নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান

নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান প্রসঙ্গে নেপোলিয়ন ও রাশিয়ার বিরোধের কারণ হিসেবে টিলসিটের সন্ধির বিফলতা, গ্ৰ্যাণ্ড ডাচি অফ ওয়ারশ গঠন, ওল্ডেনবার্গ দখল, অস্ট্রিয়ার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক মহাদেশীয় ব্যবস্থা, কারণের গুরুত্ব, রুশ অভিযানের সূত্রপাত, নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী, রাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া, রাশিয়ার পোড়ামাটি নীতি, বোরোডিনোর যুদ্ধ, মস্কো দখল, স্পেনের যুদ্ধে ব্যর্থতা, দিশেহারা সেনাদল, প্রত্যাবর্তন, লিও টলস্টয়ের মন্তব্য, নেপোলিয়নের ব্যর্থতার কারণ ও নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানের তাৎপর্য সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান

সময়কাল১৮১২ খ্রিস্টাব্দ
অভিযানকারীনেপোলিয়ন বোনাপার্ট
রাশিয়ার জারপ্রথম আলেকজান্ডার
রাশিয়ার যুদ্ধনীতিপোড়ামাটি নীতি
ফলাফলনেপোলিয়নের ব্যর্থতা
নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান

ভূমিকা:- ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে টিলসিটের সন্ধি দ্বারা ফ্রান্স ও রাশিয়ার মধ্যেমৈত্রী গড়ে ওঠে, এবং পরের বছর ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দে এরফার্ট-এর সন্ধি দ্বারা এই মৈত্রীচুক্তি সমর্থিত হয়। তা সত্ত্বেও ফ্রান্স-রুশ মৈত্রী বেশি দিন স্থায়ী হয় নি। নেপোলিয়নকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক ব্যাপক অভিযানে অগ্রসর হতে হয়। তাঁর নিজের মতে, এই অভিযান ছিল তাঁর জীবনের সর্বাপেক্ষা জটিল ও বৃহত্তর পরিকল্পনা।

বিরোধের কারণ

ফ্রান্স ও রাশিয়ার মৈত্রীতে ফাটল ধরার জন্য বেশ কয়েকটি কারণকে দায়ী করা যায়।

(১) টিলসিটের সন্ধির বিফলতা

টিলসিটের সন্ধি স্বাক্ষরের কিছুদিন পরেই নেপোলিয়ন সম্পর্কে জারের আশাভঙ্গ হয়। যেমন –

(ক) তুরস্কের বিভাজন

তুরস্ক সাম্রাজ্যকে ভাগ করে নেওয়া এবং কনস্ট্যান্টিনোপল দখলের উদ্দেশ্যেই জার এই সন্ধি সম্পর্কে আগ্রহী হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি শীঘ্রই বুঝে যান যে, তাঁর এই উদ্দেশ্য সফল হওয়ার নয়—নেপোলিয়ন কোনওভাবেই তুরস্ক বিভাজনে রাজি হবেন না।

(খ) নেপোলিয়নের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ

এই সন্ধির দ্বারা নেপোলিয়ন তুরস্কের বিরুদ্ধে রাশিয়াকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু রুশ-তুরস্ক যুদ্ধের সময় নেপোলিয়ন তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন নি। এতে জার প্রবল ক্ষুব্ধ হন।

(গ) সুইডেনের বিরুদ্ধে সাহায্য না করা

নেপোলিয়ন সুইডেনের বিরুদ্ধেও জারকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। এই প্রতিশ্রুতিও পালিত হয় নি।

(ঘ) জারের উপলব্ধি

মধ্যেই জার বুঝতে পারেন যে, নেপোলিয়ন রাশিয়াকে তাঁর তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চান।

(ঙ) স্টাইনের পরামর্শ

প্রাশিয়ার নির্বাসিত দেশপ্রেমিক স্টাইন এই সময় মস্কোতে বসবাস করছিলেন। তিনি রুশ মন্ত্রীদের বোঝান যে, জার-শাসিত রাশিয়ার ফরাসি তোষণ নীতির পরিবর্তন হওয়া দরকার — অন্যথায় রাশিয়া নিজেই বিপন্ন হবে।

(চ) প্ররোচনা

ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতও রুশ নেতৃবৃন্দকে এইভাবেই বোঝাতে থাকেন এবং জারকে নেপোলিয়ন-বিরোধী বিভিন্ন রাষ্ট্রজোটে যোগ দেওয়ার জন্য প্ররোচিত করতে থাকেন। এর ফলে জার টিলসিটের সন্ধি সম্পর্কে নতুন করে ভাবনা-চিন্তা শুরু করেন।

(২) গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশ

  • (ক) প্রাশিয়া-অধিকৃত পোল্যান্ডের অংশ নিয়ে নেপোলিয়ন গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশগঠন করেন। ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার কাছ থেকে গ্র্যান্ড ডাচি অফ গ্যালিসিয়া দখল করে এর আয়তন বৃদ্ধি করা হয়।
  • (খ) রাশিয়ার ধারণা হয় যে, নেপোলিয়ন পূর্বেকার স্বাধীন পোল্যান্ড রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করছেন এবং সেক্ষেত্রে তিনি রাশিয়া কর্তৃক অধিকৃত পোল্যান্ডের অংশগুলিকে নবগঠিত গ্র্যান্ড ডাচি অফ ওয়ারশ-এর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেবেন।
  • (গ) জার এই মর্মে নেপোলিয়নের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি চান যে, পোল্যান্ডকে কখনোই একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রে পরিণত করা হবে না। নেপোলিয়ন এই প্রতিশ্রুতি দিতে অস্বীকৃত হলে জার সন্দিগ্ধ, ভীত ও ক্ষুব্ধ হন।

(৩) ওল্ডেনবার্গ দখল

  • (ক) ওল্ডেনবার্গের ডিউক ছিলেন জারের ভগ্নিপতি।তিনি জারের প্রিয় ভগিনী, ক্যাথারিনকে বিবাহ করেন। তিনি মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা অগ্রাহ্য করলে নেপোলিয়ন এই রাজ্যটি দখল করেন।
  • (খ) এই আক্রমণ ছিল টিলসিটের সন্ধির পরিপন্থী। এর ফলে জার এবং রুশ অভিজাত সম্প্রদায় নেপোলিয়নের প্রতি প্রচণ্ড বিরক্ত হন। তাঁরা নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন।

(৪) অস্ট্রিয়ার সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক

  • (ক) নেপোলিয়ন জারের ভগিনী আনা-কে বিবাহের প্রস্তাব দেন। জার, তাঁর মাতা ও রুশ দরবার এই প্রস্তাবে অসম্মতি জানালে তিনি প্রবল অপমানিত বোধ করেন।
  • (খ) এই অবস্থায় তিনি অস্ট্রিয়ার হ্যাপসবার্গ-বংশীয়া রাজকন্যা মারিয়া লুইসা-কে বিবাহ করেন। এর ফলে জার বিপদের আশঙ্কা করেন। তিনি মনে করেন যে, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়া ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাশিয়ার ক্ষতি করবে।

(৫) মহাদেশীয় ব্যবস্থা

  • (ক) মহাদেশীয় অবরোধ প্রথা গ্রহণ করে রাশিয়া প্রবল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ইংল্যান্ড-জাত দ্রব্যাদির অভাবে রুশ জনসাধারণের দুর্দশা বৃদ্ধি পায়। রাশিয়ার কারখানাগুলি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়, বেকার সমস্যা বৃদ্ধি পায় এবং জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়।
  • (খ) রাশিয়া অবরোধ প্রথা মানতে বাধ্য হলেও নেপোলিয়ন নিজে ফরাসি বণিকদের ইংল্যান্ড থেকে মাল আমদানির লাইসেন্স দিতে থাকেন। এর ফলে ক্ষুব্ধ জার ১৮১০ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার বন্দরগুলি ব্রিটিশ বাণিজ্যের জন্য খুলে দেন। এর ফলে মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থায় ফাটল ধরে এবং নেপোলিয়ন প্রবল ক্ষুব্ধ হন।

কারণের গুরুত্ব

নেপোলিয়ন ও জারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতির জন্য কোন কারণটি সর্বাপেক্ষাগুরুত্বপূর্ণ তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য আছে।যেমন –

  • (১) ডেভিড টমসন-এর মতে, নেপোলিয়নের রুশ অভিযানের মূল কারণ হল মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা কার্যকর করতে জারের অনিচ্ছা ও অস্বীকৃতি। মর্স স্টিফেন্স ও হবসবমও অনুরূপ বক্তব্য প্রকাশ করেছেন।
  • (২) গ্রান্ট ও টেম্পারলি-র মতে, উভয় দেশের মধ্যে বিরোধের মূল ও প্রধান কারণ হল পোল্যান্ডের সমস্যা। নেপোলিয়নের জীবনীকার ভিনসেন্ট ক্রোনিন-ও অনুরূপ বক্তব্য রেখেছেন।
  • (৩) ঐতিহাসিক কোবান এ সম্পর্কে একটি ভিন্নতর বক্তব্য রেখেছেন। এই ব্যাপারে তিনি মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা অপেক্ষা রুশ-তুরস্ক মৈত্রীর উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
  • (৪) ফরাসি-রুশ মৈত্রী ভেঙে পড়ার জন্য কোন কারণটি সবচেয়ে বেশি দায়ী ছিল, তা নির্ণয় করা দুরূহ, তবে এ কথা বললে অযৌক্তিক হবে না যে, এই দুই দেশের মধ্যে প্রকৃত মিত্রতার কোনও সুযোগই ছিল না, এবং উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষই ছিল স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। এছাড়া নেপোলিয়নের তুরস্ক ও পোল্যান্ড নীতি ছিল ভ্রান্ত, এবং রাশিয়ার উপর মহাদেশীয় অবরোধ ব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে তিনি খুবই অন্যায় করেছিলেন।

রুশ অভিযানের সূত্রপাত

জারকে শাস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে নেপোলিয়ন মস্কো অভিমুখে যাত্রা করেন। লিও টলস্টয় তাঁর বিখ্যাত মহাকাব্যিক উপন্যাস ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ এই কাহিনিকে অমর করে রেখেছেন।

সেনাবাহিনী

  • (১) ফ্রান্স, হল্যান্ড, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, ইতালি, সুইজারল্যান্ড প্রভৃতি ইউরোপের প্রায় কুড়িটি দেশ থেকে সংগৃহীত ৬ লক্ষ ৭৫ হাজারের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে গঠিত হল নেপোলিয়নের তথাকথিত ‘মহতী সেনাদল’ (Grand Army)।
  • (২) নানা ধরনের পোষাক ও নানা অবয়বের সৈনিকদের দেখে মনে হতে পারে যে, সারা ইউরোপই যেন নেপোলিয়নের হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। সংখ্যার দিক থেকে বিশাল হলেও এরা সবই ছিল অভিজ্ঞতা ও উদ্যমহীন ভাড়াটে সৈনিক।
  • (৩) এই দলে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ফরাসি সৈন্যের সংখ্যা ছিল অর্ধেকেরও কম। প্রতিপক্ষ রাশিয়ার সৈন্যসংখ্যা ছিল মাত্র ২ লক্ষ। নেপোলিয়ন মনে করেছিলেন যে, সংখ্যাধিক্যের জোরে ও আক্রমণাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমে তিনি অতি সহজে এবং অতি দ্রুত তাঁর রুশ অভিযান সমাপ্ত করবেন।

রাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়া

১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ২৬শে জুন নেপোলিয়নের ‘মহতী সেনাদল’ টিলসিটের কাছে নিয়েম নদী অতিক্রম করে রাশিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। পাঁচ বছর আগে ১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে এই টিলসিটেই নেপোলিয়ন ও জার ‘আমৃত্যু বন্ধুত্বের’ চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন।

পোড়ামাটি নীতি

  • (১) রুশ সেনাবাহিনী নেপোলিয়নকে বাধা না দিয়ে এবং সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে ক্রমাগত সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে পশ্চাদপসরণ করতে থাকে। পশ্চাদপসরণের কালে তারা‘পোড়ামাটি নীতি’গ্রহণ করে।
  • (২) এই নীতি অনুসারে রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস করে, খাদ্যশস্য, শস্যক্ষেত্র, শহর ও জনপদ, বাসস্থান, বস্ত্র প্রভৃতিতে অগ্নিসংযোগ করে এবং পানীয় জলে বিষ মিশিয়ে দেয় যাতে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী সেগুলি ব্যবহার করতে না পারে।
  • (৩) রুশ সেনাদের এই ‘পোড়ামাটি নীতি’ গ্রহণ এবং তাদের অনুসরণ করে ‘মহতী সেনাদলের’ রাশিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশের ফলে নেপোলিয়নের খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
  • (৪) বোরোডিনোর যুদ্ধের আগে ‘মহতী সেনাদলের হাতে মাত্র ১৩ দিনের ময়দা সঞ্চিত ছিল। এ সময় প্রকৃতিও নেপোলিয়নের বিরোধিতা শুরু করে।জুলাই-এ প্রবল বর্ষণ, আগস্টে অসহা চাপা গরম এবং পরে প্রবল শীত নেপোলিয়নের বাহিনীর অবস্থা শোচনীয় করে দেয়।

বোরোডিনোর যুদ্ধ

  • (১) নেপোলিয়নের আক্রমণের সূচনায় রুশ বাহিনীর নেতৃত্ব ছিল বার্কলে ও বাগ্রাসিও-রহাতে। তাঁদের ক্রমাগত পশ্চাদপসরণের নীতি রুশ জনমত ও জারের অভিজাতদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
  • (২) জনমতের চাপে বৃদ্ধ সেনানায়ক কুটুসফ সৈনাপত্য গ্রহণ করেন। ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ৭ই সেপ্টেম্বর মস্কো থেকে ৭৫ মাইল দূরে বোরোডিনো গ্রামে রুশ বাহিনী সর্বপ্রথম ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।
  • (৩) বোরোডিনোর যুদ্ধে (Battle of Borodino) নেপোলিয়ন জয়যুক্ত হলেও তাঁর রসদ ও সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে নেপোলিয়নের ৩০ হাজার এবং রুশ বাহিনীর ৪০ হাজার সেনা প্রাণ হারায়।রুশ বাহিনী আত্মসমর্পণ না করে পশ্চাদপসরণ করে মস্কোর পিছনে চলে যায়।

মস্কো দখল

  • (১) বোরোডিনো থেকে মস্কোর দুর্গম পথ সাত দিনে অতিক্রম করে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের১৪ই সেপ্টেম্বর তিনি মস্কোয় পৌঁছান। এই দীর্ঘ পথ অতিক্রমকালে রোগ, মহামারী ওশীতের প্রকোপে তাঁর সেনাদলের এক বিরাট অংশ প্রাণ হারায়।
  • (২) তিনি মাত্র ১ লক্ষ সৈন্য নিয়ে বিনা বাধায় রাজধানী মস্কোয় প্রবেশ করেন। নেপোলিয়নের মস্কো বিজয় ছিল শূন্য বিজয়। মস্কো নগরী তখন ছিল জনশূন্য। মস্কোর সব লোকজন সরিয়ে দিয়ে রুশরা শহরটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে সমস্ত নগরী ভস্মীভূত হয়ে যায়।
  • (৩) প্রবল খাদ্যাভাব, বাসস্থানের অভাব এবং অকস্মাৎ শীতের আবির্ভাবে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী চরম সমস্যার সম্মুখীন হয়। এইসব সত্ত্বেও নির্বান্ধব নেপোলিয়ন মস্কোয় পাঁচ সপ্তাহ অপেক্ষা করেন।
  • (৪) নেপোলিয়নের আশা ছিল যে জার শীঘ্রই শান্তির প্রস্তাব করবেন। কিন্তু সে রকম কিছু হল না। মস্কো থেকে ৩০০ মাইল দূরে সেন্ট পিটার্সবার্গে অবস্থানরত জার এবার পাল্টা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করেন।

স্পেনের যুদ্ধে ব্যর্থতা

ইতিমধ্যে নেপোলিয়নের স্পেনের যুদ্ধে ব্যর্থতার খবর ছড়িয়ে পড়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে চতুর্থ শক্তিজোট গড়ে উঠেছে।

দিশেহারা সেনাদল

এই সময় আকস্মিকভাবে দীর্ঘ চল্লিশ বছরের নজির ভেঙে ছয় সপ্তাহ আগেই রাশিয়াতে শীত পড়ে যায়। প্রবল শীত, তুষারপাত, বরফ ঝড় এবং শীতবস্ত্র, বাসস্থান ও খাদ্যের চরম অভাব ও সেই সঙ্গে ‘টাইফাস’ নামক ভয়ঙ্কর জ্বরের প্রকোপে নেপোলিয়নের সেনাদল দিশেহারা হয়ে পড়ে।

প্রত্যাবর্তন

  • (১) নেপোলিয়ন উপলব্ধি করেন যে, তিনি ভয়ঙ্কর বিপদের জালে জড়িয়ে পড়েছেন। এই অবস্থায় ১৯শে অক্টোবর তিনি গ্র্যান্ড আর্মি-র অবশিষ্ট সৈন্যদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন।
  • (২) এই সময়েও ক্ষুধা, বৃষ্টি, শীত, তুষারপাত ও জ্বরের প্রকোপ, ‘কোসাক গেরিলা বাহিনী, রুশ গোলন্দাজ ও বন্যজন্তুর সম্মিলিত আক্রমণে তাঁর হাজার হাজার সৈন্য পথিমধ্যে প্রাণ হারায়।”
  • (৩) এইভাবে মাত্র ৩০ থেকে ৫০ হাজার সৈন্য, বিরাট অপমানের বোঝা ও ব্যর্থতার গ্লানি নিয়ে নেপোলিয়ন স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

লিও টলস্টয়ের মন্তব্য

নেপোলিয়নের এই শোচনীয় ব্যর্থতার জন্য বিখ্যাত ঔপন্যাসিক লিও টলস্টয় রাশিয়ার মানুষের সংগ্রামী মনোভাবকে কৃতিত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে এই বিজয়ের নায়ক সেনাপতি কুটুসফ বা জার আলেকজান্ডার নন—রুশ জনগণই হলেন প্রকৃত নায়ক।

ব্যর্থতার কারণ

  • (১) ডেভিড টমসনের মতে, রাশিয়া অভিযান ছিল নেপোলিয়নের সবচেয়ে নাটকীয় ও ক্ষতিকারক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে তাঁর ব্যর্থতা অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত ছিল না। ক্ষমতার দম্ভে তিনি বাস্তববোধ এবং সম্ভব-অসম্ভবের সীমারেখা হারিয়ে ফেলেন।
  • (২) ইংল্যান্ডের সঙ্গে বোঝাপড়া শেষ করার আগেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তিনি মারাত্মক ভুল করেন।
  • (৩) রুশ জনগণের সংগ্রামী মনোভাব, রাশিয়ার নতুন রণকৌশল, কুটুসফ-এর দক্ষ সৈনাপত্য, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য জারের দৃঢ় মনোভাব, যথাসময়ের পূর্বেই শীতের আবির্ভাব, নেপোলিয়নের অরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সর্বোপরি নেপোলিয়নের কিছু মারাত্মক ভুল তাঁর পতনকে অনিবার্য করে তোলে।

তাৎপর্য

নেপোলিয়নের মস্কো অভিযানের ব্যর্থতা তাঁর সাম্রাজ্যের ভিত্তিমূলে প্রবল আঘাত হানে। এই ঘটনার তাৎপর্যছিল সুদূরপ্রসারী।যেমন –

(১) অপরাজেয় ভাবমূর্তিতে আঘাত

এই দুর্ভাগ্যজনক অভিযান কেবলমাত্র নেপোলিয়নের সামরিক ক্ষমতাকেই ধূলিসাৎ করে নি, নেপোলিয়নের অপরাজেয় ভাবমূর্তির উপরেও প্রবল আঘাত হানে।

(২) প্রতিভা অস্তাচলগামী

স্পেনীয় যুদ্ধে তিনি পরাজিত হয়েছিলেন জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ একটি জাতির ইচ্ছাশক্তির কাছে, কিন্তু রাশিয়াতে তাঁর পরাজয় ঘটে কূটকৌশলের কাছে। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, তাঁর প্রতিভা অস্তাচলগামী।

(৩) জাতিসমূহের যুদ্ধ

নেপোলিয়নের ভাগ্যবিপর্যয়ের ফলে সমগ্র ইউরোপে অভূতপূর্ব উন্মাদনা দেখা দেয়। রাশিয়া, প্রাশিয়া, ইংল্যান্ড নতুন উদ্যমে নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে—শুরু হয় ‘জাতিসমূহের যুদ্ধ’।

(৪) চক্রান্ত

নেপোলিয়নের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে ফ্রান্সের অভ্যন্তরে তাঁর বিরুদ্ধে চক্রান্ত শুরু হয়। ম্যালে ও ল্যাফো নামক দুই ষড়যন্ত্রকারী রটিয়ে দেন যে রাশিয়ায় নেপোলিয়নের মৃত্যু হয়েছে।

(৫) প্রতিবাদের সূত্রপাত

যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে হত সাধারণ মানুষকে। এর ফলে ফ্রান্স ও ফ্রান্সের অধীনস্থ দেশগুলিতে প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ফরাসি কৃষক সমাজ মাদক দ্রব্য, তামাক ও লবণের উপর বাড়তি কর আরোপ মেনে নিতে পারে নি। ক্রমাগত যুদ্ধের ফলে শিল্প-বাণিজ্যে ভাটা পড়ে এবং সর্বত্রই তাঁর শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়।

(৬) বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি

নেপোলিয়নের অধীনস্থ রাজ্যগুলি ওয়েস্টফেলিয়া, ইতালি, নেপলস্ ও প্রাশিয়াকে যুদ্ধের ব্যয়ভার বহন করতে হত। করভার যুদ্ধের লেভি এবং সেনাবাহিনীকে পোষণ করার খরচ সর্বত্রই এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি করে।

উপসংহার:- রুশ অভিযান কেবলমাত্র একটি সামরিক বিপর্যয়ই নয়, বরং বলা যায় যে, নেপোলিয়নের ভাগ্যলক্ষ্মী গ্র্যান্ড আর্মি-সহ রাশিয়ার তুষারে সমাধিস্থ হয়েছিল।বলা হয় যে, “মস্কো অভিযান ছিল নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদের শেষ সঙ্গীত।”

(FAQ) নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযান সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. টিলসিটের সন্ধি কবে কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

১৮০৭ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন ও রাশিয়ার জার।

২. নেপোলিয়ন কখন রাশিয়া অভিযান করেন?

১৮১২ খ্রিস্টাব্দে।

৩. রাশিয়া অভিযানে নেপোলিয়নের সেনাদলের নাম কি ছিল?

মহতী সেনাদল বা গ্ৰ্যাণ্ড আর্মি।

৪. নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধনীতির নাম কি ছিল?

পোড়ামাটি নীতি।

৫. নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সেনাপতি কে ছিলেন?

কুটুসফ বা কুটুজফ।

৬. নেপোলিয়নের রাশিয়া অভিযানের সময় রাশিয়ার জার কে ছিলেন?

প্রথম আলেকজান্ডার।

Leave a Reply

Translate »