স্পেনের গৃহযুদ্ধ

স্পেনের গৃহযুদ্ধ প্রসঙ্গে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র, অরাজকতা, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, ১৯৩৩ এর নির্বাচন, পপুলার ফ্রন্ট, দাঙ্গা হাঙ্গামা, গৃহযুদ্ধ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূমিকা, ফ্রাঙ্কোর জয়লাভ ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানবো।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ

ঘটনা স্পেনের গৃহযুদ্ধ
স্থান স্পেন
সময়কাল ১৯৩৬-১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ
জাতীয়তাবাদী নেতা জেনারেল ফ্রাঙ্কো
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
স্পেনের গৃহযুদ্ধ

ভূমিকা:- উনিশ শতকের শেষে স্পেন ছিল একটি দুর্বল ও দরিদ্র রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। তার সমাজ ছিল মধ্যযুগীয় এবং নানা দ্বন্দ্বে ভরা। ভূসম্পত্তির অধিকাংশই ছিল জমিদার ও জোতদারদের হাতে। রাজপুরুষ, যাজক ও অভিজাতরা ছিল দুর্নীতিগ্ৰস্ত ও অপদার্থ।

নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র

স্পেনে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। বুরবো-বংশীয় ত্রয়োদশ অ্যালফান্সো স্পেনের সিংহাসনে ছিলেন। তাঁকে শাসনকাজে সাহায্য করত একটি সংসদ, যার নাম ‘করটেস্’।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে স্পেনের ভূমিকা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ -এ স্পেন নিরপেক্ষ ছিল এবং এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন পক্ষকে সামরিক উপকরণ বিক্রি করে স্পেন যথেষ্ট লাভবান হয়।

অরাজকতা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্পেনে ভয়াবহ রাজনৈতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই চরম অরাজকতা দেখা দেয়। পাঁচ বছরে দশবার মন্ত্রিসভার পরিবর্তন ঘটে।

দিশেহারা রাজতন্ত্র

সামরিক বাহিনী শাসনকাজে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে এবং নানা স্থানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। শিল্প ধর্মঘট, শ্রমিক-মালিক বিরোধ ও সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে রাজতন্ত্র দিশেহারা হয়ে পড়ে।

নতুন শাসক

এই অবস্থায় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে রাজার সম্মতিক্রমে ক্যাটালোনিয়ার সামরিক প্রশাসক প্রাইমো-ডি-রিভেরা শাসন ক্ষমতা দখল করেন এবং রাজা ত্রয়োদশ অ্যালফান্সো ‘রাজা’ উপাধি নিয়ে নামেমাত্র টিকে থাকেন।

স্পেনের সাফল্য

শাসন ক্ষমতা দখল করে প্রাইমো-ডি-রিভেরা পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনাধীনে (১৯২৩-১৯৩০ খ্রিঃ) কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক – সবক্ষেত্রে স্পেন উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করে।

প্রাইমো-ডি-রিভেরার পদত্যাগ

অচিরেই তাঁর স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দেশে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং বিদ্রোহের চাপে ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদত্যাগে বাধ্য হন।

প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা

১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের সাধারণ নির্বাচনে প্রজাতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দল জয়যুক্ত হয় এবং তাদের নেতৃত্বে স্পেনে যুগ্ম মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। রাজা পদত্যাগে বাধ্য হন এবং স্পেনে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় (১৯৩১ খ্রিঃ)।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী

নতুন এই প্রজাতান্ত্রিক সরকারের রাষ্ট্রপতি হন নিসেটো জামোরা এবং প্রধানমন্ত্রী হন ম্যানুয়েল আজানা। এই সরকার দেশে নানা প্রগতিবাদী সংস্কারের সূচনা করে।

সংস্কার

জমিদারি প্রথা লোপ, কৃষকদের মধ্যে জমিবণ্টন, বৃহৎ শিল্পগুলির রাষ্ট্রীয়করণ, বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন প্রভৃতি কাজে সাধারণ মানুষ উপকৃত হলেও জমিদার, সামন্তশ্রেণি ও দক্ষিণপন্থীরা প্রবল ক্ষুব্ধ হয়।

চরম অরাজকতা

বিভিন্ন শ্রেণির বিরোধিতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব ও সরকার-বিরোধী মনোভাব এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার প্রভাবে দেশে এক চরম অরাজকতার সৃষ্টি হয়।

১৯৩৩-এর নির্বাচন

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে স্পেনে যে সাধারণ নির্বাচন হয় তাতে দক্ষিণপন্থীরা জয়যুক্ত হয়, কিন্তু তাদের প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপে সারা দেশে প্রবল বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ধর্মঘট, বিক্ষোভ, বিদ্রোহ ও রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় রাষ্ট্রপতি জামোরা পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে নতুন নির্বাচনের ডাক দেন (১৯৩৬ খ্রিঃ)।

‘পপুলার ফ্রন্ট’ গঠন

১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে প্রজাতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা মিলে একটি ‘পপুলার ফ্রন্ট’ গঠন করে এবং নির্বাচনে জয়যুক্ত হয়ে তারা সরকার গঠন করে। ম্যানুয়েল আজানা এই সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং ক্যাসারে কুই রোগা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।

দাঙ্গা-হাঙ্গামা

এই সরকার বেশ কিছু প্রগতিশীল সংস্কারের কর্মসূচি গ্রহণ করে। দক্ষিণপন্থীরা প্রথম থেকেই এই সরকারের বিরোধিতা করতে থাকে এবং দেশের নানা স্থানে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুরু করে।

সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ

  • (১) এই অবস্থায় সরকার আনুগত্যহীনতার অভিযোগে বেশ কিছু সামরিক কর্মচারীকে বরখাস্ত, বদলি বা বাধ্যতামূলক অবসর গ্রহণে বাধ্য করে। জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো কে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়।
  • (২) এইসব কারণে সামরিক বিভাগে প্রবল ক্ষোভের সঞ্চার হয় এবং সেনাবাহিনীর অনেকেই সরকারের পতন ঘটাতে উদ্যোগী হয়। জমিদার, বুর্জোয়া, যাজক সম্প্রদায় এবং দক্ষিণপন্থীরা তাদের সমর্থনে এগিয়ে আসে।
  • (৩) ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে মরক্কোয় অবস্থিত স্পেনীয় সেনাদল প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে নির্বাসিত জেনারেল ফ্রাঙ্কো মরক্কোয় এসে বিদ্রোহের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।

গৃহযুদ্ধ

  • (১) সমগ্ৰ স্পেনবাসী এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং স্পেনে ব্যাপক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী ও প্রজাতন্ত্রীরা প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে সমর্থন করে। অপরপক্ষে দক্ষিণপন্থী ফ্যালানজিস্ট, ন্যাশনালিস্ট, রাজতন্ত্রের সমর্থক কালিস্ট প্রভৃতি দক্ষিণপন্থী দল, যাজক, ভূস্বামী ও শিল্পপতিরা জেনারেল ফ্রাঙ্কোর প্রতি সমর্থন জানায়।
  • (২) এইভাবে সমগ্র স্পেন ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ‘প্রজাতন্ত্রী’ – এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বিদ্রোহীরা ‘জাতীয়তাবাদী’ এবং সরকারপক্ষ ‘প্রজাতন্ত্রী’ নামে পরিচিত হয়। স্পেনের পশ্চিমাঞ্চল ছিল ফ্রাঙ্কোর সমর্থক। অপরপক্ষে পূর্ব, পশ্চিম ও মধ্য স্পেন ছিল প্রজাতন্ত্রীদের পক্ষে।

ক্ষুদে বিশ্বযুদ্ধ

ঐতিহাসিক ল্যাংসাম এই গৃহযুদ্ধকে ‘ক্ষুদে বিশ্বযুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন। এই যুদ্ধে প্রায় ১০ লক্ষ স্পেনবাসী নিহত এবং দেশত্যাগে বাধ্য হয়।

বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূমিকা

ইউরোপের বহু দেশ কম-বেশি নানাভাবে এই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। যেমন –

  • (১) স্পেনে রুশ বিপ্লব বা বলশেভিক বিপ্লব -এর মতো কিছু ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় হিটলার ও মুসোলিনি ফ্রাঙ্কোর সমর্থনে এগিয়ে আসেন। তাঁরা মনে করেন যে, ফ্রাঙ্কোর জয় হল একনায়কতন্ত্রের জয় এবং এর ফলে ইউরোপে ফ্যাসিবাদী শক্তি সুদৃঢ় হবে।
  • (২) মুসোলিনি আশা করেন যে, ফ্রাঙ্কো বিজয়ী হলে পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ইতালির প্রভাব বৃদ্ধি পাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া দেওয়ার জন্য হিটলার তাঁর বিমানবহর ‘লুফওয়াফ’ ও ট্যাঙ্কবাহিনীকে বিদ্রোহীদের সমর্থনে স্পেনে পাঠান। ৫০ হাজার ইতালীয় স্বেচ্ছাসেবক বিদ্রোহীদের সাহায্যে স্পেনে যায়।
  • (৩) রাশিয়া ছিল প্রজাতন্ত্রী সরকারের পক্ষে। রাশিয়ার আশঙ্কা ছিল যে ফ্রাঙ্কো জয়যুক্ত হলে স্পেনে একনায়কতন্ত্র স্থাপিত হবে। ইতালি, জার্মানি ও স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে রাশিয়ার নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। নিজ প্রভাববৃদ্ধির আশায় রাশিয়া ‘পপুলার ফ্রন্ট’ সরকারের কাছে যুদ্ধাস্ত্র, সামরিক পরামর্শদাতা ও দক্ষ কারিগর পাঠায়।
  • (৪) জার্মানি ও ইতালির ফ্যাসিবিরোধী উদ্বাস্তু এবং পৃথিবীর অন্যান্য বহু দেশের প্রজাতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করে ‘পপুলার ফ্রন্ট’ সরকারকে সাহায্যের উদ্যোগ নেয় – যদিও অভ্যন্তরীণ দলাদলিতে এই উদ্যোগ বিশেষ সফল হয় নি।
  • (৫) ইংল্যান্ডফ্রান্স নিরপেক্ষতার নীতি গ্রহণ করে। তাদের কাছে নাৎসিবাদ অপেক্ষা সাম্যবাদ বেশি বিপজ্জনক ছিল। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল জার্মানি ও ইতালিকে তোষণ করা। তারা মনে করেছিল যে, স্পেনে হস্তক্ষেপ করলে হিটলার ক্ষুব্ধ হবে। এই কারণে তারা নিরপেক্ষতার নীতি অবলম্বন করে।
  • (৬) গৃহযুদ্ধকে স্পেনের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ করে রাখার উদ্দেশ্যে ইউরোপের ২৭টি দেশ স্পেনের ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার নীতি গ্রহণ করে।
  • (৭) জাতিসঙ্ঘ স্পেন থেকে বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে একটি প্রস্তাব পাস করে, কিন্তু সেই প্রস্তাবে কেউ কর্ণপাত করে নি।

ফ্রাঙ্কোর জয়লাভ

তিন বছর যুদ্ধ চলার পর জেনারেল ফ্রাঙ্কো এই গৃহযুদ্ধে জয়ী হন এবং ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দের ৪ঠা এপ্রিল স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

গুরুত্ব

এই গৃহযুদ্ধের প্রভাব কেবলমাত্র স্পেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না – এর আন্তর্জাতিক প্রভাবও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যেমন –

  • (১) স্পেনে ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হিটলার মুসোলিনি শক্তিজোটের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায়।
  • (২) এই যুদ্ধের ফলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশগুলির কূটনৈতিক পরাজয় ঘটে এবং অপরদিকে জার্মানিই প্রবলভাবে লাভবান হয়।
  • (৩) অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, মুসোলিনি নন – এই যুদ্ধের দ্বারা প্রকৃত লাভ হয় হিটলারের। এই যুদ্ধে হিটলার তাঁর বিমান বাহিনীর কার্যকারিতা ও অন্যান্য অস্ত্রের শক্তি পরীক্ষার সুযোগ পান। তাই এই গৃহযুদ্ধকে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া’ বলা হয়।
  • (৪) এই গৃহযুদ্ধ থেকে হিটলার এই ধারনা পান যে, ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ খুব সহজে তাঁর বিরোধিতা করবে না। এই ধারনা থেকেই তিনি দ্রুত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে অগ্রসর হন।

উপসংহার:- স্পেনের গৃহযুদ্ধ সর্বসমক্ষে জাতিসংঘের অসারতা ও দুর্বলতা তুলে ধরে – প্রমাণিত হয় যে, বৃহৎ শক্তিবর্গের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘের কিছু করার নেই।

(FAQ) স্পেনের গৃহযুদ্ধ সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. স্পেনের গৃহযুদ্ধ সংঘটিত হয় কখন?

১৯৩৬-১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ।

২. কোন যুদ্ধকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মহড়া বলা হয়?

স্পেনের গৃহযুদ্ধ।

৩. স্পেনের গৃহযুদ্ধে জাতীয়তাবাদীদের নেতা কে ছিলেন?

জেনারেল ফ্রাঙ্কো।

Leave a Reply

Translate »