প্রত্যক্ষ সংগ্রাম

প্রত্যক্ষ সংগ্রাম -এর সময়কাল, পটভূমি হিসেবে নেহরুর মন্তব্য, নেহরুর মন্তব্যের সমালোচনা, লীগের মন্ত্রী মিশন প্রত্যাহার, প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক, জওহরলাল নেহেরুকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে আহ্বান, প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের আহ্বান, বীরোচিত কাজ, লীগের ছুটি ঘোষণা, প্রধানমন্ত্রীর হুমকি, লীগের ক্ষোভ প্রকাশ, নিহত ও আহত, কলকাতা হত্যাকাণ্ড, ব্রিটিশের নামে কলঙ্ক, সুরাবর্দীকে আক্রমণ, অন্নদাশঙ্কর ও আজাদের অভিমত সম্পর্কে জানবো।

Table of Contents

প্রত্যক্ষ সংগ্রাম

সময়কাল১৬-২০ আগস্ট ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ
ঘোষণামহম্মদ আলি জিন্না
বাংলার প্রধানমন্ত্রীহোসেন শহীদ সুরাবর্দী
নিখিল ভারত কংগ্রেস অধিবেশনবোম্বাই
প্রত্যক্ষ সংগ্রাম

ভূমিকা:- ক্যাবিনেট মিশনের ভারত-ত্যাগের পর ১৯৪৬ সালের ৬-৭ই জুলাই বোম্বাইয়ে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির সভা বসে এবং সেখানে মন্ত্রী মিশন পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়।

প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পটভূমি

প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পটভূমি ছিল নিম্নরূপ –

(১) নেহেরুর মন্তব্য

বোম্বাই অধিবেশনে জওহরলাল নেহরু জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হন। এই অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি মন্ত্রী মিশন ও প্রস্তাবিত অন্তবর্তী সরকার সম্পর্কে এমন একটি মন্তব্য করেন, যার ফলেমুসলিম লীগ প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয় এবং কংগ্রেসের মনোভাব সম্পর্কে তাদের মনে প্রবল সন্দেহ দেখা দেয়।

(২) নেহেরুর মন্তব্যের সমালোচনা

নেহরুর বিবৃতিকে আজাদ একটি ‘মারাত্মক ভুল’ বলে অভিহিত করেন, “যে ঘটনা ইতিহাসের মোড় ফিরিয়ে দিয়েছে”। প্যাটেল এই ঘটনাকে জওহরলালের “আবেগপূর্ণ উন্মত্ততার”লক্ষণ বলে অভিহিত করেন।

(৩) লীগের মন্ত্রী মিশন প্রত্যাহার

২৯শে জুলাই মুসলিম লীগ মন্ত্রী মিশন থেকে তাদের পূর্ব-অনুমোদন প্রত্যাহার করে নেয়এবং অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানে অসম্মতি জানায়।

প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক

‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার হয় এবং “পাকিস্তান আদায় ও বর্তমানের ইংরেজ দাসত্ব ও সম্ভাব্য হিন্দু-প্রাধান্যের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার উদ্দেশ্যে প্রত্যক্ষ সংগ্রামের” ডাক দেয়।

ভারত ভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার

এইভাবে ভারতকে অখণ্ড রেখে স্বাধীন করার শেষ সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে গেল। ১৯৪৬ এর জুলাইয়ের পর ভারত-ভাগ শুধু সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।

জওহরলালকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনে আহ্বান

৬ ই আগস্ট বড়লাট ওয়াভেল কংগ্রেস সভাপতি জওহরলালকে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানালেন এবং জিন্নাকেও লীগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানানো হয়।

নিয়মমাফিকভাবে সরকার গঠনে আহ্বান

কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ১২ই আগস্ট বড়লাট জওহরলালকে নিয়মমাফিকভাবে সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানান।

প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস পালনের আহ্বান

অন্তবর্তী সরকার গঠিত হচ্ছেই এবং দর-কষাকষি করে আর দাবি আদায় সম্ভব নয় দেখে ক্ষুব্ধ জিন্না ১৪ই আগস্ট এক বিবৃতি মারফৎ মুসলিম সমাজকে ১৬ই আগস্ট ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’ পালনের আহ্বান জানান।

বীরোচিত কাজ

ইতিপূর্বে ২৯শে জুলাই লীগের সভার সমাপ্তি ভাষণে (যেসভায় প্রত্যক্ষ সংগ্রামের-এর প্রস্তাব পাশ হয়) জিন্না বলেন যে, “আজকের সভায় আমরা যা করলাম তা আমাদের ইতিহাসে সবচেয়ে বীরোচিত কাজ।

সংবিধান ও সাংবিধানিক পদ্ধতিকে বিদায়

জিন্না বলেন যে, এতদিন আমরা সাংবিধানিক পদ্ধতি ব্যতীত অন্য কোনো পন্থা গ্রহণ করিনি। কিন্তু এখন আমরা সংবিধান ও সাংবিধানিক পদ্ধতিতে বিদায় জানাচ্ছি।

লীগের ছুটি ঘোষণা

এই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম পরিচালিত হল হিন্দুদের বিরুদ্ধে। তখন বাংলা ও সিন্ধু প্রদেশে মুসলিম লীগের সরকার ছিল। তারা ঐ দিন ছুটি ঘোষণা করে।

প্রধানমন্ত্রীর হুমকি

বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সুরাবর্দী হুমকি দেন যে, কংগ্রেস অন্তবর্তী সরকারে যোগ দিলে রক্তগঙ্গা বইবে।

লীগের ক্ষোভ প্রকাশ

স্থির ছিল যে মুসলিম লীগ ঐ দিন সভা-সমিতি ও মিছিলের মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করবে, কিন্তু সরকারের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও সাহায্যে পুলিশ ও প্রশাসনকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে রেখে কলকাতায় শুরু হয় ব্যাপক লুণ্ঠন, ধর্ষণ, দাঙ্গা, গৃহে অগ্নি সংযোগ ও বীভৎস হিন্দু নিধনযজ্ঞ।

নিহত ও আহত

লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ ধ্বনি তুলে লীগ-সমর্থকরা নির্বিচারে হিন্দু হত্যায় মেতে ওঠে। চারদিনের (১৬ ১৯শে আগস্ট) এই দাঙ্গায় ৫ হাজার নিহত ও ১৫০০ আহত হয় এবং ১ লক্ষ লোকের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়।

মোসলের অভিমত

ইংরেজ ঐতিহাসিক মোসলে (L. Mosley)-র মতে, এই কয়দিনে কলকাতার ছয় হাজার লোক ছোরা, বন্দুক, লাঠি ও অগ্নিদাহে নিহত এবং বিশ হাজার নারী বর্ণিত ও বিকলাঙ্গ হয়।

প্রবাসী পত্রিকার অভিমত

‘প্রবাসী’ পত্রিকার মতে ছয় থেকে আট হাজার লোক নিহত হয়, পনেরো থেকে কুড়ি হাজার আহত হয় এবং প্রায় পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকার সম্পত্তি লুণ্ঠিত হয়।

কলকাতা হত্যাকাণ্ড

‘স্টেটসম্যান’ পত্রিকা এই ঘটনাকে “The Great Calcutta Killing” বা “কলকাতা হত্যাকাণ্ড’ বলে আখ্যায়িত করে সমস্ত ঘটনার জন্য সুরাবর্দীকে দায়ী করে।

ব্রিটিশের নামে কলঙ্ক

বাংলার গভর্নর এবং ভারতের বড়লাটও সেদিন তাঁদের দায়িত্ব পালনে অক্ষম হয়ে ব্রিটিশের নামে কলঙ্ক লেপন করেন।

সুরাবর্দীকে আক্রমণ

বাংলার আইন পরিষদে বিতর্ক কালে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় গুণ্ডাদের হাতে কলকাতাকে ছেড়ে দিয়ে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার জন্য সুরাবর্দীকে তাঁর ভাষায় আক্রমণ করলে, সুরাবর্দী তাঁকে ‘গুণ্ডা’ বলেন।

গুণ্ডাদের সর্দার

সুরাবর্দীর গুণ্ডা অ্যাখ্যার উত্তরে শ্যামাপ্রসাদ বলেন যে,“আমি গুণ্ডা হতে পারি, কিন্তু আপনি গুন্ডাদের সর্বার — the Prince of the goondas.

অন্নদাশঙ্করের অভিমত

বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অন্নদাশঙ্কর রায় সুরাবর্দীকে ‘গুণ্ডাদের মন্ত্রণাদাতা’ এবং বিশিষ্ট কমিউনিস্ট নেত্রী মণিকুন্তলা সেন ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশনের জেনারেল’ বলে অভিহিত করেন।

আজাদের অভিমত

মৌলানা আজাদ লিখছেন “ভারতের ইতিহাসে ১৬ই আগস্ট ছিলএক কলঙ্কময় দিন। হিংসান্মত্ত জনতা যেভাবে কলকাতা মহানগরীতে রক্তগঙ্গা, নরহত্যা আর সন্ত্রাসের ঢল বইয়ে দিল, সে জিনিস ভারতের ইতিহাসে আগে কখনও হয় নি।

গৃহদাহ

শ’য়ে শ’য়ে মানুষ মারা গেল। জখম হল হাজার হাজার লোক এবং কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি বিনষ্ট হল। লীগের বার করা মিছিল লুটপাট আর গৃহদাহে মেতে উঠল। দেখতে দেখতে সারা শহর উভয় সম্প্রদায়ের গুণ্ডাদের হাতে চলে গেল।

উপসংহার:- মৌলানা আজাদবলেন যে, এই ঘটনা ইতিহাসের মোড় একেবারে ঘুরিয়ে দিল এবং কংগ্রেস ও লীগের মধ্যে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার সকল চেষ্টা তিরোহিত হল। ক্রমে এই আগুন ছড়িয়ে পড়ল বোম্বাই, পূর্ববঙ্গ, বিহার, পাঞ্জাব, যুক্তপ্রদেশ, দিল্লী সর্বত্র।

(FAQ) প্রত্যক্ষ সংগ্রাম সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কলকাতায় প্রত্যক্ষ সংগ্রাম কখন হয়?

১৬-২০ আগস্ট ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ।

২. প্রত্যক্ষ সংগ্রামের ডাক দেন কে?

মহম্মদ আলি জিন্না।

৩. প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সময় বাংলার প্রধানমন্ত্রী কে ছিলেন?

হোসেন শহীদ সুরাবর্দী।

৪. প্রত্যক্ষ সংগ্রামের সময় ভারতের বড়লাট কে ছিলেন?

লর্ড ওয়াভেল।

Leave a Reply

Translate »