অনুশীলন সমিতি

বিপ্লবী আন্দোলনকালে অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা, নামকরণ, সমিতির আখড়া স্থাপন, প্রমথনাথ মিত্রের যোগদান, যতীন্দ্রনাথের গুপ্ত সমিতি, দুই সমিতির সংযুক্তি, ভগিনী নিবেদিতার যোগদান, সমিতির কাজকর্ম, ইতিহাস, ধর্মগ্ৰন্থ পাঠ, সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠান ও ঢাকা অনুশীলন সমিতি সম্পর্কে জানবো।

অনুশীলন সমিতি

ধরণগুপ্ত সমিতি
প্রতিষ্ঠাতাসতীশচন্দ্র বসু
প্রতিষ্ঠাকাল১৯০২ খ্রিস্টাব্দ
সভাপতিপ্রমথনাথ মিত্র (পি. মিত্র)
সহ সভাপতিচিত্তরঞ্জন দাশ ও অরবিন্দ ঘোষ
অনুশীলন সমিতি

সূচনা:- মহারাষ্ট্রে বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা হলেও বাংলা ছিল তার প্রাণকেন্দ্র। বঙ্কিমচন্দ্র ও স্বামী বিবেকানন্দের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশমাতৃকার মুক্তির উদ্দেশ্যে বাংলার তরুণ দল বিপ্লবী আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

বিপ্লববাদী আন্দোলনের সূচনা

বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিপ্লববাদী আন্দোলন বাংলায় সুসংহত রূপ ধারণ করলেও, বাংলায় এর সূচনা হয়েছিল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পর থেকেই।

বিপ্লববাদী কার্যকলাপের প্রস্তুতি শুরু

জাতীয়তার পিতামহ রাজনারায়ণ বসুর অনুপ্রেরণা এবং নবগোপাল মিত্রের হিন্দু মেলার উদ্যোগে ব্যায়াম ও শরীরচর্চার মাধ্যমে বাংলার যুবসমাজের মধ্যে বিপ্লববাদী কার্যকলাপের প্রস্তুতি শুরু হয়।

ব্যায়াম চর্চার আখড়া স্থাপন

বিপ্লবী কার্যকলাপের উদ্দেশ্যে বর্তমান কলকাতা বিদ্যাসাগর কলেজের অতি-সন্নিকটে ১ নং শঙ্কর ঘোষ লেনে নবগোপাল মিত্র একটি ব্যায়ামচর্চার আখড়া স্থাপন করেন। বিপিনচন্দ্র পালের রচনা থেকে জানা যায় যে, তাঁর কলেজ-জীবনে তিনি এই আখড়ার সদস্য ছিলেন।

জীবন স্মৃতি গ্ৰন্থে সমিতির উল্লেখ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জীবন স্মৃতি’ থেকে একটি গুপ্ত সমিতির কথা জানা যায়, যার সভাপতি ছিলেন স্বয়ং রাজনারায়ণ বসু। রবীন্দ্রনাথ এই সমিতির সভ্য হন। তিনি লিখছেন—“কলিকাতার এক গলির মধ্যে এক পোড়ো বাড়িতে সেই সভা বসিত। দ্বার আমাদের রুক্ষ, ঘর আমাদের অন্ধকার, দীক্ষা আমাদের ঋকমন্ত্রে।”

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মন্তব্য

এই সব সমিতি অনেকটাই ছিল ছেলেখেলার মতো। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, “এই সভা বীরত্বের প্রহসন মাত্র অভিনয় করিতেছিল। অভিনয় সাঙ্গ হইয়া গিয়াছে, ফোর্ট উইলিয়মের একটি ইষ্টকও খসে নাই।”

অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা

১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ২৪শে মার্চ ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘অনুশীলন তত্ত্বের’ আদর্শে সতীশচন্দ্র বসু কলকাতায় বাংলার প্রথম বিপ্লবী-কেন্দ্র ‘অনুশীলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠা করেন।

নামকরণ

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ গ্রন্থ থেকে নামটি নেওয়া হয় এবং সমিতির এই নামকরণ করেন। নিউ ইণ্ডিয়ানস্কুলের প্রধান শিক্ষক নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য।

সমিতির আখড়া স্থাপন

লাঠিখেলা ও শরীরচর্চার মাধ্যমে দেশে ক্ষাত্রশক্তি বিস্তারের উদ্দেশ্যে কলকাতার মদন মিত্র লেনে সমিতির একটি আখড়া স্থাপিত হয়।

প্রমথনাথ মিত্রের যোগদান

সতীশচন্দ্র বসুর অনুরোধে কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার ও নৈহাটির বাসিন্দা প্রমথনাথ মিত্র (পি. মিত্র) সমিতির সভাপতির পদ গ্রহণ করেন। বঙ্গীয় বিপ্লববাদের ইতিহাসে পি. মিত্র এক স্মরণীয় পুরুষ।‘অনুশীলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠার পূর্বে তিনি অন্তত চারবার বাংলাদেশে গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন।

যতীন্দ্রনাথের গুপ্ত সমিতি

অনুশীলন সমিতি’ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার এক সপ্তাহ পরে বাংলাদেশে বিপ্লবী গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠার জন্য বরোদা থেকে অরবিন্দ ঘোষ যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতায় পাঠান। ১০৮ সি, আপার সার্কুলার রোডে যতীন্দ্রনাথের গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়।

দুই সমিতির সংযুক্তি

দুই সমিতিরই উদ্দেশ্য ছিল দৈহিক, মানসিক ও চারিত্রিক উন্নতি সাধন করে সশস্ত্র পথে ভারতের স্বাধীনতা অর্জন। এই কারণে দুই সমিতি যুক্ত হয়ে যায় এবং পি. মিত্র এই সম্মিলিত দলের সভাপতি, চিত্তরঞ্জন (দেশবন্ধু) দাশ ও অরবিন্দ ঘোষ, সহ-সভাপতি এবং সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুর কোষাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।

ভগিনী নিবেদিতার যোগদান

স্বামী বিবেকানন্দের শিষ্যা আইরিশ-দুহিতা ভগিনী নিবেদিতা-ও এই সমিতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তখন ‘অনুশীলন সমিতি’ বলতে পি. মিত্রের পরিচালনাধীন উভয় দলকেই বোঝাত।

সমিতির কাজকর্ম

সমিতির কাজকর্ম পরিচালনার জন্য চিত্তরঞ্জন দাশ ও অরবিন্দ ঘোষ প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন। সমিতির সদস্যদের নিয়মিত ব্যায়াম, মুষ্টিযুদ্ধ, লাঠি-খেলা, সাঁতার কাটা, অশ্বারোহণ ও অসিচালনার পাঠ নিতে হত।

ইতিহাস ও ধর্মগ্ৰন্থ পাঠ

মানসিক ও নৈতিক উন্নতির জন্য তাদের দেশ-বিদেশের ইতিহাস ও নানা ধর্মগ্রন্থ পাঠ করতে হত। গীতা ও আনন্দমঠ ছিল তাদের অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ।

খ্যাতনামা ব্যক্তিদের যোগদান

রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী সারদানন্দ এখানে গীতার ক্লাস নিতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, বিপিনচন্দ্র পাল, রাসবিহারী ঘোষ প্রমুখ সমিতির বিভিন্ন আলোচনা সভায় যোগদান করতেন।

সমিতির শাখা প্রতিষ্ঠা

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিপ্লবীরা অধিকতর সক্রিয় হয়ে ওঠে। হাওড়া, শালকিয়া, বালি, শিবপুর, উত্তরপাড়া, শ্রীরামপুর, বর্ধমান, ত্রিপুরা, ঢাকা, রংপুর, দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, রাজসাহী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ফরিদপুর, কটক ও কলকাতার বিভিন্ন স্থানে ‘অনুশীলন সমিতি’-র শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়।

ঢাকা অনুশীলন সমিতি

১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে কেবলমাত্র ‘অনুশীলন সমিতি’-র ঢাকা কেন্দ্রের অধীনেই কমপক্ষে ৫০০টি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রধান পরিচালক ছিলেন পুলিনবিহারী দাস।

অন্যান্য গুপ্ত সমিতি

অনুশীলন সমিতিছাড়াও এই সময় বাংলাদেশের নানা স্থানে একাধিক গুপ্ত সমিতি গড়ে ওঠে। এগুলির মধ্যে ময়মনসিংহের ‘সাধনা সমিতি’ ও ‘সুহৃদ সমিতি’, ফরিদপুরের ‘ব্রতী সমিতি’, ঢাকার ‘মুক্তিসঙ্গ’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

উপসংহার:- ১৯০৫-০৬ সালে বিপ্লবী সমিতিগুলির প্রভাব এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় পি. মিত্রের সভাপতিত্বে বাংলার বিপ্লবী দলগুলির এক মহাসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে বিভিন্ন বিপ্লবী দলগুলির মধ্যে ঐক্য ও সংহতি বৃদ্ধি পায়।

(FAQ) অনুশীলন সমিতি সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. কে, কবে অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন?

সতীশচন্দ্র বসু ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে।

২. অনুশীলন সমিতির সভাপতি কে ছিলেন?

প্রমথনাথ মিত্র বা পি মিত্র।

৩. ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রধান পরিচালক কে ছিলেন?

পুলিনবিহারী দাস।

৪. অনুশীলন সমিতিতে গীতার ক্লাস নিতেন কে?

রামকৃষ্ণ মিশনের স্বামী সারদানন্দ।

Leave a Reply

Translate »