নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনী (Napoleon Bonaparte Spouse)

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করা হল । ইতিহাসে এমন অনেক মহাযোদ্ধার কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে, যারা নিজেদের বীরত্ব কৌশল ও নির্ভীক ভাবনার জন্য নিজেদের নাম ইতিহাসের অমরত্বের পাতায় লিখে রাখেন । নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সেইরকম একজন যোদ্ধা যার জীবনী বাংলাতে বর্ণনা করা হচ্ছে (Biography of Napoleon Bonaparte in Bengali)। নীলনদের যুদ্ধে নেপোলিয়ন কার কাছে পরাজিত হন?

Table of Contents

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনী (Biography of Napoleon Bonaparte in Bengali)

জন্ম১৫ ই আগস্ট, ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দে
জন্মস্থানভূমধ্য সাগরের কর্সিকা দ্বীপের অ্যাজাকসিও
পিতাকার্লো বোনাপার্ট
মাতালেটিজিয়া
নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পরিচয়

ইতিহাসে এমন অনেক মহাযোদ্ধার কাহিনী লিপিবদ্ধ আছে, যারা নিজেদের বীরত্ব কৌশল ও নির্ভীক ভাবনার জন্য নিজেদের নাম ইতিহাসের অমরত্বের পাতায় লিখে রাখেন। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সেইরকম একজন যোদ্ধা যিনি কখনো হার মানেননি।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

সূচনা :- ইতিহাসে নেপোলিয়নের মত খুব কম শাসকই খুব দ্রুত উত্থান করে আবার নিমেষেই পতনের স্বীকার হয়েছেন। আধুনিক যুগের সূচনাও হয়েছে নেপোলিয়নের উত্থানের মধ্য দিয়ে। ফরাসী হিসেবে তিনি যে সাফল্য দেখিয়েছেন তা সত্যিই মহৎ। তবে তার সাফল্য যে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি তা ইতিহাসের আরেক বিস্ময়। ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ছিলেন ফ্রান্সের ভাগ্যনিয়ন্তা। অনেকের কাছে তিনি ‘ফরাসি বিপ্লব -এর জাগ্ৰত প্রতিমূর্তি’ – ফ্রান্স ও ইউরোপের মুক্তিদাতা’। আবার অনেকের কাছে তিনি ‘বিপ্লবের সংহারক’, ‘বিপ্লবের দানব’, ‘নরকের আবর্জনা’। এইসব পরস্পর বিরোধী মতাদর্শ সত্ত্বেও একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, নেপোলিয়ন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, যার আবির্ভাব ফ্রান্স ও ইউরোপের ইতিহাসকে নতুন যুগে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জন্ম পরিচয়

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী ফরাসি জাতির নায়ক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৭৬৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট ইতালির কর্সিকা দ্বীপের ক্ষুদ্র অংশ অ্যাজাকসিওতে এক দরিদ্র অথচ সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল কার্লো বোনাপার্ট ও মাতার নাম ছিল লেটিজিয়া বোনাপার্ট। নেপোলিয়নের জন্মের কিছু পূর্বে কর্সিকা দ্বীপটি ফরাসী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে জন্মগতভাবেই তিনি ছিলেন ফরাসী নাগরিক।

বাল্যকাল ও পিতৃহারা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের প্রাথমিক সামরিক জীবন

নেপোলিয়ন ছিলেন অত্যন্ত চৌকস ও মেধাবী একজন ছাত্র। ইতিহাস, অঙ্ক, যুদ্ধবিজ্ঞান ও সমকালীন দার্শনিকদের লেখার প্রতি তাঁর বিশেষ ঝোঁক ছিল। ষোল বছর বয়সে তিনি পিতৃহারা হলে পড়াশুনা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে নেপোলিয়ন একজন সামান্য সৈনিক হিসেবে ফরাসী সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন।

প্রাথমিকভাবে তুলোঁ সমুদ্র বন্দর থেকে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে জোরালো ভূমিকা রেখে তিনি অসামান্য সামরিক খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর তিনি ১৭৯৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রীদের বিদ্রোহ দমন করে জাতীয় মহাসভাকে রক্ষা করেন। ডাইরেক্টরির শাসনকালে তিনি ইতালি অভিযানের সেনাপতি নিযুক্ত হন। ইতালি অভিযানের সাফল্যই তাকে খ্যাতি ও গৌরবের শীর্ষে নিয়ে যায়। ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে এক সেনানায়কের বিধবা পত্নী যোসেফাইনকে বিবাহ করে তিনি ফরাসি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হন।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের কনস্যুলেটের শাসন

১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন দুর্নীতিপরায়ণ ডাইরেক্টরির পতন ঘটিয়ে ফ্রান্সে কনস্যুলেট নামে এক নতুন শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। সংবিধান মতে পুরো শাসনের প্রধান হিসেবে থাকেন তিনজন কনসাল। অ্যাবে সিয়েস, রজার ডুকাস এবং নেপোলিয়ন ছিলেন এই কনস্যুলেটের তিন প্রধান। নেপোলিয়ন ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। নেপোলিয়নের সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিল “কর্তৃত্ব উপর তলার আর আস্থা নিচু তলার”। মূলত সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতার স্থলে নেপোলিয়ন একটি স্বৈরাচারী প্রবণ একনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এইভাবেই ফ্রান্স তথা ইউরোপের ইতিহাসে শুরু হয় ‘Age of Napoleon’ বা ‘নেপোলিয়নের যুগ।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের বিদেশ নীতি

ফ্রান্স বিরোধী ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া মিলে জোট গড়ে উঠলে প্রাথমিকভাবে  ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়া আক্রমণ করে তা দখল করে নেন। এরপর ইতালিও দখল করতে সমর্থ হন।

অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিসকে চুক্তি করতে বাধ্য করান। কৌশলে রাশিয়াকেও জোট থেকে বের করে নিয়ে আসেন। ইংল্যান্ড আক্রমণ করা সহজ হবেনা ভেবে নেপোলিয়ন আপাতত বড় যুদ্ধে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। ইংল্যান্ড অ্যামিয়েন্সের চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সের কর্তৃত্ব মেনে নেয়। অবশ্য এই চুক্তি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি, ১৮০৩ খ্রিস্টাব্দেই আবার ফ্রান্স-ইংল্যান্ড যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সংস্কার

নেপোলিয়ন শুধু একজন বিজেতাই ছিলেন না, বরং শাসক হিসবেও ছিলেন দক্ষ। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তিনি যে সংস্কার ও উন্নতি সাধন করেন তার জন্যই পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর নাম অমর হয়ে আছে। তার প্রধান প্রধান সংস্কার নিয়ে নিম্নে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল –

  • প্রথমত: অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি কেন্দ্রীভূত শাসন প্রণালী বাস্তবায়ন করেন। ফলে সমগ্র রাজ্য জুড়ে তার কর্তৃত্ব স্থাপন সম্ভব হয়।
  • দ্বিতীয়ত: তিনি সরকারি ব্যয় সংকোচন করেন এবং বিভিন্ন কর বাজেয়াপ্ত করে আধুনিক কর ব্যবস্থা চালু করেন। ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে তার হাত ধরে ব্যাংঙ্ক অব ফ্রান্স প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সর্বপ্রথম কাগজের মুদ্রা প্রচলিত হয়।
  • তৃতীয়ত: তিনি অগোছালো আইন ব্যবস্থাকে একটি নতুন রূপ প্রদান করেন, যা ‘কোড নেপোলিয়ন’ নামে পরিচিত। তিনি নিজেই বলেন যে, ‘আমার গৌরবের মধ্যে কিছু যদি চিরস্থায়ী হয়, তাহলে তা হবে আমার আইনবিধি’।
  • চতুর্থত: তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখেন এবং ক্যাথলিক-প্রোটেস্টান্ট দ্বন্দ্ব প্রশমিত করেন। গির্জার কর্মচারীদের রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতনের ব্যবস্থা করেন।
  • পঞ্চমত: তিনি শিক্ষায় অবদান রাখার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফ্রান্সে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং শিক্ষা বিস্তারে নানাবিধ ভূমিকা পালন করেন। এছাড়াও নানাবিধ জনহিতকর কার্যাবলী তিনি পালন করেন যা ফ্রান্সের আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়।

ফরাসী বিপ্লব ও নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

প্রধান কনসাল রূপে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি ফ্রান্সের একচ্ছত্র স্বৈরাচারী ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। অথচ বুরবোঁ বংশের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধেই ফরাসী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। নেপোলিয়ন ছিলেন বিপ্লবের আদর্শের থেকে কিছুটা ভিন্ন। তিনি গণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন না। কারণ, তিনি মনে করতেন যে, সকলকে ক্ষমতা দিলে ফ্রান্স দুর্বল হয়ে পড়বে। এদিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি বিপ্লবের বিনাশক ছিলেন। তবে তিনি মৈত্রী ও সাম্যবাদে আস্থা রেখেছিলেন। তিনি একদা বলেছিলেন যে,

“What the nation is not liberty but equality”.

চাকরী লাভের ক্ষেত্রেও তিনি বংশ মর্যাদাকে গুরুত্ব না দিয়ে যোগ্যতাকেই বেছে নিতেন। তিনি বিপ্লবের বাণী চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। একবার তিনি অহংকার করেই বলেছিলেন,

  “আমিই বিপ্লব, আবার আমিই বিপ্লবকে ধ্বংস করেছি”।

সম্রাট হিসেবে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

১৮০৪ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন নিজেকে ফ্রান্সের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। তৎকালীন সময়ে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। সিনেটে নতুন আইন পাশ করে সাংবিধানিক সংশোধনীর মাধ্যমে নেপোলিয়নকে সম্রাটের মর্যাদা দান করা হয়। ক্যাথলিক পোপ স্বয়ং প্যারিসে এসে সম্রাটের প্রতীক চিহ্ন ও রাজমুকুট নিজের হাতে নেপোলিয়নকে প্রদান করেন। নেপোলিয়ন তখনই মন্তব্য করেছিলেন যে,

“ফ্রান্সের রাজমুকুট ভূলুণ্ঠিত ছিল এবং আমি তরবারির সাহায্যে তা তুলে নিয়েছি”।

এরপর তিনি সম্রাট হিসেবে সমগ্র ইউরোপে তার একচ্ছত্র ক্ষমতা বাস্তবায়নে ব্রতী হন। সমগ্র ইউরোপকে নিজের করতলগ্রস্ত করতে প্রয়াস শুরু করেন। ফ্রান্সকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করতে তিনে ছিলেন সদা সচেষ্ট।  উচ্চাকাঙ্ক্ষা  ও ক্ষমতার লোভে বিভোর হয়ে নেপোলিয়ন সাম্রাজ্যবাদী নীতি অনুসরণ করেন। একদা তিনি বলেছিলেন যে,

“ক্ষমতা হচ্ছে আমার বউয়ের মতো। এটা এমন এক শিল্প যাকে আমি বড় ভালোবাসি যেমন একজন পিয়ানোবাদক পিয়ানোকে ভালোবাসেন”।

সম্রাট হিসেবে  তিনি ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের যুদ্ধাবলী

১৮০২ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড এর মধ্যে অ্যামিয়েন্সের চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাছাড়া শতাব্দী ধরে চলতে থাকা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক ও ঔপনিবেশিক দ্বন্দ্ব ছিল প্রকট। নেপোলিয়ন সম্রাট হবার পর সপ্তবর্ষব্যাপী যুদ্ধের প্রতিশোধ নেবার জন্যও উদগ্রীব হয়ে ওঠেন। নেপোলিয়ন সর্বপ্রথম জার্মানির অন্তর্গত ব্রিটিশদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত হ্যানোভার বন্দর আক্রমণ করে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করেন। অতঃপর তিনি ইংল্যান্ডের সাথে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী জেনে বিশাল সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।

অন্যদিকে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কূটনৈতিকভাবে ইউরোপকে একতাবদ্ধ করতে চেষ্টা চালান। ১৮০৫ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া ও সুইডেন মিলে এই জোট গড়ে উঠে। এই সংবাদ শুনেই নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ইংল্যান্ড আক্রমণের চিন্তা পরিত্যাগ করে ক্ষিপ্রতার সাথে অস্ট্রিয়া আক্রমণ করেন। উলমের যুদ্ধে অস্ট্রিয়াকে পরাজিত করে সম্রাট দ্বিতীয় ফ্রান্সিসকে অবমাননাকর চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন তিনি। পাশাপাশি বর্তমান জার্মান বা তৎকালীন প্রাশিয়াও ফ্রান্সের অধিভুক্ত হয়। ফলে ইউরোপে ফ্রান্সের আরেক দফায় শক্তি বৃদ্ধি পায়। জোট বাহিনী তাদের সাহায্যে কিছুই করতে পারেনি বা এগিয়েও আসেনি।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের উপদ্বীপের যুদ্ধ

ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ফ্রান্স মহাদেশীয় ব্যবস্থা (১৮০৬ খ্রিস্টাব্দ) গ্রহণ করেন। অল্প কথায় মহাদেশীয় ব্যবস্থা হলো ব্রিটেনের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছেদ ও মিত্র দেশ সমূহের সাথে ব্রিটেনকে ব্যবসা বাণিজ্য না করতে দিয়ে তার অর্থনীতিকে পঙ্গু করা। অবশ্য শেষ পর্যন্ত ফ্রান্স নিজেই তার ফাঁদে পড়ে। ব্রিটেনকে জব্দ করতে গিয়ে ফ্রান্সের নিজ অর্থনীতিই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়।

যাইহোক এই মহাদেশীয় ব্যবস্থা কার্যকর করতে গিয়ে ফ্রান্স স্পেন এর সহায়তায় ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগাল দখল করে। পরবর্তী সময়ে নেপোলিয়ন চক্রান্ত করে স্পেনের সম্রাট চার্লসের আমলে বিশাল সেনাবাহিনী পাঠিয়ে স্পেন দখল করেন এবং নিজ ভ্রাতা জোসেফ বোনাপার্টকে ক্ষমতায় বসান । কিন্তু তিনি ক্ষমতায় মাত্র ১১ দিন স্থায়ী হতে সমর্থ হয়েছিলেন। প্রাক্তন শাসকরা গোলযোগের সুযোগে ক্ষমতা হাতে তুলে নিয়ে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে।

জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে পর্তুগালও ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ইংল্যান্ডও নেপোলিয়নের সংকটের সুযোগ নিয়ে স্পেন ও পর্তুগালের পাশে দাঁড়ায়। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ সেনাপতি ওয়েলিংটন স্যালামাঙ্কার যুদ্ধ ও ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে ভিট্টোরিয়ার যুদ্ধে স্পেন থেকে ফরাসীদের পুরোপুরি বিতাড়িত করেন। পর্তুগাল থেকেও ফরাসীরা বিতাড়িত হয়। এই স্পেন দখলই নেপোলিয়নের ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি নিজেই বলেন,

“স্পেনের ক্ষতই আমার ধ্বংস ডেকে এনেছিল”।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের রুশ বা মস্কো অভিযান

অস্ট্রিয়ার পরাজয়ের মাধ্যমে ইউরোপের স্থল শক্তির মধ্যে রাশিয়ার সাথে সম্মুখ যুদ্ধ বাকী ছিল ফ্রান্সের। উচ্চাভিলাষী নেপোলিয়ন এখানেও নিজের শক্তি পরীক্ষা করতে মনস্থ করেন। ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি রাশিয়াকে দুবার পরাজিতও করেন। ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত টিলসিটের সন্ধির ফলে ফ্রান্স এবং রাশিয়া মিত্রতায় আবদ্ধ হয়। কিন্তু খুব শীঘ্রই এই চুক্তির পতন ঘটে। কয়েকটি কারণে নেপোলিয়ন রাশিয়ার সম্রাট আলেকজান্ডার-এর বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হন এবং ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে ৬ লক্ষ সৈন্য নিয়ে মস্কো অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। প্রায় বিনা বাধায় নেপোলিয়ন বোনাপার্টে রাশিয়ায় প্রবেশ করেন।

রাশিয়াকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মধ্য রাশিয়ায় প্রবেশের জন্য উদ্যোগ নেন। শীতকে উপেক্ষা করেই তিনি সৈন্য নিয়ে এগিয়ে যান। ঠিক একই ভুলের মাসুল হিটলারকেও দিতে হয়েছিল। রুশরাও পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করে সকল শস্য ধ্বংস করে জনশূন্য শহর ফেলে চলে যায়। সেপ্টেম্বরে রাশিয়ার শীত যখন হিমাঙ্কের নীচে তখন মস্কোর কাছে বোরোডিনোর রণাঙ্গনে উভয় পক্ষের তুমুল যুদ্ধ হয়। নেপোলিয়ন জয়লাভ করলেও তার সৈন্য ও রসদের বিপুল ক্ষতি হয়।

এরপর নেপোলিয়ন মস্কোয় আগুন জ্বালিয়ে দেয়। নেপোলিয়ন ভেবেছিলেন যে রুশরা শান্তি চুক্তির জন্য আসবে কিন্তু তা হয়নি। এদিকে প্রচণ্ড শীত ও খাদ্যাভাবে নেপোলিয়নের সৈন্যরা চরম দুর্দশায় পতিত হয়। রুশদের গুপ্ত আক্রমণে নেপোলিয়নের বাহিনী ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ন ৬ লক্ষ সেনার মধ্যে মাত্র ৫০,০০০ সেনা নিয়ে প্যারিসে ফিরতে বাধ্য হয়েছিলেন।

এভাবেই নেপোলিয়নের উচ্চাভিলাষী অভিযান ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ফলে ইউরোপে নেপোলিয়নের সামরিক প্রতিভা ও জনপ্রিয়তা দারুণভাবে হ্রাস পায়। এমনকি এই যুদ্ধ নেপোলিয়নের ব্যর্থতা ডেকে আনে এবং তাকে পতনের দিকে ঠেলে দেয়। ইউরোপের অন্যান্য শক্তিও মনে করতে থাকে যে নেপোলিয়ন আর অপরাজেয় নয়। যদিও খুব দ্রুতই আবার শক্তিবৃদ্ধি করে নেপোলিয়ন রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের প্রাশিয়ার মুক্তির সংগ্রাম

রাশিয়ায় নেপোলিয়ন বোনাপার্টের পরাজয় ইউরোপে নব উন্মাদনা সৃষ্টি করে। নেপোলিয়নের দুর্দিনে জার্মানিরা প্রতিশোধ গ্রহণের মোক্ষম সময় মনে করে। ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রাশিয়া ও রাশিয়া একত্রিত হয়ে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্যেই আবার রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, সুইডেনকে নিয়ে ইংল্যান্ড আবার জোট তৈরি করে। দক্ষিণ দিক থেকে রাশিয়া ও প্রাশিয়া ফ্রান্সের অভিমুখে যুদ্ধযাত্রা শুরু করে। উত্তর দিক থেকে সুইডেনের সেনারা এগিয়ে আসতে থাকে।

এই খবর পেয়েই নেপোলিয়ন বোনাপার্ট অস্ট্রিয়া আক্রমণ করে জীবনের শেষ বড় বিজয় অর্জন করেন। যদিও এ বিজয় ছিল ক্ষণস্থায়ী। কারণ, মিত্র শক্তি চতুর্দিক থেকে নেপোলিয়নকে ঘিরে ফেলে। অবশেষে নেপোলিয়ন লাইপজিগে তিন দিন যুদ্ধ (১৮১৩ খ্রিস্টাব্দ) করে ব্যর্থ অবস্থায় ফ্রান্সে ফিরে যান। ফ্রান্সের বাইরের সকল ভূখণ্ডই তখন স্বাধীন হয়ে যায়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সিংহাসন ত্যাগ

১৮১৪ সালে যুদ্ধে জয়ী মিত্ররা নেপোলিয়নকে সন্ধি করার আমন্ত্রণ জানালে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে মিত্র বাহিনী একত্রে আক্রমণ করে ফ্রান্স দখল করে নেয়। এরপর ৬ এপ্রিল নেপোলিয়ন ফন্টেন ব্ল্যু চুক্তির মাধ্যমে সিংহাসন ত্যাগ করে ভূমধ্যসাগরের এলবা দ্বীপে চলে যান।

এভাবেই নেপোলিয়নের রাজনৈতিক জীবনের যবনিকা নেমে আসে। এলবা দ্বীপে যাওয়ার ঠিক আগে তিনি বলেছিলেন, “আমি সিংহাসন ত্যাগ করলাম, কিন্তু আমি কিছুই ছেড়ে গেলাম না” (“I abdicate, I yield nothing.”)।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের প্রত্যাবর্তন ও একশত দিবসের রাজত্ব

নেপোলিয়নের নির্বাসনের ফলে ফ্রান্সে চতুর্দশ লুইয়ের ভাই অষ্টাদশ লুইকে সিংহাসনে বসায় মিত্র শক্তি। কিন্তু ফরাসী জনগণ তার প্রতি রুষ্ট হন। সারাদেশে গোলযোগ লেগে যায়। দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় দেশ। সেনাবাহিনীও এক প্রকার বিদ্রোহ করে বসে।

এই পরিস্থিতিতে নেপোলিয়ন ভীষণ উৎসাহিত হয়ে উঠেন এবং বিশেষ কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই এলবা দ্বীপ থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। জনগণও তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়। তাকে বাধা দেবার কেউই ছিলনা। নেপোলিয়ন ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ প্যারিসে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আবার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন এবং ১০০ দিন রাজত্ব করেন। কিন্তু তিনি আর শক্তিশালী সরকার গঠন করতে সমর্থ হননি।

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের ওয়াটার্লুর যুদ্ধ

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের সিংহাসনে আরোহণের কথা শুনে মিত্র বাহিনী আবার নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করতে এগিয়ে আসে। নেপোলিয়নও অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে শেষবারের মতো লক্ষাধিক সৈন্য সংগ্রহ করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে বিখ্যাত ওয়াটার্লুর যুদ্ধে সম্মিলিত প্রাশিয়া ও ইংরেজ বাহিনীর কাছে চূড়ান্তভাবে পরাজিত হন। এটিই ছিল নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনের শেষ যুদ্ধ।

উপসংহার :- ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে নেপোলিয়নকে ফ্রান্স থেকে পাঁচ হাজার মাইল দূরে মধ্য আটলান্টিক মহাসাগরের দুর্গম সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত করা হয়। এই স্থানেই ছয় বছর অতিবাহিত করার পর ১৮২১ সালে এই মহান শক্তিশালী বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনাবসান হয়। এর মাধ্যমেই ম্লান হয়ে যায় একজন সফল বিজেতার সকল অর্জন।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য (FAQ) ?

১. নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনের শেষ যুদ্ধ কি ছিল?

নেপোলিয়ন বোনাপার্টের জীবনের শেষ যুদ্ধ হল – ওয়াটার লুর যুদ্ধ (১৮ জুন ১৮১৫ খ্রিঃ) ।

২. নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে কোন্ দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয় ?

নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে ‘সেন্ট হেলেনা’ দ্বীপে নির্বাসন দেওয়া হয় ।

৩. নীল নদের যুদ্ধে নেপোলিয়ন কার কাছে পরাজিত হন ?

ইংরেজ সেনাপতি নেলসন ।

৪. নেপোলিয়নের জন্মস্থান কোন দ্বীপ?

কর্সিকা দ্বীপ।

Leave a Reply

Translate »