বয়কট

বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম ধারা হিসেবে বয়কট, ঋষি অরবিন্দ ঘোষের আহ্বান, বয়কটের আদর্শ নতুন নয়, বয়কটের কথা ঘোষণা, অমৃতবাজার পত্রিকার ভূমিকা, বয়কট মন্ত্র প্রচার, বয়কটের প্রস্তাব গ্ৰহণ, জাতীয় নেতৃত্বের কাছে বয়কট, তিলকের কাছে বয়কট, ছাত্রসমাজের ভূমিকা, নারী সমাজের ভূমিকা, বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভূমিকা, শ্রমিক আন্দোলন, মুসলিম সমাজের ভূমিকা, বয়কট আন্দোলনের সাফল্য ও ব্যর্থতার কারণ সম্পর্কে জানবো।

বয়কট

পরিচিতিস্বদেশী আন্দোলনের অন্যতম ধারা
অর্থবিদেশী দ্রব্য বর্জন
পরিপূরকস্বদেশী
প্রথম ঘোষণা১৩ জুলাই, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দ
বয়কট

ভূমিকা:- বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলনের তিনটি ধারা লক্ষ্য করা যায়—(ক) বয়কট, (খ) স্বদেশী ও (গ) জাতীয় শিক্ষা। ‘বয়কট’-এর মাধ্যমে জাতি বিদেশি সরকারের সঙ্গেঅসহযোগিতা শুরু করে, আর ‘স্বদেশী’-র মাধ্যমে জাতি মেতে ওঠে সৃষ্টির নব-আনন্দে।

স্বদেশী ও বয়কট

স্বদেশী ও বয়কট হল একই অস্ত্রের দুই দিক। স্বদেশী হল অস্তিবাচক—গঠনমূলক; আর বয়কট হল নেতিবাচক—বর্জন কর, বাতিল কর।

ভগিনী নিবেদিতার অভিমত

স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা ভগিনী নিবেদিতা-র মতে, স্বদেশী ও বয়কট হল একই জিনিসের দু’টি প্রয়োজনীয় দিক। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি বিকশিত হতে পারে না।

জাতীয় শিক্ষা

‘জাতীয় শিক্ষা’ হল সকল বিদেশি প্রভাব বর্জন করে জাতীয় আদর্শে ও জাতীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। |

ঋষি অরবিন্দের আহ্বান

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে (৯-২৩শে এপ্রিল) ‘বন্দেমাতরম্’ পত্রিকায় ‘নিষ্ক্রিয় প্রতিরোধ’ শিরোনামায় প্রকাশিত প্রবন্ধমালায় অরবিন্দ ঘোষ বিদেশি অর্থনীতি, শিক্ষা, বিচার, শাসনতন্ত্র ও আইন ব্যবস্থা বর্জন করে সম্পূর্ণ দেশীয় নিয়ন্ত্রণাধীনে ঐ সব প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান জানান। তাঁর হাতে স্বদেশী ও বয়কটের আদর্শ এক সুসংবদ্ধ রাজনৈতিক দর্শনে রূপান্তরিত হয়।

বয়কট

সরকারের বঙ্গভঙ্গ পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করে বাঙালি জাতি সরকারের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম একটি কার্যকরী প্রতিরোধ-ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এই ব্যবস্থার নাম হল ‘বয়কট’।

বয়কটের আদর্শ নতুন নয়

  • (১) রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য ‘বয়কট’ নীতির প্রয়োগ ভারতে নতুনকিছু নয়। ভারতীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দেই বয়কটের কথা বলা হয়।
  • (২) বোম্বাইয়ের ভারতীয় মিলগুলির স্বার্থে ১৮৭৫, ১৮৭৬ এবং ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে ম্যাঞ্চেস্টার-বস্ত্র বয়কটের আহ্বান জানানো হয়।
  • (৩) ১৮৮৩-৮৪ খ্রিস্টাব্দে ইলবার্ট বিল ও সুরেন্দ্রনাথের কারাবাস উপলক্ষে উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আবার বয়কটের ডাক দেওয়া হয়।
  • (৪) ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের প্রাক্কালে বয়কট নতুন তাৎপর্য লাভ করে। ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন যে, যদিও স্বদেশী ও বয়কটের আদর্শ পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, তবুও এই ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই যে বয়কটের আদর্শই মানুষকে প্রথম অনুপ্রাণিত করে, এবং স্বদেশীর ধারণা আসে তার পরে।

বয়কটের কথা ঘোষণা

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই জুলাই কৃষ্ণকুমার মিত্র সম্পাদিত ‘সঞ্জীবনী’ পত্রিকায় সর্বপ্রথম সরকারের বিরুদ্ধে এক সামগ্রিক বয়কটের কথা ঘোষণা করা হয়। ২০শে জুলাই এই পত্রিকাতে বয়কটের একটি ‘প্রতিজ্ঞা পত্র’ প্রকাশিত হয়।

অমৃতবাজার পত্রিকার ভূমিকা

১৭ ই জুলাই ‘অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি চিঠিতে বিলিতি দ্রব্য—বিশেষ করে ম্যাঞ্চেস্টার ক্লথ বয়কটের আহ্বান জানানো হয়।কারণ এর ফলে বিলেতের প্রভুদের টনক নড়বে এবং তাঁরা ভারতের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে আগ্রহী হবেন।

বয়কট মন্ত্র প্রচার

‘বয়কট’ মন্ত্র প্রচারে সুরেন্দ্রনাথ, মতিলাল ঘোষ এবং কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ আন্দোলনের প্রথম পর্বে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন।

বয়কটের প্রস্তাব গ্ৰহণ

১৬ ই জুলাই খুলনা জেলার বাগেরহাট শহরে এক বিরাট জনসভায় বয়কটের প্রস্তাব গৃহীত হয়। ২১শে জুলাই দিনাজপুরের মহারাজার সভাপতিত্বে দিনাজপুরে অনুষ্ঠিত এক সভায় বয়কটের এগারোটি প্রস্তাব গৃহীত হয়।

বয়কট প্রস্তাবের বক্তব্য

এই সকল প্রস্তাবে বলা হয় যে, সমস্ত অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা বোর্ড, পৌরসভা ও পঞ্চায়েতের সদস্যরা পদত্যাগ করবেন এবং আগামী এক বছরকাল জাতীয় শোক পালিত হবে। পরে কলকাতা, ঢাকা, বীরভূম, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ এবং সমগ্র বাংলা ও ভারতের অন্যান্য স্থানেও অনুরূপ বয়কটের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

জাতীয় নেতৃত্বের কাছে বয়কট

জাতীয় নেতৃবৃন্দ ‘বয়কট’ বলতে কেবলমাত্র বিলিতি বস্ত্র বা লবণ বয়কটই বোঝেন নি। তাঁদের কাছে বিদেশি পণ্য, ভাষা, খেতাব, আইন-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনসভা ও প্রতিনিধিমূলক প্রতিষ্ঠান থেকে পদত্যাগ এবং সামাজিক বর্জন ছিল বয়কট আন্দোলনের অঙ্গ।

তিলকের কাছে বয়কট

বাল গঙ্গাধর তিলকের কাছে বয়কট হল একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার, এবং এর দ্বারা ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে।

ছাত্রসমাজের ভূমিকা

  • (১) বয়কট আন্দোলন সফল করতে বাংলার ছাত্ররা পরম উৎসাহের সঙ্গে অগ্রসর হয়। স্বদেশী বাংলার বিশিষ্ট জননায়ক সুরেন্দ্রনাথের মতে, তারা ছিল এই আন্দোলনের ‘স্বনিয়োজিত প্রচারক’।
  • (২) ছাত্রদের চেষ্টায় ‘বয়কট’ আন্দোলন এক প্রত্যক্ষ সংগ্রামে পরিণত হয়। তারা বিদেশি কাগজ-কলমে না লেখার শপথ গ্রহণ করে এবং বিদেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন করে।
  • (৩) বিদেশি লবণ, চিনি, কাপড়, মদ ও বিদেশি পণ্যাগারের সামনে তারা পিকেটিং শুরু করে। বিদেশি দ্রব্যে অগ্নিসংযোগ করা চলতে থাকে। ১৭ই ও ১৮ই জুলাই কলকাতার রিপন কলেজে (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) এক ছাত্র সমাবেশে ছাত্র সমাজ বয়কটের শপথ গ্রহণ করে।
  • (৪) ২৩শে ও ২৪শে জুলাই যথাক্রমে হিন্দু হস্টেল ও গোলদীঘিতে ছাত্র সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৩১শে জুলাই কলকাতার সমস্ত কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিদের নিয়ে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটি’ গঠিত হয়।
  • (৫) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ই আগস্ট কলকাতার টাউন হলে এক ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ এই সভায় যোগদান করে। কলেজ স্কোয়ার থেকে মিছিল করে পাঁচ হাজার ছাত্র এই সভায় যোগদান করে।
  • (৬) ছাত্রদের উদ্যোগেই এই আন্দোলন সফলতা অর্জন করে। তাই ছাত্রদের আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে সরকার নানা দমনমূলক নীতি গ্রহণ করে।
  • (৭) আন্দোলনে যোগদানের অপরাধে ছাত্রদের ওপর জরিমানা চাপানো হয়, তাদের বৃত্তি বন্ধ করা হয়, স্কুল থেকে বিতাড়িত করা হয়—এমনকী স্কুলের সরকারি অনুদান ও সরকারি অনুমোদন বাতিল করা হয়।

নারীসমাজের ভূমিকা

  • (১) বাংলার নারীসমাজও এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। গ্রাম-গঞ্জ-শহর সর্বত্রই তাঁরা মিহি বিলিতি শাড়ি ছেড়ে তাঁতের মোটা কাপড় ব্যবহার করতে শুরু করেন, কাঁচেরচুড়ি খুলে ফেলেন এবং রান্নাঘরে বিদেশি লবণের প্রবেশ নিষিদ্ধ হয়।
  • (২) এই প্রথম বাংলার মেয়েরা পর্দা ত্যাগ করে সভা, সমিতি, শোভাযাত্রা ও পিকেটিং-এ অংশগ্রহণ করেন। এই সব মহিলাদের মধ্যে সরলাদেবী চৌধুরানী, হেমাঙ্গিনী দাস, লীলাবতী মিত্র, কুমুদিনী বসু, সুবালা আচার্য, নির্মলা সরকার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন।
  • (৩) কলকাতার এক মহিলা সভায় নাটোরের মহারানি সভানেত্রী হয়ে বর্জন নীতি সমর্থন করেন। নদিয়ার মঙ্গলগঞ্জের জমিদার লক্ষ্মণচন্দ্র আশের বিধবা পত্নী, জলপাইগুড়িতে অম্বুজাসুন্দরী দাশগুপ্ত, ময়মনসিংহে পুণ্যলতা গুপ্তার সভানেত্রীত্বে সভা হয়।
  • (৪) কাশীতে সুশীলা বসু এবং কলকাতায় ডাক্তার সুন্দরীমোহন দাসের পত্নী হেমাঙ্গিনী দাস প্রকাশ্য জনসভায়ভাষণ দেন।ছ’বছরের রুগ্‌ণ বালিকা বিদেশি ওষুধ স্পর্শ করতে আপত্তি জানায়।

বিভিন্ন স্তরের মানুষের ভূমিকা

ময়মনসিংহের মুচিরা বিদেশি জুতো সারাতে, ফরিদপুর ও কালীঘাটের ধোপারা বিলিতি কাপড় কাচতে, বরিশালের রাঁধুনিরা রান্নায় বিদেশি দ্রব্য ব্যবহার করতে অস্বীকার করে। পুরোহিত সমাজ বলেন যে, বিদেশি বস্ত্র ব্যবহার করলে তাঁরা বিবাহে পৌরোহিত্য করবেন না। ব্রাহ্মণ পণ্ডিতরা ঘোষণা করেন যে, বিলিতি লবণ ও চিনি ব্যবহার শাস্ত্র-বিরোধী।

শ্রমিক আন্দোলন

  • (১) কৃষক ও শ্রমিকরা তেমন সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে যোগ না দিলেও জাতীয়তাবাদী নেতৃবৃন্দ শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ডঃ সুমিত সরকার-এর গবেষণা থেকে জানা যায় যে, ১৯০৩ থেকে ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কলকাতা ও তার সন্নিহিত অঞ্চলে যে সব শ্রমিক ধর্মঘট হয় স্বদেশী নেতৃবৃন্দ তা সমর্থন করেন।
  • (২) ডঃ আদিত্য মুখোপাধ্যায় বলেন যে, “১৯০৩-০৮ সালের স্বদেশী আন্দোলন ছিল শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে এক সুস্পষ্ট দিক্‌চিহ্ন।”অর্থনৈতিক দাবি দাওয়ার সঙ্গে রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষার সংযুক্তি এই যুগের শ্রমিক আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য।
  • (৩) এই আন্দোলন ঘনিষ্ঠভাবে রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। এই সময়ের শ্রমিক নেতা হিসেবে তিন ব্যারিস্টার অশ্বিনীকুমার বন্দ্যোপাধায়, প্রভাতকুমার রায়চৌধুরী, অপূর্বকুমার ঘোষ এবং একটি ছোট ছাপাখানার মালিক প্রেমতোষ বসু-র নাম উল্লেখযোগ্য।
  • (৪) এই সময় হাওড়ার বার্ন কোম্পানি, কলকাতা কর্পোরেশন, কলকাতার ট্রাম কোম্পানি, সরকারি ছাপাখানা, চটকল, পূর্ব রেলের কেরানি ও গার্ডদের ধর্মঘট উল্লেখযোগ্য।
  • (৫) ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে হাওড়ার বার্ন আয়রন ওয়ার্কস-এর কর্মীদের ধর্মঘট হল স্বদেশী যুগে বাংলার শ্রমিকদের প্রথম ধর্মঘট। রেল-শ্রমিকদের আন্দোলনে চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিনচন্দ্র পাল, শ্যামসুন্দর চক্রবর্তী, লিয়াকত হোসেন প্রমুখ নেতৃবৃন্দ যোগদান করেন।
  • (৬) ১৯০৫ থেকে ১৯০৮খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বাংলায় ৩৭টি চটকলে ধর্মঘট হয়। বাংলা ছাড়া মাদ্রাজ, বোম্বাই, কানপুর প্রভৃতি স্থানেও বিভিন্ন শিল্প-ধর্মঘট চলতে থাকে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে তিলকের গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডের পর বোম্বাইয়ে শ্রমিক আন্দোলন ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে।

মুসলিম সমাজের ভূমিকা

হিন্দু-মুসলিম বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বঙ্গভঙ্গ করা হলেও বহু শিক্ষিত মুসলিম এবং অশিক্ষিত কৃষক ঐক্যবদ্ধভাবে হিন্দুদের সঙ্গে এই আন্দোলনে অবতীর্ণ হন।

  • (১) ব্যারিস্টার আবদুল রসুল, বিশিষ্ট জননায়ক মৌলবি লিয়াকত হোসেন, মৌলবি আবুল কাশেম, সিরাজগঞ্জের মৌলবি ইসমাইল সিরাজি, ধনী ব্যবসায়ী আবদুল হালিম গজনভি, ঢাকা নবাব পরিবারের খাজা আতিকুল্লা, আবদুল গফুর সিদ্দিকী, দীন মহম্মদ, বগুড়ার জমিদার আবদুল শোভান চৌধুরি, দেদারবক্স, মৌলানা আক্রাম খাঁ প্রমুখ বিশিষ্ট মুসলিম নেতৃবৃন্দ সক্রিয়ভাবে এই আন্দোলনে যোগদান করেন।
  • (২) মুসলিম নেতৃমণ্ডলীর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন বর্ষীয়ান বিহারি নেতা মৌলবি লিয়াকত হোসেন। সরকারি নিপীড়ন, কারাবাস ও চরম দারিদ্র সত্ত্বেও অনেকের কাছেই তিনি ছিলেন দেশপ্রেম ও ক্ষাত্রধর্মের প্রেরণা-স্বরূপ। জন্মসূত্রে বিহারি হলেও বাংলাই ছিল তাঁর স্বদেশ।
  • (৩) সেন্ট্রাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন-এর পক্ষ থেকে বঙ্গভঙ্গের নিন্দা করা হয়। নানা স্থানে বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী সভা-সমিতি অনুষ্ঠিত হয়। আবদুল হালিম গজনভি ইউনাইটেড বেঙ্গল স্টোর্স’ খুলে যশস্বী হন। গজনভি ও বগুড়ার নবাব যৌথভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বেঙ্গল হোসিয়ারি কোম্পানি’।
  • (৪) চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বেঙ্গল স্টিম নেভিগেশন কোম্পানি”। মৌলবি মুজিবর রহমান ‘দি মুসলমান’ নামক ইংরেজি পত্রিকা প্রকাশ করে সকলকে সাম্প্রদায়িকতা বর্জন করে আন্দোলনে যোগদানের আহ্বান জানান। ‘সোলতান’ পত্রিকাও অনুরূপ ভূমিকা পালন করে।
  • (৫) ময়মনসিংহ, বরিশাল, শ্রীরামপুর প্রভৃতি স্থানে মসজিদে মসজিদে বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নামাজ পাঠের আয়োজন করা হয়। গ্রামে-গঞ্জে বহু মুসলিম ছাত্র ও যুবক স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব গ্রহণ করে।
  • (৬) ১৯০৫ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর কলকাতার রাজাবাজারে ব্যারিস্টার আবদুল রসুলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বিশাল জনসভায় মুসলিম সমাজ ‘স্বদেশী’ ও ‘বয়কটের’ প্রতি সমর্থন জানায়। ‘কার্লাইল সার্কুলার’-এর বিরুদ্ধে আবদুল রসুল একটি জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে উদ্যোগী হন।
  • (৭) ‘বঙ্গীয় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ’ গঠিত হলে তার ৭৬ জন সদস্য ছিলেন মুসলিম। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে বরিশালে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের সভাপতির ভাষণে আবদুল রসুল বলেন যে, “হিন্দু ও মুসলমান, আমাদের উভয়ের একই মাতৃভূমি—বাংলাদেশ।”
  • (৮) বলা বাহুল্য, এর বিপরীত চিত্রও আছে। পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের বহু শিক্ষিত ও অশিক্ষিত মুসলিম বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানান। তাঁদের কাছে বঙ্গভঙ্গ ছিল মুসলিম সমাজের উন্নতি ও নতুন চাকরির সুযোগ।
  • (৯) পূর্ববঙ্গের ‘হানাফি, ইসলাম প্রচারক’ এবং ‘মিহির ও সুধাকর’ পত্রিকা বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানায়। ঢাকার নবাব সলিমুল্লা, ময়মনসিংহের নবাব আলি চৌধুরি, কলকাতার নবাব সৈয়দ আমির হোসেন এবং বহু মৌলবি, মোল্লা, মুনশি ও গ্রাম বাংলার দরিদ্র কৃষক সমাজ বঙ্গ ভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানান।

‘বয়কট’ আন্দোলনের সাফল্য

  • (১) সূচনা পর্বে বয়কট আন্দোলন যে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছিল, সে ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। ১৯০৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ১৯০৫ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাংলার মফস্বল অঞ্চলে বিলিতি বস্ত্রের বিক্রি প্রায় ১৫% হ্রাস পায়।
  • (২) ১৯০৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর কলকাতার মারোয়াড়ি বণিকসভা ম্যাঞ্চেস্টার বণিকসভাকে টেলিগ্রাম করে জানায় যে, বিলিতি কাপড়ের বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। দু-চার দিনের মধ্যে বঙ্গভঙ্গ রহিত না হলে পূজোয় বিলিতি কাপড় বিক্রি হবে না— সুতরাং তারা যেন ভারত সচিবের ওপর চাপ দিয়ে বঙ্গভঙ্গ প্রস্তাব বাতিলের ব্যবস্থা করেন।
  • (৩) কলকাতার শুল্ক-সংগ্রাহক (Collector of Customs) ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে প্রেরিত বিগত এক বছরের গোপন রিপোর্টে জানান যে, এই সময় বিলিতি লবণ, সুতোর কাপড়, বিদেশি জুতো ও সিগারেটের আমদানি যথেষ্ট পরিমানে হ্রাস পায়।
  • (৪) ডঃ সুমিত সরকারের লেখা থেকে জানা যায় যে, ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে বিগত বৎসরের তুলনায় সুতিবস্ত্রের আমদানি ২২%, কাপড় বোনার সুতোর আমদানি ৪৪%, লবণ ১১%, সিগারেট ৫৫% এবং চামড়ার জুতোর আমদানি ৬৮% কমে যায়।

বয়কটের ব্যর্থতার কারণ

এ কথা স্পষ্টই বলা যায় যে, বয়কট আন্দোলন বিশেষ সফল হয় নি এবং কালক্রমে তা ভেঙ্গে পড়ে। এই ব্যর্থতার জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করা যায়। যেমন –

  • (১) নেতৃবৃন্দ জানতেন যে, বয়কট আন্দোলনের সাফল্য সম্ভব নয় এবং বিদেশি দ্রব্যের পুরোপুরি বয়কটও অসম্ভব।
  • (২) বাংলার বাইরে একমাত্র মহারাষ্ট্র ছাড়া বয়কটের আদর্শ আর কোথাও আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করা হয় নি।
  • (৩) স্বদেশী দ্রব্য—বিশেষত তাঁত ও মিলের কাপড়ের সরবরাহ ছিল যৎসামান্য এবং তা দিয়ে জনগণের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব ছিল না।
  • (৪) স্বদেশী বস্ত্র ছিল নিম্নমানের ও মোটা এবং তার দামও ছিল বেশি। গরিব মানুষের পক্ষে তা কেনা সম্ভব ছিল না।
  • (৫) শিক্ষিত মধ্যবিত্তরাই বয়কটের সমর্থক ছিল — গরিব মানুষ এই নিয়ে মাথা ঘামাত না। তাই বিদেশি বস্ত্র, জুতো, সিগারেট প্রভৃতির ক্ষেত্রে বয়কট সফল হলেও সাধারণ মানুষের নিত্যব্যবহার্য দ্রব্যাদির ক্ষেত্রে বয়কট সফল হয় নি।
  • (৬) ইংরেজের ‘গোলামখানা’ সরকারি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বয়কটও সফল হয় নি, কারণ চাকরির বাজারে ‘জাতীয় বিদ্যালয় -গুলির কোনও মূল্য ছিল না।

উপসংহার:- বয়কট বা বর্জন নীতি সব স্তরের মানুষকে প্রভাবিত করেছিল।বিলাতি পণ্যসম্ভারের বয়কট বা বর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে ইংরেজ নাগরিকদের বিরুদ্ধেও সামাজিক বয়কট শুরু হয়েছিল।

(FAQ) বয়কট সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. বঙ্গভঙ্গ বা স্বদেশী আন্দোলনের কটি ধারা কী কী?

তিনটি- স্বদেশী, বয়কট ও জাতীয় শিক্ষা।

২. বয়কট কথার অর্থ কী?

বিলাতি দ্রব্য বর্জন।

৩. কে, কোন পত্রিকায় প্রথম বয়কটের কথা ঘোষণা করেন?

কৃষ্ণকুমার মিত্র তাঁর সঞ্জীবনী পত্রিকায়।

Leave a Reply

Translate »