মিউনিখ চুক্তি

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত মিউনিখ চুক্তি প্রসঙ্গে চুক্তির পটভূমি, শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রস্তাব, মিউনিখ বৈঠক, মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর, চুক্তির শর্তাবলী, ফলাফল ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত মিউনিখ চুক্তি

ঘটনা মিউনিখ চুক্তি
সময়কাল ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দ
স্বাক্ষরকারী দেশ ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ডফ্রান্স
স্বাক্ষরকারী ব্যক্তি মুসোলিনি, হিটলার, চেম্বারলেন, দালাদিয়ের
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
মিউনিখ চুক্তি

ভূমিকা:- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক মুহূর্তে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের জার্মান তোষণ নীতির চরম প্রকাশ ছিল মিউনিখ চুক্তি। ঐতিহাসিক ল্যাংসামের মতে মিউনিখ চুক্তি ছিল জার্মান তোষণ নীতির শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।

মিউনিখ চুক্তির পটভূমি

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত মিউনিখ চুক্তির পটভূমি ছিল নিম্নরূপ। –

(১) চেকোশ্লোভাকিয়া সমস্যা

বিনা বাধায় অস্ট্রিয়া দখলের পর হিটলারের নজর পড়ে রাশিয়া ও ফ্রান্সের মিত্র জার্মানির পূর্ব সীমান্তে অবস্থিত চেকোশ্লোভাকিয়ার দিকে। ফলে দেখা দেয় চেকোস্লোভাকিয়া সমস্যা

(২) হিটলারের নুরেমবার্গ ভাষণ

১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর হিটলার তার বিখ্যাত নুরেমবার্গ বক্তৃতায় সুদেতান জার্মানদের জন্য স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন এবং সুদেতান জার্মানদের সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।

(৩) ইঙ্গ-ফরাসি বৈঠক

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন ও ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের এক বৈঠকে মিলিত হয়ে সিদ্ধান্ত নেন মে, চেকোস্লোভাকিয়াকে অবশ্যই জার্মান প্রধান এক বিরাট অঞ্চল জার্মানিকে ছেড়ে দিতে হবে।

(৪) হিটলারের বর্ধিত দাবি

ইতিমধ্যে হিটলার তার দাবি বর্ধিত করেন। তিনি জানান যে তার দাবি পূরণ না হলে ২৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তিনি সুদেতান অঞ্চল দখল করবেন।

শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রস্তাব

এই অবস্থায় আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট হিটলারের কাছে একটি সম্মেলনের মাধ্যমে এই বিবাদের শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রস্তাব দেন। ইতিমধ্যে তোষণ নীতির উদ্ভাবক চেম্বারলেন তার মত পরিবর্তন করে বলেন যে, কেবলমাত্র চেকোশ্লোভাকিয়ার জন্য তিনি সমগ্র ব্রিটিশ সাম্রজ্যকে যুদ্ধে জড়াতে পারেন না।

মিউনিখ বৈঠক

এই পরিস্থিতিতে হিটলার, মুসোলিনি, চেম্বারলেন ও ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের মিউনিখে এক বৈঠকে মিলিত হন। এই বৈঠকে রাশিয়া বা চেকোস্লোভাকিয়ার কোন প্রতিনিধি আহূত হননি।

মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর

মিউনিখ বৈঠকে উপস্থিত মুসোলিনি, হিটলার, চেম্বারলেন ও দালাদিয়ের এক মীমাংসায় উপনিত হন এবং ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯ সেপ্টেম্বর মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর করেন।

মিউনিখ চুক্তির শর্ত

এই চুক্তি অনুসারে স্থির হয় যে,

  • (১) সুদেতান অঞ্চল জার্মানিকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
  • (২) হিটলার চেকোস্লোভাকিয়ার বাকি অংশের সার্বভৌমত্বের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন যে, “সুদেতান জেলাই হল ইউরোপের কাছে আমার শেষ দাবি।”
  • (৩) ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১-১০ অক্টোবরের মধ্যে সুদেতান জেলা থেকে চেক সেনা ও চেক সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে ।
  • (৪) ব্রিটেন, ইতালি ও ফ্রান্স সুদেতান অঞ্চলের ও অবশিষ্ট চেকস্লাভিয়ার সীমানা স্থির করে দেবে।
  • (৫) উল্লিখিত সময়সীমার মধ্যে জার্মান বাহিনী ধাপে ধাপে সুদেতান অঞ্চলের দখল করে নেবে।
  • (৬) চার সপ্তাহের মধ্যে চেক সরকার সুদেতানের জার্মানদের চেক পুলিশ ও সেনাদল থেকে মুক্তি করে দিবে।
  • (৭) ব্রিটেন ও ফ্রান্স অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করবে।

মিউনিখ চুক্তির ফলাফল

  • (১) মিউনিখ চুক্তি ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির চূড়ান্ত পর্ব। এই চুক্তির ফলে চেকোশ্লোভাকিয়া তার পঞ্চাশ লক্ষ্য প্রজা-সহ (এর মধ্যে ১০ লক্ষ চেক ও শ্লোভাক) প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভূখণ্ড হারায়।
  • (২) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স একটি সার্বভৌম দেশের রাজ্যাংশ সেই দেশের বিনা অনুমতিতে হিটলারকে অর্পণ করে। হিটলার বিনা যুদ্ধে কেবলমাত্র হুমকির মাধ্যমে ভার্সাই সন্ধি অগ্রাহ্য করে বিনা রক্তপাতে সুদেতান জেলা জার্মানির অন্তর্ভুক্ত করেন।

কূটনৈতিক বিজয়

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন মিউনিখ চুক্তিকে ‘কুটনৈতিক বিজয়’ বলে অভিহিত করলেও নৈতিক দিক থেকে এই চুক্তি কখনোই সমর্থন করা যায় না। চেকোশ্লোভাকিয়ার মতামত না নিয়ে যে রকম নির্লজ্জভাবে তার অঙ্গহানি করা হয়েছিল কূটনৈতিক ইতিহাসে তার দৃষ্টান্ত বিরল।

টেলরের মন্তব্য

অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর-এর মতে, মিউনিখ সম্মেলন ছিল নির্লজ্জ আচরণের পরিচায়ক। এখানে ‘আন্তর্জাতিক ন্যায়নীতি’ জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছিল।

চার্চিলের মন্তব্য

ব্রিটিশ কূটনীতিক উইনস্টন চার্চিল-এর মতে, মিউনিখ চুক্তি ছিল ‘এক প্রথম শ্রেণির বিপর্যয়’। এই চুক্তি ছিল সার্বিক ও অবিমিশ্র পরাজয়। তিনি বলেন যে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যদি এই চুক্তি দ্বারা সম্মান অর্জন করে থাকেন, তাহলে ইংরেজি অভিধানে সম্মান কথাটির অর্থ পরিবর্তন করতে হবে।

টমসনের মন্তব্য

অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, চেকদের জন্য যৌথ নিরাপত্তার পরিবর্তে যৌথ ব্ল্যাকমেল বা ধারার নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল।

মিউনিখ চুক্তি লঙ্ঘন

ইঙ্গ-ফরাসি নেতৃত্বের ধারণা ছিল যে এইভাবে হিলারকে তুষ্ট করা যাবে, কিন্তু বাস্তবে তা সম্ভবপর হয় নি। মিউনিখ চুক্তি ভঙ্গ করে মাত্র ছয়মাসের মধ্যে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মার্চ হিটলার সম্পূর্ণ চেক রাজ্য দখল করে নেন।

মিউনিখ চুক্তি নানা দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যেমন –

  • (১) এই চুক্তির ফলে পূর্ব ইউরোপে জার্মান অগ্রগতির পথে সমস্ত বাধা অপসৃত হয়।
  • (২) সোভিয়েত ইউনিয়নকে বৈঠকে না ডাকায় জার্মানির বিরুদ্ধে সোভিয়েত সরকারের সঙ্গে পশ্চিমি রাষ্ট্রগুলির বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয় এবং তাদের মধ্যে জোট গঠনের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত হয়ে ওঠে।
  • (৩) এই চুক্তি ছিল ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষের জার্মান তোষণ নীতির এবং হিটলারের কাছে আত্মসমর্পণের চরম নিদর্শন।
  • (৪) এই চুক্তি হিটলারের কূটনৈতিক জয়ের পরিচায়ক।

উপসংহার:- ইঙ্গ-ফরাসি নেতৃত্বের তোষণ নীতির সুযোগ নিয়ে হিটলার বিনা যুদ্ধে কেবলমাত্র মৌখিক হুমকির দ্বারা ভার্সাই সন্ধি উপেক্ষা করে সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেন।

(FAQ) মিউনিখ চুক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কবে কাদের মধ্যে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়?

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইতালি, জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স।

২. মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষর করেন কারা?

মুসোলিনি, হিটলার, নেভিল চেম্বারলেন ও দালাদিয়ের।

৩. কোন চুক্তির মাধ্যমে হিটলার সুদেতান অঞ্চল লাভ করেন?

মিউনিখ চুক্তি।

৪. মিউনিখ চুক্তি ভঙ্গ করে হিটলার সমগ্ৰ চেকোস্লোভাকিয়া দখল করেন কবে?

১৫ মার্চ, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »