এডলফ হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি

এডলফ হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি প্রসঙ্গে বিদেশনীতির লক্ষ্য, ভার্সাই সন্ধির বিরোধিতা, জাতিসংঘ ত্যাগ, পোল-জর্মান সম্পর্ক, জার্মানির অস্ত্রসজ্জা, ইঙ্গ-জার্মান নৌচুক্তি, স্পেনের গৃহযুদ্ধ, রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি, অস্ট্রিয়া দখল, চেকোস্লোভাকিয়া দখল ও পোল্যাণ্ড সমস্যা সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

এডলফ হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি

বিষয় এডলফ হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি
বিরোধিতা ভার্সাই সন্ধি
জাতিসংঘ ত্যাগ ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ
রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি ৬ নভেম্বর, ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দ
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ
এডলফ হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি

ভূমিকা:- এডলফ হিটলার ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ওয়েমার প্রজাতন্ত্র -এর পতন ঘটিয়ে জার্মানির ক্ষমতা দখল করেন। জার্মানির অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের পর পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ নজর দিতে থাকেন।

বিদেশ নীতির লক্ষ্য

হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য কি তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। যেমন –

(১) এলান বুলকের মন্তব্য

হিটলারের জীবনীকার ঐতিহাসিক এলান বুলক বলেন যে, হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ছিল জার্মানিকে ইউরোপ -এর প্রধান শক্তিতে পরিণত করা। চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শক্তি হিসেবে জার্মানিকে প্রতিষ্ঠিত করা।

(২) টেলরের মন্তব্য

অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর এই ব্যাপারে ভিন্ন কথা বলেন। তাঁর মতে, হিটলারের বিশ্বব্যাপী জার্মান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সম্পর্কে কোনও যুক্তিগ্রাহ্য প্রমাণ নেই। তিনি বলেন যে,

(ক) নৌবাহিনী সম্পর্কে উদাসীন

বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত হল সুদক্ষ নৌবাহিনী। হিটলার নৌবাহিনীর উপর কোনও গুরুত্ব দেন নি। তিনি ভূমধ্যসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দখলে রাখার কোনও চেষ্টা করেন নি।

(খ) ইতালিকে সাহায্য

উত্তর আফ্রিকার গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলির উপর প্রাধান্য বিস্তারের কোনও আগ্রহ তাঁর ছিল না। জার্মানির মিত্র ফ্যাসিস্ট ইতালি উত্তর আফ্রিকার যুদ্ধে বিপদে পড়লে তিনি সেখানে সামান্য কিছু সাহায্য পাঠান।

(৩) ইংল্যান্ডের সাথে মিত্রতা

সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের সঙ্গে শত্রুতা নয় – মিত্রতা রক্ষার জন্য হিটলার বারবার চেষ্টা চালান। কাইজার ইংল্যান্ড-বিরোধিতার জন্য যে ভুল করেন, হিটলার তার পুনরাবৃত্তি করতে রাজি ছিলেন না।

(৪) ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি অনীহা

হিটলার ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি কোনও সহানুভূতি দেখান নি, কারণ তাতে ব্রিটেনের সঙ্গে মিত্রতার সম্ভাবনা বিনষ্ট হত।

প্রকৃত লক্ষ্য

অধ্যাপক টেলর বলেন যে, তাঁর প্রকৃত লক্ষ্য ছিল পূর্ব ইউরোপে জার্মান সাম্রাজ্য বিস্তার করে ওই অঞ্চলে জার্মান উদ্বাস্তুদের জন্য স্থান সংকুলান করা।

ভার্সাই সন্ধির বিরোধিতা

  • (১) ভার্সাই সন্ধি জার্মানির উপর জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল এবং জার্মান জাতির সব অগ্রগতির মূল প্রতিবন্ধক ছিল এই সন্ধি। হিটলারের লক্ষ্য ছিল এই চুক্তির বেড়াজাল থেকে জার্মানিকে সর্বতোভাবে মুক্ত করা।
  • (২) এই কারণে ক্ষমতায় আসার অনেক আগে থেকেই তিনি এই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং ক্ষমতায় এসে প্রথম থেকেই তিনি এই চুক্তি লঙ্ঘন করতে শুরু করেন। জার্মান জাতি হিটলারের এই সিদ্ধান্ত সানন্দে মেনে নেয়, কারণ তারা ভার্সাই সন্ধিকে ‘বলপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সন্ধি ছাড়া অন্য কিছু মনে করত না।

জার্মানির জাতিসংঘ ত্যাগ

  • (১) ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে জেনেভাতে অনুষ্ঠিত নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে জার্মানি দাবি করে যে, ভার্সাই সন্ধি কেবল জার্মানির উপরেই অস্ত্রশস্ত্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। সুতরাং অন্যান্য রাষ্ট্রও তাদের সামরিক শক্তি হ্রাস করে জার্মানির স্তরে নামিয়ে আনুক, অথবা জার্মানিকে তার সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার অনুমতি দেওয়া হোক।
  • (২) এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে জার্মান প্রতিনিধি সম্মেলন ত্যাগ করেন এবং একই সঙ্গে জার্মানি ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই অক্টোবর জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদও ত্যাগ করে। এর ফলে ভার্সাই ব্যবস্থা প্রবল আঘাতপ্রাপ্ত হয়।

পোল-জার্মান সম্পর্ক

পোল্যান্ড ও জার্মানির সম্পর্কের বিভিন্ন দিক গুলি হল –

(ক) অনাক্রমণ চুক্তি

ভার্সাই সন্ধি দ্বারা জার্মানির বহু ভূখণ্ড পোল্যান্ডকে দেওয়া হয়। এর ফলে পোল্যান্ড সম্পর্কে জার্মানির মনোভাব খুবই তিক্ত ছিল। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে হিটলার পোল্যান্ডের সঙ্গে দশ বছরের অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব বিবাদ মিটিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

(খ) হিটলারের উদ্দেশ্য

এই চুক্তির পেছনে হিটলারের মূল উদ্দেশ্য ছিল ফ্রান্সের সঙ্গে মিত্রতা থেকে পোল্যান্ডকে বিচ্ছিন্ন করে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেওয়া।

(গ) পোল্যাণ্ডের উদ্দেশ্য

পোল্যান্ডেরও কয়েকটি উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়। যেমন –

  • (১) সম্ভাব্য জার্মান আক্রমণের সম্ভাবনা থেকে পোল্যান্ড মুক্তি পায়।
  • (২) জার্মানির কাছ থেকে অনাক্রমণের প্রতিশ্রুতি পেয়ে পোল্যান্ড ফ্রান্সের উপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করে।
  • (৩) এই চুক্তির দ্বারা ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত লোকার্নো চুক্তির ফ্রাঙ্কো-পোলিশ পারস্পরিক আত্মরক্ষা চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। এর ফলে ফ্রান্সের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং তার জার্মানিকে বেষ্টন করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
  • (৪) জার্মানির কাছে অনাক্রমণের প্রতিশ্রুতি পেয়ে পোল্যান্ড রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করার সুযোগ পায়।

জার্মানি কর্তৃক সার পুনরুদ্ধার

  • (১) ভার্সাই চুক্তি অনুসারে জার্মানির শিল্পসমৃদ্ধ সার উপত্যকা ফ্রান্সকে দেওয়া হয় এবং স্থির হয় যে, পনেরো বছর পর ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে গণভোটের মাধ্যমে সার উপত্যকার ভাগ্য নির্ধারিত হবে – স্থির হবে সার অঞ্চল ফ্রান্সের দখলে থাকবে, না জার্মানির হাতে ফিরে যাবে।
  • (২) ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতায় এসে হিটলার সার উপত্যকায় জার্মানির অনুকূলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ শুরু করেন এবং ভোটদাতাদের নানাভাবে ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন। এই ব্যাপারে ফ্রান্স আপত্তি জানালে জার্মানি সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়।
  • (৩) ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে সার উপতাকা অঞ্চলে গণভোট গৃহীত হয় এবং এই অঞ্চলের প্রায় নব্বই শতাংশ মানুষ জার্মানির সঙ্গে সংযুক্তির পক্ষে মত দেয়। এইভাবে পনেরো বছর পর সার পুনরায় জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হয়।

জার্মানির অস্ত্রসজ্জা

  • (১) ভার্সাই সন্ধি দ্বারা জার্মানির পদাতিক সৈন্যের সংখ্যা ১ লক্ষে বেঁধে দেওয়া হয়, যা চেকোশ্লোভাকিয়া এবং পোল্যান্ডের চেয়েও কম ছিল। তার বিমান বাহিনী রাখা নিষিদ্ধ হয়। জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ত্যাগের পর হিটলার সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহে তৎপর হন।
  • (২) জার্মানির সৈন্যসংখ্যা ১ লক্ষ থেকে ২০ লক্ষে দাঁড়ায়। জার্মানির অস্ত্র কারখানাগুলিতে প্রায় ১৩ লক্ষ যুবক নিযুক্ত হয়। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা প্রবর্তনের কথা ঘোষণা করে। এছাড়া বলা যে, জার্মানিতে পাঁচ লক্ষ পঞ্চান্ন হাজার সেনাবিশিষ্ট ছত্রিশটি ডিভিসন গড়ে তোলা হবে।
  • (৩) জার্মানিতে ট্যাঙ্ক, কামান, রণতরী, সাঁজোয়া গাড়ি, ডুবোজাহাজ, বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান প্রভৃতি যুদ্ধের নানা আধুনিক উপকরণ তৈরি হতে থাকে। জার্মান বিমান বাহিনী ‘লুফৎওয়াফ্’ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিমান বাহিনীতে পরিণত হয়।

ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তি

  • (১) জার্মানির এই সমরসজ্জায় যখন চারিদিকে প্রতিবাদ উঠেছে তখন ইংল্যান্ড জার্মানিকে বাধা না দিয়ে ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে জার্মানির সঙ্গে এক নৌ-চুক্তি সম্পাদন করে, যা ‘ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তি’ নামে পরিচিত।
  • (২) এর দ্বারা ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫% হারে জার্মান নৌ-শক্তি বৃদ্ধির কথা বলা হয়। এই চুক্তিটি হিটলারের বিরাট কূটনৈতিক জয়রূপে পরিগণিত হয়। জার্মান বিদেশমন্ত্রী রিবেনট্রপ সদম্ভে ঘোষণা করেন যে, “ইঙ্গ-জার্মান নৌ-চুক্তির অর্থই হল ভার্সাই চুক্তির বিলোপ।”
  • (৩) এই চুক্তির দ্বারা জার্মানি ব্রিটেনের সহানুভূতি অর্জন করে এবং জার্মানির অস্ত্রবৃদ্ধির বিরুদ্ধে ফ্রান্সের একক প্রতিবাদ মূল্যহীন হয়ে পড়ে। পোল-জার্মান চুক্তি-র ফলে ফ্রান্স পোল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছিল। এখন ইঙ্গ-জার্মান চুক্তি ফ্রান্সকে ব্রিটেন থেকেও বিচ্ছিন্ন হরে। ইউরোপে ফ্রান্স মিত্রহীন হয়ে পড়ে।
  • (৪) এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার আশায় ফ্রান্স ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রাঙ্কো-সোভিয়েত পারস্পরিক আত্মরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত করে। এর দ্বারা স্বাক্ষরকারী দেশ দুটি সম্ভাব্য জার্মান আক্রমণে একে অন্যকে সাহায্য করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়।

রাইন ভূখণ্ড জয়

  • (১) ভার্সাই ও লোকার্নো চুক্তির শর্তানুসারে রাইন ভূখণ্ড ছিল এক অসামরিক এলাকা, সেখানে কোনোপ্রকার অস্ত্রসজ্জা নিষিদ্ধ ছিল। এই দুই সন্ধির শর্ত উপেক্ষা করে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে হিটলার রাইন ভূখণ্ডে অস্ত্রসজ্জা শুরু করেন এবং তারপর একরকম বিনা বাধায় তা দখল করে নেন।
  • (২) আশা ছিল যে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স হিটলারকে বাধা দিতে আসবে, কিন্তু তা হয় নি। ফ্রান্স ইচ্ছা করলে একাই এই আক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারত, কিন্তু মৌখিক প্রতিবাদ ছাড়া ফ্রান্স কিছু করে নি। অন্যদিকে, ইংল্যান্ড পুরোপুরি তোষণ নীতি অবলম্বন করেছিল। এছাড়া, ইংল্যান্ড এর মধ্যে কোনও অন্যায় দেখে নি।

স্পেনের গৃহযুদ্ধ

১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে স্পেন -এ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। স্পেনের প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে জেনালের ফ্রাঙ্কো বিদ্রোহ ঘোষণা করলে হিটলার তাঁকে সমর্থন জানান। এর মূলে দুটি কারণ ছিল। –

  • (১) ফ্রাঙ্কো জয়ী হলে স্পেনে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে। এর ফলে ইউরোপে একনায়কতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং প্রজাতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়বে।
  • (২) স্পেনের গৃহযুদ্ধ -এ যোগ দিয়ে হিটলার তার সমরবাহিনী – বিশেষ করে তাঁর বিমান বাহিনীর দক্ষতা দেখতে চেয়েছিলেন।

রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি

  • (১) জার্মানির আগেই ইতালিতে মুসোলিনির একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হিটলারের শক্তিবৃদ্ধিতে আতঙ্কিত হয়ে মুসোলিনি ফ্রান্সের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেন।
  • (২) ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনির আবিসিনিয়া আক্রমণের সময় হিটলার মুসোলিনিকে সমর্থন করেন। এর ফলে হিটলার ও মুসোলিনি পরস্পরের কাছাকাছি আসেন।
  • (৩) হিটলারের লক্ষ্য ছিল অস্ট্রিয়া দখল এবং এডলফ হিটলারের অস্ট্রিয়া দখল -এর সময় ইতালির সাহায্য দরকার হতে পারে – এই উপলব্ধি থেকেই হিটলার মুসোলিনির সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে উদ্যোগী হন।
  • (৪) ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে দু’জনের মধ্যে মৈত্রী গড়ে ওঠে। এই মৈত্রী রোম-বার্লিন অক্ষচুক্তি নামে পরিচিত। এখানে উল্লেখ্য যে, মুসোলিনিই প্রথম ‘অক্ষ’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি সদর্পে ঘোষণা করেন যে, “বার্লিন-রোমের যোগ একটি নতুন অক্ষরেখা রচনা করল।”
  • (৫) ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে নভেম্বর জার্মানি ও জাপান সাম্যবাদ-বিরোধী অ্যান্টি-কমিন্টার্ন চুক্তি স্বাক্ষর করে। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ৬ই নভেম্বর ইতালি এই কমিন্টার্ন-বিরোধী মিত্রজোটে যোগ দিলে ইতালি-জার্মানি-জাপান এই তিন রাষ্ট্রের জোট গড়ে ওঠে। ইতিহাসে এই জোট ‘রোম-বার্লিন-টোকিও অচুক্তি’ নামে পরিচিত।
  • (৬) স্থির হয় যে, এই জোট চতুর্থ কোনও শক্তি কর্তৃক আক্রান্ত হলে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করবে এবং এই চুক্তি দশ বছর স্থায়ী হবে। এইভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব দুটি মৈত্রী জোটে বিভক্ত হয়ে পড়ে – একটি ‘রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি’ এবং অপরটি ‘ব্রিটেন-ফ্রান্স-সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রশক্তি’।

অস্ট্রিয়া দখল

  • (১) এরপর হিটলার অস্ট্রিয়ার দিকে নজর দেন। ভার্সাই সন্ধি ও সেন্ট জার্মেইন সন্ধির দ্বারা জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার সংযুক্তি নিষিদ্ধ ছিল। হিটলার ও তাঁর দল শুরু থেকেই দুই দেশের সংযুক্তির পক্ষে ছিল, কারণ, অস্ট্রিয়ায় বসবাসকারী জার্মান জাতিগোষ্ঠীর মানুষের সংখ্যা নেহাত কম ছিল না।
  • (২) ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে হিটলার অস্ট্রিয়ার নাৎসিদের নানাভাবে ইন্ধন দিতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ১৪ই মার্চ ইংল্যান্ডের পরোক্ষ সমর্থনে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করে। ১০ই এপ্রিল এক গণভোটের মাধ্যমে অস্ট্রিয়ার ৯৯.৭৫ ভাগ মানুষ এই সংযুক্তির পক্ষে রায় দেয়।

চেকোস্লোভাকিয়া দখল

  • (১) অস্ট্রিয়া দখলের পর হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়া জয়ে অগ্রসর হন। দক্ষিণ-পূর্ব ইউরোপের প্রবেশদ্বার শিল্পসমৃদ্ধ এবং সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই দেশটির দিকে হিটলারের নজর ছিল। এছাড়া, চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলটি ছিল জার্মান-প্রধান জার্মানির প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন।
  • (২) হিটলারের প্ররোচনায় স্থানীয় জার্মানরা সরকার বিরোধী দাঙ্গা শুরু করে। হিটলার এই অঞ্চলে বসবাসকারী জার্মানদের স্বার্থরক্ষায় তৎপর হন এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন।
  • (৩) শেষ পর্যন্ত মুসোলিনির মধ্যস্থতায় মিউনিখে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন, ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালাদিয়ের, হিটলার ও মুসোলিনি-র মধ্যে ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের ২৯শে সেপ্টেম্বর এক চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা মিউনিখ চুক্তি নামে পরিচিত।
  • (৪) এই চুক্তি অনুসারে সুদেতান অঞ্চল জার্মানিকে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার বাকি অংশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন। এইভাবে বিনা যুদ্ধে হিটলার চেকোশ্লোভাকিয়ার এক বিরাট অংশ দখল করেন। এই চুক্তি স্বাক্ষরের ছয়মাস পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই মার্চ হিটলার সমগ্র চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেন।

পোল্যান্ড সমস্যা

  • (১) এরপর হিটলারের দৃষ্টি পড়ে পোল্যান্ডের দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ -এর পর ভার্সাই সন্ধি দ্বারা জার্মান শহর ডানজিগকে একটি মুক্ত আন্তর্জাতিক শহরে পরিণত করা হয়। কিন্তু এর অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকে পোল্যান্ডের হাতে।
  • (২) এইসব কারণেই ডানজিগের জার্মান অধিবাসীদের সঙ্গে পোল্যান্ডের বিরোধ বাধে। হিটলার ডানজিগ বন্দর এবং সেখানে পৌঁছবার জন্য পোল্যান্ডের মধ্য দিয়ে একটি করিডর-এর দাবি জানান। পোল্যান্ড এই দাবি অগ্রাহ্য করে।
  • (৩) জার্মানির ক্রমাগত এই আগ্রাসন নীতিতে ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ প্রবল ক্ষুব্ধ হয় এবং ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে মার্চ ইঙ্গ-ফরাসি পক্ষ পোল্যান্ডের সঙ্গে একটি আত্মরক্ষামূলক চুক্তি স্বাক্ষর করে।
  • (৪) সুচতুর হিটলার উপলব্ধি করেন যে, পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সহজে মেনে নেবে না। এই কারণে একদিকে তিনি যেমন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করেন, তেমনি অন্যদিকে সাম্যবাদী রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্থাপনে উদ্যোগী হন।

রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি

  • (১) হিটলারের কমিউনিস্ট-বিদ্বেষ বা স্ট্যালিনের নাৎসি-বিদ্বেষ কারো অজানা নয়। তা সত্ত্বেও কয়েকটি কারণে দু’পক্ষ কাছাকাছি আসতে বাধ্য হয়। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে আগস্ট মধ্যরাতে রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
  • (২) এই চুক্তি সম্পাদনে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মলোটভ এবং জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। বহু পাশ্চাত্য ঐতিহাসিক এই চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতার নামান্তর বলে অভিহিত করেছেন, কিন্তু অধ্যাপক এ. জে. পি. টেলর বলেন যে, মিউনিখ চুক্তির কর্মকর্তাদের পক্ষে কোনও সমালোচনা শোভা পায় না।

রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির শর্ত

চুক্তির শর্তানুসারে স্থির হয় যে,

  • (১) আগামী দশ বছর জার্মানি ও রাশিয়া পরস্পরকে আক্রমণ করবে না।
  • (২) শান্তিপূর্ণভাবে পারস্পরিক বিবাদ মিটিয়ে নেওয়া হবে।
  • (৩) তৃতীয় কোনও শক্তি দ্বারা দু’জনের কেউ আক্রান্ত হলে, কেউই সেই তৃতীয় পক্ষকে সাহায্য করবে না।
  • (৪) এই চুক্তির একটি গোপন অংশ ছিল তাতে স্থির হয় যে, দু’পক্ষ পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেবে।

হিটলারের কূটনৈতিক বিচক্ষণতা

১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩শে আগস্ট রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি দ্বারা জার্মানি পূর্ব সীমান্তে রুশ নিরপেক্ষতা অর্জন করে। এই চুক্তি হিটলারের কূটনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক।

উপসংহার:- রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ১লা সেপ্টেম্বর হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করেন। সদ্য-স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া নিরপেক্ষ থাকে। পোল্যান্ডের রক্ষক ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স ৩রা সেপ্টেম্বর জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

(FAQ) এডলফ হিটলারের পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জার্মানিতে ওয়েমার প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটান কে?

এডলফ হিটলার।

২. মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কবে?

২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে।

৩. রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় কবে?

২৩ আগস্ট, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ।

৪. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় কবে?

৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে।

Leave a Reply

Translate »