মুসোলিনি

ইতালির একচ্ছত্র নেতা মুসোলিনি -র জন্ম, রাজনৈতিক চেতনার সূচনা, কারারুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান, ফ্যাসিস্ট দল গঠন, ফ্যাসিস্ট প্রাধান্য, আবিসিনিয়া দখল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ গ্ৰহণ ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

মুসোলিনি

জন্ম ২৯ জুলাই, ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে
পরিচয় ইতালির একনায়ক
উপাধি ইল-ডুচে
যুদ্ধে সৈনিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
শেষ যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
মৃত্যু ২৮ এপ্রিল, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ
মুসোলিনি

ভূমিকা:- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির জাতীয় জীবনের এক সংকটময় পরিস্থিতিতে বেনিতি মুসোলিনি নামে এক নেতার আবির্ভাব হয়। তিনি ও তার ফ্যাসিস্ট দল ইতালিকে নব বলে বলিয়ান করে, নতুন পথে পরিচালিত করেন।

মুসোলিনির জন্ম

১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে জুলাই উত্তর ইতালির প্রোল্লিও গ্রামে এক দরিদ্র কর্মকারের গৃহে মুসোলিনির জন্ম। তাঁর মা ছিলেন একজন শিক্ষয়িত্রী। তাঁর পিতা ছিলেন সমাজতান্ত্রিক মতবাদে বিশ্বাসী।

রাজনৈতিক চেতনার সূচনা

তাঁর পিতার কর্মশালায় প্রতি সন্ধ্যার স্থানীয় সমাজতান্ত্রিক নেতারা সমবেত হতেন। তাই মুসোলিনির রাজনৈতিক চেতনার প্রাথমিক সূচনা হয়েছিল পিতার কর্মশালায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনো

আঠারো বছর বয়সে তিনি শিক্ষকতার চাকরি গ্রহণ করেন এবং কিছুদিন পর উচ্চতর শিক্ষার প্রয়োজনে সুইজারল্যান্ডের লুসান ও জেনেভা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন।

সুইজারল্যান্ড থেকে বহিস্কার

সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা এবং শ্রমিক ধর্মঘটে প্ররোচনা দানের জন্য তিনি সুইজারল্যান্ড থেকে বহিষ্কৃত হন।

কারারুদ্ধ

দেশে ফিরে তিনি পুরোপুরি সমাজতান্ত্রিক কাজকর্মে যুক্ত হয়ে যান। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে সরকার তাঁকে ‘বিপজ্জনক বিপ্লবী’ বলে চিহ্নিত করে চার বছরের জন্য কারারুদ্ধ করে।

আভান্তি পত্রিকা

কারামুক্তির পর ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে সমাজতান্ত্রিক দলের মুখপত্র ‘আভান্তি’ (‘প্রগতি’) পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন।

সৈনিক হিসেবে যুদ্ধে যোগদান

মুসোলিনি বলেন, “এই যুদ্ধ জনগণের বুদ্ধ। আজকের যুদ্ধ আগামীকালের বিপ্লবে পরিণত হবে।” যুদ্ধ-সংক্রান্ত মতামতের জন্য তিনি সমাজতন্ত্রী দল থেকে বহিষ্কৃত হন। একজন সৈনিক হিসেবে তিনি যুদ্ধে যোগদান করেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে গুরুতর আহত হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

ফ্যাসিস্ট দল গঠন

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে মার্চ মিলান শহরে ১১৮ জন কর্মচ্যুত সৈনিক ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তির এক সমাবেশে মুসোলিনি ‘ফ্যাসিস্ট দল’ গড়ে তোলেন। ল্যাটিন শব্দ ‘ফ্যাসেস’ থেকে ‘ফ্যাসিস্ট’ কথার উৎপত্তি। ‘ফ্যাসেস’ কথার অর্থ হল ‘শক্তি’। এই দলের প্রতীক ছিল ‘ফ্যাসিস’ বা দড়িবাঁধা কাষ্ঠদণ্ড বা আঁটি।

প্রতীক গ্ৰহণে উদ্দেশ্য

প্রাচীন রোমের রাজশক্তির প্রতীক ছিল এই ‘ফ্যাসিস’। প্রাচীন ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর উদ্দেশ্যে তিনি এই প্রতীক গ্রহণ করেন।

ফ্যাসিস্ট দলের লক্ষ্য

এই দলের লক্ষ্য ছিল –

  • (১) রাষ্ট্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করা,
  • (২) বিশ্বসভায় ইতালিকে পূর্ণ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে বলিষ্ঠ বিদেশ নীতি গ্রহণ করা,
  • (৩) কমিউনিস্ট প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষা করা এবং
  • (৪) ব্যক্তিগত ধন-সম্পত্তি রক্ষা করা।

‘ব্ল্যাক শার্টস্’

কর্মচ্যুত সৈনিক ও বেকার যুবকদের নিয়ে তিনি অচিরেই একটি আধা-সামরিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গড়ে তোলেন। অবিলম্বেই এটি একটি সুসজ্জিত ও সুশৃঙ্খল সেনাদলে পরিণত হয়। এই দলের সদস্যরা কালো পোশাক পরত বলে তাদের ‘ব্ল্যাক শার্টস্’ বলা হত।

‘ব্ল্যাক শার্টস্’ বাহিনীর কার্যকলাপ

তারা সমাজতন্ত্রী ও অপরাপর বিরোধী দলগুলির সভা-সমিতির উপর হামলা চালিয়ে সেগুলি ভেঙে দিত, বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ওইসব দলের ধর্মঘট বানচাল করত – এমনকী বিরোধী নেতাদের হত্যাও করত।

ফ্যাসিস্ট দলের উত্থান

১৯২২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে সমাজতন্ত্রীরা সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দিলে ফ্যাসিস্ট দলের উত্থান-পর্ব শুরু হয়। ইতালীয়রা ধর্মঘটের নামে অরাজকতা মানতে রাজি ছিল না। এর সুযোগ নিয়ে ফ্যাসিস্টরা সমাজতন্ত্রীদের উপর ব্যাপক আঘাত হানতে শুরু করে। বিভিন্ন শহরে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুসোলিনির রোম অভিযান

১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ২৭শে অক্টোবর মুসোলিনি তাঁর ‘ব্ল্যাক শার্টস্’ বাহিনীর ৫০ হাজার সদস্য নিয়ে রাজধানী রোম অভিমুখে অগ্রসর হন।

মন্ত্রীসভার পদত্যাগ

ইতালির তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লুইজি ফ্যাক্টা সামরিক আইন জারি করে এই অভিযান বন্ধ করতে চাইলে রাজা তৃতীয় ভিক্টর ইমান্যুয়েল সম্মত হন নি। এর ফলে রোমের ফ্যাক্টা মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।

ক্ষমতা দখল

মুসোলিনি ২৮শে অক্টোবর ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে রোম দখল করেন। ২৯শে অক্টোবর রাজা তাকে মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানান এবং পরদিন তিনি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এইভাবে ১৯২২ খ্রিস্টাব্দের ৩০ অক্টোবর মুসোলিনি ও তাঁর দল ক্ষমতা দখল করে।

ফ্যাসিস্ট বিরোধিতার পথ বন্ধ

১৯২২ খ্রিস্টাব্দে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হয়ে মুসোলিনি ইতালিতে ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হন। বিরোধী দলগুলির উপর নানা ধরনের অত্যাচার ও দমন-পীড়ন চলতে থাকে। বিরোধী নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ বা হত্যা করা হয়। এইভাবে সব রকম ফ্যাসিস্ট-বিরোধিতার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ফ্যাসিস্ট প্রাধান্য

১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে ইতালিতে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতে গুণ্ডামি, সন্ত্রাস ও কারচুপির দ্বারা ফ্যাসিবাদী দল ৬৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে।

একনায়ক উপাধি ধারণ

১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে যে নতুন সংবিধান প্রবর্তিত হয়, তার দ্বারা ইতালিতে অন্যান্য দল নিষিদ্ধ করে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তিত হয় এবং ইতালীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট দলের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মুসোলিনি ‘ইল-ডুচে’ বা একনায়ক উপাধি ধারণ করেন।

ফ্যাসিস্ট দল সর্বেসর্বা

একেবারে গ্রাম থেকে শুরু করে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট দলের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। মুসোলিনির ব্যবস্থায় দেশের মধ্যে ফ্যাসিস্ট দলই ছিল সর্বেসর্বা।

তরুণ ও যুব সংগঠন

ফ্যাসিস্টদের তরুণ ও যুব সংগঠন ‘বালিলা’, ‘অ্যাভান গার্ডিয়া’, ‘জিওভানি ফ্যাসিস্ট’ প্রভৃতির সদস্যদের দলীয় সদস্যপদ প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হত।

রাষ্ট্রদ্রোহিতা

বাক্‌-স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সভা-সমিতির স্বাধীনতা খর্ব করা হয় এবং ফ্যাসিবাদী সংবাদপত্র ব্যতীত সব সংবাদপত্রের প্রকাশনা বন্ধ করা হয়। ফ্যাসিবিরোধী সব সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়। ফ্যাসিস্ট দলের বিরোধিতাকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলে গণ্য করা হত।

মুসোলিনির লক্ষ্য

মুসোলিনির লক্ষ্য ছিল সমস্ত বিষয়ে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব স্থাপন। রাষ্ট্রই হবে সকল ক্ষমতার আধার, উৎস ও অধিকারী। বলা বাহুল্য, রাষ্ট্র বলতে মুসোলিনি বুঝতেন নিজেকে ও তাঁর দলকে।

পোপের সঙ্গে মীমাংসা

দীর্ঘদিনের বিবাদ মিটিয়ে নিয়ে পোপের সঙ্গে সমঝোতা স্থাপন মুসোলিনির অন্যতম কৃতিত্ব। গির্জার সাহায্যে জনসাধারণের উপর প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পোপের সঙ্গে ল্যাটেরান চুক্তি সম্পাদন করেন। ল্যাটেরান প্রাসাদে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় বলে এর নাম ল্যাটেরান চুক্তি।

ল্যাটেরান চুক্তির শর্ত

এই চুক্তি অনুসারে,

  • (১) রোমান ক্যাথলিক ধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং রোমের ভ্যাটিকান নগরীকে সার্বভৌম রাষ্ট্রের মর্যাদা দেওয়া হয়। ভ্যাটিকান সরকারকে নিজস্ব মুদ্রা, ডাকটিকিট, রেলপথ ও টেলিগ্রাফ স্থাপনের অধিকার দেওয়া হয়।
  • (২) পোপ বিদেশে রাষ্ট্রদূত প্রেরণ এবং বিদেশি রাষ্ট্রদূত গ্রহণের অধিকার লাভ করেন। স্বাধীন রাজার মতো পোপকে ‘পবিত্র’ ও ‘আইনের বর্হিভূত’ বলে ঘোষণা করা হয়।
  • (৩) অপরপক্ষে, পোপ স্যাভয় বংশের অধীনস্থ ইতালি রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন। এইভাবে মুসোলিনি ধর্মভীরু ইতালীয়দের সমর্থন লাভ করে নিজ রাজনৈতিক প্রতিপত্তি সুদৃঢ় করেন।

সাম্রাজ্যবাদী নীতি

মুসোলিনির পররাষ্ট্রনীতির মূল কথাই হল সাম্রাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ইতালির মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত করা। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, আন্তর্জাতিক শান্তি হল কাপুরুষের স্বপ্ন – সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধনীতি হল জাতির প্রাণশক্তির প্রাচুর্যের প্রমাণ।

লণ্ডনের গোপন চুক্তি

১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত লন্ডনের গোপন চুক্তি অনুসারে রোডস্ দ্বীপ ও ডডিক্যানিজ দ্বীপপুঞ্জ ইতালির পাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে ইতালি ও গ্রিসের মধ্যে এক চুক্তি মারফত ইতালি এই স্থান দুটি গ্রিসকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

লুসানের সন্ধি

ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যেই মুসোলিনি এই স্থান দুটি ফিরে পাওয়ার দাবিতে সোচ্চার হন। ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসের সঙ্গে সম্পাদিত লুসানের সন্ধি দ্বারা ইতালি এই স্থানগুলি ফিরে পায়। এই অঞ্চলে একটি শক্তিশালী নৌ-ঘাঁটি স্থাপিত হওয়ায় পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে ইতালির প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়।

ভূমধ্যসাগরে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা

ভূমধ্যসাগরের প্রবেশদ্বারগুলি শত্রুপক্ষের হাতে চলে গেলে ইতালির পক্ষে বহির্বিশ্বে যাওয়া সম্ভব হত না। এইসব কারণে ইতালির উচ্চাশা পূরণের জন্য ভূমধ্যসাগর ও আড্রিয়াটিক সাগরের উপর ইতালির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য ছিল।

নেটিউনো চুক্তি

মুসোলিনি ক্ষমতায় এসে ফিউম বন্দর-সহ অন্যান্য স্থানগুলিও যুগোশ্লাভিয়ার কাছে দাবি করতে থাকেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে নেটিউনো চুক্তির দ্বারা ফিউম বন্দর ইতালির অন্তর্ভুক্ত হয় এবং যুগোশ্লাভিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে ইতালি বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। এতেও কিন্তু দু’পক্ষের মধ্যে সম্পর্কের উন্নতি হয় নি।

রোম চুক্তি

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে হিটলারের উত্থান হলে ইতালি ও ফ্রান্স উভয়েই আতঙ্কিত হয়ে ওঠে এবং দু’পক্ষের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও ইতালি রোম চুক্তি (লাভাল-মুসোলিনি চুক্তি নামেও পরিচিত) সম্পাদন করে নিজেদের মধ্যে উপনিবেশ-সংক্রান্ত বিরোধগুলি মিটিয়ে নেয়।

ইতালি-জার্মানি মৈত্রী

স্পেনের গৃহযুদ্ধ -এ ইতালি ও জার্মানি জেনারেল ফ্রাঙ্কো-কে যুগ্মভাবে সমর্থন জানান। ফলে ইতালি-জার্মানি সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর হয়। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইতালি জার্মানির সঙ্গে অক্ষশক্তি জোট গঠন করে এবং জাতিসংঘ -এর সদস্যপদ ত্যাগ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইতালি-ফ্রান্স বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়।

হোর-লাভাল চুক্তি

নবোদিত শক্তি জার্মানির সঙ্গে ইতালির প্রীতির সম্পর্ক ইঙ্গ-ফরাসি শক্তিকে ভীত করে তোলে। তারা ইতালিকে তোষণ করে হাতে রাখার চেষ্টা করে। এই উদ্দেশ্যে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিয়ের লাভাল এবং ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যানুয়েল হোর ১৯৩৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর ইতালির সঙ্গে এক গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হন। এই যুক্তি হোর-লাভাল চুক্তি নামে খ্যাত।

আবিসিনিয়া দখল

সাত মাস যুদ্ধ করার পর ইতালির চাপের মুখে আবিসিনিয়া ভেঙে পড়ে এবং ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১লা মে আবিসিনিয়ার সম্রাট হাইলে সেলাসি পদত্যাগে বাধ্য হন। ব্রিটিশ জাহাজ তাঁকে ইউরোপে নিয়ে যায়।

ইতালির জাতিসংঘ পরিত্যাগ

৯ই মে ইতালির রাজা আবিসিনিয়ার সম্রাট বলে ঘোষিত হন এবং ইরিত্রিয়া, সোমালিল্যান্ড ও আবিসিনিয়া নিয়ে ‘ইতালীয় পূর্ব আফ্রিকা’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইতালি জাতিসঙ্ঘ পরিত্যাগ করে।

আলবানিয়া জয়

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ইতালি আলবানিয়া আক্রমণ করে টিরানায় প্রবেশ করলে সম্রাট জগ সপরিবারে আলবানিয়া ত্যাগ করেন। ইতালির সঙ্গে আলবানিয়া সংযুক্ত হয়। তৃতীয় ভিক্টর ইম্যানুয়েল ইতালির রাজা এবং আবিসিনিয়া ও আলবানিয়ার সম্রাট বলে ঘোষিত হন।

যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব

১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ‘কমিন্টার্ন’ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব দেয়। তখন জার্মানি ও ইতালি-তে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং জাপান -এ একটি গণতন্ত্রের আবরণ থাকলেও সমরনায়কদের অধীনে জঙ্গিবাদই ছিল প্রধান।

কমিন্টার্ন বিরোধী চুক্তি

কমিন্টার্ন এই ঘোষণায় এইসব রাষ্ট্রগুলি নিজ নিজ রাষ্ট্রে গোপন কমিউনিস্ট তৎপরতার আশঙ্কা করে। এর ফলে ১৯৩৬ সালের ২৫শে নভেম্বর জার্মানি ও জাপান “কমিন্টার্ন-বিরোধী চুক্তি” স্বাক্ষর করে। স্থির হয় যে, দু’পক্ষ কমিউনিজমের বিরুদ্ধে পরস্পরকে সাহায্য করবে, কমিউনিজমের অগ্রগতি সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করবে এবং কখনোই রাশিয়ার সঙ্গে কোনোরকম চুক্তিতে আবদ্ধ হবে না।

রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষ

১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ই নভেম্বর ইতালি কমিন্টার্ন-বিরোধী মিত্রজোটে যোগ দিলে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি গড়ে ওঠে। অন্যদিকে গড়ে উঠেছিল ব্রিটেন-ফ্রান্স-সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রজোট। এভাবেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। হিটলারের মিত্র মুসোলিনি কিছুদিন নিরপেক্ষ থাকেন।

যুদ্ধে যোগদান সম্পর্কে দ্বিধান্বিত

যুদ্ধের গতি কোনদিকে যাবে তা না জেনে মুসোলিনি যুদ্ধে যোগ দিতে রাজি ছিলেন না। শেষ পর্যন্ত হিটলারের ক্রমাগত সাফল্য তাঁর চিন্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

যুদ্ধে যোগদান

হিটলারের বাহিনী যখন পূর্ণ গতিতে ফ্রান্সের মধ্যে ঢুকে পড়ছে, তখন মুসোলিনি উপলব্ধি করেন যে, ফ্রান্সের পতন আসন্ন এবং মিত্রপক্ষের পরাজয় সুনিশ্চিত। তখনই ১৯৪০ সালের ১০ই জুন ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করেন।

উপসংহার:- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে মুসোলিনির স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রবল গণ-বিক্ষোভ শুরু হয় এবং গণরোষে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতেই তার মৃত্যু ঘটে। ক্রুদ্ধ জনতা মুসোলিনি ও তাঁর উপপত্নী ক্লারা পেত্রাচ্চি-র মৃতদেহ দুটি গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেয়।

(FAQ) মুসোলিনি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. ইতালির একনায়ক মুসোলিনির উপাধি কি ছিল?

ইল-ডুচে।

২. মুসোলিনি কোন পত্রিকা প্রকাশ করেন?

আভান্তি।

৩. কোন যুদ্ধের সময় মুসোলিনির মৃত্যু হয়?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

৪. কোন যুদ্ধে মুসোলিনি সৈনিক হিসেবে যোগ দেন?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে।

Leave a Reply

Translate »