আর্য সমাজ

আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠা, ভিত্তি, মূল নীতি, আর্য সমাজের কর্মসূচি, হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা, দয়ানন্দ সরস্বতীর অনুগামী, কলেজ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠা, শুদ্ধি আন্দোলন, আর্য সমাজের বিস্তার, জনপ্রিয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

আর্য সমাজ

প্রতিষ্ঠাতাস্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী
প্রতিষ্ঠাকাল১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ
স্থানবোম্বাই
সদস্যলালা হংসরাজ, পণ্ডিত গুরু দত্ত, লালা লাজপৎ রায়, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ
আর্য সমাজ

ভূমিকা :- ব্রাহ্ম সমাজপ্রার্থনা সমাজ ছিল পাশ্চাত্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত আন্দোলন, কিন্তু স্বামী দয়ানন্দ ও শ্রীরামকৃষ্ণ প্রবর্তিত আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল ভারতীয় ধর্ম, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী

  • (১) গুজরাটের এক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারে স্বামী দয়ানন্দের জন্ম। তাঁর গার্হস্থাশ্রমের নাম ছিল শঙ্কর। মাত্র পনেরো বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেন।
  • (২) তিনি স্বামীবিরজানন্দের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে কঠোর যোগ সাধনা করতে থাকেন। সংস্কৃত সাহিত্য ও ধর্মশাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল অসাধারণ এবং পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে তাঁর কোনও সম্পর্কই ছিল না।

আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠা

ব্রাহ্ম, মুসলিম ও খ্রিস্টানদের আক্রমণ প্রতিরোধ এবং হিন্দুধর্মেরআভ্যন্তরীণ সংস্কারের উদ্দেশ্যে ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ই এপ্রিল স্বামী দয়ানন্দ বোম্বাই-এ ‘আর্য সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন।

ভিত্তি

তাঁর সকল চিন্তাধারা ও আদর্শের ভিত্তি ছিল বেদ। বৈদিক যুগের গৌরব এবং পবিত্রতায় হিন্দুধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর কাছে বেদই ছিল চরম, পরম ও অভ্রান্ত সত্য, সর্বজ্ঞানের আকর।

আর্য সমাজের মূল নীতি

আর্য সমাজ মূলত স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী প্রবর্তিত দশটি নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। নীতিগুলি হল –

  • (১) সব সত্যবিদ্যা এবং যা পদার্থবিদ্যা দ্বারা জানা যায় সেই সবের আদিমূল পরমেশ্বর।
  • (২) ঈশ্বর সচ্চিদানন্দস্বরূপ, নিরাকার, সর্বশক্তিমান, ন্যায়কারী, দয়ালু, অজন্মা, অনন্ত, নির্বিকার, অনাদি, অণুপম, সর্বাধার, সর্বেশ্বর সর্বব্যাপক, সর্বান্তর্যামী, অজর, অমর, অভয়, নিত্য, পবিত্র ও সৃষ্টিকর্তা, একমাত্র তারই উপসনা করা উচিত।
  • (৩) বেদ সব সত্যবিদ্যার পুস্তক, বেদের পঠন-পাঠন, শ্রবণ ও শ্রাবণ সকল আর্যের পরম ধর্ম।
  • (৪) সত্য গ্রহণে ও অসত্য পরিত্যাগে সদা উদ্যত থাকবে।
  • (৫) সব কাজ ধর্মানুসারে অর্থাৎ সত্য ও অসত্য বিচারপূর্বক করা উচিত।
  • (৬) সংসারের উপকার করা এই সমাজের মুখ্য উদ্দেশ্য অর্থাৎ শারীরিক, আত্মিক ও সামাজিক উন্নতি করা।
  • (৭) সকলের সঙ্গে প্রীতিপূর্বক ধর্মানুসারে যথাযোগ্য ব্যবহার করা উচিত।
  • (৮) অবিদ্যার নাশ ও বিদ্যার বৃদ্ধি করা উচিত।
  • (৯) প্রত্যেককে নিজের উন্নতিতেই সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়, সবার উন্নতিতে নিজের উন্নতি ভাবা উচিত।
  • (১০) সব মানুষকে সামাজিক সর্বহিতকারী নিয়ম পালনে পরতন্ত্র এবং প্রত্যেক হিতকারী নিয়মে সবাইকে স্বতন্ত্র থাকা উচিত।

আর্য সমাজের কর্মসূচি

আর্য সমাজ কর্তৃক গৃহীত উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি গুলি হল –

(১) শুদ্ধি আন্দোলন

আর্য সমাজের অন্যতম কর্মসূচি ছিল শুদ্ধি আন্দোলন। শুদ্ধির প্রধান লক্ষ্য ছিল অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হিন্দুদের পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরিয়ে এনে এবং বিধর্মী প্রভাব রোধ করে ভারতকে এক জাতি, এক ধর্ম ও এক সমাজ রূপে প্রতিষ্ঠা করা।

(২) নারীদের উন্নতি

স্বামী দয়ানন্দ সমাজে নারীদের সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা, স্বাধীনতা দেওয়া এবং স্ত্রী শিক্ষার সার্বিক উন্নতি ঘটানোর কর্মসূচি গ্রহণ করেন।

(৩) হিন্দু ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠা

দয়ানন্দ বেদের ওপর নির্ভর করে সকল চিন্তাধারা ও আদর্শ নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন, যাতে বৈদিক সভ্যতা -এর গৌরব এবং পবিত্রতা হিন্দুধর্মে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তিনি বলতেন, বৈদিক শাস্ত্রে ফিরে যাও ( ‘ Go back to the Vedas ‘ )।

(৪) সংস্কৃত ভাষার গুরুত্ব

সংস্কৃত ভাষার ওপর আরও গুরুত্ব আরোপ করে তার মর্যাদা বৃদ্ধি করাও ছিল আর্য সমাজের একাধিক কর্মসূচির একটি।

সমর্থক

বৈদিক উত্তর যুগের ধর্মগ্রন্থ- পুরাণ, ব্রাহ্মণ ও উপনিষদের প্রতি তাঁর কোনও শ্রদ্ধা ছিল না। তিনি ছিলেন গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অস্পৃশ্যতা, পৌত্তলিকতা ও জাতিভেদ-বিরোধী এবং একেশ্বরবাদের সমর্থক।

উৎসাহী সমর্থক

তিনি নারী-স্বাধীনতা, স্ত্রীশিক্ষা, নারী-পুরুষ সমানাধিকার ও উভয়ের ব্রহ্মচর্য পালন, বিধবা বিবাহ, সমুদ্রযাত্রা ও সংস্কৃত ভাষার উৎসাহী সমর্থক ছিলেন।

হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা

তিনি বৈদিক শিক্ষার সঙ্গে পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের সমন্বয় চেয়েছিলেন। রাজা রামমোহন রায় ও শ্রীরামকৃষ্ণ সর্বধর্মসমন্বয়ের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু স্বামী দয়ানন্দের আদর্শ ছিল হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা।

শুদ্ধি আন্দোলন

তিনি ‘শুদ্ধি আন্দোলন-এর মাধ্যমে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীকে হিন্দুধর্মের অভ্যন্তরে আনতে সচেষ্ট ছিলেন এবং এই পন্থার প্রথম প্রবর্তক ছিলেন তিনিই।

রচিত গ্ৰন্থ

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী রচিত ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ ও ‘বেদ ভাষা’ নামক হিন্দি গ্রন্থে তাঁর ধর্মীয় মতাদর্শ প্রকাশিত হয়েছে।

জনপ্রিয়তা

ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল, বিশেষত পাঞ্জাবে তাঁর ভাবধারা অতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।তবে এ কথা ঠিকই যে, ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুকালে আর্য সমাজের সদস্যসংখ্যা ছিল ২০ হাজারেরও কম।

আর্য সমাজের বিস্তার

অল্প সময়ের মধ্যেই আর্য সমাজপাঞ্জাব, গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তার সংস্কার আন্দোলনকে গণমুখী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতীর অনুগামী

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে স্বামী দয়ানন্দের মৃত্যুর পর তাঁর অনুগামী লালা হংসরাজ, পণ্ডিত গুরু দত্ত, লালা লাজপৎ রায়, স্বামী শ্রদ্ধানন্দ (লালা মুনশী রাম) এই আন্দোলনের ধারা অব্যাহত রাখেন।

কলেজ ও আশ্রম প্রতিষ্ঠা

১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে লালা হংসরাজ লাহোরে দয়ানন্দ অ্যাংলো-বৈদিক কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত করেন। ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে স্বামী শ্রদ্ধানন্দ হরিদ্বারে ‘গুরুকুল আশ্রম’ প্রতিষ্ঠিত করে প্রাচীন বৈদিক রীতিতে শিক্ষার ব্যবস্থা করেন।

গুরুত্ব

ভারতীয় জাতীয় জাগরণের ইতিহাসে স্বামী দয়ানন্দ ও আর্য সমাজের ভূমিকা অতিগুরুত্বপূর্ণ। এর প্রধান গুরুত্ব হল –

  • (১) দয়ানন্দ সরস্বতীর প্রচারকার্যের ফলে হিন্দুদের হীনমন্যতা দূর হয়। বৈদিক হিন্দুধর্ম তার হৃত গৌরব ফিরে পায়, হিন্দু জনসাধারণ নিজেদের গৌরবময় ঐতিহ্যসম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
  • (২) হিন্দু সমাজে বিভিন্ন জাত-পাতের মধ্যে এক ঐক্যবোধ গড়ে ওঠে। আর্য সমাজের উদ্যোগেই হিন্দুধর্ম আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং এক সর্বগ্রাসী শক্তিতে পরিণত হয়।
  • (৩) রাজা রামমোহন বা মহাদেব গোবিন্দ রাণাডের আন্দোলন কেবলমাত্র মুষ্টিমেয় শিক্ষিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু আর্য সমাজের আন্দোলন ছিল গণমুখী।স্বামী দয়ানন্দই সর্বপ্রথম জনসাধারণকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন।
  • (৪) তিহাসিক ডঃ অমলেশ ত্রিপাঠী ভারতে চরমপন্থী রাজনীতির বিকাশে স্বামী দয়ানন্দ ও আর্য সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন।
  • (৫) সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদান সমাজের নীতিবিরুদ্ধ হলেও স্বামী দয়ানন্দের মৃত্যুর পরে আর্য সমাজ অধিকতর রাজনৈতিক রূপ পরিগ্রহ করে।
  • (৬) আর্য সমাজ থেকে লালা লাজপৎ রায়, লালা হরদয়াল, ভাই পরমানন্দ প্রমুখ বিপ্লবীর আবির্ভাব ঘটে।
  • (৭) ইংরেজ সাংবাদিক ভ্যালেন্টাইন চিরল ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে পাঞ্জাবের সকল সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের জন্য সরাসরি আর্য সমাজকেই দায়ী করেছেন।

সমালোচনা

আর্য সমাজ আন্দোলনের কিছু ত্রুটি-র কথাও উল্লেখ করা হয়। যেমন –

  • (১) এই আন্দোলন যেমন একদিকে নানা সংস্কারমূলক আন্দোলনের প্রবর্তন করে প্রগতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল, তেমনি অপরদিকে বৈদিক যুগের সব কিছুকেই অন্ধভাবে মেনে নেওয়া নিশ্চয়ই সঠিক হয় নি।
  • (২) তাঁদের কাছে বেদ-ই ছিল সকল জ্ঞানের উৎস। এই তত্ত্বও নিশ্চয়সর্বাংশে গ্রহণযোগ্য নয়।
  • (৩) তাঁর প্রচারকার্যের ফলে হিন্দুদের মধ্যে ঐক্যবোধের সঞ্চার হয় ঠিকই, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে হিন্দু, মুসলিম, পারসি ও খ্রিস্টানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা বৃদ্ধি পায়।
  • (৪) আর্য সমাজ ‘গো-রক্ষা সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করে গো-হত্যার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।এমনকী কয়েক জায়গায় হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গাও সংঘটিত হয়।
  • (৫) আর্য সমাজ রাজনীতি অপেক্ষা ধর্মের ওপর গুরুত্ব আরোপ করার ফলে ভারতে ‘হিন্দু রাজ’ প্রতিষ্ঠার চিন্তা বলবতী হয়।

উপসংহার :- আর্য সমাজ উত্তর ভারতের ম্রিয়মান হিন্দু সমাজের হতাশা ও অবসাদ দূর করে তাঁদের মনোবল বৃদ্ধি করেছিল।পরবর্তীকালে স্বাধীনতাপ্রেমী বিপ্লবীদের প্রেরণাস্থলছিল এই আর্য সমাজ।

(FAQ) আর্য সমাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. আর্য সমাজ কে প্রতিষ্ঠা করেন?

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী।

২. কবে কোথায় আর্য সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়?

১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে বোম্বাইয়ে।

৩. স্বামী দয়ানন্দ পরিচালিত আন্দোলন কি নামে পরিচিত?

শুদ্ধি আন্দোলন।

৪. ‘সত্যার্থ প্রকাশ’ও’বেদ ভাষা’ গ্ৰন্থ দুটি কে রচনা করেন?

স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী।

Leave a Reply

Translate »