প্রথম আরব ইজরায়েল যুদ্ধ

প্রথম আরব ইজরায়েল যুদ্ধ প্রসঙ্গে যুদ্ধের পটভূমি হিসেবে জাতীয়তাবাদ, ব্রিটিশের পরস্পর বিরোধিতা, পিল কমিশনের ব্যর্থতা, আরব লীগ গঠন, সংঘর্ষ, আরবদের পরাজয় ও যুদ্ধের গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

প্রথম আরব ইজরায়েল যুদ্ধ

ঐতিহাসিক যুদ্ধপ্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ
সময়কাল১৯৪৮ খ্রি
বিবাদমান পক্ষইজরায়েল বনাম আরব রাষ্ট্র
হস্তক্ষেপসম্মিলিত জাতিপুঞ্জ
সমাপ্তি১৯৪৯ খ্রি
বিজয়ীইজরায়েল
প্রথম আরব ইজরায়েল যুদ্ধ

ভূমিকা :- ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মে ইজরায়েল রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে পাঁচটি আরব রাষ্ট্র (মিশর, জর্ডন, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাক) ইজরায়েলের ওপর আক্রমণ হানলে সূচনা ঘটে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের।

প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের পটভূমি

বিভিন্ন কারণে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের সূচনা হয়। যেমন –

(ক) উগ্র জাতীয়তাবাদ

আরব জাতীয়তাবাদীরা চেয়েছিল প্যালেস্টাইনের আরব (ফিলিস্তিনীয়)-দের জন্য স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তুলতে, অপরদিকে জিওনবাদীরা চেয়েছিল প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। ফলে আরব ও ইহুদি উভয় শক্তির মধ্যে এক সংঘর্ষের পরিস্থিতি তৈরি হয়।

(খ) ব্রিটিশের পরস্পরবিরোধিতা

এক্ষেত্রে প্রধান দুটি দিক হল –

(১) আরবদের সমর্থন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকে তুরস্কের বিরুদ্ধে আরবদের সমর্থন লাভের লক্ষ্যে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হেনরি ম্যাকমোহন মক্কার শরিফ হুসেনের কাছে আরবদের স্বাধীনতাদানের প্রতিশ্রুতি দেন। এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে আরবরা আশা করেছিল প্যালেস্টাইন স্বাধীন অঞ্চলভুক্ত থাকবে।

(২) ইহুদিদের সমর্থন

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষার্ধে অক্ষশক্তির বিরুদ্ধে ইহুদিদের সমর্থনলাভের আশায় ব্রিটিশ বিদেশ-সচিব আর্থার ব্যালফুর বলেন, “প্যালেস্টাইনে ইহুদিদের জাতীয় বাসভূমি গঠনে ইংরেজ সরকারের সম্পূর্ণ সহানুভূতি রয়েছে এবং এই উদ্দেশ্যপূরণের জন্য ইংরেজ সরকার যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।

(গ) পিল কমিশনের ব্যর্থতা

পিল কমিশন তার রিপোর্টে প্যালেস্টাইনকে তিনটি ভাগে ভাগ করার কথা বলে। ইহুদিদের জন্য গঠিত হবে স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র। জেরুজালেম, বেথেলহেম ইত্যাদি পবিত্র স্থানগুলি ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের অধীনে থাকবে। প্যালেস্টাইনের অন্যান্য স্থানগুলি ট্রান্স-জর্ডনের সঙ্গে যুক্ত করে এক নতুন আরব রাষ্ট্র গঠন করা হবে।

(ঘ) আরব লিগ গঠন

আরব লিগ প্যালেস্টাইনের ওপর ব্রিটিশ ম্যান্ডেট উচ্ছেদের দাবি জানায়। এতে ব্রিটেন প্যালেস্টাইন সমস্যা জাতিপুঞ্জের হাতে ছেড়ে দেয়। জাতিপুঞ্জের সাধারণ সভা এক কমিটি গঠন করে। এই কমিটির বেশিরভাগ সদস্য প্যালেস্টাইনকে আরব ইহুদিদের মধ্যে ভাগ করার পক্ষে মত দিলে আরব-ইহুদি বিবাদ আরও জটিল হয়ে ওঠে।

প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ

১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের সংঘটিত প্রথম আরও ইজরায়েল যুদ্ধের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) ইজরায়েল আক্রমণ

স্বাধীন ইজরায়েল রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে মিশর, জর্ডন, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাক – এই পাঁচটি আরব রাষ্ট্র ইজরায়েল আক্রমণ করে।

(২) আরবদের পরাজয়

আরবদের জনসংখ্যা ও সেনাবাহিনীর শক্তি বেশি থাকা সত্ত্বেও তারা ইজরায়েলের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধে জয়ী ইজরায়েল জাতিপুঞ্জ-নির্ধারিত সীমানা অপেক্ষা অনেক বেশি ভূখণ্ড নিজেদের অধিকারে নিয়ে নেয়। এভাবে প্যালেস্টাইনের প্রায় ৩/৪ অংশ অঞ্চল এবং লোহিত সাগরে অবস্থিত মিশরের এইলাট বন্দরটি ইজরায়েলের দখলে চলে যায়। আরবদের অধিকারে থাকে মধ্য ও পূর্বাংশ এবং গাজা ভূখণ্ড।

যুদ্ধবিরতি ও শান্তি স্থাপন

এই যুদ্ধের ফলে কয়েক লক্ষ নিরীহ আরব গৃহহারা ও রাষ্ট্রহারা হয়। তারা মিশর, জর্ডন, সিরিয়া ও লেবাননের শরণার্থী শিবিরগুলিতে চরম দুর্দশার মধ্যে জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে সাময়িক শান্তি স্থাপিত হয়।

প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের ফলাফল

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে ইজরায়েল জয়লাভ করে। ইজরায়েলের এই সাফল্য ছিল চমকপ্রদ। এই যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। যেমন –

(১) ইজরায়েলের কর্তৃত্ব বৃদ্ধি

আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে জয়ের ফলে ইজরায়েল প্যালেস্টাইনের তিন-চতুর্থাংশ অঞ্চল দখল করে এবং লোহিত সাগরে অবস্থিত মিশরের এইলাট বন্দরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। জাতিপুঞ্জের হস্তক্ষেপে জেরুজালেমকে দু-ভাগে বিভক্ত করে একটি ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণাধীন এবং অপরটি জর্ডনের অধীনস্থ করা হয় ।

(২) ফিলিস্তিনিরা দেশচ্যুত

এই যুদ্ধের ফলে প্রায় ২০ লক্ষ নিরীহ ফিলিস্তিনি গৃহহারা ও দেশছাড়া হয়। তারা জর্ডন, লেবানন, মিশর ও সিরিয়ার শরণার্থী শিবিরে চরম দুর্দশার মধ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয় ৷

(৩) আরবে উদবাস্তু সমস্যা

আরব দুনিয়ার বিভিন্ন রাষ্ট্রে এই ব্যাপক উদ্বাস্তু আগমন তাদের মধ্যে ইজরায়েলের প্রতি বিদ্বেষ আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়।

(৪) আরব রাজনীতিতে পরিবর্তন

যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে আরব রাষ্ট্রগুলির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তনের সূচনা হয়। মিশরে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ সঞ্চারিত হতে থাকে, ফলাফলস্বরূপ সিরিয়াতে সরকার-বিরোধী অভ্যুত্থান শুরু হয় ৷

(৫) ইজরায়েলকে বৃহৎ শক্তিবর্গের সমর্থন

আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইজরায়েলকে সমর্থন করে এবং তার নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দেয়।

প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে আরবদের ব্যর্থতার কারণ

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে আরবদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ গুলি হল নিম্নরূপ। –

(১) আরবদের পুরোনো অস্ত্রশস্ত্র

যুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রশস্ত্রের আধুনিকতার বিচারে আরবরা ইজরায়েলের তুলনায় অনেক পিছিয়ে ছিল।

(২) আরব রাষ্ট্র গুলির অনৈক্য

আরব রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ঐক্যের প্রবল অভাব ছিল। অন্যদিকে বিশ্বের বিভিন্ন ইহুদি সংস্থার কাছ থেকে ইজরায়েল পূর্ণ সমর্থন ও সাহায্য পেয়েছিল।

উপসংহার :- জনসংখ্যা ও সামরিক শক্তির দিক থেকে আরবরা অনেক এগিয়ে থাকলেও ইজরায়েল শেষপর্যন্ত যুদ্ধে আরব রাষ্ট্রজোটকে পরাজিত করে জয়ী হয়। সুযোগ বুঝে বিজয়ী ইজরায়েল জাতিপুঞ্জ-নির্ধারিত সীমানার বাইরে অনেক বেশি এলাকা দখল করে নেয়। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে জাতিপুঞ্জের উদ্যোগে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তবে এই শান্তি ছিল নিতান্ত সাময়িক।

(FAQ) প্রথম আরব ইজরায়েল যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্রথম আরব ইজরায়েল যুদ্ধ শুরু হয় কখন?

১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে।

২. প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আরব রাষ্ট্রগুলি নাম লেখ।

মিশর, জর্ডন, সিরিয়া, লেবানন ও ইরাক।

৩. প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধে জয়লাভ করে কি?

ইজরায়েল।

৪. প্রথম আরব-ইজরায়েল যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে কখন?

১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Comment