ভার্সাই সন্ধি

২৮শে জুন, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জার্মানি ও বিজয়ী মিত্রপক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত ভার্সাই সন্ধি প্রসঙ্গে সন্ধির মূলনীতি, সন্ধির শর্তাবলী হিসেবে আঞ্চলিক পুনর্বণ্টন, সামরিক শর্তাবলী, অর্থনৈতিক শর্তাবলী ও অন্যান্য শর্তাদি এবং সন্ধির সমালোচনা সম্পর্কে জানবো।

ভার্সাই সন্ধি

ঘটনা ভার্সাই সন্ধি
সময়কাল ২৮ জুন, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ
স্বাক্ষরকারী জার্মানি ও মিত্রপক্ষ
প্রেক্ষাপট প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
পরবর্তী যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
ভার্সাই সন্ধি

ভূমিকা:- বিজয়ী মিত্রপক্ষ ও পরাজিত জার্মানির মধ্যে সন্ধিটি ভার্সাইয়ের রাজপ্রাসাদে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে জুন স্বাক্ষরিত হয় বলে তা ভার্সাই সন্ধি নামে পরিচিত।

ভার্সাই সন্ধির মূলনীতি

কয়েকটি বিশেষ নীতি অনুসরণ করে ভার্সাই সন্ধির শর্তাবলী রচিত হয়। যেমন –

  • (১) জার্মানিকে বিশ্বযুদ্ধের জন্য সর্বতোভাবে দায়ী করা,
  • (২) জার্মানি যাতে ভবিষ্যতে বিশ্বের শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে তার ব্যবস্থা করা,
  • (৩) ইউরোপে শক্তিসাম্য বজায় রাখা,
  • (৪) জার্মানির ভবিষ্যৎ আক্রমণ থেকে ফ্রান্সের নিরাপত্তা বিধান করা,
  • (৫) মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসনের জাতীয়তাবাদের আদর্শকে যথাসম্ভব বাস্তবায়িত করা এবং
  • (৬) বিশ্বে শাস্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করা।

ভার্সাই সন্ধির শর্তাবলী

২৩০ পৃষ্ঠা সম্বলিত ভার্সাই সন্ধির দলিলটি ১৫টি অধ্যায় ও ৪৩৯টি পারায় বিভক্ত ছিল। আলোচনার সুবিধার জন্য এই সন্ধিকে

  • (ক) আঞ্চলিক পুনর্বণ্টন,
  • (খ) সামরিক শর্তাবলী এবং
  • (গ) অর্থনৈতিক শর্তাবলী প্রভৃতি ভাগে ভাগ করা যায়।

(ক) আঞ্চলিক পুনর্বণ্টন

ভার্সাই সন্ধির শর্ত অনুসারে জার্মানি

  • (১) ফ্রান্সকে আলসাস ও লোরেন,
  • (২) বেলজিয়ামকে মরেসনেট, ইউপেন ও ম্যালমেডি,
  • (৩) লিথুয়ানিয়াকে মেমেল বন্দর,
  • (৪) পোল্যান্ডকে পোজেন ও পশ্চিম প্রাশিয়া এবং
  • (৫) ডেনমার্ককে উত্তর স্লেজউইগ ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
  • (৬) জার্মানির পূর্ব সীমান্তে পোল্যান্ড স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হয়।
  • (৭) উত্তর সাইলেশিয়া ও পূর্ব প্রাশিয়া গণভোটের মাধ্যমে পোল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলে জার্মানি এই বিষয়ে স্বীকৃত হয়।
  • (৮) পোল্যান্ড যাতে সমুদ্রে যেতে পারে সেজন্য পোল্যান্ড জার্মানির ভিতর দিয়ে একটি যোগাযোগকারী রাস্তা লাভ করে। এর নাম হয় ‘পোলিশ করিডোর’। এই রাস্তাটি পূর্ব প্রাশিয়া থেকে জার্মানিকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
  • (৯) জার্মানির ডানজিগকে লিগ অব নেশনস্-এর অধীনে একটি উন্মুক্ত শহর’ বলে ঘোষণা করা হয়।
  • (১০) জার্মানি তার এশিয়া ও আফ্রিকাস্থ উপনিবেশগুলি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জাপান, অস্ট্রিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও বেলজিয়ামের মধ্যে ভাগ করে দিতে বাধ্য হয়।
  • (১১) এলবা, দানিয়ুব, ওডার, নিয়েসেন ও রাইন নদীকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
  • (১২) জার্মানির পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে জার্মানি যাতে ভবিষ্যতে ফ্রান্সকে আক্রমণ করতে না পারে, সেজন্য একটি নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়।
  • (১৩) স্থির হয় যে, রাইনল্যান্ডে আপাতত ১৫ বছরের জন্য মিত্রশক্তির দখলদার বাহিনী অবস্থান করবে এবং ফ্রান্সকে নিরাপত্তা দেবে। রাইন নদীর পূর্বতীরে জার্মান সামরিক বাহিনী রাখা যাবে না।
  • (১৪) যুদ্ধের সময় ফ্রান্সের কয়লা সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলি ধ্বংস করার ক্ষতিপূরণ হিসেবে জার্মানির কয়লা-সমৃদ্ধ সার জেলা আগামী ১৫ বছরের জন্য ফ্রান্সকে দেওয়া হয়। স্থির হয় যে, ১৫ বছর পর গণভোটের মাধ্যমে ঠিক হবে যে সার অঞ্চল কে পাবে।
  • (১৫) এইভাবে প্রায় ২৫ হাজার বর্গমাইল এলাকা ও ২০ লক্ষ জার্মান নাগরিককে স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। মিত্রপক্ষীয় রাষ্ট্রগুলি জার্মান উপনিবেশগুলি থেকে ১০ লক্ষ ২৭ হাজার বর্গমাইল এলাকা লাভ করে।

(খ) সামরিক শর্তাবলী

ভার্সাই সন্ধির পঞ্চম অনুচ্ছেদে সামরিক শর্তাবলীর উল্লেখ আছে। জার্মানির সামরিক শক্তিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা, ফ্রান্সের নিরাপত্তা বিধান এবং জার্মানির ভবিষ্যৎ-উত্থানের সম্ভাবনা নির্মূল করার উদ্দেশ্যে তার উপর বেশ কিছু কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা আরোপিত হয়। যেমন –

  • (১) জার্মানির জল, স্থল ও বিমানবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়।
  • (২) জার্মানির সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে এক লক্ষ করা হয় এবং বলা হয় যে, এই বাহিনী কেবল জার্মানির সীমানা রক্ষা ও অভ্যন্তরীণ শান্তিরক্ষার কাজেই ব্যবহৃত হবে।
  • (৩) জার্মানিতে বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষাদান এবং সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক যোগদানের ব্যবস্থা নিষিদ্ধ করা হয়।
  • (৪) হেলিগোল্যান্ডের নৌ-ঘাঁটি বিলুপ্ত করা হয়।
  • (৫) জার্মানির যুদ্ধজাহাজগুলি ইংল্যান্ডকে প্রদান করতে বাধ্য করা হয়। স্থির হয় যে, জার্মানি কেবলমাত্র ৬টি যুদ্ধজাহাজ, ৩টি ছোটো ক্রুজার, ৪টি ডেস্ট্রয়ার, ১২টি সাবমেরিন এবং ১৫,০০০ নৌ-সেনা রাখতে পারবে।
  • (৬) রাইন নদীর পশ্চিম তীরে ত্রিশ মাইলব্যাপী এলাকায় জার্মান সামরিক ঘাঁটি ও দুর্গগুলি ভেঙে ফেলে একে ‘অসামরিক অঞ্চল’ বলে ঘোষণা করা হয়।
  • (৭) জার্মান সেনাপতিদের বরখান্ত করা হয়।
  • (৮) জার্মানিতে ট্যাঙ্ক, বোমারু বিমান এবং কামান নির্মাণ নিষিদ্ধ হয়।
  • (৯) এইব সামরিক শর্তাদি পালিত হচ্ছে কিনা তা তদারকির জন্য রাইন নদীর পূর্বতীরে জার্মানির ব্যয়েই মিত্রপক্ষের একটি সেনাবাহিনী ও একটি কমিশন নিয়োগ করা হয়।

(গ) অর্থনৈতিক শর্তাবলী

জার্মানির উপর বেশ কিছু কঠোর অর্থনৈতিক শর্তাদি আরোপিত হয় এবং এই ব্যাপারে মিত্রপক্ষের উদ্দেশ্য ছিল জার্মান অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া। যেমন –

  • (১) যুদ্ধ সৃষ্টির জন্য জার্মানিকে অপরাধী বলে ঘোষণা করে জার্মানির উপর ৬৬০ কোটি পাউন্ডের বিপুল ক্ষতিপূরণের দাবি চাপিয়ে দেওয়া হয়।
  • (২) জার্মানি তার অধিকাংশ বাণিজ্যপোত ফ্রান্সকে এবং যুদ্ধজাহাজগুলি (৩) অর্থনৈতিক শর্তাবলী ইংল্যান্ডকে সমর্পণ করতে বাধ্য হয়।
  • (৩) জার্মানি নিজ ব্যয়ে জাহাজ নির্মাণ করে ঘাটতি পুরণের জন্য বাধ্য থাকে।
  • (৪) জার্মানি শ্যাম, মরক্কো, লাইবেরিয়া, মিশর, তুরস্ক, বুলগেরিয়া প্রভৃতি স্থানের সম্পত্তি ও ‘বিশেষ অধিকার’ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
  • (৫) জার্মানির বাইরে জার্মান নাগরিকদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার মিত্রপক্ষের হাতে অর্পিত হয়।
  • (৬) ফ্রান্সের কয়লা খনিগুলি ধ্বংসের অভিযোগে জার্মানির কয়লা সম্পদে সমৃদ্ধ সার অঞ্চলটি আগামী ১৫ বছরের জন্য আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। স্থির হয় যে, আগামী ১৫ বছর এই অঞ্চলের কয়লাখনিগুলি ফ্রান্সের অধীনে থাকবে এবং ১৫ বছর অতিক্রান্ত হলে এই অঞ্চলের জনগণ গণভোটের দ্বারা স্থির করবে যে, তারা কোন রাষ্ট্রে যোগ দেবে।
  • (৭) দশ বছরের জন্য ফ্রান্স, ইতালি, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবার্গকে জার্মানি এক বিশেষ ধরনের কয়লা, লোহা, কাঠ, রবার ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থ সরবরাহ করতে বাধ্য থাকবে।
  • (৮) জার্মানি মিত্রপক্ষকে ৫ হাজার রেল ইঞ্জিন এবং দেড় লক্ষ্য মোটর গাড়ি দিতে বাধা থাকবে।
  • (৯) ভার্সাই সন্ধির ২৩৪ ধারায় বলা হয় যে, মিত্রশক্তির দ্বারা উৎপাদিত শিল্পদ্রব্য বিক্রয়ের জন্য জার্মানির বাজারে মিত্রপক্ষকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • (১০) জার্মানির এলবা, ওডার, নিয়েসেন, রাইন ও দানিয়ুব নদী এবং কিয়েল খালকে আন্তর্জাতিক শাসনাধীনে আনা হয়।

(ঘ) অন্যান্য শর্তাদি

  • (১) সন্ধির ২১৩ ধারায় জার্মান যুদ্ধপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা ছিল। সন্ধির শর্তাদি ও আন্তর্জাতিক রীতি-নীতি লঙ্ঘনের দায়ে কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়মকে ‘যুদ্ধপরাধী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। তিনি হল্যান্ডে পলায়ন করেন এবং হল্যান্ড সরকার তাঁকে মিত্রপক্ষের হাতে সমর্পণ করতে অস্বীকার করায় তাঁর বিচার করা সম্ভব হয় নি।
  • (২) যুদ্ধের আইন ভাঙার অপরাধে সামরিক আদালত ১০০ জন জার্মানকে অভিযুক্ত করলেও শেষ পর্যন্ত ১২ জনের জার্মানির আদালতে বিচারের ব্যবস্থা হয়।
  • (৩) ভার্সাই সন্ধিতে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘জাতিসঙ্ঘ‘ বা ‘লিগ অব নেশনস-এর শর্তাদি অন্তর্ভুক্ত হয়।
  • (৪) জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পাদিত ব্রেস্ট-লিটোভস্কের সন্ধি ও অন্যান্য সন্ধি বাতিল করা হয়।
  • (৫) বেলজিয়াম, পোল্যান্ড, যুগোশ্লাভিয়া ও চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা মেনে নেওয়া হয়।

ভার্সাই সন্ধির সমালোচনা

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে সম্পাদিত ভার্সাই সন্ধি সমকাল ও পরবর্তীকালে নানাভাবে সমালোচিত হয়েছে। বস্তুত আধুনিক ইতিহাস -এর যুগের এমন বিতর্কিত চুক্তি খুব কমই দেখা যায়। যেমন –

(১) মৃত্যুর পরিকল্পনা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পরে জার্মানিতে যে নতুন যৌথ মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, তার চ্যান্সেলার ফিলিপ সীডম্যান ভার্সাই সন্ধিকে একটি ‘মৃত্যু পরিকল্পনা’ ও ‘দাসত্বের শৃঙ্খল’ বলে অভিহিত করেন।

(২) জবরদস্তিমূলক সন্ধি

জার্মান ঐতিহাসিকেরা এই সন্ধিকে ‘একতরফা ও জবরদস্তিমূলক সন্ধি’ এবং ‘একটি ম্যাকিয়াভেলীয় সন্ধি’ বলে অভিহিত করেছেন।

(৩) অপমানজনক সন্ধি

অধ্যাপক কিম্‌স্‌ একে ‘কার্থেজিয়ান পিস’ বলে উল্লেখ করেছেন। অধ্যাপক ল্যাসিং-এর মতে, এই চুক্তি ছিল অস্বাভাবিক কঠোর ও অপমানজনক।

(৪) প্রতিহিংসামূলক মনোভাব

জার্মান ঐতিহাসিকদের মতে, এই সন্ধির মূলে মিত্রশক্তিবর্গের প্রতিহিংসামূলক মনোভাব কাজ করে।

উপসংহার:- অধ্যাপক ডেভিড টমসন বলেন যে, এই সন্ধির রচয়িতারা “ভ্রান্ত স্থানে কঠোরতা ও অবিজ্ঞোচিত উদারতা’ দেখান। চুক্তি রচনাকালে তাঁরা জার্মানির প্রতি কঠোর মনোভাব দেখালেও চুক্তি রূপায়ণে তাঁরা দুর্বলতা দেখান। এর ফলে ভার্সাই সন্ধি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

(FAQ) ভার্সাই সন্ধি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কবে কাদের মধ্যে ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়?

২৮ জুন, ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ও মিত্রপক্ষ।

২. কোন যুদ্ধাবসানে ভার্সাই সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

৩. পোলিশ কোরিডোর লাভ করে কে?

পোল্যাণ্ড।

৪. একতরফা ও জবরদস্তিমূলক সন্ধি কাকে বলা হয়?

ভার্সাই সন্ধি।

Leave a Reply

Translate »