশৃঙ্খলা, ক্যারোলিঞ্জীয় সাম্রাজ্যের পতন প্রভৃতি বিষয়ের জন্য ভাইকিংদের দায়ী করা হয়। কিন্তু ভাইকিংদের সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের কৌশল, নৌবিদ্যায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছিল।
  • (২) ভূমধ্যসাগর, বাল্টিক সাগর, আটলান্টিক মহাসাগরে পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসিকতা ভাইকিংদের জন্মগত প্রতিভার স্বাক্ষর ছিল। খ্রিস্টানজগৎকে সমুদ্রমুখী করে তোলার ক্ষেত্রেও ভাইকিংদের অবদান ছিল।
  • (৩) G. A. J. Hodgett তাঁর ‘A Social and Economic History of Medieval Europe’ গ্রন্থে ভাইকিংদের ইতিহাসকে কেবলমাত্র ধ্বংসের অধ্যায় না বলে নতুন বাণিজ্যপথ আবিষ্কার ও বাণিজ্যসম্পর্ক তৈরীর ক্ষেত্রে ভাইকিংদের পথ প্রদর্শক বলেছেন।
  • (৪) স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলে নবম শতকের শেষদিক থেকে একাদশ শতক পর্যন্ত বাণিজ্য বিস্তার তার অন্যতম নিদর্শন। ভাইকিংদের একটি শাখা ভারাঙ্গিয়ানরা (সুইডিশ) রাশিয়ার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপে বাণিজ্যিক পথ বিস্তার করেছিল।
  • (৫) রিগা উপসাগর থেকে ডুইনার নদীর মধ্যে দিয়ে পোলোটস্ক এবং নীপার নদীর তীরে স্মোলেনস্ক এবং কৃষ্ণসাগর পর্যন্ত পণ্য আমদানি-রপ্তানির পথ তাদের উদ্যোগেই চালু হয়েছিল। ভাইকিংদের দ্বারা যেসব দ্রব্য বিক্রি হত, তার মধ্যে প্রধান ছিল কাঠ, ফার, মোম এবং ক্রীতদাস।
  • (৬) বাগদাদ অঞ্চলেও ভাইকিংদের বাণিজ্যিক বিস্তার ঘটেছিল। সপ্তম ও অষ্টম শতকে ইউরোপের বাণিজ্য ভূমধ্যসাগরকেন্দ্রিক ছিল। নবম-দশম শতকে ভাইকিংরা উত্তরদিকে বাণিজ্যিক লেনদেন ঘটায়। দক্ষিণ ইউরোপের সঙ্গে উত্তর ইউরোপের বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু হয়। ইতালির নগরগুলি যে মধ্যযুগের বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসাবে যে পরিচিতি লাভ করে তার অর্ধেক কৃতিত্ব ভাইকিংদের।

ভাইকিংদের অবদান

  • (১) Henry Adams ভাইকিংদের কৃতিত্বের দিকটি তুলে ধরতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন যে, “ভাইকিংরা কোনো কাজ শেষ না করে অন্য কাজে হাত দেয় না।’ ইউরোপের বিভিন্ন জাতির সঙ্গে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক তৈরি করেছিল ভাইকিংরা। ফ্রান্স, রাশিয়া, ইংল্যান্ডের সংস্কৃতিকে তারা আপন করে নিয়েছিল। দক্ষিণ ইতালি এবং সিসিলিতে যে সভ্যতার সূচনা করেছিল তা কৃতিত্বপূর্ণ।
  • (২) ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের ক্ষেত্রেও ভাইকিংদের সাফল্য লক্ষ্য করা যায়। চার্চের ধ্বংসকারীরূপে ভাইকিংদের চিহ্নিত করা হলেও ইতিহাসের নিয়মে তারা পোপের এবং চার্চের শুভাকাঙ্খী হয়ে উঠেছিল। ইউরোপের সভ্যতার বিকাশে নর্মান বা ভাইকিংদের উজ্জ্বল ভূমিকা ছিল। মধ্যযুগের ইউরোপীয় সাহিত্য ভাইকিংদের দ্বারা সমৃদ্ধ হয়েছিল। ইউরোপে ও প্রশাসন ব্যবস্থায় ভাইকিংদের বিশেষ প্রভাব ছিল।

উপসংহার :- একসময় আক্রমণকারী হিসাবে চিহ্নিত ভাইকিংরাই শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিল।

(FAQ) নরম্যান বা ভাইকিংদের অভিযান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ভাইকিং শব্দের অর্থ কি?

জলদস্যু।

২. ভাইকিংরা অন্য কি নামে পরিচিত?

নরম্যান।

৩. ভাইকিংরা অভিযানের ক্ষেত্রে কোন বিষয়গুলিকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছিল?

মদ, নারী লুণ্ঠন, যুদ্ধ, আমোদ-প্রমোদ প্রভৃতি।

৪. ভাইকিংরা ইংল্যান্ডের দক্ষিণ দিকে আক্রমণ চালায় কখন?

৭৮৭ খ্রিস্টাব্দে।

৫. ভাইকিংরা আয়ারল্যান্ড দখল করে কখন?

৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment