শার্লামেন

পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট শার্লামেন প্রসঙ্গে তার পরিচয়, তার বংশ পরিচয়, খ্রিস্টান জনগণের নেতা শার্লামেন, শার্লামেন কর্তৃক পণ্ডিত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা, শার্লামেনের নীতি, শার্লামেনের সাম্রাজ্য বিস্তার, লোম্বার্ডদের বিরুদ্ধে শার্লামেনের ইটালী অভিযান, স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে শার্লামেনের অভিযান, ব্যাভেরিয়ার বিরুদ্ধে শার্লামেনের অভিযান, স্লাভ, ডেন, আভারদের উপর শার্লামেনের আধিপত্য ও শার্লামেনের স্পেন অভিযান সম্পর্কে জানবো।

সম্রাট শার্লামেন

ঐতিহাসিক চরিত্রশার্লামেন
পরিচিতিফ্রাঙ্কদের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট
 বংশক্যারোলিঞ্জিয়
রাজত্বকাল৭৬৮-৮১৪ খ্রি
রাজধানীআখেন নগর
সম্রাট শার্লামেন

ভূমিকা :- R.H.C. Davis যথার্থই বলেছিলেন, “সমস্ত ফ্রাঙ্ক সম্রাটদের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন শার্লামেন”। Pépin III এর কনিষ্ঠ সন্তান ছিলেন শার্লামেন। তিনি কেবলমাত্র ফ্রাঙ্ক জাতির ইতিহাসেই নয় মধ্যযুগের ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তি ছিলেন।

শার্লামেনের পরিচিত

  • (১) শার্লামেনের জীবনীকার ছিলেন আইনহার্ড। তাঁর লিখিত জীবনী থেকে জানা যায়, শার্লামেন ছিলেন অসাধারণ শক্তিশালী ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। তিনি তলোয়ার চালনায় অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। কঠোর পরিশ্রম করতে পারতেন। তিনি দক্ষ সাঁতারু এবং খেলোয়াড়সুলভ মনোভাবাপন্ন ছিলেন।
  • (২) ৬ ফুটের ওপর লম্বা ছিলেন এবং হাসিখুশি স্বভাবের ছিলেন। তিনি প্রজাদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের দিকটিও দেখতেন এবং তাদের অভাব অভিযোগগুলো শোনবার জন্য নিয়ম করে রাজকর্মচারী ও রাজ্যের অন্যান্য ব্যক্তিদের নিয়ে সভা ডেকে আলোচনা করতেন।

শার্লামেনের বংশ পরিচয়

শার্লামেন প্রকৃতপক্ষে জার্মান বংশজাত ছিলেন। জার্মান ভাষায় কথা বলা ছাড়াও মাঝে মধ্যেই জার্মান অঞ্চলে গিয়ে বসবাস করতেন। খ্রিস্টান সম্রাটদের কর্তব্য ও কর্ম বিষয়ে নতুন ধারণার উদ্ভব ঘটিয়েছিলেন।

খ্রিস্টান জনগণের নেতা শার্লামেন

শার্লামেন পশ্চিম ইউরোপের বৃহত্তর অংশে সামরিক দক্ষতার প্রয়োগ করেছিলেন। শার্লামেন ফ্রাঙ্কদের শিক্ষিত করে তুলেছিলেন এবং খ্রিস্টান জনগণের নেতা হিসাবে নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন।

শার্লামেন কর্তৃক পণ্ডিত ব্যক্তিদের পৃষ্ঠপোষকতা

তিনি পণ্ডিত ব্যক্তিদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। যেমন – পিসার পিটার নামক ব্যাকরণবিদ, Paul the Deacon নামক লোম্বার্ডদের ঐতিহাসিক যিনি ইটালী থেকে এসেছিলেন, Theodulf the Visigoth স্পেন থেকে এসেছিলেন এবং বিখ্যাত ইংরেজ Alcuin, যিনি ইয়র্ক থেকে এসেছিলেন।

শার্লামেনের নীতি

  • (১) শার্লামেনের রাজধানী ছিল Aachen। শার্লামেন শিল্প ও স্থাপত্যের অনুরাগী ছিলেন। এছাড়াও শিক্ষার প্রতি তাঁর আকর্ষণও ছিল প্রবল। শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রে এবং বিজেতা হিসাবে তাঁর দক্ষতার তুলনা করা যায় না। শার্লামেন-এর নীতির মধ্যে প্রধান ছিল সাম্রাজ্যের বিস্তার।
  • (২) তিনি জার্মান সাম্রাজ্যকে ইউরোপ তথা ফ্রাঙ্ক সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে চেয়েছিলেন। তার অন্যতম লক্ষ্যও ছিল জার্মান সাম্রাজ্যকে নিজের সাম্রাজ্যভুক্ত করা। শার্লামেনের নীতির অন্যতম ছিল পোপতন্ত্রের সঙ্গে সহযোগিতা ও মিত্রতার নীতি অনুসরণ করা।
  • (৩) শার্লামেন ছিলেন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি তাই তাঁর নীতিগুলির ক্ষেত্রেও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বৈদেশিক অভিযান ও আক্রমণ থেকে খ্রিস্টানদের সুরক্ষা দিতেও সচেষ্ট হয়েছিলেন।

শার্লামেনের রাজ্যবিস্তার

  • (১) Donald Bellough তাঁর “Age of Charlemagne” গ্রন্থে শার্লামেনের শাসনদক্ষতার পাশাপাশি সাম্রাজ্য বিস্তারের দিকটিও বর্ণনা করেছিলেন। শার্লামেন ছিলেন একজন দক্ষ সাম্রাজ্যবাদী মনোভাবাপন্ন ব্যক্তিত্ব। তাঁর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই ছিল রাজ্য বিস্তার করে ফ্রাঙ্ক সাম্রাজ্যকে ইউরোপে সবচেয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তোলা।
  • (২) শার্লামেন তাঁর রাজত্বকালে বেশিরভাগ সময়ই যুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। তাঁর সফল হওয়ার মানসিকতা ও উদ্যম তাঁকে রাজ্য জয়ের ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিল। তিনি যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন তারা মোটেই দুর্বল প্রতিপক্ষ ছিল না, যেমন – লোম্বার্ড, স্যাক্সন, স্পেনের মুসলিমগণ, সার্বগণ, আভারগণ, দক্ষিণ ইটালীর বাইজান্টাইন প্রদেশ, ব্রিটনস্, ডেনগণ, Benevento ডাচি প্রদেশ প্রভৃতি।
  • (৩) শার্লামেন-এর সাম্রাজ্য বহুদূর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল বেলজিয়াম, আধুনিক ফ্রান্স, সুইজারল্যাণ্ড, ইংল্যাণ্ড, পশ্চিম জার্মানির বেশিরভাগ অংশ, ইটালীর বহু অঞ্চল, উত্তর স্পেনের অল্পকিছু অংশ এবং কর্সিকা প্রভৃতি।

লোম্বার্ডদের বিরুদ্ধে শার্লামেনের ইটালী অভিযান

  • (১) শার্লামেন লোম্বার্ডদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। লোম্বার্ডদের রাজধানী ছিল Pavia, যা উত্তর ইটালীতে অবস্থিত ছিল। লোম্বার্ডরা বহু শহর দখল করেছিল যে শহরগুলিতে পোপতন্ত্রের কর্তৃত্ব বজায় ছিল।
  • (২) ইটালীতে শার্লামেনের সামরিক অভিযানের সময়কাল ছিল ৭৭৩-৭৭৪ খ্রিস্টাব্দ। Pope Hadrian I (৭৭২-৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ) লোম্বার্ডদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইটালীতে শার্লামেনকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে শার্লামেনের প্রথম বৃহৎ সামরিক অভিযান ইটালী থেকে শুরু হয়েছিল।
  • (৩) ৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি আল্পস অতিক্রম করে Pavia দখল করেছিলেন। লোম্বার্ডদের সম্রাট Didierকে পরাজিত করে তিনি এই অঞ্চল দখল করেছিলেন ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে। লোম্বার্ডরা যে সমস্ত অঞ্চল দখল করেছিল তা শার্লামেন পোপকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। শার্লামেন লোম্বার্ডদের পরাজিত করে লোম্বার্ড সম্রাট হিসাবে পরিচিতি পেয়েছিলেন ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দের জুন মাস নাগাদ।
  • (৪) এছাড়াও শার্লামেন তাঁর শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন Venetia, Istria, Dalmatia এবং Corsica-তে। ৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে রোমে Easter উৎসব পালনের সময়কালে শার্লামেন পোপকে Venetia, Istria প্রভৃতি অঞ্চল দান করতে চেয়েছিলেন। শার্লামেন পোপকে যেসব অঞ্চল দান করতে চেয়েছিলেন তার পূর্ণাঙ্গ বিবরণী “ভিটা হাড্রিয়ানি” দলিল নামে পরিচিত ছিল।
  • (৫) এছাড়া “Donation of Pepin” (৭৫৬ খ্রিস্টাব্দ) এর সূত্র ধরে বলা যায় Pepine পোপকে কিছু অঞ্চল দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। শার্লামেন পোপের এই প্রতিশ্রুতিও রাখতে পারতেন। কিন্তু লোম্বার্ডদের সম্রাট ও Patricius-এর মর্যাদা পাওয়ার পর তিনি পোপের প্রতিশ্রুতি রাখেন নি।

স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে শার্লামেনের অভিযান

  • (১) স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে শার্লামেনের অভিযান ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে শার্লামেনের যে যুদ্ধ হয়েছিল তা ছিল ভয়াবহ। স্যাক্সনরা ছিল খ্রিস্টান-ধর্ম বিরোধী। শার্লামেন তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। এই সময়কাল ছিল ৭৭২ থেকে ৮০৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।
  • (২) জার্মানবাসী স্যাক্সনরা ছিল অসীম সাহসী ও কঠোর পরিশ্রমী। ৭৭৫ খ্রিস্টাব্দে Westphalia-তে স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে শার্লামেন জয়লাভ করেছিলেন। স্যাক্সনরা কিন্তু সবকিছু মেনে নিতে পারে নি। শার্লামেনের বিরুদ্ধে তারা ক্রমাগত বিদ্রোহ করেছিল। স্যাক্সনদের জাতীয় বীর ছিল Witikind। শার্লামেন স্যাক্সনদের খ্রিস্টানধর্ম গ্রহণে প্ররোচনা দিয়েছিলেন। কিন্তু স্যাক্সনরা খ্রিস্টান ধর্মের বিরোধিতা করেছিল।
  • (৩) স্যাক্সন বিদ্রোহ তীব্র আকার ধারণ করেছিল ৭৯৩-৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে। শার্লামেন বিশপের অধীনে বিভিন্ন প্রদেশ বা Bishoprics গড়ে তুলেছিলেন। এই অঞ্চলে Bishopric-এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। শার্লামেন কঠোর শাসনের পরিবর্তে স্বাধীনতাপ্রিয় সাক্সনদের শান্তি শৃঙ্খলার মাধ্যমে ফ্রাঙ্ক শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

ব্যাভেরিয়ার বিরুদ্ধে শার্লামেনের অভিযান

শার্লামেন ব্যাভেরিয়ার বিরুদ্ধেও তাঁর অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ব্যাভেরিয়া ছিল প্রধানত জার্মান অঞ্চল। ফ্রাঙ্কশক্তির বিরুদ্ধে ব্যাভেরিয়ার Duke Tassilo ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ করেছিলেন। শার্লামেন এই ব্যাভেরিয়া অধিকার করে ফ্রাঙ্ক রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ব্যাভেরিয়ার Duke Tassilo আনুষ্ঠানিকভাবে শার্লামেনকে ঊর্ধ্বতন প্রভুরূপে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন।

স্লাভ, ডেন, আভারদের উপর শার্লামেনের আধিপত্য

শার্লামেন স্লাভদের বিরুদ্ধেও জয়লাভ করেছিলেন। এর মাধ্যমে স্লাভ, ডেন, আভারদের বিরোধিতার সমুচিত জবাব তিনি দিতে পেরেছিলেন। বোহেমিয়াও ৮০৫-৮০৬ খ্রিস্টাব্দে শার্লামেনের অধিকারে এসেছিল। ডেনরা শার্লামেনের আধিপত্যের বাধাস্বরূপ ছিল। ডেনিসদেরও তিনি পরাজিত করেছিলেন। জার্মানির দক্ষিণ পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত বা আধুনিক হাঙ্গেরিয় অঞ্চলে বসবাসকারি আভার উপজাতির উপরও তিনি আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

শার্লামেনের স্পেন অভিযান

  • (১) শার্লামেনের সামরিক দক্ষতার অন্যতম উদাহরণ ছিল স্পেনের সঙ্গে যুদ্ধ। স্পেন স্যারাসেন বা মুসলিমদের অধিকারে ছিল। স্পেনের এই যুদ্ধ ছিল প্রথম ইসলামদের বিরুদ্ধে এক সক্রিয় প্রতিরোধ এবং যাকে ক্রুসেডের আদিরূপ বলা যেতে পারে। শার্লামেনের মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান (৭৭৮ খ্রিস্টাব্দ) যদিও সফলতা অর্জন করে নি।
  • (২) কিন্তু তিনি বিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে পিরেনিজ পর্বত অতিক্রম করে স্পেন আক্রমণ করেছিলেন। শেষপর্যন্ত স্পেনের অধিকাংশ অঞ্চলে (৭৯৫ খ্রিস্টাব্দ) শার্লামেনের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শার্লামেনকে তাই আধুনিক স্পেনের প্রতিষ্ঠাতা হিসাবে গণ্য করা হয়।

উপসংহার :- শার্লামেনের সম্বন্ধে বলা হয়ে থাকে যে, একসময় প্রাচীন বিশ্ব জগৎ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছিল। এরপর শার্লামেনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন জগৎ-এর সূচনা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল।

(FAQ) পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট শার্লামেন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. শার্লামেন কে ছিলেন?

ফ্রাঙ্কদের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্রাট।

২. শার্লামেনের রাজত্বকাল কত?

৭৬৮-৮১৪ খ্রিস্টাব্দে।

৩. শার্লামেনের রাজধানী কোথায় ছিল?

আখেন নগরে।

৪. শার্লামেনের মৃত্যু কখন হয়?

৮১৪ খ্রিস্টাব্দে।

অন্যান্য ঐতিহাসিক চরিত্রগুলি

Leave a Comment