জগদীশচন্দ্র বসু

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু প্রসঙ্গে তার জন্ম, বংশ পরিচয়, শিক্ষা, বিলাত যাত্রা, বিবাহ, বৃত্তি লাভ, কলেজের অধ্যাপক, প্রবন্ধ রচনা, বৈদ্যুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দ স্থানান্তর, ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার, উদ্ভিদের প্রাণের প্রমাণ, গ্ৰন্থ রচনা, বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা ও তার মৃত্যু সম্পর্কে জানবো।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

ঐতিহাসিক চরিত্রজগদীশচন্দ্র বসু
জন্ম৩০ নভেম্বর, ১৮৫৮ খ্রি:
দেশভারত
পরিচিতিপদার্থবিজ্ঞানী
আবিষ্কারক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র
মৃত্যু২৩ নভেম্বর, ১৯৩৭ খ্রি:
আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

ভূমিকা :- একজন বাঙালি পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী এবং কল্পবিজ্ঞান রচয়িতা ছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্যবহারিক এবং গবেষণাধর্মী বিজ্ঞানের সূচনা তার হাত ধরেই হয় বলে মনে করা হয়। ইনস্টিটিউট অব ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ার্স তাকে রেডিও বিজ্ঞানের একজন জনক হিসেবে অভিহিত করে।

জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম

বিজ্ঞান তাপস আচার্য জগদীশচন্দ্র জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের বাড়ীখাল গ্রামে।

জগদীশচন্দ্র বসুর বংশ পরিচয়

তাঁর বাবা ভগবানচন্দ্র ছিলেন ফরিদপুরের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। জগদীশচন্দ্র যে বাড়িতে থাকতেন, বাড়ির পাশ দিয়ে পদ্মার একটি শাখা নদী বয়ে গিয়েছিল। জগদীশচন্দ্র এই নদীর ধারে বসে থাকতে খুবই ভালবাসতেন। সমস্ত জীবনই তাঁর নদীর প্রতি আকর্ষণ ছিল। তাই পরবর্তীকাল তিনি গঙ্গার উৎস সন্ধানে যাত্রা করেছিলেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর শিক্ষা

  • (১) স্থানীয় স্কুলে পড়া শেষ হলে ভগবানচন্দ্র জগদীশকে কলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু ইংরেজীতে আশানুরূপ উন্নতি না হওয়ায় তিন মাস পর জগদীশচন্দ্র ভর্তি হলেন সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুলে। ভগবানচন্দ্র তখন বর্ধমানের অ্যাসিস্টেন্ট কমিশনার।
  • (২) হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা হল জগদীশচন্দ্রের। সেই সময় জগদীশচন্দ্রের বয়স এগারো। ছাত্র হিসাবে জগদীশচন্দ্র ছিলেন যেমন মেধাবী, পড়াশুনায় ছিল তেমনি গভীর অনুরাগ।
  • (৩) ষোল বছর বয়সে জগদীশচন্দ্র প্রথম বিভাগে এন্ট্রাস পরীক্ষায় পাশ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ভর্তি হলেন। ১৮৭৭ সালে তিনি এফ. এ. পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করলেন। তিন বছর পর দ্বিতীয় বিভাগেই বিজ্ঞান বিভাগে বি-এ পাশ করলেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর বিলাত যাত্রা

১৮৮০ সালে জগদীশচন্দ্র বিলাতের পথে যাত্রা করলেন। লন্ডনে গিয়ে ডাক্তারি পড়বার জন্য মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলেন। কিন্তু মৃতদেহ কাটাকুটির সময় প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। শেষে ডাক্তারি ছেড়ে দিয়ে তিনি কেমব্রিজের ক্রাইস্ট কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেন। অবশেষে ১৮৮৪ সালে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি-এস-সি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এলেন ভারতবর্ষে।

জগদীশচন্দ্র বসুর সম্বন্ধে রিপনের কাছে চিঠি

ভারতে ফিরে আসার আগে ইংল্যান্ডের পোস্ট মাস্টার জেনারেল ভারতের বড়লাট লর্ড রিপনের কাছে জগদীশচন্দ্র বসুর সম্বন্ধে চিঠি লিখে দিলেন। লর্ড রিপন তখন ছিলেন সিমলায়। তিনি বাংলার গভর্নরকে চিঠি লিখে দিলেন যাতে জগদীশচন্দ্রকে শিক্ষা বিভাগে কোনো ভাল পদ দেওয়া যায়।

প্রেসিডেন্সী কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপক জগদীশচন্দ্র বসু

সেই সময় সাহেবদের ধারণা ছিল ভারতীয়রা বিজ্ঞান শিক্ষার অনুপযুক্ত। সেই কারণে চাকরিতে নিয়োগের ব্যাপারে নানা অজুহাত সৃষ্টি করা হল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লর্ড রিপনের আদেশে তাঁকে কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজে অস্থায়ী অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করা হল। এই পদে ইংরেজ অধ্যাপকরা যে বেতন পেত জগদীশচন্দ্রকে তার দুই-তৃতীয়াংশ বেতন স্থির হল। আবার অস্থায়ী বলে ঐ বেতনের অর্ধেক হাতে দেওয়া হত।

বিনা বেতনে জগদীশচন্দ্র বসুর ক্লাস

এই ব্যবস্থায় জগদীশচন্দ্রের আত্মসম্মানে ঘা লাগল। ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করবার জন্য তিনি প্রথমে প্রতিবাদ জানালেন। বাঙালী তরুণ অধ্যাপকের এই প্রতিবাদে কেউ কোনো কর্ণপাত করল না। শেষে তিনি স্থির করলেন কোনো বেতন নেবেন না। বেতন না নিলেও তিনি নিয়মিত ক্লাস নিতে আরম্ভ করলেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর বিবাহ

১৮৮৭ সালে জগদীশচন্দ্র অবলা দাসকে বিয়ে করলেন। অবলা দাস ছিলেন বিদূষী উচ্চশিক্ষিতা। মাদ্রাজ মেডিকেল কলেজে কয়েক বছর ডাক্তারি পড়েছিলেন। যখন দুজনের বিয়ে হল তখন জগদীশ বসু কোনো মাইনে নেন না। সংসারে অভাব অনটন।

জগদীশচন্দ্র বসুর বৃত্তি লাভ

অধ্যাপনার এক বছরের মধ্যেই জগদীশচন্দ্র তাঁর গবেষণাপত্র ইংলন্ডের রয়েল সোসাইটিতে পাঠালেন। অল্পদিনের মধ্যেই তা প্রকাশিত হল। রয়েল সোসাইটির তরফ থেকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য বৃত্তি দেওয়া হল। এছাড়া লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে D. Sc. উপাধি দিল।

জগদীশচন্দ্র বসুর জয় লাভ

ইতিমধ্যে তিন বছর তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কলেজে অধ্যাপনা করে গেলেন। তাঁর এই অসহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হল কলেজ কর্তৃপক্ষ। জগদীশচন্দ্রকে শুধু যে ইংরেজ অধ্যাপকের সমান বেতন দিতে স্বীকৃতি হল তাই নয় তাঁর তিন বছরের সমস্ত প্রাপ্য অর্থ মিটিয়ে দেওয়া হল।

জগদীশচন্দ্র বসুর প্রবন্ধ

প্রাপ্ত অর্থে পিতার সমস্ত দেনা শোধ করলেন জগদীশচন্দ্র। গবেষণাগারে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ছাড়াই জগদীশচন্দ্র ইলেকট্রিক রেডিয়েশন বিষয়ে গবেষণা করতেন। তাঁর প্রথম প্রবন্ধ ছিল, “বিদ্যুৎ-উৎপাদক ইথার তরঙ্গের কম্পনের দিকে পরিবর্তন” এই প্রবন্ধটি তিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতে পেশ করেছিলেন। এর পরের প্রবন্ধগুলি ইংল্যান্ডের “ইলেকট্রিসিয়ান” পত্রিকায় প্রকাশ করেন।

জগদীশচন্দ্র বসু কর্তৃক বিনা তারে বৈদুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দ স্থানান্তর

  • (১) এই সময় বিনা তারে বৈদুতিক তরঙ্গের মাধ্যমে শব্দকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় কিভাবে পাঠানো যায় সেই বিষয়ে গবেষণা করছিলেন, আমেরিকায় বিজ্ঞানী লজ, ইতালিতে মার্কোনি। জগদীশচন্দ্র ছিলেন এ বিষয়ে অগ্রণী।
  • (২) ১৮৯৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে প্রথম এই বিষয় পরীক্ষা করেন। কলকাতার টাউন হলে সর্বসমক্ষে এই পরীক্ষা করেন। এর পরে তিনি বিনা তারে তাঁর উদ্ভাসিত যন্ত্রের সাহায্যে নিজের বাসা থেকে এক মাইল দূরে কলেজে সঙ্কেত আদান-প্রদানের ব্যবস্থা করলেন। এই কাজ অসমাপ্ত রেখেই তিনি পশ্চিমে যাত্রা করলেন।

গবেষণার জন্য জগদীশচন্দ্র বসুর ইংল্যন্ড গমন

  • (১) ১৮৯৬ সালে তিনি এক বছরের ছুটির জন্য দরখাস্ত করলেন। প্রথমে সম্মত না হলেও শেষ পর্যন্ত গভর্নর তাঁকে গবেষণার জন্য ইংল্যন্ডে যাবার অনুমতি দিলেন। Wireless telegraphy সম্বন্ধে তাঁর আবিষ্কার ইংল্যান্ডে সাড়া ফেলে দিয়েছিল।
  • (২) এই প্রসঙ্গে জগদীশচন্দ্র লিখেছেন, “একটি বিখ্যাত ইলেকট্রিক কোম্পানি আমার পরামর্শ মত কাজ করে Wireless telegraphy বিষয়ে প্রভূত উন্নতি করিয়াছেন আমি আর একটি নুতন পেপার লিখিয়াছি তাহাতে Practical Wireless telegraphy-র অনেক সুবিধা হইবে।”

জগদীশচন্দ্র বসুর গবেষণা ব্যাহত

অর্থনৈতিক কারণে জগদীশচন্দ্রের গবেষণা ব্যাহত হয়েছিল। ইতিমধ্যে ১৮৯৬ সালে মার্কোনি  Wireless telegraphy-র প্রথম পেটেন্ট নিলেন।

ব্রিটেনের বিজ্ঞানী মহলে জগদীশচন্দ্র বসুর পরিচিতি

ব্রিটেনে গিয়ে অল্পদিনের মধ্যেই তিনি বিজ্ঞানী মহলে পরিচিত হয়ে উঠলেন। লন্ডনে থাকার সময় জগদীশ অনুভব করলেন বিলাতে বিজ্ঞানীরা কত আধুনিক গবেষণাগারের সুযোগ পাচ্ছে। তাঁর অনুরোধে লর্ড কেলভিন ও অন্য বিজ্ঞানীরা ভারত সচিবের কাছে গবেষণার সুযোগ প্রদান করবার জন্য অনুরোধ জানালেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর ভারতে প্রত্যাগমন

১৮৯৭ সালে জগদীশচন্দ্র দীর্ঘ প্রবাস জীবন যাপন করার পর ভারতবর্ষে ফিরে এলেন। ভারতবর্ষে ফিরে এসে আবার অধ্যাপনার কাজ শুরু করলেন সেই সাথে গবেষণা। এই সময়েই তাঁর উদ্ভিদ বিষয়ক যুগান্তকারী গবেষণা আরম্ভ করেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর প্যারিস গমন

১৯০০ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পদার্থবিদ্যা বিষয়ক সম্মেলনে যোগ দেবার জন্য ডাক এল জগদীশচন্দ্রের। জুলাই মাসে জগদীশচন্দ্র প্যারিসে পৌঁছবেন। এখানে তাঁর বক্তৃতার বিষয় ছিল “জীব ও জড়ের উপর বৈদ্যুতিক সাড়ার একত্বতা।” ফ্রান্স থেকে জগদীশচন্দ্র গেলেন ইংলন্ডে। সেখানে জীব ও জড়ের সম্পর্ক বিষয়ে ব্রিটিশ এ্যাসোসিয়েশনের ব্রাডফোর্ড সভায় বক্তৃতা দিলেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর গ্ৰন্থ রচনা

১৯০২ সালে জগদীশচন্দ্র ভারতে ফিরে এসে রচনা করলেন তাঁর বৈজ্ঞানিক গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে “জীব ও জড়ের সাড়া” (১৯০২) (Responses in the living and nonliving) ১৯০৬ সাল প্রকাশিত হল তাঁর আর একটি গ্রন্থ “উদ্ভিদের সাড়া” (Plant Responses 1906 )। এই দুটি গ্রন্থের মধ্যে তিনি প্রমাণ করলেন উদ্ভিদ বা প্রাণীকে কোনোভাবে উত্তেজিত করলে তা থেকে একই রকম সাড়া পাওয়া যায়।

ইউরোপ থেকে জগদীশচন্দ্র বসুর ডাক

এই সময় ইউরোপ থেকে ডাক এল। তিনি প্রথমে গেলেন ইংল্যান্ড, সেখান থেকে আমেরিকা। বিশেষত আমেরিকার বিজ্ঞানীরা তাঁর আবিষ্কার সম্বন্ধে ছিল যথেষ্ট কৌতূহলী তাছাড়া ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী মহলও ধীরে ধীরে গবেষণার সত্যতাকে স্বীকার করে নিচ্ছিলেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর ক্রেস্কোগ্রাফ যন্ত্র আবিষ্কার

দেশে ফিরে এসে তাঁর তৃতীয় পর্যায়ের গবেষণা শুরু করলেন, “উদ্ভিদ ও প্রাণীদের দেহকলার মধ্যে তুলনামূলক গবেষণা”। এই সময় তিনি উদ্ভাবন করলেন তাঁর বিখ্যাত যন্ত্র ক্রেস্কোগ্রাফ। এই যন্ত্রের সাহায্যে কোনো বস্তুর অতি সূক্ষ্মতম সঞ্চালনকেও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেখানো সম্ভবপর।

জগদীশচন্দ্র বসু কর্তৃক উদ্ভিদের প্রাণের প্রমাণ

  • (১) ইতিমধ্যে দেশে বিদেশে তাঁর একাধিক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। ১৯১৪ সালে তিনি চতুর্থবারের জন্য ইংল্যান্ড গেলেন। এইবার যাত্রার সময় তিনি সাথে করে শুধু যে তাঁর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি নিয়ে গেলেন তাই নয়, তাঁর সঙ্গে ছিল লজ্জবতী ও বনচাড়াল গাছ। এই গাছগুলি সহজেই সাড়া দেয়।
  • (২) তিনি অক্সফোর্ড ও কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, এছাড়া রয়েল সোসাইটিতেও তাঁর উদ্ভাসিত যন্ত্রের সাহায্যে প্রমাণ করলেন, জীবদেহের মত বৃক্ষেরও প্রাণ আছে, তারাও আঘাতে উত্তেজনায় অনুরণিত হয়।

জগদীশচন্দ্র বসুর চাকরি জীবনে অবসর

১৯১৩ সালে জগদীশচন্দ্র চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করবার সময় ছিল, কিন্তু তাঁর চাকরির মেয়াদ আরো দু’বছর বাড়ানো হল। ১৯১৫ সালে সুদীর্ঘ ৩১ বছর অধ্যাপনা করবার পর চাকরি জীবন থেকে অবসর নিলেন।

ভারতে উন্নত গবেষণাগার প্রতিষ্ঠায় জগদীশচন্দ্র বসুর আগ্ৰহ

চাকরি জীবন শেষ হলেও তাঁর গবেষণার কাজ বন্ধ হল না। তিনি ইংল্যন্ডে থাকার সময় লন্ডনের রয়াল ইনস্টিটউটের সাথে যুক্ত ছিলেন। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দেখে তাঁর মনে হয়েছিল ভারতবর্ষে যদি এই ধরনের একটি গবেষণার কাজে আগ্রহী হয়ে উঠবে।

জগদীশচন্দ্র বসু কর্তৃক বসু বিজ্ঞান মন্দির প্রতিষ্ঠা

  • (১) তিনি তাঁর পরিচিত জনের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে তাঁর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করলেন। এবার এই কাজে এগিয়ে এলেন দেশের বহু মানুষ। কাশিমবাজারের মহারাজা মণীচন্দ্রচন্দ্র নন্দী দুই লক্ষ টাকা দিলেন।
  • (২) এছাড়া বম্বের দুই ব্যবসায়ী মিঃ এস আর বোমানজী দিলেন এক লক্ষ টাকা। মি: মূলরাজ খাতা সোয়া লক্ষ টাকা দিলেন। তাছাড়া জগদীশচন্দ্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ঘুরে অর্থ সঞ্চয় করলেন, এইভাবে প্রায় ছয় লক্ষ টাকা সংগৃহিত হল।
  • (৩) জগদীশ নিজের সমস্ত জীবনেরর উপার্জন পাঁচ লক্ষ টাকা দিলেন। সরকারের তরফ থেকে বার্ষিক অনুদান হিসাবে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করা হল এবং জমি অধিগ্রহণ করার ব্যাপারে সাহায্য করা হল।
  • (৪) অবশেষে ১৯১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর জগদীশচন্দ্রের ৫৯তম জন্মদিনে প্রতিষ্ঠা হল বিজ্ঞান মন্দির। জগদীশচন্দ্রের স্বপ্নের এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান শুধু ভারতবর্ষ নয়, সমগ্র বিশ্বের একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষণাগার।

জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে জগদীশচন্দ্র বসুর যোগদান

১৯২৮ সালে জগদীশচন্দ্র জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনে যোগ দেবার জন্য জেনেভা গেলেন। জেনেভাতে অভূতপূর্ব সম্মান পেলেন জগদীশচন্দ্র। তাঁর গবেষণা দেখে আইনস্টাইন মুগ্ধ বিস্ময়ে বলেছিলেন, জগদীশচন্দ্র পৃথিবীকে যে সব অমূল্য উপহার দিয়েছেন তার যে কোনো একটির জন্যই বিজয় স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।

পদ্মার উৎস সন্ধানে জগদীশচন্দ্র বসু

পরিণত বয়সে তিনি বেরিয়ে পড়েন পদ্মার উৎস সন্ধানে। তাঁর এই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন অপূর্ব ভাষায় ‘অব্যক্ত’ গ্রন্থে বিজ্ঞানী আর সাহিত্যিক জগদীশ একাকার হয়ে গিয়েছেন। বাংলা গ্রন্থ আর লেখা হয়নি।

অসুস্থ জগদীশচন্দ্র বসু

বয়স বাড়বার সাথে সাথে মাঝে মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়তেন জগদীশচন্দ্র। গবেষণার কাজ ছেড়ে দিলেও বসু বিজ্ঞান মন্দিরের কাজ নিয়মিত দেখাশুনা করতেন। মাঝে মাঝে দার্জিলিং যেতেন। জীবনের শেষ চার বছর কয়েক মাসের জন্য গিরিডিতে চলে যেতেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্তব্য

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঋষিতুল্য বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে বলেছেন, “ভারতের কোনও বৃদ্ধ ঋষির তরুণ মূর্তি তুমি হে আর্য আচার্য জগদীশ”।

জগদীশচন্দ্র বসুর সম্পর্কে আইনস্টাইনের মন্তব্য

আইনস্টাইন তার সম্পর্কে নিজেই বলেছেন, জগদীশচন্দ্র যেসব অমূল্য তথ্য পৃথিবীকে উপহার দিয়েছেন তার যে কোনটির জন্য বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করা উচিত।

জগদীশচন্দ্র বসু রচিত গ্ৰন্থ

বাংলা ভাষায় তার একমাত্র গ্ৰন্থ অব্যক্ত। ইংরেজি ভাষায় রচিত গ্ৰন্থগুলি হল-

Responses in the Living and Nonliving (১৯০২), Plant Responses as a Means of Physiological Investigations (১৯০৬), Comparative Electrophysiology (১৯০৭), Physiology of the Ascent of Sap (১৯২৩), Physiology of Photosynthesis (১৯২৪), Nervous Mechanism of Plants (১৯২৫), Collected Physical Papers (১৯২৭), Motor Mechanism of Plants (১৯২৮), Growth and Tropic Movement in Plants (১৯২৯)।

জগদীশচন্দ্র বসুর প্রতি সম্মাননা

নাইটহুড, ১৯১৬; রয়েল সোসাইটির ফেলো, ১৯২০; ভিয়েনা একাডেমি অফ সাইন্স-এর সদস্য, ১৯২৮; ভারতীয় বিজ্ঞান কংগ্রেস-এর ১৪তম অধিবেশনের সভাপতি, ১৯২৭; লিগ অফ ন্যাশন্‌স কমিটি ফর ইনটেলেকচুয়াল কো-অপারেশন -এর সদস্য; ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ সাইন্সেস অফ ইন্ডিয়া-এর প্রতিষ্ঠাতা ফেলো; বিবিসি জরিপে তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় সপ্তম স্থান লাভ করেন।

জগদীশচন্দ্র বসুর মৃত্যু

১৯৩৭ সালে তিনি তখন গিরিডিতে ছিলেন, বসু বিজ্ঞান মন্দিরের প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে কলকাতায় আসবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলেন, ২৩শে নভেম্বর সকালের গোসলের সময় অচৈতন্য হয়ে পড়ে গেলেন, অল্পক্ষণের মধ্যেই তাঁর হৃদয়স্পন্দন চিরদিনের মত স্তব্ধ হয়ে গেল। জগদীশচন্দ্রের কোন সন্তান ছিল না। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর স্ত্রী অবলা দাস সব কিছু বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানে দান করে যান।

উপসংহার :- বিজ্ঞান শিক্ষাদান ও বিজ্ঞান গবেষণার ক্ষেত্রে জগদীশচন্দ্র বসু প্রভূত সাফল্য অর্জন করেছিলেন, যার জন্য তার সুখ্যাতি তখনই ছড়িয়ে পড়েছিল। জগদীশ চন্দ্র যে গ্যালিলিও-নিউটনের সমকক্ষ বিজ্ঞানী তার স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯২৭ সালে লন্ডনের ডেইলি এক্সপ্রেস পত্রিকা।

(FAQ) আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. জগদীশচন্দ্র বসু কে ছিলেন?

একজন বাঙালি পদার্থবিদ, জীববিজ্ঞানী এবং কল্পবিজ্ঞান রচয়িতা।

২. উদ্ভিদের প্রাণ আছে কে প্রমাণ করেন?

জগদীশচন্দ্র বসু।

৩. অব্যক্ত গ্ৰন্থটির রচয়িতা কে?

জগদীশচন্দ্র বসু।

৪. উদ্ভিদের প্রাণ আছে তা প্রমাণ করার জন্য জগদীশচন্দ্র বসু কোন যন্ত্র আবিষ্কার করেন?

ক্রেস্কোগ্রাফ।

Leave a Comment