দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ

চীনে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ প্রসঙ্গে ক্যান্টন বন্দর সমস্যা, ক্যান্টনে ব্রিটিশ সশস্ত্র অভিযান, বিদেশী শক্তিগুলির চুক্তি সংশোধনের দাবি, দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পথ প্রশস্ত, অ্যারো সংক্রান্ত ঘটনা, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের প্রস্তুতি, দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে ইংরেজ ও ফরাসি বাহিনীর যৌথ অভিযান, আমেরিকা ও রাশিয়ার ভূমিকা, দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ শেষে তিয়েনসিনের সন্ধি-চুক্তি ও শর্ত, ইংরেজ ও ফরাসিদের পিকিং দখল, দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ পরবর্তীতে পিকিং কনভেনশন ও তার শর্ত, দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর চিনে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি, আইগুন সন্ধি ও দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের ফলে কৃষক বিদ্রোহের পথ প্রশস্ত সম্পর্কে জানবো।

চীনে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ

ঐতিহাসিক যুদ্ধদ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ
বিবাদমান পক্ষচীন বনাম ইংল্যান্ডফ্রান্স
সময়কাল১৮৫৬-৬০ খ্রি
স্থানচীন
পিকিং কনভেনশন১৮৬০ খ্রি
চীনে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ

ভূমিকা :- নানকিং-এর চুক্তি বা তার পরবর্তী চুক্তিগুলি চীন ও বিদেশিদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারে নি। বিদেশিদের লালসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ইতিমধ্যে ক্যান্টন শহরকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ এবং চীনাদের মধ্যে নতুন উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

ক্যান্টন বন্দর সমস্যা

  • (১) নানকিং চুক্তি অনুযায়ী ক্যান্টন বন্দর বিদেশিদের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল, তবুও ক্যান্টনের স্থানীয় অধিবাসীরা বিদেশিদের শহরের অভ্যন্তরে ঢুকতে দিতে রাজি ছিলেন না। অন্যদিকে ব্রিটিশ বণিকেরা ক্যান্টনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছিল। তারা এই বিষয়ে ক্রমাগত ক্যান্টনের তৎকালীন গভর্নর চি-ইং-এর ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকে।
  • (২) চি-ইং ব্রিটিশদের ক্যান্টনে অনুপ্রবেশের অনুমতি দেন। কিন্তু ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ক্যান্টনের জনরোষের চাপে তিনি ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে ক্যান্টনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার বিষয়টি কিছুদিনের জন্য পিছোতে বলেন। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিনিধি ডেভিস, যিনি ১৮৪৪ খ্রিস্টাব্দে পটিংগারের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন, চি-ইং-এর অনুরোধ মেনে নেন।
  • (৩) ক্যান্টনবাসীরা এটিকে তাঁদের বিজয় বলে মনে করেছিলেন এবং তাঁদের সাহস বেড়ে গিয়েছিল। স্থানীয় অধিবাসীরা মাঝেমধ্যেই ব্রিটিশ ভ্রমণকারীদের ক্যান্টনে অপমান করতেন এবং ঘৃণায় ইট-পাটকেল ও পাথর ছুঁড়তেন।

ক্যান্টনে ব্রিটিশদের সশস্ত্র অভিযান

  • (১) ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ডেভিসের নেতৃত্বে ব্রিটিশরা প্রতিশোধ গ্রহণের উদ্দেশ্যে ক্যান্টনে একটি সশস্ত্র অভিযান চালায়। ক্যান্টনের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তখন ব্রিটিশদের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। চুক্তিতে বলা হয় যে, ঠিক দুবছর পরে ব্রিটিশদের ক্যান্টন শহরের ভিতরে ঢুকতে দেওয়া হবে।
  • (২) দুবছর পর ব্রিটিশরা আবার ক্যান্টন শহরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার দাবি উত্থাপন করে। কিন্তু তাতে ক্যান্টনের অভ্যন্তরীণ শান্তি বিঘ্নিত হতে পারে, এই যুক্তিতে চিনা কর্তৃপক্ষ ক্যান্টন শহরে ব্রিটিশদের ঢুকতে দিতে রাজি হল না। ফলে ইঙ্গ-চীন সম্পর্ক তিক্ততর হয়।

বিদেশী শক্তিগুলির চুক্তি সংশোধন

  • (১) আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চিনের যে ওয়াংশিয়া সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তাতে অন্যতম শর্ত ছিল যে, ১২ বছর পরে এই চুক্তির পুনর্বিন্যাস করা হবে। হোয়াম্পোয়ার সন্ধি-চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্স চিনের কাছ থেকে একই শর্ত আদায় করে নিয়েছিল।
  • (২) ইংল্যান্ড যেহেতু “সব থেকে অনুগৃহীত দেশ”-এর মর্যাদা লাভ করেছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই ইংল্যান্ডও নানকিং চুক্তি পুনর্বিন্যাসের অধিকারী ছিল। ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন এবং ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে আমেরিকা ও ফ্রান্স চিনা কর্তৃপক্ষের কাছে চুক্তি সংশোধনের দাবি জানায়।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পথ প্রশস্ত

  • (১) প্রকৃতপক্ষে পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ চীনের পাঁচটি বন্দরে বাণিজ্য করার অধিকার পেয়েও সন্তুষ্ট হয় নি। তারা সমগ্র চীনে বাণিজ্য করতে চেয়েছিল। তাদের এই চাহিদার সঙ্গে চুক্তি সংশোধনের দাবি সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
  • (২) ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেন, আমেরিকা ও ফ্রান্স একসাথে চুক্তি সংশোধনের দাবি জানায়। কিন্তু চীনারা কোনোমতেই এই দাবি মেনে নিতে রাজি হয় নি। ফলে বিদেশিদের সাথে চীনের সম্পর্ক তিক্ত হয় এবং উভয়পক্ষের মধ্যে আর একটি যুদ্ধের পথ প্রশস্ত হয়ে ওঠে।

‘অ্যারো’-সংক্রান্ত ঘটনা

  • (১) ‘অ্যারো’ ছিল ইউরোপীয় কাঠামো অথচ চিনা পালবিশিষ্ট একটি দো-আঁশলা জাহাজ। এই জাহাজের মালিক ছিলেন হংকংবাসী এক চিনা। কিন্তু জাহাজটি হংকং-এর একটি ব্রিটিশ কোম্পানির কাছে রেজিস্ট্রিকৃত ছিল। তাই ঘটনাটি যখন ঘটে, তখন জাহাজটিতে ব্রিটিশ পতাকা উড্ডীন ছিল।
  • (২) ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৮ অক্টোবর জনৈক কুখ্যাত জলদস্যুকে গ্রেপ্তার করার উদ্দেশ্যে ৪ জন চিনা অফিসার ও ৬০ জন সৈন্য জাহাজটিতে উঠে পড়েন। ১২ জন চিনা নাবিককে গ্রেপ্তার করা হয়। ধস্তাধস্তিতে ব্রিটিশ পতাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • (৩) ১২ অক্টোবর ক্যান্টনের ব্রিটিশ কনসাল হ্যারি পার্কস তদানীন্তন ব্রিটিশ প্রতিনিধি বাওরিং-এর নির্দেশে ঘটনাটির তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ পতাকা অবমাননার অভিযোগ আনেন।
  • (৪) হ্যারি পার্কস্ ক্যান্টনের তৎকালীন গভর্নর ইয়েহ্ মিং-চেনের কাছে লিখিত ক্ষমা-প্রার্থনা দাবি করেন। কিন্তু ইয়ে এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দেন, ও ক্ষমা চাইতে অস্বীকার করেন। ব্রিটিশ সরকার চীনাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিতে বদ্ধপরিকর হয়।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে ফ্রান্সের অংশ গ্ৰহণের কারণ

ইতিমধ্যে ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারিতে কোয়াংশি প্রদেশে চিনা কর্তৃপক্ষ চ্যাপডে লাইন নামে জনৈক ফরাসি ক্যাথলিক মিশনারিকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। এই ঘটনাকে ফরাসিরা চীনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র অভিযান চালানোর অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল।

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের প্রস্তুতি

ফরাসিরা ক্যাথালিক মিশনারীর মৃত্যুদণ্ড ও ব্রিটিশরা ‘অ্যারো’ সংক্রান্ত ঘটনার মধ্যে চিন-বিরোধী যুদ্ধের অজুহাত খুঁজে পায়। দুটি অত্যন্ত সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইংরেজ এবং ফরাসিরা চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তৈরি হতে থাকে। আসলে যুদ্ধের মূল কারণ ছিল পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের সাম্রাজ্যবাদী লালসা।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে ইংরেজ ও ফরাসি বাহিনীর যৌথ অভিযান

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ইঙ্গ-ফরাসি যৌথ বাহিনী ক্যান্টনের গভর্নর ইয়েহ মিং-চেনকে একটি নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে ক্ষতিপূরণ দানের জন্য চাপ দেয়। কিন্তু ইয়েহ এই চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন নি, তখন লর্ড এলগিনের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বাহিনী এবং ব্যারন গ্রসের নেতৃত্বে ফরাসি বাহিনী যৌথভাবে চিনের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে আমেরিকা ও রাশিয়ার ভূমিকা

এরপর রাশিয়া চিন-বিরোধী ষড়যন্ত্রে যোগ দেয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া যুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণ না করলেও ব্রিটেন ও ফ্রান্সকে মদত দেবার জন্য তারা যথাক্রমে উইলিয়াম রিড ও পুটিরাটিনকে তাদের প্রতিনিধি হিসাবে প্রেরণ করে।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনীর ঝটিকা গতি

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর ইঙ্গ-ফরাসী যৌথ বাহিনী ঝড়ের গতিতে ক্যান্টন শহর দখল করে নেয় এবং ইয়েহকে বন্দী করে। তারপর তারা উত্তরমুখী অভিযান চালিয়ে পিকিং-এর উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হয়। সেখানে তারা যথেচ্ছ লুণ্ঠন ও তাণ্ডবলীলা চালায়। এই ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো বলেছিলেন, “দু’জন দস্যু, ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ড, এশিয়ার একটি গির্জায় অনুপ্রবেশ করেছিল”।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ শেষে তিয়েনসিনের সন্ধি-চুক্তি

ইঙ্গ-ফরাসী আক্রমণের চাপে এবং পিকিং আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় চীনারা একটি সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে তিয়েনসিনের সন্ধি-চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকা ও রাশিয়া চীনের সাথে পৃথক পৃথক চুক্তি স্বাক্ষর করে।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ শেষে তিয়েনসিনের সন্ধির শর্ত

চিন তিয়েনসিনের চুক্তি অনুযায়ী নিম্নলিখিত শর্তগুলি মেনে নিতে বাধ্য হয় –

  • (১) এখন থেকে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রবর্গ কূটনৈতিক সমতার ভিত্তিতে একজন করে মন্ত্রী পিকিং-এ স্থায়ীভাবে রাখতে পারবে।
  • (২) নানকিং, নিউচ্যাং, তেংচাও, হাংকাও, কিউকিয়াং, চিনকিয়াং, তাইওয়ানফু, তামসুই, সোয়াটো এবং কিয়াংচাও – এই আরও দশটি নতুন বন্দর বিদেশিদের কাছে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
  • (৩) বিদেশীরা চীনের সর্বত্র ভ্রমণ করার অধিকার লাভ করে। তবে ভ্রমণকারীদের সঙ্গে নিজেদের কনসালদের দেওয়া এবং চীনা কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর করা পাশপোর্ট বা অনুমতিপত্র রাখতে হবে। উন্মুক্ত কোনো বন্দর থেকে ১০০ লি বা ৩৩ মাইল ভ্রমণের জন্য কোনো পাশপোর্ট লাগবে না।
  • (৪) চীনা কর্তৃপক্ষ আমদানিকৃত বিদেশি পণ্যের উপর অভ্যন্তরীণ শুল্ক বা লিকিন পণ্যমূল্যের ২.৫ শতাংশের বেশি ধার্য করতে পারবে না। ৫. যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ চীন ব্রিটেনকে ৪ মিলিয়ন টেইল এবং ফ্রান্সকে ২ মিলিয়ন টেইল দিতে সম্মত হয়।
  • (৫) ক্যাথলিক এবং প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারিরা চীনের সর্বত্র অবাধ বিচরণের অধিকার অর্জন করে।

তিয়েনসিনের চুক্তির শর্তাবলি কার্যকরী করার চাপ

চিনা কর্তৃপক্ষ কথা দেয় যে, কিছুদিনের মধ্যেই তিয়েনসিন চুক্তির শর্তাবলী কার্যকরী করা হবে। কিন্তু চিনারা কিছুতেই রাজধানী পিকিং-এ একজন করে বিদেশি মন্ত্রীর স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার মেনে নিতে পারে নি। ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ইংরেজ ও ফরাসিরা তিয়েনসিনের সন্ধির শর্তগুলি বলবৎ করার জন্য চিনা কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেয়।

ইংরেজ ও ফরাসিদের পিকিং দখল

  • (১) কিন্তু তাতে কোনো সুফল না পেয়ে ইঙ্গ-ফরাসী যৌথ বাহিনী ভিয়েতসিন থেকে নদীপথে পিকিং-এ প্রবেশ করার চেষ্টা করে। টাকু নামক স্থানে চিনা বাহিনী ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনীর ওপর গোলাবর্ষণ করে। এই ঘটনার প্রতিশোধ নেবার জন্য ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে লর্ড এলগিন ও ব্যারন গ্রস পিকিং আক্রমণ করেন এবং ইঙ্গ-ফরাসী বাহিনী পিকিং দখল করে নেয়।
  • (২) ইংরেজ বাহিনী চিন সম্রাটের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ অগ্নিদগ্ধ করে। চিন সম্রাট আগেই পিকিং ত্যাগ করে মাঞ্চুরিয়ার জেহলে পালিয়ে গিয়েছিলেন। চীন সম্রাটের ছোট ভাই যুবরাজ কুং-ও গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সন্ত্রস্ত হয়ে পিকিং ত্যাগ করতে চাইলেন।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ পরবর্তীতে পিকিং কনভেনশন

  • (১) চীনের ইতিহাসের এই সংকটাপন্ন মুহূর্তে রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করলেন রুশ প্রতিনিধি ধূর্ত কূটনীতিবিদ নিকোলাই ইগনাটিয়েভ। ইগনাটিয়েভ যুবরাজ কুংকে পিকিং পরিত্যাগ না করে মিত্রপক্ষের সাথে নতুন চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পরামর্শ দেন। কুং এই পরামর্শ গ্রহণ করেন।
  • (২) গ্রস ও এলগিন তখন চীনা কর্তৃপক্ষকে দিয়ে তিয়েনসিন চুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন করিয়ে নেন। লর্ড এলগিন তারপর আরও কতকগুলি কঠোর শর্ত চিনাদের ওপর চাপিয়ে দেন। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অক্টোবর যুবরাজ কুং শর্তগুলি মেনে নিয়ে পিকিং কনভেনশন স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন।

পিকিং কনভেনশনের শর্তাবলী

এলগিন কর্তৃক চাপানো শর্তগুলি ছিল নিম্নরূপ –

  • (১) ব্রিটেন ও ফ্রান্স উভয় দেশই ৮ মিলিয়ন টেইল করে ক্ষতিপূরণ পাবে।
  • (২) অবাধ বিদেশি বাণিজ্য এবং বিদেশিদের বসবাসের জন্য তিয়েশুসিন উন্মুক্ত হল।
  • (৩) ব্রিটেন হংকং-এর উল্টোদিকে অবস্থিত কৌলুন উপদ্বীপ লাভ করল।
  • (৪) চীনের অভ্যন্তরে ক্যাথলিক মিশনারিদের ভূসম্পত্তির অধিকারী হবার শর্ত ফ্রান্স আদায় করে।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর চিনে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি

পিকিং কনভেনশন স্বাক্ষরিত হবার পরই রুশ প্রতিনিধি ইগনাটিয়েভের চাপে ইঙ্গ-ফরাসী বাহিনী ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ৮ নভেম্বর পিকিং ত্যাগ করে। ইগনাটিয়েভ বন্ধু এই সময় অপরিসীম কূটনৈতিক ধূর্ততার পরিচয় দিয়েছিলেন। কনভেনশন অফ পিকিং স্বাক্ষরের সময় তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, রাশিয়া চিনের শুভাকাঙ্ক্ষী এইভাবে তিনি চিনা কর্তৃপক্ষের বিশ্বাসভাজন হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল চিনে রাশিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি করে রুশ সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ রক্ষা করা।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর আইগুন সন্ধি

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে চিন ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত আইগুন চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া আমুর নদীর উত্তরে যাবতীয় চিনা জমি লাভ করেছিল। তাছাড়া, উসুরি নদী ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে রাশিয়া ও চীনের যৌথ কর্তৃত্ব স্বীকৃত হয়েছিল।

পিকিং কনভেনশনের সম্পূরক চুক্তি

  • (১) ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে ইঙ্গ-ফরাসি বাহিনী পিকিং ত্যাগ করার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ইগনাটিয়েভ চিনের কাছ থেকে মধ্যস্থতা করার পুরস্কার দাবি করেন। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের ১৪ নভেম্বর রাশিয়া ও চিনের মধ্যে পিকিং কনভেনশনের সম্পূরক একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
  • (২) এই চুক্তির শর্ত অনুসারে উসুরি নদী ও প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্যবর্তী ভূখণ্ডে রুশ-চিন যৌথ কর্তৃত্বের পরিবর্তে কেবলমাত্র রুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। তাছাড়া, উর্গা এবং কাশগড় অঞ্চল রুশ বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত হয়। এই দুই অঞ্চলে রুশ কনসাল ও নাগরিকেরা স্থায়ীভাবে বসবাসের অধিকার লাভ করে।
  • (৩) রাশিয়া কতকগুলি বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করে নেয়। একজন সৈনিকের জীবন বা একটিও গোলা খরচ না করে, কেবলমাত্র ইগনাটিয়েভের কূটবুদ্ধির ওপর নির্ভর করে রাশিয়া চিনে প্রায় তিন থেকে চার লক্ষ বর্গমাইল জমি লাভ করে। তদুপরি রাশিয়াও ‘সর্বাপেক্ষা অনুগৃহীত রাষ্ট্রের সুবিধা আদায় করে নেয়।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের পর দ্বিতীয় চুক্তি ব্যবস্থা

১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চিন বিভিন্ন পাশ্চাত্য রাষ্ট্র -এর সাথে অসম শর্তের ভিত্তিতে কতকগুলি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিল। এই অপমানজনক চুক্তিগুলি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে চীন দ্বিতীয়বার চুক্তি ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছিল।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের ফলে কৃষক বিদ্রোহের পথ প্রশস্ত

মাঞ্চু বংশের মর্যাদাহানি ঘটেছিল। বিদেশি চাপের মুখে মাঞ্চু-সরকারের নির্লজ্জ আত্মসমর্পণ ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাঞ্চু-বিরোধী জঙ্গি কৃষক বিদ্রোহের পথ প্রশস্ত করেছিল।

উপসংহার :- ঐতিহাসিক ইম্যানুয়েল সু বলেছেন, “এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রাচীন সভ্যতার অধিকারী চিনদেশ পশ্চিমের কাছে পুরোপুরি পরাজিত ও অপমানিত হয়েছিল” (Beyond a doubt, by 1860 the ancient civilisation that was China had been thoroughly defeated and humiliated by the West.)।

(FAQ) চীনে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়েছিল?

চিনের সঙ্গে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের।

২. দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সময়কাল কত?

১৮৫৬-৬০ খ্রিস্টাব্দ।

৩. কোন সন্ধি দ্বারা দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের অবসান ঘটে?

পিকিং কনভেনশন।

Leave a Comment