সেডানের যুদ্ধ

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও প্রাশিয়ার মধ্যে সংঘটিত ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ বা সেডানের যুদ্ধ প্রসঙ্গে যুদ্ধের কারণ হিসেবে দক্ষিণ জার্মানির ঐক্য বাকি, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনিবার্য, ফ্রান্সের নিরাপত্তার প্রশ্ন, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, ফ্রান্সের দাবি প্রত্যাখ্যান, র‍্যাণ্ডন ও থিয়ার্সের মন্তব্য, ফরাসি রাজনীতিকের মন্তব্য, যুদ্ধের প্রস্তুতি, রাশিয়ার সাহায্য লাভ, অস্ট্রিয়ার নিরপেক্ষতা, ইতালির সহযোগিতা, স্পেনের উত্তরাধিকার প্রশ্ন, স্পেনের রানির সিংহাসনচ্যুতি, ফ্রান্সের প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ, প্রতিশ্রুতি আদায়ের প্রচেষ্টা, এমস টেলিগ্ৰাম, বিসমার্কের কূটনীতি, যুদ্ধের সূচনা, আক্রমণকারী ফ্রান্স, ফ্রান্সের পরাজয়, ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত, ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধি, ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধির শর্ত এবং সেডানের যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ বা সেডানের যুদ্ধ

সময়কাল১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ
বিবাদমান পক্ষপ্রাশিয়া ও ফ্রান্স
ফলাফলফ্রান্সের পরাজয়
পরিস্থিতিজার্মানির ঐক্য আন্দোলন
প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রীবিসমার্ক
ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ বা সেডানের যুদ্ধ

ভূমিকা:- প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্য আন্দোলনের শেষ যুদ্ধ ছিল ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেডানের যুদ্ধ। এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন হয়।

সেডানের যুদ্ধের কারণ

ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া বা সেডানের যুদ্ধের কারণ ছিল নিম্নরূপ। –

(১) দক্ষিণ জার্মানির ঐক্য বাকি

স্যাডোয়ার যুদ্ধের ফলে উত্তর জার্মানি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, কিন্তু দক্ষিণ জার্মানির ঐক্য তখনও বাকি ছিল। দক্ষিণ জার্মানির ব্যাডেন, উটেনবার্গ, ডার্মস্টাট প্রভৃতি ক্যাথলিক রাজ্যগুলি ফরাসি-রাজ নেপোলিয়নকে তাদের রক্ষাকর্তা বলে মনে করত।

(২) ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অনিবার্য

দক্ষিণ জার্মানির এই রাজ্যগুলিকে প্রাশিয়ার সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ করতে গেলে ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ অপরিহার্য ছিল। এই কারণে বিসমার্ক তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন যে, ফ্রান্সের সঙ্গে প্রাশিয়ার যুদ্ধ অনিবার্য ছিল।

(৩) ফ্রান্সের নিরাপত্তার প্রশ্ন

স্যাডোয়ার যুদ্ধের ফলে ফ্রান্সের পাশে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে প্রাশিয়ার উন্মেষ ফ্রান্সের নিরাপত্তার পক্ষে যথেষ্ট ক্ষতিকারক ছিল। ফ্রান্সবাসী এই বিষয়টিকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারে নি।

(৪) প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

স্যাডোয়ার যুদ্ধে নিরপেক্ষ থাকার মাধ্যমে বিসমার্ক তৃতীয় নেপোলিয়নকে যে সব স্থান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ফ্রান্স তা-ও পায় নি।

(৫) ফ্রান্সের দাবি প্রত্যাখ্যান

পুরস্কার হিসেবে ফ্রান্স প্রথমে রাইন অঞ্চল দাবি করে। বিসমার্ক এই দাবির প্রতি কোনও আমল দেন নি। এরপর ফ্রান্স বেলজিয়াম দাবি করে। এই দাবি উপেক্ষিত হলে ফ্রান্স লুক্সেমবার্গ কেনার প্রস্তাব দেয়। বিসমার্ক তাও প্রত্যাখ্যান করেন। এর ফলে সমগ্র ফ্রান্সে এই ধারণাই হয় যে, স্যাডোয়ার যুদ্ধে অস্ট্রিয়া নয়—ফ্রান্সেরই পরাজয় ঘটে।

(৬) র‍্যাণ্ডন ও থিয়ার্সের মন্তব্য

মার্শাল র‍্যাণ্ডন  মন্তব্য করেন যে, “স্যাডোয়ার যুদ্ধে ফ্রান্সই পরাজিত হয়েছে।” রাজনীতিবিদ থিয়ার্স (Theirs) মন্তব্য করেন যে, স্যাডোয়ার যুদ্ধে যা ঘটল তা হল বিগত চারশো বছরের ইতিহাসে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক বিপর্যয়।

(৭) ফরাসি রাজনীতিকের মন্তব্য

স্বাভাবিকভাবেই ফ্রান্সবাসী প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উন্মুখ হয়ে ওঠে। জনৈক ফরাসি রাজনীতিক মন্তব্য করেন যে, ফ্রান্স ও প্রাশিয়া যেন দুটি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিন, যারা একই লাইন ধরে পরস্পর পরস্পরের দিকে তীব্র গতিতে এগিয়ে আসছিল এবং এদের মধ্যে সংঘর্ষ অনিবার্য ছিল।

সেডানের যুদ্ধের প্রস্তুতি

দুই রাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমন করতে ইউরোপে কোনও তৃতীয় শক্তি বা আন্তর্জাতিক সংস্থা ছিল না। ফ্রান্সের সঙ্গে যুদ্ধ অনিবার্য জেনে বিসমার্ক যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন এবং ফ্রান্সকে ইউরোপীয় রাজনীতিক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন করতে সচেষ্ট হন।

(১) রাশিয়ার সাহায্য লাভ

ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ও পোল বিদ্রোহকালে তৃতীয় নেপোলিয়নের ভূমিকায় রাশিয়া প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। অপরপক্ষে, পোল বিদ্রোহ দমনে রাশিয়াকে সাহায্য করে বিসমার্ক রাশিয়ার সহানুভূতি অর্জন করেন।

(২) অস্ট্রিয়ার নিরপেক্ষতা

স্যাডোয়ার যুদ্ধে পরাস্ত হওয়া সত্ত্বেও বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার উপর কোনও অসম্মানজনক সন্ধি চাপিয়ে দেননি। তাই অস্ট্রিয়া বিসমার্কের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিল। এই কারণে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগে বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার নিরপেক্ষতা লাভে সক্ষম হন।

(৩) ইতালির সহযোগিতা

রোম তখনও ইতালির সঙ্গে যুক্ত হয় নি। ইতালিকে রোম দেওয়া হবে – এই শর্তে বিসমার্ক ইতালির সহযোগিতা লাভ করেন। এইভাবে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলি থেকে ফ্রান্সকে বিচ্ছিন্ন করে বিসমার্ক ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সুযোগ খুঁজতে থাকেন।

(৪) স্পেনের উত্তরাধিকার প্রশ্ন

এই সময় স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকারের প্রশ্ন নিয়ে এক গোলযোগের সূত্রপাত হয় এবং এর ফলেই ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ শুরু হয়।

(৫) স্পেনের রানির সিংহাসনচ্যুতি

১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে গণবিদ্রোহের ফলে স্পেনের রানি ইসাবেলা সিংহাসনচ্যুত হলে, স্পেনবাসী প্রাশিয়ার রাজবংশ হোহেনজোলার্ন-বংশীয় প্রিন্স লিওপোল্ড-কে স্পেনের রাজপদ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করে।

(৬) ফ্রান্সে প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভ

এই সংবাদে ফ্রান্সে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। ফ্রান্সের পূর্বে জার্মানি এবং পশ্চিমে স্পেনে যদি একই হোহেনজোলান-বংশীয় রাজাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে ফ্রান্সের সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হওয়ার সম্ভাবনা। ফ্রান্সের এই বিক্ষোভের ফলে প্রিন্স লিওপোল্ড স্পেনবাসীর এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন।

(৭) প্রতিশ্রুতি আদায়ের প্রচেষ্টা

ফ্রান্স কিন্তু এতেও খুশি হয় নি। ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন প্রাশিয়া-রাজ প্রথম উইলিয়মের কাছ থেকে এই মর্মে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে চান যে, হোহেনজোলান বংশের কেউ কখনও স্পেনের সিংহাসনে বসবে না।

(৮) এমস টেলিগ্ৰাম

প্রতিশ্রুতি আদায়ের উদ্দেশ্যে ফরাসি দূত কাউন্ট বেনেদিতি এমস নামক স্থানে বিশ্রামরত প্রাশিয়া-রাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। প্রাশিয়া-রাজ এই ধরনের কোনও প্রতিশ্রুতি দানে তাঁর অক্ষমতা প্রকাশ করেন এবং পুরো বিষয়টি টেলিগ্রাম মারফত প্রধানমন্ত্রী বিসমার্ককে জানান (১৩ই জুলাই, ১৮৭০ খ্রিঃ)। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘এমস টেলিগ্রাম’ নামে খ্যাত।

(৯) বিসমার্কের কূটনীতি

কূটকৌশলী বিসমার্ক মূল টেলিগ্রামের কিছু শব্দ বাদ দিয়ে টেলিগ্রামটি এমনভাবে সাজিয়ে পরের দিন সংবাদপত্রে (North German Gazette ) প্রকাশ করেন যাতে মনে হয় যে, প্রাশিয়া-রাজ ফরাসি দূতকে অপমান করেছেন।

সেডানের যুদ্ধের সূচনা

এর ফলে ফরাসি জনমত প্রবলভাবে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং তারা তাদের জাতীয় অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার দাবি করতে থাকে। বিসমার্ক এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন।  অপ্রস্তুত ফ্রান্স ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুলাই প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

আক্রমণকারী ফ্রান্স

বিসমার্ক সহাস্যে বলেন যে, “লাল কাপড় দেখিয়ে তিনি গলদেশের (ফ্রান্স) ষাঁড়কে ক্ষেপিয়ে দিয়েছেন।” সমগ্র ইউরোপের চোখে ফ্রান্স আক্রমণকারী বলে প্রতিপন্ন হয়।

ফ্রান্সের পরাজয়

নির্বান্ধব ফ্রান্স ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর সেডানের যুদ্ধে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন স্বয়ং বন্দি হন।

ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠ

এই পরাজয়ের সংবাদ ফ্রান্সে পৌঁছানো মাত্র সেখানে ব্যাপক বিদ্রোহ শুরু হয়। দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে ফ্রান্সে পুনরায় প্রজাতন্ত্র (তৃতীয় প্রজাতন্ত্র) প্রতিষ্ঠিত হয় (৪ঠা সেপ্টেম্বর, ১৮৭০ খ্রিঃ)।

ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধি

১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মে ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধির দ্বারা আনুষ্ঠানিকভাবে সেডানের যুদ্ধের অবসান ঘটে। জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন হয়।

ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধির শর্ত

এই সন্ধির শর্তানুসারে,

  • (১) দক্ষিণ জার্মানি প্রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়।
  • (২) ফ্রান্স প্রাশিয়াকে মেট্‌জ ও আলসাস-লোরেন ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
  • (৩) ফ্রান্স প্রাশিয়াকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে স্বীকৃত হয়। স্থির হয় যে, যতদিন না এই ক্ষতিপূরণের অর্থ হস্তান্তরিত হচ্ছে, ততদিন প্রাশিয়ার সেনাবাহিনী ফ্রান্সে অবস্থান করবে।
  • (৪) রোম থেকে ফরাসি সেনা প্রত্যাহৃত হয় এবং রোম ইতালির অন্তর্ভুক্ত হয়।
  • (৫) প্রাশিয়া-রাজ প্রথম উইলিয়ম ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সম্রাট বা ‘কাইজার’ বলে ঘোষিত হন।

সেডানের যুদ্ধের ফলাফল

ইউরোপের ইতিহাসে সেডানের যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন –

  • (১) এই যুদ্ধের ফলে ভিয়েনা ব্যবস্থার সমাধি রচিত হয়, ফ্রান্স ও জার্মানির সীমানা সংশোধিত হয়, ফ্রান্সের দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে এবং জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ দুশো বছর ধরে প্যারিস ছিল ইউরোপীয় রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই যুদ্ধের ফালে ইউরোপীয় রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র প্যারিস থেকে বার্লিনে স্থানান্তরিত হয়। তাই বলা হয় যে, “ইউরোপ একজন কর্ত্রী হারিয়ে একজন কৰ্তা পেল।”
  • (২) এই যুদ্ধের দ্বারা ইতালি ও জার্মানির রাজনৈতিক ঐক্য সম্পন্ন হয়। যুদ্ধের পর দক্ষিণ জার্মানির রাজ্যগুলি ও আলসাস-লোরেন উত্তর জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই জানুয়ারি ভার্সাই রাজপ্রাসাদে প্রাশিয়া-রাজ প্রথম উইলিয়ম ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সম্রাট হিসেবে ঘোষিত হন। এই যুদ্ধের সময় ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন রোম থেকে সেনা অপসারণে বাধ্য হন। এই সুযোগে পিডমন্ট-অধিপতি ভিক্টর ইমান্যুয়েল রোম দখল করেন। এর ফলে ইতালির ঐক্যও সম্পূর্ণ হয়।
  • (৩) ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করার ফলে প্রাশিয়া তথা জার্মানির মর্যাদা বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় এবং জার্মানি ইউরোপের শ্রেষ্ঠ শক্তিতে পরিণত হয়। বিসমার্কের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা, ভারী শিল্প এবং রেল যোগাযোগের মাধ্যমে ইউরোপে এক নতুন ‘কলোসাস’ হিসেবে জার্মানির উত্থান ঘটে। ইউরোপীয় রাজনীতি নতুন পথে মোড় নেয়।
  • (৪) বিসমার্ক ইউরোপের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কূটনীতিক হিসেবে স্বীকৃতি পান এবং ইউরোপীয় শক্তির ভারকেন্দ্র ভিয়েনা থেকে বার্লিনে স্থানান্তরিত হয়। কেটেলবি (Ketelbey) বলেন যে, এই যুদ্ধে জয়লাভের ফলে জার্মানি ইউরোপের কর্ত্রী এবং বিসমার্ক জার্মানির কর্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
  • (৫) এই যুদ্ধের ফলে ফ্রান্সের মর্যাদা ধূলিলুণ্ঠিত হয়। ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন পরাজিত ও বন্দি হন। ফরাসি পার্লামেন্ট তাঁকে পদচ্যুত করে ফ্রান্সে দ্বিতীয় সাম্রাজ্যের অবসান ঘোষণা করে—ফ্রান্সে রাজতন্ত্র চিরতরে অবলুপ্ত হয়।
  • (৬) ফরাসি পার্লামেন্ট ফ্রান্সে তৃতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করে। ফ্রান্স থেকে প্রজাতন্ত্র আর কখনও বিলুপ্ত হয় নি। প্যারিসের শ্রমজীবী জনতা এই প্রজাতন্ত্রের উপর আস্থা রাখতে পারে নি। এই কারণে তারা ‘প্যারিস কমিউন’ নামে একটি সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠা করে সমাজতন্ত্রের পক্ষে লড়াই শুরু করে। বলা হয় যে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ‘প্যারিস কমিউন’ হল মেহনতি জনতার প্রথম শাসন। তাদের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়, কারণ এই সরকারের স্থায়িত্ব ছিল মাত্র দু’ মাস।
  • (৭) রোম থেকে পোপের অধিকার অপসৃত হওয়ায় পোপ ও ক্যাথলিক চার্চ প্রবল ক্ষুব্ধ হয়। পরাজিত দুই রাষ্ট্র অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্স ছিল ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র। স্বাভাবিকভাবেই ইতালি ও জার্মানির সঙ্গে ক্যাথলিকদের সুসম্পর্ক ছিল না। বিসমার্ককে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ক্যাথলিকদের বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়।
  • (৮) সেডানের যুদ্ধ প্রাচ্য সমস্যাকেও প্রভাবিত করে। এই যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে রাশিয়া প্যারিসের সন্ধি (১৮৫৬ খ্রিঃ)-র নৌ-সংক্রান্ত শর্তগুলি লঙ্ঘন করতে থাকে। রাশিয়া কৃষ্ণসাগরের তীরে দুর্গ নির্মাণ করে তার শক্তিবৃদ্ধি করতে সচেষ্ট হয়।
  • (৯) ইংল্যান্ড রাশিয়ার কার্যকলাপের বিরোধিতা করতে থাকে এবং এই উদ্দেশ্যে লন্ডনে একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক ডাকা হয় (ডিসেম্বর, ১৮৭০ – মার্চ, ১৮৭১ খ্রিঃ)। এই বৈঠকে প্যারিসের সন্ধি লঙ্ঘন করার জন্য রাশিয়াকে দায়ী করা হলেও তার বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। এর ফলে রাশিয়ার অবৈধ কার্যকলাপ একরকম স্বীকৃতি পায়।

উপসংহার:- অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর বলেন যে, সেডানের যুদ্ধের পর ইউরোপীয় রাজনীতি নতুন চরিত্র ধারণ করে। এই উক্তির মধ্যে কোনও বাহুল্য নেই। বস্তুত এই সময় থেকে ইউরোপীয় রাজনীতিতে যে সব পরিবর্তনের সূচনা হয়, তা পরবর্তী ইতিহাসকে নানাভাবে প্রভাবিত করে। অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের আশা-আকাঙ্ক্ষাই ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে পূর্ণতা পায়।

(FAQ) সেডানের যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়া যুদ্ধ কবে কাদের মধ্যে হয়?

১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে প্রাশিয়া ও ফ্রান্স।

২. সেডানের যুদ্ধের সময় প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

বিসমার্ক।

৩. কোন যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানি ও ইতালির ঐক্য সম্পন্ন হয়?

সেডানের যুদ্ধ।

৪. কোন সন্ধি দ্বারা সেডানের যুদ্ধের অবসান ঘটে?

ফ্রাঙ্কফোর্টের সন্ধি ১০ মে ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Reply

Translate »