তাইপিং বিদ্রোহ

তাইপিং বিদ্রোহ প্রসঙ্গে বিদ্রোহের সূচনাকাল, তাইপিং বিদ্রোহের সূচনায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত, তাইপিং বিদ্রোহের নেতৃত্ব, তাইপিং বিদ্রোহের পূর্বে ঈশ্বর ভক্তদের সমিতি প্রতিষ্ঠা, তাইপিং বিদ্রোহের সূচনা, তাইপিং বিদ্রোহের উদ্দেশ্য, তাইপিং বিদ্রোহের কারণ, তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি, তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা ও তাইপিং বিদ্রোহের গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

তাইপিং বিদ্রোহ

ঐতিহাসিক ঘটনাতাইপিং বিদ্রোহ
দেশচীন
স্থানকোয়াংসি প্রদেশ
সূচনাকাল১৮৫০ খ্রি
সময়কাল১৮৫০-৬৪ খ্রি
নেতাহুং শিউ চুয়ান
তাইপিং কথার অর্থমহতী শান্তি
তাইপিং বিদ্রোহ

ভূমিকা :- উনিশ শতকের মধ্যভাগে বেশ কতগুলি গণবিদ্রোহ চীনের মাঞ্চু শাসনের ভিত দুর্বল করেছিল। একদিকে পশ্চিমি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলির সাম্রাজ্যবাদী নীতি এবং অন্যদিকে একের পর এক গণবিদ্রোহ চীনের রাজনীতিতে তীব্র সংকটের সৃষ্টি করেছিল। এই বিদ্রোহগুলির মধ্যে তাইপিং বিদ্রোহ (১৮৫০- ১৮৬৪) ছিল উল্লেখযোগ্য।

তাইপিং বিদ্রোহের সূচনাকাল

১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে তাইপিং বিদ্রোহের সূচনা হয়েছিল দক্ষিণ চীনের কোয়াংসি প্রদেশে।

তাইপিং বিদ্রোহের সূচনায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত

  • (১) কিয়াংসি প্রদেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত লেগে থাকত। বিশেষত, হাক্কা এবং বেন্ডি – এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ তীব্র আকার ধারণ করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে কোয়াংসি প্রদেশে বেশ কতকগুলি কৃষক বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল।
  • (২) তাছাড়া কোয়াংসি ছিল ক্যান্টন বন্দরের দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত একটি পশ্চাদপ্রদেশ। পশ্চিমিদের কার্যকলাপের দ্বারা ক্যান্টন অঞ্চল প্রভাবিত হয়েছিল। তাই কোয়াংসি প্রদেশে প্রাচীনপন্থী ও আধুনিক – এই দুই ধরনের প্রভাবের সংমিশ্রণ দেখা গিয়েছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের নেতৃত্ব

  • (১) এই তাইপিং বিদ্রোহের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হুং শিউ চুয়ান ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি কোয়াংটাং প্রদেশের একটি হাক্কা বংশীয় কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়সে তিনি একটি গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। তিনি বেশ কয়েকবার কনফুসীয় উপাধি লাভের সরকারি পরীক্ষায় বসেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই তিনি অকৃতকার্য হন।
  • (২) এই সময়ে একদিকে মাঞ্চু শাসকদের অত্যাচার ও দুর্নীতি চরমে পৌঁছেছিল, অন্যদিকে পাশ্চাত্য রাষ্ট্রবর্গের হাতে চীন চূড়ান্তভাবে লাঞ্ছিত হতে আরম্ভ করেছিল। নিজের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা ও জাতীয় অপমান হুং শিউ চুয়ানকে ব্যথিত করেছিল। এই সময় তিনি অসুস্থ হন এবং দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ থাকার সময় তাঁর ধারণা হয় যে, যীশু এবং তিনি দুজনেই পরম-পিতা ঈশ্বরের সন্তান এবং তিনি যীশুর কনিষ্ঠ ভ্রাতা।
  • (৩) এই সময় থেকে তিনি খ্রিস্টধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি প্রচার করতে থাকেন যে, চিনবাসীকে দুষ্ট গ্রহের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ঈশ্বর তাঁকে দৈব-ক্ষমতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। কিছুদিনের মধ্যে কয়েকজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ অনুগামী হুং-এর সাথে যোগ দেন। এদের মধ্যে ছিলেন হাক্কা বংশজাত স্কুল শিক্ষক ফেং উন-শান, কাঠকয়লা বিক্রেতা ইয়াং-শিউ-চিং এবং কাঠুরে শিয়াও চাও-কুই।
  • (৪) শেষোক্ত দুজন আগে ইয়াংসি অঞ্চলে কুলির কাজ করতেন। কিন্তু পশ্চিমি দেশগুলির হস্তক্ষেপের ফলে ক্যান্টন-ইয়াংসি বাণিজ্যে মন্দা দেখা দেয় এবং দুই ব্যক্তিই কর্মচ্যুত হন। হুং-এর চতুর্থ অনুগামী হাক্কা বংশজাত শি-ডা-কাই সরকারি পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ হন। পঞ্চম অনুগামী ওয়েই চ্যাং-হুই ছিলেন এক ধনী জমিদার। কিন্তু তিনি তাঁর মানবহিতৈষী কাজের জন্য হাক্কা কৃষকদের মধ্যে যথেষ্ট জনপ্রিয়তা লাভ করেন।
  • (৫) এই ছয় ব্যক্তি (হুং সহ) তাইপিং বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। এঁদের প্রায় সকলেই দরিদ্রশ্রেণী থেকে এসেছিলেন। কেবলমাত্র ওয়েই চ্যাং-হুই ছিলেন ব্যতিক্রম। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের ঐতিহাসিকরা বলেছেন, তাইপিং বিদ্রোহের ক্ষেত্রে এক ‘প্রাক্-সর্বহারা’ নেতৃত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের পূর্বে ঈশ্বর ভক্তদের সমিতি প্রতিষ্ঠা

  • (১) ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ হুং শিউ চুয়ান “ঈশ্বর ভক্তদের সমিতি” নামে একটি সংগঠন তৈরি করেন। কোয়াংসির যাবতীয় হতাশ ও দরিদ্র লোকেরা, যথা – খনি শ্রমিক, কাঠকয়লা বিক্রেতা, ভূমিহীন চাষি, সুযোগ বিহীন হাক্কা, বেকার সৈনিক প্রভৃতিরা এই সমিতিতে যোগদান করেছিলেন।
  • (২) হুং-এর নির্দেশ অনুযায়ী সমিতির সদস্যরা তাদের ব্যক্তিগত সমস্ত জিনিস বিক্রি করে সমিতির তহবিলে জমা দিতে থাকেন। ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে সমিতির সদস্যসংখ্যা ১০,০০০ অতিক্রম করে। সমিতির নারী ও পুরুষ সব সদস্যদের ক্ষেত্রেই সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক ছিল। হুং তাঁর সমিতির সদস্যদের একটি সশস্ত্র বিদ্রোহের জন্য তৈরি করছিলেন।

তাইপিং বিদ্রোহের নেতা হুং রচিত গ্ৰন্থ

১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ হুং A Teaching for Awakening the World নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেন। এই গ্রন্থে পুরোনো চিনা কৃষক ঐতিহ্যের আদিম সমষ্টিবাদের তত্ত্বের প্রতিফলন ঘটেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের সূচনা

১৮৫১ খ্রিস্টাব্দের ১১ জানুয়ারি কোয়াংসি প্রদেশের জিন-তিয়েন গ্রামে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাইপিং বিদ্রোহ শুরু হয়। ঐ অনুষ্ঠানে ‘তাইপিং তিয়েন কুও’ বা ‘মহতী শান্তির স্বর্গরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষণা করা হয়।

তাইপিং বিদ্রোহের সূচনাপর্বে গুপ্ত সমিতিগুলির সম্পর্কে চিড়

এই বিদ্রোহের সূচনাপর্বে হুং-এর নেতৃত্বাধীন ‘ঈশ্বর ভক্ত সমিতি’র সাথে অন্যান্য গুপ্ত সমিতির সম্পর্কে চিড় ধরে। ১৮৪৮- ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ, ‘ঈশ্বর ভক্ত সমিতি’র ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার জন্য বিভিন্ন গুপ্ত সমিতির সদস্যরা, বিশেষত দক্ষিণ চীনের ট্রায়াড জাতীয় গুপ্ত সমিতির কর্মীরা ঈশ্বর ভক্ত সমিতিতে যোগ দিতে থাকেন।

তাইপিং বিদ্রোহের উদ্দেশ্য

  • (১) আগেই বলা হয়েছে, গুপ্ত সমিতিগুলির সদস্যরা রাজনৈতিক দিক দিয়ে মিং বংশের সমর্থক ছিলেন। তাঁরা মাঞ্চু শাসনের অবসান ঘটিয়ে চিনে মিং শাসন প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাইপিংদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। তারা দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত, পশ্চিমি সাম্রাজ্যবাদের কাছে আত্মসমর্পণকারী মাঞ্চু শাসনের অবলুপ্তি ঘটিয়ে সম্পূর্ণ নতুন শাসনতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন।
  • (২) হুং কখনোই মিং শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে মেনে নেননি। তিনি ‘তাইপিং তিয়েন কুও’ বা ‘মহতী শান্তির স্বর্গরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিলেন। তাইপিং কথার অর্থ মহতী শান্তি, আরও যথার্থ অর্থে “মহান সামাজিক সঙ্গতি”।

তাইপিং বিদ্রোহের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিরোধী মনোভাব

উদ্দেশ্যের ভিন্নতাকে কেন্দ্র করে তাইপিংদের সাথে গুপ্ত সমিতিগুলির সম্পর্কে ফাটল ধরেছিল। যদিও তাইপিংদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য গুপ্ত সমিতিগুলির উদ্দেশ্য থেকে পৃথক ছিল, তবুও এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাইপিং বিদ্রোহেরও অনুপ্রেরণা ছিল কৃষকদের কল্পরাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রাচীন চিনা ঐতিহ্য।

তাইপিং বিদ্রোহের কারণ

চিনে তাইপিং বিদ্রোহের বিভিন্ন কারণগুলি হল নিম্নরূপ –

(১) তাইপিং বিদ্রোহের কারণ আফিমের চোরা চালান

আফিমের চোরাই চালান চীনা অর্থনীতিকে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, এ কথা আগেই আলোচিত হয়েছে। আফিম আমদানির মূল্য হিসাবে চীন থেকে প্রভূত পরিমাণ রৌপ্য বিদেশে চলে যেত। ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দে থেকে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে চীন থেকে প্রতি বছর গড়ে ২০ লক্ষ থেকে ৩০ লক্ষ টেইল মূল্যের রৌপ্য বিদেশে চলে যেত। হুং শিউ চুয়ান যখন বিদ্রোহের ডাক দেন, তখন তিনি আফিমের বিনিময়ে বছরে লক্ষ লক্ষ টাকার স্বর্ণ ও রৌপ্য নষ্ট করার জন্য চিং সরকারকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করেছিলেন।

(২) তাইপিং বিদ্রোহের কারণ দেশীয় হস্তশিল্পের বিনাশ

প্রথম আফিম যুদ্ধে চীনের পরাজয়ের ফলে নানকিং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী চীনের পাঁচটি বন্দর বিদেশিদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে ঐ বন্দরগুলি দিয়ে বিদেশি পণ্য চীনের অভ্যন্তরে স্রোতের মতো ঢুকতে থাকে। বিশেষত, বিদেশি সুতিবস্ত্র চীনের বাজার ছেয়ে ফেলে। চীনের হস্তনির্মিত সুতিবস্ত্রের চাহিদা হ্রাস পায়। কিছুদিনের মধ্যেই দেশীয় হস্তশিল্পের বিনাশ ঘটতে থাকে।

(৩) তাইপিং বিদ্রোহের বাণিজ্যিক কারণ

বৈদেশিক বাণিজ্যের জন্য পাঁচটি বন্দর, বিশেষত, সাংহাই বন্দর উন্মুক্ত হবার ফলে চীনের বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রের পরিবর্তন হয়েছিল। ইয়াংসি অঞ্চল থেকে পরিচালিত বৈদেশিক বাণিজ্য এখন সাংহাই অঞ্চল থেকে পরিচালিত হতে থাকে। কিন্তু বিদেশি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ক্যান্টনের একচেটিয়া অধিকার বিলুপ্ত হবার পর মাল বহনের কাজে নিযুক্ত হাজার হাজার নৌকার মাঝি এবং কুলি বেকার হয়ে পড়েন।

(৪) তাইপিং বিদ্রোহের কারণ মাঞ্চু শাসনের দুর্বল ভিত্তি

দক্ষিণ চীনে মাঞ্চু শাসনের ভিত্তি কখনোই সুদৃঢ় ছিল না। তাছাড়া, ইয়াংসির দক্ষিণে ইউরোপীয়দের বসবাসের ফলে সেখানে পশ্চিমের প্রভাব পড়েছিল। বিশেষত, খ্রিস্টান মিশনারিদের কার্যাবলী তাইপিং বিদ্রোহীদের অনেকাংশে প্রভাবিত করেছিল। তাছাড়া ঐ অঞ্চলে দারিদ্র্য ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। সব মিলিয়ে দক্ষিণ চীনে মাঞ্চু-বিরোধী সংগ্রামের একটি ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি

সমাজবিজ্ঞানী মানবেন্দ্রনাথ রায় তাঁর বিখ্যাত Revolution and Counter Revolution in China গ্রন্থে তাইপিং বিদ্রোহের প্রকৃতি আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, “বহু কলঙ্কিত, ভ্রান্ত ভাবে বিশ্লেষিত এবং স্বল্পবোধ্য তাইপিং বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে চীনের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে উত্তরণ ঘটেছিল”। তিনি ফরাসি বিপ্লবের সাথে তাইপিং বিদ্রোহের সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। কারণ, ফরাসি বিপ্লবের মতো তাইপিং বিদ্রোহেরও নেতৃত্ব দিয়েছিল বুর্জোয়াশ্রেণী এবং পরবর্তী স্তরে কৃষকরা এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা

বিদ্রোহের প্রাথমিক পর্বে বিদ্রোহীরা অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছিলেন। তাঁদের অবাধ অগ্রগতি মাঞ্চু শাসনের অবসান অনিবার্য করে তুলেছিল। কিন্তু একদল রাজপুরুষের কর্মদক্ষতা তাইপিংদের দুর্বার গতি রুদ্ধ করতে সমর্থ হয়। তাইপিং বিদ্রোহ দমনে যে রাজপুরুষ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁর নাম সেং কুয়ো ফান। কৌশলগত ভ্রান্তি তাইপিং বিদ্রোহের ব্যর্থতা অনিবার্য করে তুলেছিল।

তাইপিং বিদ্রোহের গুরুত্ব

যদিও তাইপিং বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়েছিল তবুও আধুনিক চিনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব অপরিসীম। যেমন –

(১) স্বতন্ত্র কৃষক বিদ্রোহ

আধুনিক চিনের ইতিহাসে তাইপিং সর্বপ্রথম গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক সংগ্রাম। স্বরূপ এবং গুরুত্বের দিক দিয়ে বিচার করলে বলা যায় যে, অতীতের চিনের যে-কোনো কৃষক বিদ্রোহ থেকে তাইপিং ছিল স্বতন্ত্র। তাইপিংরা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেই ক্ষান্ত হন নি, তাঁরা একটি বিকল্প আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। সর্বোপরি তাঁরা একটি নিজস্ব সমান্তরাল রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

(২) শাসনতান্ত্রিক পদে চিনাদের নিয়োগ

তাইপিং বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা মাঞ্চু শাসকদের একটি বিকেন্দ্রীকৃত শাসনব্যবস্থা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করেছিল। তাইপিং-এর পূর্ববর্তীকালে সম্রাটের দরবার থেকে শাসনকার্য পরিচালিত হত। তাইপিং-পরবর্তী যুগে প্রাদেশিক শাসকদের পরামর্শ যথাযথ গুরুত্ব সহকারে বিবেচিত হতে থাকে। তাছাড়া, এই সময় থেকে মাঞ্চুদের পরিবর্তে চিনারা গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক পদ পেতে থাকে।

(৩) পরবর্তী প্রজন্মের উপর প্রভাব

পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাইপিং বৈপ্লবিক সংগ্রাম সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবের নায়ক সান ইয়াৎ সেন স্বর্গরাজ্যের পতনের ঠিক দুই বছর পর ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছেলেবেলায় তাইপিং বিদ্রোহের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল। মাত্র বারো বৎসর বয়সে তিনি দ্বিতীয় হুং হবার স্বপ্ন দেখেছিলেন।

(৪) কমিউনিস্টদের উপর প্রভাব

তাইপিং বিপ্লবীদের অধিকৃত অঞ্চলের ওপর দিয়ে অভিযান চালাবার সময় চিনের কমিউনিস্টরা তাইপিং সংগ্রামের কথা বারে বারে স্মরণ করেছিলেন। “ভালো খাও, ভালো বস্ত্র পরিধান কর” – চিনা কমিউনিস্টরা জাপানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে মুক্তাঞ্চল গড়ে তুলেছিলেন, সেখানে তাইপিংদের এই শ্লোগান তাঁরা বার বার উচ্চারিত করেছিলেন।

(৫) ইউরোপে প্রভাব

শুধু চীন নয়, ইউরোপেও এই বিপ্লব নতুন আশা ও উদ্দীপনার সঞ্চার করেছিল। ইউরোপে ১৮৪৮-এর বিপ্লবের ব্যর্থতা কার্ল মার্কসকে হতাশ করেছিল। কিন্তু প্রাথমিক পর্বে তাইপিং-এর অভাবনীয় সাফল্যে তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন এবং কৃষি বিপ্লবের সম্ভাবনা তাঁর সামনে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল।

উপসংহার :- গণপ্রজাতন্ত্রী চীনে তাইপিং বিপ্লবের বীরত্বপূর্ণ স্মৃতি আজও মর্যাদা সহকারে স্মরণ করা হয়। ইস্রায়েল এপস্টেইন যথার্থই বলেছেন, তাইপিং অভ্যুত্থান পৃথিবীর ইতিহাসে মানব-মুক্তির অন্যতম মহান সংগ্রাম হিসাবে মানুষের চেতনায় স্থান করে নেবে (The Taiping Uprising will take its place in the consciousness of all peoples as one of the world’s great wars for human freedom.)

(FAQ) তাইপিং বিদ্রোহ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তাইপিং কথার অর্থ কি?

মহতী শান্তি।

২. তাইপিং বিদ্রোহ কোথায় সংঘটিত হয়?

চিনে।

৩. চিনের কোথায় তাইপিং বিদ্রোহের সূচনা হয়?

১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ চীনের কোয়াংসি প্রদেশে।

৪. তাইপিং বিদ্রোহের সময়কাল কত?

১৮৫০-৬৪ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Comment