আনন্দমঠ উপন্যাস

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত আনন্দমঠ উপন্যাস -এর রচনাকাল, পটভূমি, সংক্ষিপ্ত কাহিনী, স্বদেশ প্রেমের গীতা, জাতীয় গান বন্দেমাতরম্ -এর অর্থ ও ভারতে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে আনন্দমঠ উপন্যাসের ভূমিকা সম্পর্কে জানবো।

আনন্দমঠ উপন্যাস

লেখকবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ভাষাবাংলা
ধরণউপন্যাস
প্রকাশকাল ১৮৮২
আনন্দমঠ উপন্যাস

ভূমিকা :- উনিশ শতকে ভারতীয় জাতীয়তাবোধের জাগরণে যেসব ব্যক্তি প্রখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

স্বদেশ প্রেমের গীতা

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি রচনার মধ্য দিয়ে ভারতবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তুলেন। এজন্য উপন্যাসটি ‘স্বদেশপ্রেমের গীতা’ নামে পরিচিত।

গ্রন্থের রচনাকাল

১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসটি রচনা করেন।

পটভূমি

সন্ন্যাসী-ফকির বিদ্রোহ ও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পটভূমিকে কেন্দ্র করে এই উপন্যাসটি রচিত হয়।

বন্দেমাতরম মন্ত্রের অর্থ

এই উপন্যাসটিতে বন্দে মাতরম্ গানটি গাওয়া হয়েছে। বন্দেমাতরমের অর্থ “মা, আমি তোমাকে প্রণাম করি মা”। 

ভারতের জাতীয় গান

বন্দেমাতরম মন্ত্র বিংশ শতাব্দীতে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জাগিয়ে তোলে এবং এর প্রথম দুটি স্তবক স্বাধীনতার পরে ভারতের জাতীয় গানে পরিণত হয়।

সংক্ষিপ্ত কাহিনী

  • (১) ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের কাহিনী শুরু মহেন্দ্র এবং কল্যাণী নামে এক দম্পতির পরিচয় দিয়ে, যারা দুর্ভিক্ষের সময় খাবার ও জল ছাড়া তাদের গ্রামে আটকে রয়েছে। 
  • (২) পরে তারা তাদের গ্রাম ছেড়ে নিকটতম শহরে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেখানে বেঁচে থাকার ভাল সম্ভাবনা আছে। 
  • (৩) কিন্ত ঘটনাচক্রে এই দম্পতি আলাদা হয়ে যায় এবং ডাকাতদের হাতে ধরা না পড়ার জন্য দৌড়াতে থাকে এবং এক পর্যায়ে নদীর তীরে চেতনা হারায়।
  • (৪) সত্যানন্দ নামে একজন হিন্দু সন্ন্যাসী কল্যাণী ও তার শিশুপুত্রীকে তাঁদের আশ্রমে নিয়ে যান এবং তিনি ও অন্যান্য সন্ন্যাসীরা তার স্বামীর সাথে পুনরায় মিলন না হওয়া পর্যন্ত তার ও তার সন্তানের যত্ন নেন।
  • (৫) স্বামী মহেন্দ্র এই মুহূর্তে সন্ন্যাসীদের আশ্রমে যোগদান এবং মাতৃজাতির সেবা করার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন।  কল্যাণী নিজেকে হত্যা করার চেষ্টা করে তাঁর স্বপ্ন অর্জনে সহায়তা দিতে চায়, যাতে তিনি পার্থিব কর্তব্য থেকে মুক্তি পান। 
  • (৬) এই সময়ে সত্যানন্দ তার সাথে যোগ দেন তবে তিনি তাকে সাহায্য করার আগে তাঁকে ব্রিটিশ সেনারা গ্রেপ্তার করে, কারণ অন্যান্য অনেক সন্ন্যাসী ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূত্রপাত করেছিলেন। 
  • (৭) সত্যানন্দকে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অন্য এক সন্ন্যাসীকে লক্ষ্য করেন যিনি তাঁর সন্ন্যাসীর পোশাকে ছিলেন না। সত্যানন্দ তাঁকে লক্ষ্য করে একটি গান করেন।
  • (৮) অন্য সন্ন্যাসী গানটির অর্থ অনুধাবন করে কল্যাণী এবং শিশুপুত্রীটিকে উদ্ধার করে বিদ্রোহী সন্ন্যাসীদের আস্তানায় নিয়ে যান। একই সাথে কল্যাণীর স্বামী মহেন্দ্রকেও ভিক্ষুরা আশ্রয় দেন।
  • (৯) কল্যাণী ও মহেন্দ্র আবার একত্রিত হয়।  বিদ্রোহীদের নেতা মহেন্দ্রকে ভারত-মাতার (মাদার ইন্ডিয়া) তিনটি মুখ দেখান যে পর পর তিনটি ঘরে তিন দেবীর পূজা করা হচ্ছে – জগদ্ধাত্রী, কালী ও দুর্গা।
  • (১০) ধীরে ধীরে বিদ্রোহী প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং তাদের সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। উৎসাহিত হয়ে তারা তাদের সদর দফতর একটি ছোট ইটের দুর্গে স্থানান্তরিত করে। 
  • (১১) এরপর ব্রিটিশরা একটি বিশাল বাহিনী নিয়ে দুর্গ আক্রমণ করে। বিদ্রোহীরা নিকটবর্তী নদীর উপর ব্রিজ অবরোধ করলেও সামরিক প্রশিক্ষণের অভাব উপলব্ধি করে। 
  • (১২) লড়াইয়ে ব্রিটিশরা সেতুর উপর থেকে কৌশলে পশ্চাদপসরণ করে। ব্রিজটি বিদ্রোহীদের দ্বারা পূর্ণ হয়ে গেলে ব্রিটিশ সরকার গুলি চালিয়ে দেয় এবং অনেকে গুরুতর হতাহত হন।
  • (১৩) কিন্তু বিদ্রোহীরা কিছু কামান দখল করে নিলে ব্রিটিশরা পিছিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। বিদ্রোহীরা তাদের প্রথম যুদ্ধে জয়লাভ করে।
  • (১৪) এরপর মহেন্দ্র এবং কল্যাণী বাড়ি ফিরে আসে। তাদের আবার বাড়ি তৈরির মধ্য দিয়ে উপন্যাসের কাহিনী শেষ হয়েছে। অবশ্য মহেন্দ্র বিদ্রোহীদের সমর্থন অব্যাহত রেখেছিলেন।

ভারতে জাতীয়তাবাদের বিকাশে আনন্দমঠ উপন্যাসের অবদান

ব্রিটিশ শাসনকালে ভারতে জাতীয়তাবাদের উন্মেষে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের আনন্দমঠ উপন্যাস নিঃসন্দেহে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

(১) ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে ভারতের ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি এদেশে ব্রিটিশ শাসনের করুণ অবস্থাটিকে তাঁর রচনায় ফুটিয়ে তোলেন এবং ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে সকল ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান।

(২) দেশকে মা বলে সম্বোধন

‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র স্বদেশভূমিকে ‘মা’ বলে অভিহিত করেছেন। এর ফলে উপন্যাসটি স্বদেশপ্রেমের একটি নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।

(৩) নারীদের প্রতি সম্মান

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে নারী জাতিকে সম্মান করেছেন। কল্যাণী, বীণা প্রভৃতি নারী চরিত্রের জীবনধারা ও সংগ্রামশীল মানসিকতার মধ্যে তিনি সমগ্র নারীজাতির অন্ধকারময় দিকটি তুলে ধরেছেন। এবং ভারতের সমগ্র নারীজাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দিয়েছেন।

(৪) বন্দেমাতরম মন্ত্রের উদ্ভাবন

‘বন্দেমাতরম’ হল ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংগীত, যা পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ‘জাতীয় মন্ত্রে’ পরিণত হয়। বিপ্লবীরা এই মন্ত্র উচ্চারণ করে ফাঁসির দড়ি গলায় পরতে থাকে।

(৫) বন্দেমাতরম মন্ত্রের স্থান

বিপ্লববাদের জননী রূপে পরিচিত ভিকাজি রুস্তমজী কামা (মাদাম কামা) ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে পরাধীন ভারতে ‘জাতীয় পতাকা’ তৈরি করলে সেখানে ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রটি স্থান পায়।

(৬) সন্তান দলের আদর্শ প্রচার

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে একটি সন্তান দলের কল্পনা করেছেন। এই দল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বন্দেমাতরম মন্ত্র নিয়ে কামানের সামনে রুখে দাঁড়ায়। সন্তান দল কল্পনার মধ্য দিয়ে তিনি ভারতবাসীকে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন।

(৭) পাশ্চাত্য শিক্ষার সমালোচনা

বঙ্কিমচন্দ্র তার উপন্যাসে পাশ্চাত্য শিক্ষার সমালোচনা করেছেন। তিনি মনে করেন পাশ্চাত্য শিক্ষা ভারতীয়দের ব্রিটিশ করণিক তৈরি করতে পারবে। কিন্তু এই শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো মানুষই ব্রিটিশ বিরোধিতায় অংশ নেবে না।

(৮) দেশপ্রেমের প্রতিষ্ঠা

বঙ্কিমচন্দ্র সর্বদা দেশকে ঈশ্বর ও মা হিসেবে পুজো করেছেন। তিনি বলতেন- “Patriotism is Religion and Religion is Patriotism.” অর্থাৎ দেশপ্রেমই হল ধর্ম এবং ধর্মই হল দেশপ্রেম।

উপসংহার :-  বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস ব্রিটিশদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ হয়ে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রশংসা করে বিপ্লবী অরবিন্দ ঘোষ তাঁকে ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ঋষি’ বলে অভিহিত করেছেন এবং বলেছেন যে, তিনি শুধু সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, তিনি একটি জাতির সৃষ্টি করেছেন।

(FAQ) আনন্দমঠ উপন্যাস সম্পর্কে জিজ্ঞাস্য?

১. স্বদেশ প্রেমের গীতা নামে পরিচিত কোন উপন্যাস?

আনন্দমঠ উপন্যাস।

২. কোন আন্দোলনের পটভূমিতে আনন্দমঠ উপন্যাস রচিত হয়েছে?

১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে সন্ন্যাসী আন্দোলন।

৩. আনন্দমঠ উপন্যাসের দুটি বিদ্রোহী চরিত্রের নাম কী?

সত্যানন্দ, ভবানন্দ।

৪. আনন্দমঠ উপন্যাসের সন্তানদলের মূল লক্ষ্য কী ছিল?

ইংরেজদের অধীনে থেকে নিষ্কন্টক ধর্মাচরণ বা জ্ঞান লাভ নয়, পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য।

Leave a Reply

Translate »