জার্মানির ঐক্য আন্দোলন

জার্মানির ঐক্য আন্দোলন -এ সর্বজার্মানবাদ, বুরখেনশাফট্, জোলভ্যারাইন, ফ্রাঙ্কফুর্ট পার্লামেন্টের ভূমিকা, প্রথম উইলিয়ামের সিংহাসন লাভ, বিসমার্কের উত্থান, রক্ত ও লৌহ নীতি, ডেনমার্কের সাথে যুদ্ধ, গ্যাস্টিনের সন্ধি, বিয়ারিৎসের চুক্তি, স্যাডোয়ার যুদ্ধ, প্রাগের সন্ধি, এমস টেলিগ্রাম, সেডানের যুদ্ধ ও ফ্রাঙ্কফুর্টের সন্ধি সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

জার্মানির ঐক্য আন্দোলন

প্রধান ব্যক্তিত্ববিসমার্ক
ডেনমার্কের সঙ্গে যুদ্ধ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দ
স্যাডোয়ার যুদ্ধ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দ
সেডানের যুদ্ধ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ
জার্মানির ঐক্য আন্দোলন

ভূমিকা :- ফরাসি বিপ্লব -এর সময় জার্মানি ছিল কয়েকটি ছোটো-বড়ো রাজ্য নিয়ে গঠিত একটি ভৌগোলিক অঞ্চল। জার্মানি একসময় অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গ বংশীয় শাসকদের অধীনে ৩০০টি ছোটো-বড়ো রাজ্যে বিভক্ত ছিল।

কনফেডারেশন অব দ্য রাইন

নেপোলিয়ন জার্মানি জয় করে ৩০০টি রাজ্যের পরিবর্তে ৩৯টি রাজ্য নিয়ে গড়ে তোলেন ‘কনফেডারেশন অব দ্য রাইন’।

অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব

নেপোলিয়নের পতনের পর এই অঞ্চলের উপর অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং অস্ট্রিয়া এর সভাপতি নিযুক্ত হয়। এর ফলে জার্মান জাতীয়তাবাদীরা হতাশ হন।

সর্বজার্মানবাদ

এই সময় ‘প্যান জার্মানিজম’ বা সর্বজার্মানবাদ নামে একটি মতাদর্শ জার্মান জাতিকে ঐক্যের পথে এগিয়ে দেয়। সর্বজার্মানবাদ হল জার্মান জাতিমাত্রেরই ঐক্যবদ্ধ হবার আকাঙ্ক্ষা।

সর্বজার্মানবাদের প্রচার

জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, অধ্যাপক এবং বিভিন্ন মনীষী ফিকটে, হেগেল, স্টাইন, বোহেমার, হুসার, ঐতিহাসিক ডাইলম্যান, সঙ্গীতজ্ঞ সেবাস্টিয়ান বাখ প্রমুখ এই আদর্শ প্রচার করেন।

বুরখেনশাফট্

জেনা বিশ্ববিদ্যালয় তীয়তাবাদী ভাবধারার কেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা অধ্যাপক লডেন-এর প্রভাবে বুরখেনশাফট্ নামে একটি ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলে।

কার্লসবাড ডিক্রি

জেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাবে জার্মানির আরও ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। শেষপর্যন্ত ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে মেটারনিখ কার্লসবাড ডিক্রি জারি করে ‘বুরখেনশাফট্’ ভেঙে দেন।

জোলভ্যারাইন

এই সময় জার্মান জাতিকে ঐক্যের পথে এগিয়ে দেয় জোলভ্যারাইন নামক শুল্কসংঘ। জার্মান অর্থনীতিবিদ ম্যাজেন-এর উদ্যোগে প্রাশিয়ার নেতৃত্বে ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

সদস্য

১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ১৮টি জার্মান রাজ্য এর সদস্য হয়েছিল। এটি জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্যের পথ প্রশস্ত করে।

উদ্দেশ্য

জার্মান রাজ্যগুলির মধ্যে অন্তঃশুল্ক প্রথা তুলে দিয়ে এবং অবাধ বাণিজ্য নীতি চালু করে জার্মানির অর্থনৈতিক ঐক্য ও সমৃদ্ধিসাধন ছিল জোলভ্যারাইনের উদ্দেশ্য।

ভর-পার্লামেন্ট

জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জার্মানির বিভিন্ন রাজ্যের পার্লামেন্ট-এ নির্বাচিত ৫০০ জন প্রতিনিধি ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চে ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে একটি প্রস্তুতি অধিবেশনে মিলিত হন এবং একটি নির্বাচিত জাতীয় পার্লামেন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। এই পার্লামেন্ট ‘ভর-পার্লামেন্ট’ নামে খ্যাত।

ফ্রাঙ্কফুর্ট পার্লামেন্ট

জার্মান জাতীয়তাবাদীরা জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সংবিধান রচনা করার জন্য ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরে ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট পার্লামেন্ট’ ‘আহ্বান করেন।

পার্লামেন্টের ভাঙন

ফ্রাঙ্কফুর্ট সভা প্রাশিয়ার অধিপতি চতুর্থ ফ্রেডারিখ উইলিয়ামকে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির রাজমুকুট গ্রহণের জন্য আবেদন জানায়। প্রাশিয়ার রাজা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে পার্লামেন্ট ভেঙে যায়।

প্রথম উইলিয়ামের সিংহাসন লাভ

১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে চতুর্থ ফ্রেডারিখ উইলিয়ামের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই প্রথম উইলিয়াম প্রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন।

বিসমার্কের উত্থান

প্রাশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়াম ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী অটো ফন বিসমার্ক কে প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেন।

রক্ত ও লৌহ নীতি

প্রধানমন্ত্রী পদ গ্ৰহণ করে তিনি ঘোষণা করেন “বক্তৃতা বা ভোটের দ্বারা নয়, রক্ত ও লৌহ নীতির দ্বারাই জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।”

তিনটি যুদ্ধ

বিসমার্ক তিনটি যুদ্ধের দ্বারা জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করেন।

  • (১) ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের সঙ্গে যুদ্ধ,
  • (২) ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রো প্রাশিয়া যুদ্ধ এবং
  • (৩) ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ।

ডেনমার্কের সঙ্গে যুদ্ধ

শ্লেজউইগ হলস্টাইন সমস্যাকে কেন্দ্র করে ডেনমার্কের সঙ্গে প্রাশিয়ার প্রথম যুদ্ধ শুরু হয়। এই দুটি প্রদেশ ছিল জার্মানির রাজ্যসীমার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু আইনত স্থান দুটি ছিল ডেনমার্কের অধীন। বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

গ্যাস্টিনের সন্ধি

পরাজিত ডেনমার্ক ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে গ্যাস্টিনের সন্ধি দ্বারা প্রাশিয়াকে শ্লেজউইগ এবং অস্ট্রিয়াকে হলস্টাইন ছেড়ে নিতে বাধ্য হয়।

অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি

বিসমার্ক জানতেন যে, জার্মানির ঐক্যের জন্য অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অপরিহার্য। তাই তিনি যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং ইউরোপীয় রাজনীতিতে অস্ট্রিয়াকে মিত্রহীন করতে সচেষ্ট হন।

বিয়ারিৎসের চুক্তি

বিসমার্ক যুদ্ধে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নকে নিরপেক্ষ রাখতে ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে বিয়ারিৎসের গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

স্যাডোয়ার যুদ্ধ

১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। ইংরেজ ঐতিহাসিকদের মতে, এই যুদ্ধ স্যাডোয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধ সাত সপ্তাহ স্থায়ী হয়েছিল বলে একে “সাত সপ্তাহের বুদ্ধ” বলা হয়। এই যুদ্ধকেই জার্মান ঐতিহাসিকরা কোনিগ্রাৎসের যুদ্ধ বলেছেন।

প্রাগের সন্ধি

কোনিগ্রাৎসের যুদ্ধে অস্ট্রিয়া পরাজিত হয়। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে প্রাগের সন্ধির স্বাক্ষরের মধ্যে দিয়ে যুদ্ধের অবসান ঘটে।

প্রাগের সন্ধির শর্ত

এই সন্ধির ফলে,

  • (১) ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে গঠিত জার্মান রাজ্য সংঘের বিলুপ্তি ঘটে,
  • (২) জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্যের অবসান ঘটে,
  • (৩) প্রাশিয়ার নেতৃত্বে উত্তর জার্মানির রাজ্যগুলি ঐক্যবদ্ধ হয় এবং
  • (৪) ইতালি ভেনিশিয়া লাভ করে।

ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি

স্যাডোয়ার যুদ্ধের ফলে ফ্রান্সের পাশে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে প্রাশিয়ার উন্মেষ ফরাসিরা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি। তারা প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য জেনে বিসমার্ক যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন।

স্পেনের উত্তরাধিকার প্রশ্ন

এই সময় স্পেনের সিংহাসনে উত্তরাধিকারের প্রশ্ন নিয়ে এক গোলযোগের সূত্রপাত হয়। স্পেনবাসী প্রাশিয়ার হোহেনজোলান বংশের প্রিন্স লিওপোল্ডকে স্পেনের রাজপদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করলে ফ্রান্সে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

প্রাশিয়ার কাছে প্রতিশ্রুতি

ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন প্রাশিয়া-রাজ প্রথম উইলিয়ামের কাছ থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চান যে, হোহেনজোলান বংশের কেউ কখনও স্পেনের সিংহাসনে বসবে না।

এমস টেলিগ্রাম

ফরাসি দূত কাউন্ট বেনিদিতি এমস নামক স্থানে বিশ্রামরত প্রাশিয়ারাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রাশিয়ারাজ কোনো প্রতিশ্রুতিদানে তাঁর অক্ষমতা প্রকাশ করেন এবং পুরো বিষয়টি টেলিগ্রাম মারফত প্রধানমন্ত্রী বিসমার্ককে জামান (১০ জুলাই, ১৮৭০ খ্রিঃ)। বিসমার্ক মূল টেলিগ্রামের কিছু শব্দ বাদ দিয়ে পরের দিন সংবাদপত্রে প্রকাশ করেন, যাতে মনে হয় যে, প্রাশিয়ারাজ ফরাসি দূতকে অপমান পরেছেন। এটি এমস টেলিগ্রাম’ নামে খ্যাত।

সেডানের যুদ্ধ

এই এমস টেলিগ্রামটি ছিল ১৮৭০ – যুদ্ধ বা সেডানের যুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ। যুদ্ধে ফ্রান্স পরাজিত হয়।

ফ্রাঙ্কফুর্টের সন্ধি

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ মে ফ্রাঙ্কফুর্টের সন্ধি দ্বারা এই যুদ্ধের অবসান ঘটে। ফ্রান্স প্রাশিয়াকে মেটজ ও আলসাস লোরেন ছেড়ে দিতে এবং প্রচুর অর্থ ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকৃত হয়।

উপসংহার :- ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে  প্রাশিয়ারাজ প্রথম উইলিয়াম ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদে জার্মানির সম্রাট বা কাইজার বলে ঘোষিত হন। এইভাবে জার্মানির ঐক্য আন্দোলন সম্পূর্ণ হয়।

(FAQ) জার্মানির ঐক্য আন্দোলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জার্মানির ঐক্য আন্দোলনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন কে?

বিসমার্ক।

২. কোন নীতির মাধ্যমে বিসমার্ক জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ করেন?

রক্ত ও লৌহ নীতি।

৩. জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয় কত খ্রিস্টাব্দে?

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে।

৪. কোন কোন যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়?

১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের সঙ্গে যুদ্ধ; ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রো প্রাশিয়া যুদ্ধ এবং ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ।

Leave a Reply

Translate »