স্বদেশী

বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম ধারা হিসেবে স্বদেশী, স্বদেশী ভাবধারা, স্বদেশী ভাবধারা নতুন নয়, স্বদেশী শিল্প, স্বদেশী সাহিত্য ও সংস্কৃতি প্রসঙ্গে খ্যাতনামা সাহিত্যিক, স্বদেশী ইতিহাস চর্চা, চিত্রশিল্প, স্বদেশী বিজ্ঞান চর্চা সম্পর্কে জানবো।

স্বদেশী

পরিচিতিবঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন -এর অন্যতম ধারা
পরিপূরকবয়কট
স্বদেশী ভাণ্ডাররবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
লক্ষ্মীর ভাণ্ডারসরলাদেবী চৌধুরাণী
স্বদেশী

ভূমিকা:- বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলনের তিনটি ধারা লক্ষ্য করা যায়— (ক) বয়কট, (খ) স্বদেশী ও (গ) জাতীয়শিক্ষা। ‘বয়কট’ -এর মাধ্যমে জাতি বিদেশি সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করে, আর ‘স্বদেশী’-র মাধ্যমে জাতি মেতে ওঠে সৃষ্টির নব-আনন্দে।

স্বদেশী ও বয়কট

স্বদেশী ও বয়কট হল একই অস্ত্রের দুই দিক। স্বদেশী হল অস্তিবাচক—গঠনমূলক; আর বয়কট হল নেতিবাচক—বর্জনকর, বাতিলকর।

ভগিনী নিবেদিতার অভিমত

স্বামী বিবেকানন্দ -এর শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা -র মতে, স্বদেশী ও বয়কট হল একই জিনিসের দু’টি প্রয়োজনীয় দিক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি বিকশিত হতে পারে না।

জাতীয় শিক্ষা

‘জাতীয় শিক্ষা’ হল সকল বিদেশি প্রভাব বর্জন করে জাতীয় আদর্শেও জাতীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

স্বদেশী ভাবধারা

‘স্বদেশী’ ছিল বয়কটের পরিপুরক। বিলিতি বর্জনের সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশীর বিস্তার চলতে থাকে।

স্বদেশীভাবধারা নতুন নয়

  • (১) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে আমেরিকা, আয়ারল্যাণ্ড ও চীনের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন।
  • (২) ভারতে স্বদেশী আন্দোলনের বহু পূর্বে ১৮৪৯ খ্রিস্টাব্দে ‘লোকহিতবাদী’ নামে পরিচিত মহারাষ্ট্রের গোপালহরি দেশমুখ প্রথম স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
  • (৩) জি. ভি. যোশী, মহাদেব গোবিন্দ রাণাডে, আর্য সমাজ -এর প্রতিষ্ঠাতা স্বামী দয়ানন্দ প্রমুখ স্বদেশী দ্রব্যাদি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
  • (৪) বাংলাদেশে রাজনারায়ণ বসু-র প্রেরণায় ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে নবগোপাল মিত্র হিন্দুমেলার মাধ্যমে স্বদেশীর আদর্শ প্রচার করতে থাকেন।
  • (৫) ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে ভোলানাথ চন্দ দেশীয় ব্যাঙ্ক, কোম্পানি, মিল, কারখানা খুলে দেশীয় দ্রব্যাদি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
  • (৬) স্বদেশীর প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘স্বদেশী ভাণ্ডার’ (১৮৯৭ খ্রিঃ) এবং সরলা দেবী ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (১৯০৩ খ্রিঃ) খোলেন।
  • (৭) সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, স্বদেশীর আদর্শ ভারত বা বাংলায় নতুন কিছু নয়। সেই সময় এই সব উদ্যোগ ফলপ্রসূ না হলেও, বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন স্বদেশীর আদর্শকে নতুন তাৎপর্য দান করে।

শিল্প

  • (১) স্বদেশীর প্রেরণায় এই সময় দেশে বহু নতুন শিল্প গড়ে উঠতে থাকে। বাংলায় প্রতিষ্ঠিত হয় বঙ্গলক্ষ্মী মিল ও মোহিনী মিল। কুষ্ঠিয়া, হাওড়া, জলপাইগুড়ি, চট্টগ্রাম, ত্রিপুরা প্রভৃতি স্থানে গড়ে ওঠে বেশ কিছু কাপড়ের কল।
  • (২) হাওড়া, ধনেখালি ও হরিপালে আবার তাঁতিরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। আমেদাবাদ ও বোম্বাই এর তাঁতশিল্প ও মিলগুলিতে নবজীবনের সূচনা হয়।
  • (৩) স্বদেশী মূলধনে দেশের বিভিন্ন অংশে ব্যাঙ্ক, ওষুধ, ইনসিওরেন্স ও জাহাজ কোম্পানি এবং গেঞ্জি, মোজা, দেশলাই, সিগারেট, সাবান, চিনি, গুড়, চামড়া, কালি, কাগজ, চীনামাটির বাসন ও মৃৎশিল্পের প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হতে থাকে।
  • (৪) মুর্শিদাবাদ ও মালদহে রেশম শিল্প, মেদিনীপুরের উত্তরাঞ্চলে কাঁসা ও পেতলের বাসন শিল্প, পূর্ব বর্ধমান জেলার কাঞ্চননগরের ছুরি-কাঁচি শিল্প প্রভৃতির প্রসার ঘটে।
  • (৫) আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেঙ্গল কেমিক্যাল’। ডাঃ নীলরতন সরকার জাতীয় সাবান কারখানা প্রতিষ্ঠিত করেন। কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ’ নামে দেশীয় হাসপাতাল
  • (৬) জামসেদজি টাটা জামসেদপুরে ‘লৌহ ও ইস্পাত কারখানা’ প্রতিষ্ঠিত করেন। সুধীরকুমার সেন সাইকেল শিল্পের গোড়াপত্তন করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সেন এ্যাণ্ড পণ্ডিত কোম্পানি (১৯১০ খ্রিঃ)।
  • (৭) দ্বারভাঙ্গার মহারাজ, রাজেন্দ্রনাথ মুখার্জী প্রমুখের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেঙ্গল ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক’ (১৯০৮ খ্রিঃ)। প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ন্যাশনাল ইনসিওরেন্স কোম্পানি এবং “ইস্টার্ন লাইফ ইনসিওরেন্স’ প্রভৃতি বিমা সংগঠন।
  • (৮) জাহাজ পরিবহনের ক্ষেত্রেও উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠিত হয়ইস্ট বেঙ্গল রিভার স্টিম সার্ভিস’। কেবলমাত্র এই নয়—স্বদেশী উৎপাদন যাতে উন্নততর হয় এবং এই ব্যাপারে প্রশিক্ষণের দিকেও নেতৃবৃন্দের নজর ছিল।
  • (৯) ছাত্ররা যাতে জাপানে গিয়ে শিল্প-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিতে পারে এই উদ্দেশ্যে ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে যোগেশচন্দ্র ঘোষের উদ্যোগে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে।
  • (১০) একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, স্বদেশী উৎপাদনকে উন্নততর করে তোলার জন্য তিলক রাশিয়া, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার কনসালদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ঐ সব দেশ থেকে ভারতীয় শিল্পের জন্য আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি করা।
  • (১১) স্বদেশী বিস্তারের জন্য ব্রতী সমিতি, স্বদেশী মণ্ডলী, বন্দেমাতরম্ সম্প্রদায়, সন্তান সম্প্রদায়, স্বদেশ-বান্ধব সমিতি ও সুহৃদ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • (১২) স্বদেশী দ্রব্যাদি বিক্রির জন্য বাংলার শহর ও গ্রামে বহু স্বদেশী দোকান খোলা হয়। স্বদেশীর আদর্শ সফল করতে ছাত্র-যুবকরা সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। তারা বাড়ি বাড়িগিয়ে স্বদেশী পণ্য বিক্রি করে আসত।
  • (১৩) এই কাজে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত ডন সোসাইটি’ এবং ‘অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি’র ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি

স্বদেশী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের সাহিত্য ও শিল্পচর্চা নতুন রূপ ধারণ করে। এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দিক গুলি ছিল –

(১) খ্যাতনামা সাহিত্যিক

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রজনীকান্ত সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ, ক্ষীরোদপ্রসাদ, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় প্রভৃতি কবি, নাট্যকার, প্রবন্ধকার ও সংগীত রচয়িতার জাতীয়তাবাদী সৃষ্টিতে দেশে এক নব উন্মাদনা দেখা দেয়।

(২) ইতিহাসচর্চা

নিখিলনাথ রায়, অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ও রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ইতিহাসচর্চা দেশবাসীকে নতুন চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে।

(৩) চিত্রশিল্প

ভগিনী নিবেদিতার প্রেরণায় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নন্দলাল বসু, অসিত হালদার প্রমুখের শিল্পচেতনা ও শিল্পকার্যে স্বদেশী প্রভাব প্রত্যক্ষ হয়।

(৪) বিজ্ঞানচর্চা

বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেও এক যুগান্তর আসে। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও ডঃ প্রফুল্লচন্দ্র রায় ছাড়াও এই যুগে প্রেসিডেন্সি কলেজকে কেন্দ্র করে একদল তরুণ ও প্রতিশ্রুতিবান বৈজ্ঞানিকের আবির্ভাব হয়। তাঁরা হলেন রসিকলাল দত্ত, নীলরতন ধর, জ্ঞানেন্দ্রচন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।

উপসংহার:- সাহিত্য, কাব্য ও  সঙ্গীতের ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে স্বদেশী ভাবধারা বিজ্ঞান ও শিল্পের ক্ষেত্রেও স্থায়ী কীর্তি রেখে গেছে।স্বদেশের আদর্শ বাঙালিকে বিজ্ঞান চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

(FAQ) স্বদেশী সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলন কখন শুরু হয়েছিল?

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে।

২. বঙ্গভঙ্গ ও স্বদেশী আন্দোলনের কটি ধারা কি কি?

তিনটি, বয়কট, স্বদেশী ও জাতীয় শিক্ষা।

৩. লক্ষ্মীর ভাণ্ডার কে গঠন করেন?

সরলাদেবী চৌধুরাণী।

Leave a Reply

Translate »