ইউরোপে গিল্ড ব্যবস্থা

ইউরোপে গিল্ড ব্যবস্থা প্রসঙ্গে গিল্ড প্রতিষ্ঠা, ব্যবসায়ীদের গিল্ড, কারিগরদের গিল্ড, ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠার কারণ, কারিগরদের গিল্ড প্রতিষ্ঠার কারণ, মধ্যযুগের ইউরোপে গিল্ডের কার্যাবলী ও মধ্যযুগের ইউরোপে বাণিজ্যের প্রসারে গিল্ডের ভূমিকা সম্পর্কে জানবো।

ইউরোপে গিল্ড ব্যবস্থা

ঐতিহাসিক ঘটনাইউরোপে গিল্ড ব্যবস্থা
সময়কালএকাদশ-দ্বাদশ শতক
উদ্দেশ্যবণিক ও কারিগরদের শ্রেণি স্বার্থ রক্ষা
ব্যবসায়ীদের গিল্ডইংল্যান্ড
কারিগরদের গিল্ডইতালি
ইউরোপে গিল্ড ব্যবস্থা

ভূমিকা :- ইউরোপে মোটামুটিভাবে একাদশ শতকের শেষদিকে এবং দ্বাদশ শতকের প্রথমদিকে গিল্ড বা সংঘগুলির প্রতিষ্ঠা শুরু হয়। ইউরোপে সর্বপ্রথম ব্যবসায়ীদের এবং পরে কারিগরদের গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয়।

গিল্ডের বিভাগ

প্রথমদিকে বণিক ও কারিগর উভয়ই একই গিল্ডের সদস্য ছিল। কিন্তু ক্রমে বণিকদের অর্থ ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেলে তারা শ্রমিক-কারিগরদের শোষণ করতে শুরু করে। ফলে শ্রমিক ও কারিগররা নিজেদের পৃথক গিল্ড গড়ে তোলে

ব্যবসায়ীদের গিল্ড

ইউরোপে খ্রিস্টীয় দশম-দ্বাদশ শতাব্দীতে প্রথম ফ্লান্ডার্স, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানিতে ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার প্রথম পর্বে ব্যবসায়ী এবং কারিগর – উভয়ই গিল্ডের সদস্য ছিল। পরে তাদের গিল্ড বা সংঘ আলাদা হয়ে যায়।

কারিগরদের গিল্ড

পরবর্তীকালে বিভিন্ন কারিগরি শিল্পের কাজে নিযুক্ত শিল্পী এবং শ্রমিকরাও নিজেদের পৃথক গিল্ড প্রতিষ্ঠা করে। সর্বপ্রথম কারিগরদের পৃথক গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ইটালিতে। স্বর্ণকার, কর্মকার, চর্মকার, ক্ষৌরকার প্রভৃতি বিভিন্ন পেশার কারিগর, শিল্পী ও শ্রমিকরা নিজেদের পৃথক পৃথক গিল্ড গড়ে তোলে।

মধ্যযুগে ইউরোগে গিল্ড প্রতিষ্ঠার কারণ

মধ্যযুগের দ্বিতীয়ার্ধে ইউরোপে বাণিজ্যের যথেষ্ট প্রসার ঘটে। এই সময় ইউরোপে নিজের শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা করার উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীরা বণিক সংঘ এবং শিল্পী-কারিগররা কারিগর সংঘ গড়ে তুলেছিল। এই গ্রিল প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কারণগুলি হলো নিম্নরূপ। –

(ক) ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠার কারণ

মধ্যযুগের ইউরোপে ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কারণ গুলি হল –

(১) নিরাপত্তা প্রদান

মধ্যযুগে সর্বদা ব্যাবসাবাণিজ্যে নিরাপত্তার অভাব, অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বণিকদের চিন্তিত করত। বাণিজ্যের নিরাপত্তা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীরা নিজেদের ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করতে গিল্ড বা সংঘ গড়ে তুলেছিল।

(২) বেআইনি কর আদায় রোধ

সামন্তপ্রভুরা বিভিন্ন অজুহাতে বণিকদের কাছ থেকে সর্বদা বিভিন্ন বেআইনি বা অন্যান্য কর আদায় করত। এই ধরনের কর আদায় প্রতিরোধ করতে ব্যবসায়ীরা গিল্ডের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল।

(৩) দস্যুদের মোকাবিলা

বাণিজ্যপথে দস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে বণিকরা নিজেদের খরচে ভাড়াটে রক্ষীবাহিনী নিয়োগ করত। এই কাজ তদারকির উদ্দেশ্যে গিল্ড প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

(৪) নগর ও বন্দরগুলিতে আধিপত্য

ক্রুসেডের পরবর্তীকালে সামন্ততন্ত্রের দুর্বলতার সুযোগে বণিকরা নগর ও বন্দরগুলিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। এই আধিপত্যকে আরও শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে বণিকরা গিল্ড প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করে।

(খ) কারিগরদের গিল্ড প্রতিষ্ঠার কারণ

মধ্যযুগের ইউরোপে কারিগরদের গির প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন কারণগুলি হল –

(১) শ্রেণিস্বার্থ রক্ষা

বণিকরা যাতে কারিগরদের পণ্যের মূল্য বা শ্রমের মজুরি কম না দিতে পারে তার জন্য কারিগররা ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গড়ে তোলে।

(২) প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধ

কোনো কোনো কারিগর অন্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে নিজের পণ্য কম দামে বিক্রি করত। ফলে উভয় প্রতিপক্ষেরই ক্ষতি হত। এই প্রবণতা রোধ করে পণ্যের দাম বেঁধে দিয়ে রেষারেষি বন্ধের উদ্দেশ্যে গিল্ডের প্রতিষ্ঠা হয়।

(৩) কাঁচামালের জোগান অব্যাহত রাখা

সব কারিগরের পক্ষে সবসময় কাঁচামাল জোগাড় করে ওঠা সম্ভব হত না। তাই কাঁচামাল ও পণ্যের জোগান নিয়মিত রেখে উৎপাদন ব্যবস্থাকে সচল রাখতে গিল্ড গঠনের প্রয়োজন হয়।

(৪) ক্রেতাস্বার্থ রক্ষা

অসাধু কারিগরদের হাত থেকে ক্রেতাদের রক্ষা করতে গিল্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অসাধু কারিগরদের চিহ্নিত করে যাতে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, সে ব্যাপারে গিল্ড সতর্ক দৃষ্টি রাখত।

(৫) নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার তাগিদ

গিল্ডগুলি প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠার তাগিদটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু গিল্ডের কর্মকর্তারা বাস্তবক্ষেত্রে শিল্পের চিরাচরিত প্রথার দিকে বেশি নজর দেওয়ার ফলে উৎপাদনের ক্ষেত্রে নতুন আবিষ্কার ও উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার বিশেষভাবে ব্যাহত হয়েছিল।

মধ্যযুগের ইউরোপে গিল্ডের প্রধান কাজ

মধ্যযুগে ইউরোপের বিভিন্ন বণিক ও কারিগররা নিজেদের শ্রেণি স্বার্থ রক্ষা ও বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গঠিত গিল্ড বা সংঘগুলি বিভিন্ন ধরনের কার্যাবলি পরিচালনা করত। যেমন –

(১) বাণিজ্যে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা

প্রতিটি শহরের প্রতিষ্ঠিত গিল্ডগুলি নিজেদের সদস্যদের বাণিজ্যিক স্বার্থের দিকে সর্বদা নজর রাখত। গিল্ডের সদস্য নয় বা সেই শহরের বাসিন্দা নয় এমন ব্যক্তিদের সেই শহরে ব্যাবসা করার অধিকার সেই গিল্ড দিত না।

(২) প্রতিদ্বন্দ্বিতা রোধ

গিল্ডগুলি তাদের সদস্যসংখ্যা সীমিত রেখে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বন্ধ করার উদ্যোগ নিত। ব্যবসায়ী ও কারিগর গোষ্ঠীর সকলে যাতে সমান সুযোগসুবিধা পায়, সে বিষয়ে গিল্ড পদক্ষেপ নিত।

(৩) সঠিক মান বজায় রাখা

উৎপাদিত পণ্যদ্রব্যের সঠিক মান বজায় রাখা, ভেজাল দ্রব্য বিক্রয় প্রতিরোধ করা প্রভৃতি কাজগুলি গিল্ড করত। পণ্যসামগ্রীর উচ্চমান ও নির্ধারিত মূল্য বজায় আছে কিনা তা তদারকির উদ্দেশ্যে গিল্ডগুলি মাঝেমধ্যে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করত।

(৪) কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান

সদস্যদের কারখানায় যাতে সর্বদা প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও শ্রমিকের জোগান অব্যাহত থাকে, গিল্ড সেদিকে নজর রাখত।

(৫) সদস্যদের সহায়তা

কোনো সদস্যের দারিদ্র্য, সম্পত্তি ধ্বংস হওয়া, ঋণের দায়ে পড়া বা কারারুদ্ধ হওয়া প্রভৃতিতে সদস্যদের সহায়তা করা, সদস্যদের মধ্যে যে-কোনো বিরোধের মীমাংসা করা, মৃত সদস্যের পরিবারের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা গিল্ডের অন্যতম কাজ ছিল।

(৬) গিল্ডের অনুশাসন বজায় রাখা

গিল্ডের নিয়মকানুনগুলি ছিল আইনের মতোই মূল্যবান। এই নিয়মকানুনগুলি ভঙ্গ করলে গিল্ড তার সদস্যদের জরিমানা ও শাস্তি দান করত।

(৭) প্রশাসনিক কাজ

গিল্ডগুলি শহরের বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্য পরিচালনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। শহরের বাসিন্দাদের স্বার্থরক্ষা, পণ্যশুল্ক আদায়, শহরের রাস্তাঘাট ও সেতু, প্রাচীর, ফটক, নর্দমা প্রভৃতি নির্মাণে তদারকি করা প্রভৃতি বিভিন্ন কাজ গিল্ডগুলি করত।

(৮) সামাজিক উদ্যোগ

গিল্ডের আর্থিক ব্যয়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, জনসাধারণের জন্য গৃহগুলির সংস্কার, হাসপাতাল ও অনাথাশ্রম প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কাজ সম্পন্ন করা হত।

(৯) অন্যান্য উদ্যোগ

এ ছাড়া গিল্ডগুলি সামন্তপ্রভুদের সঙ্গে বাণিজ্যের খাজনা, শুল্ক ও অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা চালাত, গির্জার সংস্কার, বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করত, গির্জার নিয়ন্ত্রণমুক্ত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করত।

মধ্যযুগে ইউরোপে বাণিজ্যের প্রসারে গিল্ডের ভূমিকা

মধ্যযুগে বাণিজ্যের প্রসারে ইউরোপের গিল্ডগুলি বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এই গুলি হল-

(১) প্রতিযোগিতার অবসান ঘটানো

বিভিন্ন গিল্ড বহিরাগত বণিকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বন্ধ করার জন্য নিজেদের শহরের বাজারের ওপর একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করত। কোনো বণিক অতিরিক্ত উদ্যোগী হয়ে নিজেদের গিল্ডের অন্য বণিকদের সঙ্গে ব্যাবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু করলে গিল্ড তার কার্যকলাপের ওপর রাশ টেনে ধরত।

(২) সততার প্রতিষ্ঠা

গিল্ডগুলি পণ্যদ্রব্যের গুণগত মান বজায় রাখা, ব্যবসায় দুর্নীতি প্রতিরোধ করা ও ব্যাবসায়িক সততা বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করত।

(৩) পণ্যের মূল্য

গিল্ডগুলি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধ করত ও পণ্যের মূল্য বেধে দিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে ব্যাবসায়িক রেষারেষি বন্ধ করত।

(৪) কাজ সচল রাখা

কারখানায় কাঁচামাল ও শ্রমিকের নিয়মিত জোগান, শ্রমিকের কাজের সময় বেঁধে দেওয়া, কারখানায় কাজের সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখা প্রভৃতি দায়িত্ব গিল্ড পালন করত।

(৫) বাণিজ্য সচল রাখা

বাণিজ্যের পণ্য রক্ষা করা, পণ্য চলাচলের পথে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা, কাঁচামালের জোগান অব্যাহত রাখার চেষ্টা করা প্রভৃতির মাধ্যমে গিল্ড বাণিজ্য বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল।

(৬) শিক্ষাদান

উৎকৃষ্ট শিল্পসামগ্রী উৎপাদনের জন্য গিল্ডগুলি শিক্ষানবিশদের শিল্প সংক্রান্ত শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করত।

(৭) শুল্ক মকুব

আর্থিক লাভ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে শহরের অভ্যন্তরীণ সব ধরনের বাণিজ্য শুল্ক ও কর মকুব করার বিষয়ে গিল্ড উদ্যোগ নিত।

(৮) পরিদর্শক নিয়োগ

গিল্ডের নিয়মকানুন সঠিকভাবে মান্য করা হচ্ছে কি না তা দেখার উদ্দেশ্যে গিল্ডগুলি পরিদর্শক নিয়োগ করত।

(৯) নগর পরিচালনা

বহু শহরে বণিক গিল্ডগুলি নগরের প্রশাসন পরিচালনা করত।

(১০) মানবিক কাজ

গিল্ডগুলি তাদের দরিদ্র সদস্যদের বা মৃত সদস্যদের পরিবারকে সহায়তা করত।

উপসংহার :- মধ্যযুগের ইউরোপে গিল্ডগুলি বাণিজ্য -এ সততা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও তা বাস্তব ক্ষেত্রে যে পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হত না তা সমকালীন বিভিন্ন সাহিত্যে পাওয়া যায়।

(FAQ) ইউরোপে গিল্ড ব্যবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইউরোপে গিল্ড প্রতিষ্ঠা শুরু হয় কখন?

একাদশ শতকে শেষ ও দ্বাদশ শতকের প্রথম দিকে।

২. সর্বপ্রথম ব্যবসায়ীদের গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয় কোথায়?

ইংল্যান্ডে।

৩. সর্বপ্রথম কারিগরদের পৃথক গিল্ড প্রতিষ্ঠিত হয় কোথায়?

ইতালিতে।

Leave a Comment