ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ

মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ প্রসঙ্গে বাণিজ্যের চূড়ান্ত অগ্রগতি, বাণিজ্যের বিকাশের কারণ হিসেবে ক্রুসেডের অবদান, প্যালেস্টাইন দখলের ফল, গিল্ডের প্রতিষ্ঠা, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, মূল্য বিপ্লব, বাণিজ্য মেলা, কম্পাস এর আবিষ্কার, মুসলিমদের উদ্যোগ, মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্য সংঘ বা গিল্ড ব্যবস্থা সম্পর্কে জানবো।

মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ

ঐতিহাসিক ঘটনাইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ
পশ্চিম রোমের পতন৪৭৬ খ্রি
ক্রুসেড১০৯৬-১২৯১ খ্রি
প্রাচীন নগরনেপলস, পিসা
নতুন নগরভেনিস, মিলান
মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ

ভূমিকা :- প্রাচীন ইউরোপে উদ্‌বৃত্ত কৃষিপণ্যের ওপর ভিত্তি করে বাণিজ্যের বিকাশ ঘটেছিল। বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় প্রভৃতি ঘটনা নগরায়ণের বিকাশে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল। তবে প্রাচীন যুগের চেয়ে মধ্যযুগেই বাণিজ্য ও নগরায়ণের বিকাশ এবং অগ্রগতি বেশি ছিল।

ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ

বহিরাগত বর্বরদের আক্রমণে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন হলে ইউরোপের রাষ্ট্র ও সমাজজীবনে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার অভাব দেখা দেয়। –

  • (১) এর ফলে চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপের, বিশেষ করে পশ্চিম ইউরোপের বাণিজ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • (২) এরপর ইউরোপে বাণিজ্যের পরিপন্থী সামন্ততন্ত্রের বিকাশ ঘটলে কৃষি অর্থনীতির ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং বাণিজ্যের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়।
  • (৩) সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বয়ংসম্পূর্ণ ম্যানরগুলিতে শুধু নিজেদের প্রয়োজনেই উৎপাদনকার্য চলত। এই ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদনের কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে এই যুগে বাণিজ্য বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
  • (৪) বাণিজ্যের এই অবক্ষয়ের কালেও অবশ্য ক্ষীণ ধারায় বাণিজ্য চলত। এই সময় রোমান সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলি থেকে পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশগুলিতে রেশমি বস্ত্র, মশলা, খাদ্যশস্য, মণিমুক্তা রপ্তানি চলত। মিশর থেকে ইউরোপে প্যাপিরাস রপ্তানি হত। আর পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশগুলি থেকে পূর্বাঞ্চলের প্রদেশগুলিতে ক্রীতদাস, শিকারি কুকুর প্রভৃতি রপ্তানি করা হত।
  • (৫) অবশ্য পরবর্তীকালে পশ্চিম ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের অবক্ষয় শুরু হলে বাণিজ্যের কিছু অগ্রগতি ঘটতে থাকে।

বাণিজ্যের চূড়ান্ত অগ্ৰগতি

মধ্যযুগে ইউরোপে বাণিজ্যের চূড়ান্ত অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় একাদশ শতক থেকে চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগে। এই সময় প্রাচ্যের সঙ্গে ইউরোপের বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। পশুটানা গাড়ির সাহায্যে এই সময় বাণিজ্য পণ্য পরিবহণ করা হত। সমুদ্রপথেও দূরদূরান্তে পণ্য রপ্তানি শুরু হয়। এই সময় যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রগতি, নগরজীবনের প্রসার, পণ্য চলাচলে পাহারার ব্যবস্থা, প্রাচ্যের সঙ্গে ইউরোপের যোগাযোগ বৃদ্ধি প্রভৃতি বিষয়গুলি ইউরোপের বাণিজ্যিক অগ্রগতিতে বিশেষভাবে সহায়তা করেছিল।

ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশের কারণ

মধ্যযুগের (৪৭৬-১৪৫৩ খ্রি.) প্রথমদিকে ইউরোপে বেশ কিছুকাল রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে অস্থিরতা বিরাজ করায় তখন বাণিজ্যের বিশেষ অগ্রগতি ঘটে নি। কিন্তু কিছুকাল পর ইউরোপীয় সমাজ ও রাজনীতিতে শান্তি ও স্থিরতা ফিরে এলে বাণিজ্যের যথেষ্ট বিকাশ ঘটে। এই সময় ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশের বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন –

(ক) ক্রুসেডের অবদান

  • (১) খ্রিস্টানদের পবিত্রভূমি জেরুজালেম দখলকে কেন্দ্র করে খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মযোদ্ধাদের মধ্যে প্রায় দুশো বছর ধরে (১০৯৬-১২৯১ খ্রি.) যে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল তা মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।
  • (২) ক্রুসেডের ফলে পাশ্চাত্যের সঙ্গে প্রাচ্যের যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা স্থাপিত হয়। পশ্চিমের জগতে প্রাচ্যের বিভিন্ন সামগ্রীর চাহিদা বৃদ্ধি পায়। এই যোগাযোগের ফলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীর আমদানি-রপ্তানি আরম্ভ হয়।

(খ) নগরজীবনের প্রসার

  • (১) একাদশ শতকের পরবর্তীকালে ইউরোপের পুরোনো শহরগুলির পুনরুত্থান শুরু হয় এবং বেশ কিছু নতুন শহরের প্রতিষ্ঠা হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে উদ্‌বৃত্ত ফসলের জোগান নগরের বিকাশে সহায়তা করে। নেপলস, র‍্যাভেনা, পিসা প্রভৃতি প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
  • (২) এর পাশাপাশি ভেনিস, আমালফি, মিলান, পেভিয়া প্রভৃতি নতুন নতুন নগরগুলি বিভিন্ন দেশের বণিকদের বাসস্থান ও পণ্য চলাচলের কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নগরগুলিতে বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন এবং তা বিক্রির জন্য বাজার গড়ে উঠলে বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়। সামন্তপ্রভুদের পরিবর্তে নগরগুলিতে ব্যবসায়ী ও শিল্প-কারখানার মালিকরা বেশি মর্যাদার অধিকারী হয়।

(গ) প্যালেস্টাইন দখলের ফল

খ্রিস্টান ধর্মযোদ্ধারা তাদের পবিত্রভূমি প্যালেস্টাইন দখলের ফলে এখানকার সম্পদশালী জেরুজালেম, আশফেলন, পেল্লা প্রভৃতি শহর ও বন্দরগুলির দরজা পশ্চিমের বণিকদের কাছে খুলে যায়। এখানকার বিভিন্ন শহর ও বন্দর থেকে দূরদূরান্তে বিভিন্ন পণ্যসামগ্রী রপ্তানি হতে থাকে। ইউরোপের আমালফি, ভেনিস, জেনোয়া, পিসা প্রভৃতি শহরগুলি বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।

(ঘ) গিল্ডের প্রতিষ্ঠা

মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের অগ্রগতিতে সেখানকার বণিক ও কারিগরদের প্রতিষ্ঠিত পৃথক পৃথক গিল্ডগুলি বিশেষ সহায়তা করেছিল। বাণিজ্যের সুবিধার্থে তখনকার গিল্ড বা সংঘগুলি প্রয়োজনীয় আইন রচনা করত। কারখানায় কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান অব্যাহত রাখা, বাণিজ্যিক পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখা প্রভৃতি কাজে গিল্ডের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিত। বিভিন্ন গিল্ড ঐক্যবদ্ধ হয়ে লিগ গঠন করত। ‘থোনসিটিক লিগ’ ছিল জার্মানির এরূপ একটি লিগ। লিগগুলি বড়ো মাপের বৈদেশিক আমদানি-রপ্তানিতে যুক্ত থাকত।

(ঙ) যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও নিরাপত্তা বৃদ্ধি

ইউরোপে শান্তি স্থাপনের পরবর্তীকালে যোগাযোগ ব্যবস্থার বিশেষ উন্নতি ঘটে। রাস্তাঘাট ও নদীপথগুলির উন্নতি হলে দূরদূরান্তে পণ্য চলাচলে সুবিধা হয়। পথে বণিকের দল ও তাদের পণ্যসামগ্রীর নিরাপত্তা বিধানের জন্য রাজকীয় বাহিনীর সঙ্গে সঙ্গে বণিকদের নিজস্ব রক্ষী বাহিনীও কাজ শুরু করলে দস্যুদের আক্রমণ থেকে বণিক ও পণ্য উভয়ই রক্ষা পায়। বন্দরে বাতিঘর প্রতিষ্ঠা করে পণ্য ও বণিকদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি করা হয়।

(চ) মূল্যবিপ্লব

দ্বাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়ে ইউরোপে জিনিসপত্রের মূল্য যথেষ্ট বৃদ্ধি পায় যা সাধারণভাবে মূল্যবিপ্লব নামে পরিচিত। এর ফলে বণিকদের হাতে মুনাফা বৃদ্ধি পায় এবং পুঁজি কেন্দ্রীভূত হয়। এই পুঁজি বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হলে তা বাণিজ্যের বিকাশে সহায়তা করে।

(ছ) বাণিজ্য মেলা

ইউরোপের বড়ো বড়ো শহরগুলিতে বছরে অন্তত একবার বাণিজ্য মেলা বসত। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন মানুষ এই সব মেলায় পণ্য ক্রয় বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে আসত। পাইকারি বণিকরা মেলা থেকে পণ্য কিনে দূরদূরান্তে রপ্তানি করত। এভাবেও বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছিল।

(জ) লোম্বার্ডদের আক্রমণ

বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ভূমধ্যসাগরের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ক্রমাগত লোম্বার্ডদের আক্রমণের ফলে সেখানকার কৃষি উৎপাদন দীর্ঘকাল ধরে দারুণভাবে ব্যাহত হয়। ফলে এখানকার মানুষ কৃষির বিকল্প হিসেবে কুটিরশিল্প ও বাণিজ্যকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করে। তারা শীঘ্রই পণ্যদ্রব্যের বিশাল বাজারে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে ব্যাবসাবাণিজ্যের উন্নতি ঘটিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনতে সক্ষম হয়।

(ঝ) কম্পাসের আবিষ্কার

দ্বাদশ শতকে কম্পাস আবিষ্কৃত হলে জলপথে পণ্য আদানপ্রদানে বিশেষ সুবিধা হয়। কম্পাসের সহায়তায় অজানা সমুদ্রে নির্ভয়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব হয়। এর ফলে নতুন নতুন বাণিজ্য পথ ও বাজারের সন্ধান পাওয়ায় বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।

(ঞ) মুসলিমদের উদ্যোগ

ইউরোপের বাণিজ্যিক অগ্রগতিতে আরবের মুসলিমদেরও পরোক্ষ ভূমিকা ছিল। কারণ মুসলিম ব্যবসায়ীরা ইতালির বিভিন্ন বাণিজ্যকেন্দ্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন শুরু করেছিল। ফলে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বাণিজ্যিক পণ্য আদানপ্রদান সহজ হয়।

মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যিক সংঘ বা গিল্ড

মধ্যযুগে ইউরোপে বাণিজ্যের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিষয়গুলির বিকাশ ঘটেছিল। এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল ‘গিল্ড’ (Guild) বা বণিক সংঘ। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) শিল্ডের প্রতিষ্ঠা

  • (১) এই সময় ইউরোপে ব্যবসায়ী ও কারিগর শ্রেণি নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে এই সব গিল্ড বা সংঘ প্রতিষ্ঠা করত। প্রথমে বণিকরা গিল্ড গঠনের উদ্যোগ নেয়, পরে তা কারিগরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। নিজেদের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীরা বণিক সংঘ এবং শিল্পী-কারিগররা কারিগর সংঘ গড়ে তোলে।
  • (২) খ্রিস্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকে ইংল্যান্ডে সর্বপ্রথম ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্রমে ইউরোপের বিভিন্ন শহরে গিল্ডের প্রতিষ্ঠা হতে থাকে। এই সময় ব্যবসায়ী এবং কারিগর উভয়ই গিল্ডের সদস্য ছিল। পরবর্তীকালে কারিগরি শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শিল্পী ও শ্রমিকরা নিজেদের পৃথক গিল্ড প্রতিষ্ঠা করে।
  • (৩) কারিগরদের পৃথক শিল্ড সর্বপ্রথম প্রতিষ্ঠিত হয় ইতালিতে। স্বর্ণকার, কর্মকার, চর্মকার, ক্ষৌরকার প্রভৃতি বিভিন্ন পেশার কারিগর, শিল্পী ও শ্রমিক, চিকিৎসক, এমনকি ভিক্ষুকরাও নিজেদের পৃথক পৃথক গিল্ড গড়ে তোলে।

(খ) গিল্ড প্রতিষ্ঠার কারণ

মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যক্ষেত্রে শিন্ডের প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কারণ ছিল। যেমন  –

(১) বেআইনি কর আদায় প্রতিরোধ

মধ্যযুগে সামন্তপ্রভুরা বণিকদের কাছ থেকে বিভিন্ন অজুহাতে বিভিন্ন ধরনের বেআইনি কর আদায় করত। তা প্রতিরোধ করতে ব্যবসায়ীরা গিল্ডের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

(২) অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি দূর

ব্যাবসাবাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, ঝুঁকি ও নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের গিল্ড গড়ে তুলেছিল।

(৩) রক্ষীবাহিনী তদারকি

পথে দস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করতে বণিকরা যে রক্ষীবাহিনী নিয়োগ করত তার তদারকির প্রয়োজনে গিল্ডের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

(৪) আধিপত্য বৃদ্ধি

গিল্ড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বণিকরা নগর ও বন্দরগুলিতে নিজেদের আধিপত্য বৃদ্ধি করতে চেয়েছিল।

(৫) কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান অব্যাহত রাখা

উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে কারখানায় কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত রাখতে গিল্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

(৬) কারিগরদের স্বার্থরক্ষা

বণিকরা যাতে কারিগরদের পণ্যের মূল্য বা শ্রমের মজুরি কম না দিতে পারে সেই উদ্দেশ্যে কারিগররা নিজেদের গিল্ড প্রতিষ্ঠা করেছিল।

(৭) নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধ

কারিগরদের নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিরোধ করার উদ্দেশ্যে গিল্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

(৮) ক্রেতা সুরক্ষা

অসাধু কারিগরদের হাত থেকে ক্রেতাদের রক্ষার উদ্দেশ্যেও গিল্ড প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ নেওয়া হয় ।

(গ) গিল্ডের কাজ

মধ্যযুগে গড়ে ওঠা ইউরোপের বণিক ও কারিগরদের গিল্ডগুলি বিভিন্ন ধরনের কাজ করত। যেমন  –

(১) বাণিজ্যে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা

গিল্ডগুলি নিজেদের সদস্যদের বাণিজ্যিক স্বার্থের দিকে সর্বদা নজর রাখত এবং বাণিজ্যে নিজেদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করত। সকল সদস্য যাতে সমান সুযোগসুবিধা পায় সেদিকে গিল্ড নজর রাখত। অন্য অঞ্চলের বাসিন্দা বা কোনো গিল্ডের সদস্য নয় এমন ব্যক্তিকে বাণিজ্য করার অধিকার কোনো গিল্ড দিত না।

(২) দুর্নীতি রোধ

গিল্ডগুলি ব্যবসায়ীদের দুর্নীতি রোধ করা এবং পণ্যদ্রব্যের সঠিক গুণগত মান বজায় রাখার ক্ষেত্রে যথেষ্ট দায়িত্ব পালন করত। তারা ভেজাল দ্রব্য বিক্রয় প্রতিরোধ করার উদ্যোগ নিত।

(৩) প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধ

পণ্যসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি রোধ করা এবং পণ্যের মূল্য সুনির্দিষ্ট করে নিজেদের মধ্যে ব্যাবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বন্ধ করার ক্ষেত্রে গিল্ডগুলি কাজ করত। গিল্ডগুলি নিজেদের সদস্য-সংখ্যা সীমিত রেখে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বন্ধ করার চেষ্টা করত।

(৪) কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান

কারখানায় নিয়মিত কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান, শ্রমিকের কাজের সময়সীমা নির্ধারণ এবং কারখানায় কাজের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে গিল্ডগুলি উদ্যোগ নিত।

(৫) নিরাপত্তা প্রদান

পণ্য চলাচলের পথে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, পণ্য চলাচলে নজর রাখা প্রভৃতির মাধ্যমে গিল্ডগুলি বাণিজ্যের অগ্রগতিতে সহায়তা করত।

(৬) সদস্যদের সহায়তা

কোনো সদস্যের দারিদ্র্য, সম্পত্তি ধ্বংস হওয়া, ঋণের দায়ে পড়া বা কারারুদ্ধ হওয়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে গিল্ড তার সদস্যদের সহায়তা করত। সদস্যদের মধ্যে যে-কোনো বিরোধের মীমাংসা করা এবং মৃত সদস্যদের পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা প্রভৃতিও গিল্ডের অন্যতম কাজ ছিল।

(৭) অনুশাসন বজায় রাখা

গিল্ডের নিয়মকানুনগুলি ছিল আইনের মতোই মূল্যবান। এই নিয়মকানুনগুলি অমান্য করলে গিল্ড তার সদস্যদের জরিমানা ও শাস্তিদান করত।

(৮) প্রশাসনিক কাজ

গিল্ডগুলি শহরের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্বও পালন করত। শহরের বাসিন্দাদের স্বার্থরক্ষা, পণ্যশুল্ক আদায় ছাড়াও শহরের সেতু, প্রাচীর, ফটক, নর্দমা প্রভৃতি নির্মাণে এবং রক্ষণাবেক্ষণে তদারকি করা প্রভৃতি বিভিন্ন কাজ গিল্ডগুলি করত।

(৯) সামাজিক উদ্যোগ

গিল্ডের সদস্যদের আদায়িকৃত চাঁদার অর্থে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, জনসাধারণের জন্য গৃহগুলির সংস্কার, হাসপাতাল ও অনাথ আশ্রম প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কাজ সম্পন্ন হত।

(১০) অন্যান্য উদ্যোগ

এ ছাড়া গিল্ডগুলি সামন্তপ্রভুদের সঙ্গে খাজনা, শুল্ক প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা করত, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির ব্যবস্থা করত, চার্চের নিয়ন্ত্রণমুক্ত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করত।

উপসংহার :- ইউরোপের সামন্ততান্ত্রিক যুগে শিল্প বাণিজ্যের প্রসারের ফলে সেখানকার গ্রামগঞ্জে সামন্ত ও ম্যানর প্রভুদের ক্ষমতা ক্রমে দুর্বলতা থাকে। নগর ও বন্দরগুলিতে উদীয়মান ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ভবিষ্যতের মর্যাদা সম্পন্ন গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

(FAQ) মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের বিকাশ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে কখন?

৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে।

২. ইউরোপে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ কতদিন ধরে চলে?

১০৯৬ থেকে ১২৯১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর।

৩. কম্পাস আবিষ্কৃত হয় কখন?

দ্বাদশ শতকে।

৪. কোথায় সর্বপ্রথম ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয়?

 একাদশ-দ্বাদশ শতকে ইংল্যান্ডে।

৫. কোথায় সর্বপ্রথম কারিগরের গেট প্রতিষ্ঠিত হয়?

ইতালিতে।

Leave a Comment