স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ

স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ প্রসঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা, অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা, বাঙালি জাতিসত্তা, বাঙালির ক্ষোভ, ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ভূমিকা, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, ভারতের অবদান, পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ, ও স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাব সম্পর্কে জানবো।

স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ

ঐতিহাসিক ঘটনাস্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ
মুসলিম জাতির পিতামহম্মদ আলি জিন্না
আওয়ামী লিগশেখ মুজিবর রহমান
ভাষা আন্দোলন২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ খ্রি
স্বাধীন বাংলাদেশ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রি
প্রথম রাষ্ট্রপতিশেখ মুজিবর রহমান
স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ

ভূমিকা :- ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। ভারত বিভাগের সূত্রে বঙ্গপ্রদেশও দ্বিখণ্ডিত হয়ে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্তর্ভুক্ত এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

মুসলিম জাতির পিতা জিন্না

পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় সেদিন মহম্মদ আলি জিন্নাকে মুসলিম জাতির একমাত্র রক্ষাকর্তা মনে করে তাদের মন-প্রাণ তাঁর জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। তাঁরা জিন্নাকে তাদের ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকার করে সেদিন আনন্দে উল্লসিত হয়ে স্লোগান তুলেছিলেন, “এক জাতি মুসলমান, এক রাষ্ট্র পাকিস্তান, এক নেতা কয়েদ এ আজম (জিন্না)।”

পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী মুক্তিযুদ্ধের সূচনা

পূর্ববঙ্গের মুসলিমরা সেদিন স্বপ্নে বিভোর ছিলেন যে, পাকিস্তানের সৃষ্টি হলে মুসলিমরা হিন্দুদের অধীনতা থেকে মুক্তি পাবে, মুসলিমদের সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, নিরাপদ হবে, দারিদ্র্যের অবসান হবে, চালের দাম কমবে ইত্যাদি। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী ৩/৪ বছরের মধ্যেই পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বিভিন্ন কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী মুক্তিযুদ্ধ।

স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের ফলে পূর্ববঙ্গ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট হিসেবে বিভিন্ন ঘটনা কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছিল। এগুলি হল –

(ক) অর্থনৈতিক শোষণ

  • (১) দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গের মুসলিম জনগণ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ শুরু করে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই পূর্ববঙ্গের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়।
  • (২) মোট জাতীয় আয়ের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ থাকত। সরকার পূর্ববঙ্গকে শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদক অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলে। পূর্ববঙ্গে শিল্পায়ন না ঘটিয়ে সরকার এখানকার কৃষিপণ্য ও প্রাকৃতিক সম্পদের সহায়তায় পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্পের প্রসার ঘটায়। সরকার এইভাবে পূর্ববঙ্গকে পিছিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত করে।

(খ) রাজনৈতিক বঞ্চনা

  • (১) পূর্ববঙ্গের বাঙালি জাতি পশ্চিম পাকিস্তানের তীব্র রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার হয়। দেশের যাবতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু পশ্চিম পাকিস্তানে সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের জনসংখ্যা অনেক বেশি হলেও দেশের যাবতীয় রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে।
  • (২) পূর্ব পাকিস্তানের কোনো নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেও কোনো-না-কোনো অজুহাতে তাঁদের পদচ্যুত করা হত। খাজা নাজিমুদ্দিন, মহম্মদ আলি বগুড়া, হোসেন শইদ সুরাবর্দি প্রমুখকে এভাবেই পদচ্যুত হতে হয়।

(গ) বাঙালি জাতিসত্তা

  • (১) মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পূর্ববঙ্গ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও পূর্ববঙ্গের বাঙালি জাতিসত্তা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের অ-বাংলাভাষী মুসলিমদের সংস্কৃতির সঙ্গে পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মুসলিম সংস্কৃতি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
  • (২) ঐতিহাসিক রফিউদ্দিন আহমেদ বলেছেন যে, “পূর্ববঙ্গে ধর্মীয় দিক থেকে ইসলামীয় সত্তা বিরাজ করলেও জাতিগত দিক থেকে এখানে বাঙালি জাতিসত্তা অধিক গুরুত্ব পেত। এর ফলে পাকিস্তান সৃষ্টির কিছুদিন পরই পূর্ববঙ্গের বাঙালি জাতিসত্তা আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি জানায়।”

(ঘ) রাষ্ট্রভাষা উর্দু

  • (১) স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, তা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, পূর্ব পাকিস্তানের ৯৮.১৬ শতাংশ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলত। আর পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের সমগ্র জনসংখ্যার ৫৬.৪০ শতাংশ মানুষ বাংলায় কথা বলত।
  • (২) ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি রিপোর্টে দেখা যায় যে, সমগ্র পাকিস্তানের মাত্র ৭.২ শতাংশ মানুষ এবং পূর্ব পাকিস্তানের ১ শতাংশেরও কম সংখ্যক মানুষ উর্দুভাষী ছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাক সরকার উর্দুকে পূর্ববঙ্গ সহ সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষীদের ওপর জোর করে এই ভাষা চাপিয়ে দেয়।
  • (৩) পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনও মনে করতেন যে, সংস্কৃত ভাষা থেকে সৃষ্ট বাংলা হল হিন্দুদের ভাষা। তাই বাংলা কখনও মুসলিমদের ভাষা হওয়া উচিত নয়। জিন্নাও ঘোষণা করেন যে, “যারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষার বিরোধিতা করে তারা পাকিস্তানের শত্রু।”

(ঙ) বাঙালির ক্ষোভ

  • (১) পাক সরকার পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মানুষের ওপর অনৈতিকভাবে উর্দুভাষা চাপিয়ে দিয়ে বাংলা ভাষাকে ধ্বংস করার কু-চক্রান্তে নেমে পড়ে। পূর্ববঙ্গের মুষ্টিমেয় উর্দুভাষী অবাঙালিও বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। পশ্চিমবঙ্গের জনৈক মন্ত্রী তখন বাংলা ভাষার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করলে পূর্ববঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় প্রকাশ্যে এই মন্ত্রীর ফাঁসি দাবি করে।
  • (২) এভাবে পাকিস্তান সরকার বাংলা ভাষাকে পদানত করতে উদ্যত হলে পূর্ববঙ্গের বাংলাভাষী মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলা ভাষাকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তারা পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পথে পা বাড়ায়।

(চ) ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন

ভাষা আন্দোলনের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(১) নাজিমুদ্দিনের উদ্যোগ

নাজিমুদ্দিন ইতিমধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হয়ে পূর্ববঙ্গে উর্দুভাষার প্রসারে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তিনি ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় এসে জানান যে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু এবং সরকারি তত্ত্বাবধানে পরীক্ষামূলকভাবে ২১টি কেন্দ্রে আরবি অক্ষরে বাংলা ভাষায় শিক্ষা দান করা শুরু হয়েছে যা সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলেছে। নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার প্রতিবাদে পূর্ববঙ্গে ক্ষুব্ধ বাঙালিদের আন্দোলন তীব্রতর হয়ে ওঠে।

(২) পুলিশের গুলি

আন্দোলনকারী ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি মিছিল নিয়ে এগিয়ে চলে। ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ বেধে গেলে পুলিশ নিরস্ত্র মিছিলে গুলি চালায়। সঙ্গে সঙ্গে মহম্মদ সালাউদ্দিন, আব্দুল জব্বার, আবুল বরকত ও রফিকুদ্দিন আহমেদের দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তাদের মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ বাঙালি জাতি যে পাক-বিরোধী সংগ্রাম শুরু করে তা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়।

(জ) সংস্কৃতির প্রসার

  • (১) ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনাকে কেন্দ্র করে বহু গান, কবিতা ও সাহিত্য রচিত হয়। এগুলি বাংলার প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে পড়লে গ্রামবাংলার মানুষ শিহরিত হয় এবং বর্বর পাক সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা বর্ষণ করে। ২১ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপটে আব্দুল গাফফার চৌধুরি রচিত “আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো ২১ শে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি?” গানটি পূর্ববঙ্গের বাঙালির জনমানসে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
  • (২) বাংলার জনৈক কবি এই ঘটনা প্রসঙ্গে লেখেন, “আমি চিৎকার করে উঠলাম, ‘পলাশ। পলাশ। ব্যর্থ হল তোমার রং। এর চেয়েও আমার ভাইয়ের রক্ত লাল। বুকের রক্তে যারা পথ রাঙিয়ে দিল।” ২১ ফেব্রুয়ারিতে পাক সরকারের নারকীয় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে লেখা কবির ভাষা পরবর্তী দিনগুলিতে পাক সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাঙালি জাতিকে উদ্বুদ্ধ করল –

“আজকের দিন প্রমাণ দিয়েছে আমরা লড়তে পারি

আজকে মোদের শপথের দিন ২১ শে ফেব্রুয়ারি।”

(ঝ) আওয়ামি লিগের ভূমিকা

  • (১) ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ আওয়ামি লিগ কয়েকটি ক্ষুদ্র দলের সঙ্গে মিলিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। যুক্তফ্রন্ট পূর্ববঙ্গের সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করলেও পাক সরকার তাদের ক্ষমতাচ্যুত করে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
  • (২) আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আওয়ামি লিগের নেতা শেখ মুজিবর রহমান আন্দোলন শুরু করলে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে মুজিব-সহ লিগের প্রধান কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করে তাদের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়। কিন্তু ব্যাপক গণ-আন্দোলনের চাপে সরকার ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে মুজিবকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

(ঞ) সাধারণ নির্বাচন

  • (১) পূর্ব ও পশ্চিম উভয় পাকিস্তানে গণ-অসন্তোষের ফলে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে শেখ মুজিবের নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানের ১৪০টি আসনের মধ্যে জুলফিকার আলি ভুট্টোর পিপলস পার্টি ৮১টি আসন পায়।
  • (২) এভাবে জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে নতুন সংবিধান রচনার সম্ভাবনা দেখা দেয়। নতুন সংবিধান রচিত হলে পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে ১ মার্চ, ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে পাক রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে পূর্ব পাকিস্তান অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে।

(ট) ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ

  • (১) ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মার্চে পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে পূর্ববাংলার সর্বত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামি লিগের নেতা শেখ মুজিবর রহমান ৭ মার্চ ঘোষণা করেন, “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” ২৫ মার্চ পাক সেনাবাহিনী পূর্ববাংলায় ব্যাপক গণহত্যা শুরু করে।
  • (২) শেখ মুজিব তাঁর আগুন-ঝরা বক্তৃতায় বাঙালি জাতিকে নির্দেশ দেন, “ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ো। এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই।” ২৬ মার্চ মুজিবর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ২৬ মার্চে মুজিবরের স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়েই স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটে বলে ধরা হয়।
  • (৩) মুজিবরের জ্বালাময়ী বক্তৃতা, স্বাধীনতার ঘোষণা এবং পাক সরকারের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্যের খবর আকাশবাণী কলকাতা ধারাবাহিকভাবে প্রচার করলে তা পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেরও প্রতিটি বাঙালির মনে অভূতপূর্ব উন্মাদনার সৃষ্টি করে। ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিবাহিনী প্রচণ্ড আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে বর্বর পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যায়।

(ঠ) গণহত্যা

  • (১) স্বাধীন বাংলাদেশের দাবিতে পূর্ববঙ্গের মানুষ শেখ মুজিবরের নেতৃত্বে তীব্র আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়লে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও পূর্ববঙ্গের মানুষের ওপর নৃশংসভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাক বাহিনীর সহায়তায় এগিয়ে আসে পূর্ববঙ্গের মৌলবাদী আল-বদর, আল-সামস প্রভৃতি রাজাকার বাহিনী।
  • (২) বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সেখানকার কিছু কিছু মৌলবাদী মুসলিম নেতা মুজিবর রহমানের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করে এবং পশ্চিম পাকিস্তানকে সমর্থন করে। এই মৌলবাদী নেতারা রাজাকার বাহিনী নামে পরিচিত। শান্তিপূর্ণ জমায়েতে, গ্রাম বা শহরের লোকালয়ে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হঠাৎ সশস্ত্র পাক বাহিনী উপস্থিত হয়ে দীর্ঘ ২৬৭ দিন ধরে নির্বিচারে হত্যালীলা চালায়।
  • (৩) ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের গণহত্যার সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বে এটিই সবচেয়ে বড়ো গণহত্যা বলে মনে করা হয়। শুধু খুলনায় দেড় লক্ষ, ঢাকায় ১ লক্ষ, চট্টগ্রামে ১ লক্ষ, কুমিল্লায় ৯৫ হাজার, যশোহরে ৭৫ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল বলে জানা যায়। গণহত্যায় মোট নিহতের সংখ্যা ১০ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ ছিল বলে অনেকে মনে করেন। অন্তত ৪ লক্ষ বাঙালি নারী ধর্ষিতা হন।

(ড) প্রবাসী সরকার প্রতিষ্ঠা

পাক সরকার শীঘ্রই মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতা শেখ মুজিবরকে গ্রেপ্তার করে। ফলে পূর্ববঙ্গের জাতীয়তাবাদী নেতারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা করে (১০ এপ্রিল)। শেখ মুজিবর রহমান রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দিন আহমেদ এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। মুজিবর রহমান বন্দি থাকায় সৈয়দ নজরুল ইসলামকেই কার্যনির্বাহী ও অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করা হয়। এই সরকার ভারতের মাটি থেকে তাদের কাজকর্ম পরিচালনা করতে থাকে।

(ঢ) ভারতের ভূমিকা

  • (১) মুক্তিসংগ্রামের সময় বর্বর পাক বাহিনী পূর্ববঙ্গে ব্যাপকহারে গণহত্যা চালালে পাক হামলা থেকে বাঁচতে প্রায় এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেয়। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। ভারত অস্ত্র ও সৈন্য দিয়ে পূর্ববঙ্গের মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে।
  • (২) ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধি ত্রাতার ভূমিকা নিয়ে পূর্ববঙ্গের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ান। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় পূর্ববঙ্গের মুক্তিযোদ্ধারা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে পাক বাহিনীকে পূর্ববঙ্গে কোণঠাসা করে ফেলে।
  • (৩) কিন্তু আমেরিকা এবং চিন পাক সরকারকে সমর্থন ও সহায়তা করার ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। তবে ভারত ও বাংলাদেশকে সমর্থন করে সোভিয়েত ইউনিয়ন। অবশেষে ভারত ৩ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে প্রায় ১০ হাজার পাক সেনাকে বন্দি করে।

(ণ) পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণ

  • (১) ভারতীয় সেনাবাহিনী ও পূর্ববঙ্গের মুক্তিবাহিনীর সাঁড়াশি আক্রমণে পাক সৈন্যবাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ভারতীয় বাহিনী আকাশ থেকে ঢাকায় পাক সেনাদের উদ্দেশ্যে বিপুল পরিমাণে প্রচারপত্র বিতরণ করে। এই প্রচারপত্রে ভারতীয়রা জানায় যে, সময় থাকতে পাক বাহিনী শান্তিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করুক।
  • (২) শেষপর্যন্ত পাক বাহিনীর সেনাপ্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজি ৯৩০০০ সৈন্যসহ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্র

পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের ফলে দীর্ঘ ৯ মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসান হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হয়। আত্মপ্রকাশ ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের।

মাতৃভাষা আন্দোলনেরই চূড়ান্ত পরিণতি

বাংলা ভাষাকে রক্ষার জন্য পূর্ববঙ্গে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ক্রমে ভাষা আন্দোলনের সীমানা ছাড়িয়ে পূর্ববাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ববাংলার স্বাধীনতা লাভ ছিল প্রকৃতপক্ষে ২১ ফেব্রুয়ারির মাতৃভাষা আন্দোলনেরই চূড়ান্ত পরিণতি। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিযুক্ত হন।

উপসংহার :- স্বাধীন বাংলাদেশে শীঘ্রই অসংখ্য দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, সাহিত্য, নাটক প্রভৃতি রচিত হয়। “এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না” – এই ধরনের অসংখ্য সংগীতে বাংলা মুখরিত হয়ে ওঠে। এপার বাংলার শিল্পী ভূপেন হাজারিকার কণ্ঠে ‘গঙ্গা আমার মা, পদ্মা আমার মা গানটি উভয় বাংলাকেই দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে। এক কথায়, বাংলাদেশের জন্ম দুই বাংলার বাঙালি জাতিকেই এক নতুন সংস্কৃতি দান করে।

(FAQ) স্বাধীন বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পূর্ব বঙ্গের মুসলিম সম্প্রদায় জাতির পিতা কাকে বলত?

মহম্মদ আলি জিন্না।

২. পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি ছিল?

উর্দু।

৩. ভাষা আন্দোলন কখন সংঘটিত হয়?

১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি।

৪. বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের প্রধান নেতা কে ছিলেন?

শেখ মুজিবর রহমান।

৫. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নায়ক কে ছিলেন?

শেখ মুজিবর রহমান।

৬. বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে কখন?

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে।

৭. স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?

শেখ মুজিবর রহমান।

Leave a Comment