ভার্সাই সম্মেলন

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের প্যারিস নগরীর ভার্সাইয়ে অনুষ্ঠিত প্যারিসের শান্তি সম্মেলন বা ভার্সাই সম্মেলন প্রসঙ্গে প্রথম আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমাবেশ, যোগদানকারী দেশ, একাধিক হোটেলের প্রয়োজনীয়তা, প্রতিনিধিত্বমূলক, বিজয়ী দেশের সম্মেলন, সম্মেলনের স্থান, সম্মেলনের সভাপতি, প্রধান চারজন, সম্মেলনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি, সম্মেলনে প্রভাব বিস্তার, দুটি পরস্পর বিরোধী ধ্যান ধারণা ও শান্তি চুক্তি সমূহ সম্পর্কে জানবো।

প্যারিসের শান্তি সম্মেলন বা ভার্সাই সম্মেলন

ঘটনা প্যারিসের শান্তি সম্মেলন
স্থান প্যারিস শহরের ভার্সাই
সময়কাল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দ
সভাপতি জর্জ ক্লেমেশোঁ
পূর্ববর্তী ঘটনা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ
উদ্দেশ্য বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা
প্যারিসের শান্তি সম্মেলন বা ভার্সাই সম্মেলন

ভূমিকা:- ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ১১ই নভেম্বর জার্মানি আত্মসমর্পণ করলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। এরপর ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসের শুরু থেকে পৃথিবীর ৩২টি দেশের প্রতিনিধিরা শান্তিচুক্তি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে ফ্রান্স -এর রাজধানী প্যারিস শহরে সম্মিলিত হতে থাকেন।

প্রথম আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমাবেশ

বিশালতা ও ব্যাপকতার দিক থেকে এই সম্মেলন ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলন অপেক্ষা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ভিয়েনা সম্মেলন ছিল একটি ইউরোপীয় সম্মেলন এবং এর কর্মকাণ্ড ইউরোপের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে ভার্সাই সম্মেলন হল পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সমাবেশ।

যোগদানকারী দেশ

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ছোটো-বড়ো ৩২টি দেশ এই সম্মেলনে যোগদান করে – আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, চিন, কিউবা, চেকোশ্লোভাকিয়া, গ্রিস, গুয়াতেমালা, হাইতি, হেজ্জাজ, হন্ডুরাস, যুগোশ্লাভিয়া, সাইবেরিয়া, নিকারাগুয়া, পানামা, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, রুমানিয়া, শ্যাম, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ভারত, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, বলিভিয়া, ইকুয়েডর, পেরু এবং উরুগুয়ে।

একাধিক হোটেলের প্রয়োজনীয়তা

এক একটি দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বহু কূটনীতিক, সরকারি কর্মচারী, টাইপিস্ট, কেরানি, সাংবাদিক প্রভৃতি শত শত মানুষ প্যারিসে সমবেত হন। এক একটি প্রতিনিধি দলের থাকার জন্য একটি পুরো হোটেল – বহুক্ষেত্রে একাধিক হোটেলের প্রয়োজন হয়।

প্রতিনিধিত্বমূলক

১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলন অপেক্ষা এই সম্মেলন ছিল অনেক বেশি প্রতিনিধিত্বমূলক। রাজা বা রাষ্ট্রপ্রধান নয় – বেলজিয়ামের রাজা এলবার্ট বা মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন ছাড়া সব দেশেরই প্রতিনিধিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। ১১ জন প্রধানমন্ত্রী এবং ১২ জন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই সম্মেলনে যোগ দেন।

বিজয়ী দেশের সম্মেলন

এই সম্মেলন ছিল মূলত বিজয়ী দেশগুলির সম্মেলন। জার্মানি, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি দেশগুলিকে এই সম্মেলনে যোগ দিতে দেওয়া হয় নি। তাদেরকে বলপূর্বক সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য করা হয়।

সম্মেলনের স্থান

নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডে এই সম্মেলন বসার কথা ছিল, কিন্তু ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধ -এ প্রাশিয়ার হাতে পরাজয়ের পর ফ্রান্সের প্যারিসের সন্নিকটে ভার্সাই নগরীর ‘হল অব মিরারস্’ গৃহে ফ্রান্স ভার্সাইয়ের সন্ধি (২৬শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৭১ খ্রিঃ) সম্পাদনে বাধ্য হয়। এই চুক্তি ফ্রান্সের উপর চরম অপমানের বোঝা চাপিয়ে দেয়। এখানে প্রাশিয়ার সম্রাট প্রথম উইলিয়ম জার্মানির সম্রাট বা ‘কাইজার’ হিসেবে ঘোষিত হন। ৪৮ বছর পর জার্মানির পরাজয়ে ফ্রান্স এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ পায়।

সম্মেলনের সভাপতি

স্বাভাবিকভাবেই ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমেশোঁ (George Clemenceau) সম্মেলনে সভাপতিত্ব করার দায়িত্ব পান।

প্রধান চারজন

সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ অংশগ্রহণ করলেও সম্মেলনের নীতি-নির্ধারণ ও কার্য পরিচালনায় চারটি বৃহৎ শক্তি ও তাদের নেতারা প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাঁরা হলেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমেশোঁ, মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসন, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী ভিট্টোরিও অর্লান্ডো। এই চার নেতা ‘প্রধান চারজন’ (Big four) নামে খ্যাত ছিলেন।

সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব

উড্রো উইলসন ছিলেন এই সম্মেলনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব। এই সম্মেলনে তাঁর যোগদান সমগ্ৰ ইউরোপে প্রবল উন্মাদনার সঞ্চার করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কালে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, কিন্তু ১৯১৮-র নির্বাচনে রিপাবলিকান দল জয়যুক্ত হয়। সুতরাং মার্কিন সেনেটের সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করেই তিনি এই সম্মেলনে যোগ দেন।

সম্মেলনে প্রভাব বিস্তার

ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রধানমন্ত্রীরাও ছিলেন ধুরন্ধর রাজনীতিক। অপরদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী অর্লান্ডো ছিলেন প্রাক্তন অধ্যাপক, সুপণ্ডিত, সুবক্তা ও সুচতুর কূটনীতিক, কিন্তু ইংরেজি ভাষায় দখল না থাকার জন্য তিনি সম্মেলনে প্রভাব বিস্তার করতে পারেন নি।

দুটি পরস্পর বিরোধী ধ্যান-ধারণা

প্যারিস শান্তি সম্মেলনে দুটি পরস্পর-বিরোধী ধ্যান-ধারণার দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে ওঠে। যেমন –

(১) ন্যায়-নীতির দৃষ্টিভঙ্গি

মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসন ন্যায়-নীতি ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করে নতুন বিশ্বব্যবস্থ গড়ে তুলতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বিশ্বশান্তি ও গণতন্ত্রকে নির্বিঘ্ন করে তোলা। উইলসনের চোদ্দোদফা নীতির উপর নির্ভর করেই জার্মানি আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

(২) স্বার্থান্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি

ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রতিনিধিরা নিজেদের স্বার্থান্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল জার্মানিকে দুর্বল করে রাখা এবং জার্মানির স্বার্থ ক্ষুন্ন কর নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করা। স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে এইসব দ্বন্দ্ব সম্মেলনকে দুর্বল করে দেয়।

শান্তি চুক্তিসমূহ

বহু আলাপ-আলোচনার পর প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে মোট পাঁচটি সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। যথা –

উপসংহার:- এই সম্মেলনে বিশ্ব মানচিত্র পুনর্গঠনের ফলে অসংখ্য সংকটপূর্ণ আন্তর্জাতিক অসঙ্গতির অবতারণা হয়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হবার অন্যতম কারণ।

(FAQ) প্যারিসের শান্তি সম্মেলন বা ভার্সাই সম্মেলন সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. প্যারিসের শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কখন?

১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে।

২. প্যারিসের শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কোথায়?

প্যারিস নগরীর ভার্সাই।

৩. প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন কে?

ফরাসি প্রধানমন্ত্রী জর্জ ক্লেমেশোঁ।

৪. কোন যুদ্ধের পর প্যারিসের শান্তি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

Leave a Reply

Translate »