ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতি

হিটলারের প্রতি ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতি প্রসঙ্গে রাশিয়ার প্রস্তাব, তোষণ নীতি, নীতির প্রবর্তক, স্পেনের বিদ্রোহ, মিউনিখ চুক্তি, তোষণ নীতির অসারতা ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে জানবো।

ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতি

বিষয় তোষণ নীতি
গ্রহণকারী দেশ ইংল্যান্ডফ্রান্স
উদ্ভাবক নেভিল চেম্বারলেন
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতি

ভূমিকা:- বিংশ শতকের তৃতীয় দশকে ইউরোপ -এর একনায়কতন্ত্রী দেশ গুলির আগ্ৰাসনের বিরুদ্ধে ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি কোনোরকম প্রতিরোধের পরিবর্তে যে আপস নীতি গ্রহণ করেছিল তা তোষণ নীতি নামে পরিচিত।

রাশিয়ার প্রস্তাব

হিটলার কর্তৃক ইউরোপে আগ্রাসী নীতি গ্রহণ রাশিয়াকে শংকিত করে তোলে। হিটলারকে প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে রাশিয়া ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে একটি পশ্চিমী জোট গঠনে উৎসুক ছিল এবং এই মর্মে সে প্রস্তাবও দেয়।

সাম্যবাদ অধিক বিপজ্জনক

ইঙ্গ-ফরাসি কুটনীতিকরা মনে করতেন যে, তাদের কাছে নাৎসিবাদ ও সাম্যবাদ দুই-ই বিপজ্জনক হলেও সামাবাদ আরও বেশি বিপজ্জনক।

ভার্সাই সন্ধি

ইঙ্গ-ফরাসি শক্তি হিটলারকে সাম্যবাদের বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন যে, ভার্সাই সন্ধিতে যথার্থই জার্মানিইতালির প্রতি অন্যায় করা হয়েছে। সুতরাং বিশ্বশান্তির তাগিদে তাদের কিছু দাবি মেনে নিলে কোনও অন্যায় হবে না।

তোষণ নীতি

এইভাবে জার্মানি ধীরে ধীরে পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে একদিন রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে। তাতে ইউরোপের শান্তি বজায় থাকবে এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কোনও অসুবিধা হবে না। ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ কর্তৃক অনুসৃত এই নীতি তোষণ নীতি নামে পরিচিত।

প্রবর্তক

এই নীতির উদ্‌গাতা হলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেন, যদিও এর সূচনা হয় পূর্ববর্তী প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলি বল্ডউইন (১৯৩৫-১৯৩৭ খ্রিঃ)-এর আমলে। এই তোষণ নীতির ফলে হিটলারের একের পর এক রাজ্যগ্রাস সত্ত্বেও ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ চুপচাপ ছিল।

ভার্সাই সন্ধির বিরোধিতা

ভার্সাই সন্ধির ৫ নং অনুচ্ছেদ দ্বারা জার্মানির উপর যে নিরস্ত্রীকরণের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া হয়, হিটলার তা মানতে রাজি ছিলেন না। তাঁর দাবি ছিল যে, এই শর্ত সবার উপরেই আরোপিত হোক।

ইঙ্গ-জার্মান নৌচুক্তি

নানা আলাপ-আলোচনার পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বল্ডউইন ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইঙ্গ-জার্মান নৌচুক্তি স্বাক্ষর করে জার্মানির অস্ত্রসজ্জার দাবি মেনে নেন।

জার্মান নৌশক্তি বৃদ্ধি

স্থির হয় যে, জার্মানি ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত নৌবহর রাখতে পারবে। এই চুক্তি হিটলারের আগ্রাসী মনোভাবকে পরোক্ষ সমর্থন জানায়। জার্মানির বিদেশমন্ত্রী রিবেনট্রপ ঘোষণা করেন যে, “ইঙ্গ-জার্মান নৌচুক্তির অর্থই হল ভাসাই চুক্তির বিলোপ।”

ইতালির আবিসিনিয়া দখল

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইতালি আবিসিনিয়া আক্রমণ করলে লিগ অব নেশনস ইতালিকে ‘যুদ্ধ অপরাধী’ বলে ঘোষণা করে, এবং লিগ চুক্তিপত্রের ১৬ নং ধারা অনুযায়ী ইতালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধের ডাক দেয়।

ব্রিটেনের সাহায্য

ব্রিটেন জাতিসংঘ -এর ডাক উপেক্ষা করে ইতালিকে নানাভাবে সাহায্য করে। এর ফলে আইনভঙ্গকারী আগ্রাসী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে লিগের অর্থনৈতিক অবরোধের প্রথম পরীক্ষ ব্যর্থ হয়। ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ মনে করত যে, ইতালি বা জার্মানির বিরোধিতা করলে তারা ঐক্যবদ্ধ হবে।

স্পেনে বিদ্রোহ

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে রাশিয়ার মদতপুষ্ট স্পেন -এর প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর একটি গোষ্ঠী জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। জার্মানি ও ইতালি ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে এগিয়ে এলেও ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স চুপচাপ থাকে।

ফ্যাসিবাদ বিরোধী জোটের অভাব

এই সময় ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ যদি রাশিয়ার সঙ্গে মিলিত হত তাহলে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী একটি জোট গড়ে উঠত এবং হিটলার বা মুসোলিনি বেশি ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারতেন না।

আলোচনা

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রিয়ার সংযুক্তির ব্যাপারেও ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষের দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। হিটলারের অস্ট্রিয়া আক্রমণের প্রাক্কালে ব্রিটেন এই ব্যাপারে একই সঙ্গে ইতালি ও জার্মানির সঙ্গে আলোচনায় বসে।

অস্ট্রিয়ার সংযুক্তি

ব্রিটেনের বক্তব্য ছিল যে, জার্মানি যদি তার জাতীয়তাবাদী আশা-আকাঙ্ক্ষা পুরণের জন্য জার্মান ভাষা-ভাষী অস্ট্রিয়াকে নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করে, তাতে আপত্তির কিছু নেই। হতাশ ফ্রান্স অস্ট্রিয়ার ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করলেও অস্ট্রিয়াকে রক্ষা করতে অগ্রসর হয় নি।

মুসোলিনির অনীহা

রোম-বার্লিন অক্ষচুক্তির ফলে মুসোলিনিও কোনও বাধা দেন নি। তিনি বলেন যে, “অস্ট্রিয়াকে পাহারা দিয়ে তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।”

চেকোস্লোভাকিয়া সমস্যা

  • (১) এরপর হিটলারের নজর পড়ে রাশিয়া ও ফ্রান্সের মিত্র চেকোশ্লোভাকিয়ার দিকে। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের প্রবেশদ্বার এই দেশটি ছিল শিল্পসমৃদ্ধ এবং স্কোডার অস্ত্র কারখানার জন্য বিখ্যাত।
  • (২) সুতরাং নিজ শক্তিবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়া সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন। এখানকার সুদেতান অঞ্চল ছিল জার্মান-প্রধান এবং জার্মানির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন। হিটলারের প্ররোচনায় স্থানীয় জার্মানরা সরকার-বিরোধী দাঙ্গা শুরু করে।
  • (৩) সুদেতানে জার্মানদের স্বার্থরক্ষার উদ্দেশ্যে হিটলার যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন। বিচলিত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন বার্লিনে উপস্থিত হয়ে হিটলারকে বিরত হওয়ার অনুরোধ জানান। এতে কোনও কাজ হয় নি।

মিউনিখ চুক্তি

এই পরিস্থিতিতে মুসোলিনির মধ্যস্থতায় ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর মিউনিখে ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের, হিটলার ও মুসোলিনি-র মধ্যে এক চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা মিউনিখ চুক্তি নামে পরিচিত।

মিউনিখ চুক্তির শর্ত

এই চুক্তি অনুসারে সুদেতান অঞ্চল জার্মানিকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত হয় এবং হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার বাকি অংশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। এইভাবে ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির ফলে চেকোশ্লোভাকিয়ার এক বিরাট অংশ হিটলার বিনা যুদ্ধে দখল করেন।

তোষণ নীতির অসারতা

চেম্বারলেন মিউনিখ চুক্তিকে সম্মানজনক শান্তি বলে চিহ্নিত করেছেন, কিন্তু ইংল্যান্ডের যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের মতে, মিউনিখ চুক্তি ছিল ইংল্যান্ডের পক্ষে সম্পূর্ণ পরাজয়, কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষরের ছয় মাস পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মার্চ হিটলার সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেন। এর ফলে তোষণ নীতির অসারতা প্রমাণিত হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলির তোষণ নীতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে আত্মরক্ষার স্বার্থে রাশিয়া জার্মানির সঙ্গে অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। শেষ পর্যন্ত ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ তোষণ নীতি ত্যাগ করে পোল্যান্ড -এর অখণ্ডতা রক্ষায় অগ্রসর হলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়।

যুদ্ধের ঝুঁকি

ব্রিটেন ও ফ্রান্স যদি প্রথম থেকেই সক্রিয় প্রতিরোধ নীতি গ্রহণ করত বা রাশিয়ার সঙ্গে নাৎসি-বিরোধী জোট গড়ে তুলত তাহলে হিটলার যুদ্ধের ঝুঁকি নিতেন না।

উপসংহার:- গ্যাথর্ন হার্ডি, ট্রেভার রোপার প্রমুখ ঐতিহাসিকেরা তোষণ নীতিকে ভ্রান্ত ও অদূরদর্শি নীতি বলে মনে করেন। এই নীতি অনুসরণ করে ইউরোপীয় নেতৃবর্গ জার্মানির শক্তিবৃদ্ধিতে সাহায্য করেন এবং এর ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ত্বরান্বিত হয়।

(FAQ) ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. তোষণ নীতির উদ্ভাবক কে?

নেভিল চেম্বারলেন।

২. হিটলারের বিরুদ্ধে কোন কোন দেশ তোষণ নীতি গ্রহণ করে?

ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স।

৩. মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কবে?

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ।

Leave a Reply

Translate »