তৃতীয় আরব ইজরায়েল যুদ্ধ

তৃতীয় আরব ইজরায়েল যুদ্ধ প্রসঙ্গে যুদ্ধের পটভূমি হিসেবে বিবদমান সেনা মোতায়েন, মিশরের গাজা ভূখণ্ড দখল, আরব লীগের ঘোষণা মিশরের সেনাপ্রস্তুতি, জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, যুদ্ধের সূচনা, যুদ্ধবিরতি ও যুদ্ধের গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

তৃতীয় আরব ইজরায়েল যুদ্ধ

ঐতিহাসিক যুদ্ধতৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ
সময়কাল১৯৬৭ খ্রি
বিবাদমান পক্ষইজরায়েল ও আরব রাষ্ট্র
গাজা পুনরুদ্ধারমিশর
টিরান প্রণালীইজরায়েল
হস্তক্ষেপসম্মিলিত জাতিপুঞ্জ
তৃতীয় আরব ইজরায়েল যুদ্ধ

ভূমিকা :- ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধবিরতি আরব-ইজরায়েল সম্পর্কে আপাতত শান্তি এনে দেয়। কিন্তু সেই অঞ্চলে জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষী বাহিনী অবস্থান করলেও এই শান্তি মোটেই দীর্ঘস্থায়ী ছিল না। আপাত শান্তির আড়ালে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি চলছিল।

জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনী প্রত্যাহার

এই সময় আরব-ইজরায়েল সীমান্তের শান্তির জন্য জাতিপুঞ্জের শান্তিরক্ষা বাহিনী মিশরে অবস্থান করছিল। মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসের ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে জাতিপুঞ্জের বাহিনী প্রত্যাহার করার আবেদন জানালে জাতিপুঞ্জ দু-দিনের মধ্যেই বাহিনী প্রত্যাহার করে নেয়। এর ফলে শীঘ্রই সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়।

তৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষের পিছনে যে কারণগুলি বিদ্যমান ছিল সেগুলি হল –

(১) বিবদমান সেনা মোতায়েন

মিশরের অনুরোধে জাতিপুঞ্জ ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে সেখান থেকে তার শান্তিসেনা সরিয়ে নিলে সঙ্গে সঙ্গে ইজরায়েল, সিরিয়া ও জর্ডন তাদের সীমান্তে নিজেদের সেনা মোতায়েন করে। ফলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

(২) মিশরের গাজা ভূখণ্ড দখল

মিশর ২০ মে গাজা অঞ্চলে নিজের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

(৩) আরব লিগের ঘোষণা

আরব লিগের সদস্যগুলি একটি যৌথ ঘোষণা মারফত জানায় যে, তাদের সংস্থার যে- কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর কোনো আক্রমণ সমবেতভাবে সকলের ওপর আক্রমণ বলে তারা মনে করবে।

(৪) মিশরের সেনা-প্রস্তুতি

মিশর ২০ মে তার সেনাবাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেয়।

(৫) জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা

মিশর ২২ মে টিরান প্রণালী দিয়ে ইজরায়েলের জাহাজ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

(৬) আকাবা অবরোধ

এরপর শীঘ্রই মিশর আকাবা উপসাগর অবরোধ করে। ফলে ইজরায়েলের এইলাট বন্দরটি বন্ধ হয়ে গিয়ে ইজরায়েলের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব কারণে আরব দুনিয়ায় খুবই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং আমেরিকা ও রাশিয়া এই অঞ্চলে তাদের নৌবহর পাঠায়।

তৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ

এই পরিস্থিতিতে শুরু তৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ। এই যুদ্ধের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) ইজরায়েলের আক্রমণ

ইজরায়েলের বিমানবাহিনী ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ৫ জুন একই সঙ্গে গাজা, সিনাই, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের ওপর আক্রমণ চালায়। আকস্মিক আক্রমণে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের বিমানবাহিনীর অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে যায়। আরব বাহিনী বিভিন্ন রণাঙ্গণে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়।

(২) ইজরায়েলের জাহাজ চলাচলের সকল বাধা দূরীভূত

পরবর্তী পাঁচদিনে ইজরায়েল জর্ডন নদী থেকে সুয়েজ খাল পর্যন্ত এলাকা, জেরুজালেমের আরব-অধিকৃত অঞ্চল, আকাবা উপসাগরের নিকটবর্তী শারম এল শরক দখল করে এবং টিরান প্রণালী দিয়ে ইজরায়েলের জাহাজ চলাচলের সকল বাধা দূর করে।

(৩) যুদ্ধবিরতি

৮ জুন জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গৃহীত হলে ইজরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলি এই প্রস্তাব মানতে বাধ্য হয়। তবে ইজরায়েল যেমন তার অধিকৃত এলাকা ছাড়তে রাজি ছিল না তেমনি যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আরবরা কোনো আলোচনায় বসতে রাজি ছিল না।

তৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের গুরুত্ব

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলি হল –

(১) ইজরায়েলের সাফল্য

এই যুদ্ধে আরব দেশগুলির বিরুদ্ধে ইজরায়েলের সাফল্য ছিল ব্যাপক ও চমকপ্রদ। তারা মাত্র ৬ দিনের যুদ্ধে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্রের অন্তর্ভুক্ত বহু স্থান দখল করে এবং জাতিপুঞ্জের নির্দেশ অমান্য করে সেগুলি ফেরত দিতেও অস্বীকার করে।

(২) মধ্যবর্তী অঞ্চল

ইজরায়েল কর্তৃক নববিজিত এই অঞ্চলগুলি ভবিষ্যৎ যুদ্ধকালে দু-পক্ষের মধ্যে ‘মধ্যবর্তী অঞ্চল’ হিসেবে কাজ করে। এই অঞ্চলে বসবাসকারী আরবজাতির প্রায় ১০ লক্ষ মানুষের অধিকাংশই ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে গাজা উপত্যকায় শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা ছিল। তারা এই অঞ্চলে বসবাস শুরু করলে বহু সমস্যার সৃষ্টি হয়।

(৩) রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীলতা

এই যুদ্ধ ছিল আরব দেশগুলির কাছে, বিশেষ করে মিশরের রাষ্ট্রপতি নাসেরের কাছে বিরাট পরাজয়। এই যুদ্ধের পর থেকে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে আরব রাষ্ট্রগুলি সোভিয়েত রাশিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। রাশিয়া তাদের অন্যতম মিত্রে পরিণত হয় এবং তাদের বিভিন্ন সামরিক সহায়তা দিতে থাকে।

নতুন সংঘর্ষের পটভূমি

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের অবসান ঘটায় নি, বরং নতুন সংঘর্ষ ও যুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল। এই যুদ্ধের পর থেকে উভয় পক্ষই নতুন করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

উপসংহার :- ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে আবার যুদ্ধ শুরু হয় যা ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের যুদ্ধের চেয়ে অনেক দীর্ঘস্থায়ী ছিল। এই যুদ্ধে আমেরিকা ইজরায়েলকে এবং রাশিয়া আরব দেশগুলিকে সহায়তা করে।

(FAQ) তৃতীয় আরব ইজরায়েল যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তৃতীয় আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু হয় কখন?

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে।

২. জাতিপুঞ্জ মিশর থেকে শান্তি সেনা প্রত্যাহার করে কখন?

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে।

৩. মিশর গাজা অঞ্চল দখল করে কখন?

২০ মে ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে।

৪. যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গৃহীত হয় কোথায়?

সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে।

Leave a Comment